থাইল্যান্ডে সামরিক আইন জারি

থাইল্যান্ডে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে গত কয়েক মাস ধরে চলা রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সামরিক আইন জারি করেছে সেনাবাহিনী। আজ (মঙ্গলবার) ভোরে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আকস্মিকভাবে এ ঘোষণা দেয়া হয়। সামরিক আইন জারির পর সেনাবাহিনী রাজধানী ব্যাংকের রাস্তায় টহল দিচ্ছে।

সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এটি কোনো অভ্যুত্থান নয়। শান্তি বজায় ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন, “সামরিক শাসনে দেশটির ক্ষমতাসীন অন্তবর্তী সরকারের কাজে কোনো বাধা হবে না। সবকিছুই স্বাভাবিক থাকবে। সেনাবাহিনী কেবল জাতীয় নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে। সামরিক আইন জারির ঘোষণার জনগণের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তারা স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারবে।”

১৯৩২ সালে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে থাইল্যান্ড। এ পর্যন্ত দেশটিতে ১৮টি অভ্যুত্থান বা অভ্যুত্থানের উদ্যোগ হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার সময় দেশটিতে স্থিতিশীলতা আসে। কিন্তু গণবিক্ষোভের মুখে ২০০৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন থাকসিন। পরে তিনি স্বেচ্ছানির্বাসনে যান। ঐ ঘটনার পর থাইল্যান্ডে আরেকটি সরকার আসে। সেই সরকারও বেশি দিন টিকতে পারেনি।

২০১০ সালে ব্যাংককের রাজপথে অবস্থান নেয় থাকসিনের সমর্থকেরা। ২০১১ সালে ক্ষমতায় ফিরে আসে থাকসিন সিনাওয়াত্রার পুয়ে থাই পার্টি। প্রধানমন্ত্রী হন থাকসিনের বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা। অল্প সময়ের জন্য থাইল্যান্ডে স্থিতিশীলতা আসে। ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিন না যেতেই ইংলাক সরকারের বিরোধিতা শুরু হয়।

গত বছরের অক্টোবরে ইংলাক সরকার একটি সাধারণ দায়মুক্তি বিল পার্লামেন্টে পাস করানোর চেষ্টা করে। এ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। বিরোধীরা অভিযোগ করেন, থাকসিনকে নির্বাসিত অবস্থা থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ঐ বিল পাসের উদ্যোগ।

একই বছরের ১ নভেম্বর নিম্নকক্ষে বিলটি পাস হয়। পরে আন্দোলনের মুখে উচ্চকক্ষে তা বাতিল হয়। ৮ ডিসেম্বর প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্যরা পার্লামেন্ট থেকে গণহারে পদত্যাগ করেন। বিক্ষোভের মুখে গত বছরের ডিসেম্বরে পার্লামেন্ট ভেঙে দেন ইংলাক। একই সঙ্গে ২ ফেব্রুয়ারি আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন তিনি। ঐ সময় থেকে তিনি দেশের অন্তবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তবে, নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহতের ঘোষণা দেয় বিরোধীরা। আন্দোলনের মধ্যেও ২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে ভোট গ্রহণ করা হয়। দেশটির সাংবিধানিক আদালত গত ২১ মার্চ ঐ নির্বাচন বাতিল করেন।

২০১১ সালে থাইল্যান্ডের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান থাবিল প্লিয়েনশ্রিকে বদলি করেছিল ইংলাক সরকার। তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা হয় ইংলাকের একজন আত্মীয়কে। ঐ  ঘটনায় ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে ইংলাক ও তাঁর ৯ জন মন্ত্রীকে গত ৭ এপ্রিল বরখাস্ত করেছেন দেশটির সাংবিধানিক আদালত। এরপর ইংলাক সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী নিওয়াত্তুমরং বুনসংপাইসান অন্তবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। আগামী জুলাই মাসে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করার কথা এই সরকারের।

ইংলাক বরখাস্ত হওয়ার পর তার সমর্থকেরাও রাজপথে নামেন। সাংবিধানিক আদালতের রায়কে থাকসিন পরিবার ও ক্ষমতাসীন পুয়ে থাই পার্টির (পিটিপি) বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেন তারা।

সরকার-সমর্থক ‘লাল শার্ট’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান জতুপর্ন প্রমপ্যান অনির্বাচিতদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবির বিরোধিতা করেন। থাইল্যান্ডের গণতন্ত্র রক্ষা করার জন্য তারা রাজপথে নামার ঘোষণা দেন।

অপরদিকে বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টিও অন্তর্র্বতী সরকার পতনে চূড়ান্ত আন্দোলনের ডাক দেয়। দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় সংস্কার দাবি করে আসছে বিরোধী দল। এ জন্য একটি ‘পিপলস কাউন্সিল’ গঠনের কথা বলছে তারা। সমাজের বিভিন্ন অংশের অনির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে এই কাউন্সিল হবে। অন্তবর্তী সরকারকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে তা ভেঙে ওই কাউন্সিলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান বিরোধী নেতা সুথেপ থগসুবান।

তখন থেকে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে সরকার ও বিরোধী উভয়পক্ষ বিক্ষোভ শুরু করে। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত দেশটিতে সামরিক আইন জারি হলো।

You Might Also Like