হোম » তুরস্কের ঐতিহাসিক গণভোটে জয়ী এরদোয়ান কতটা শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট হবে ?

তুরস্কের ঐতিহাসিক গণভোটে জয়ী এরদোয়ান কতটা শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট হবে ?

admin- Monday, April 17th, 2017

রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে আরও ক্ষমতা তুলে দিতে আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বড়’ সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে আয়োজিত গণভোটে জয় পেয়েছেন প্রেসিডেন্ট রিজেপ তায়িপ এরদোয়ান, যার মধ্য দিয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত তার ক্ষমতায় থাকার পথ তৈরি হল।
বিবিসি জানিয়েছেন, ৯৯.৪৫ শতাংশ ভোট গণনায় এরদোয়ানের সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৫১ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট পড়েছে প্রায় ৪৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অর্থাৎ, এরদোয়ান শিবির স্বল্প ব্যবধানে জয় পেয়েছে।
এর ফলে তুরস্কে সংসদীয় গণতন্ত্রের বদলে পুরোমাত্রায় প্রেসিডেন্টের নির্বাহী শাসন শুরু করা যাবে, এরদোয়ানের হাতে আসবে প্রভূত ক্ষমতা, দেশটির আধুনিকায়নের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ বলে তার সমর্থকদের দাবি।
অবশ্য তুরস্কের প্রধান দুটি বিরোধী দল বলছে, তারা গণভোটের এই ফলাফল চ্যালেঞ্জ করবে।
দেশটির রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি) ৬০ শতাংশ ভোট পুণঃগণনার দাবি জানিয়েছে। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে গেলে এরদোয়ান আরও বেশি কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠবেন বলে বিরোধী শিবিরের শঙ্কা।
বিবিসির খবরে বলা হয়, গণভোটে জয়ের পর এরদোয়ানের সমর্থকরা বড় শহরগুলোর রাস্তায় রাস্তায় পতাকা নিয়ে উল্লাস শুরু করে। অন্যদিকে এরদোয়ানবিরোধীরা ইস্তাম্বুলে হাড়ি-পাতিল পিটিয়ে বিক্ষোভ দেখায়।
রয়টার্স জানিয়েছেন, রোববার তুরস্কের পূর্বাঞ্চলে স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোট গ্রহণ শুরু হয় এবং দেশের বাকি অংশে ভোট শুরু হয় স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কয়েকটি জায়গায় সহিংসতা হয়, দিয়ারবাকির এলাকায় ভোট কেন্দ্রের কাছ গুলিতে নিহত হন তিনজন।
গত বছরের জুলাইয়ে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত তুরস্কে প্রায় ৪০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; চাকরিচ্যুত হয়েছে এক লাখ ২০ হাজার লোক। এরদোয়ান সরকারের এই দমননীতির কড়া সমালোচনা করে আসছে পশ্চিমা দেশগুলো এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এক চুক্তির পর সিরিয়া ও ইরাক থেকে ইউরোপ অভিমুখী অভিবাসন প্রত্যাশীদের স্রোতে লাগাম দিয়েছিল তুরস্ক। সম্প্রতি গণভোটের প্রচার নিয়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নাজুক হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে ওই চুক্তি পুনর্বিবেচনার হুমকি দেন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান।
রোববার রাতে গণভোটে জয়ের ঘোষণা দিয়ে স্বভাবসুলভ উত্তেজক ভঙ্গিতে ৬৩ বছর বয়সী এরদোয়ান বলেন, তার এই জয়কে অবশ্যই সম্মান দেখাতে হবে।
সেই সঙ্গে তিনি মৃত্যুদণ্ডের বিধান ফিরিয়ে আনতে আরেকটি গণভোটের প্রস্তাব তোলেন, যার বাস্তবায়ন ঘটলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তুরস্কের সমঝোতার আর কোনো পথ থাকবে না।
ইস্তাম্বুলে নিজের সরকারি বাসভবন হুবার প্রাসাদে এক ব্রিফিংয়ে এরদোয়ান বলেন, “তুরস্ক আজ এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করতে যাচ্ছি।”
সাংবিধানিক সংস্কারে যা ঘটবে
প্রায় এক শতক আগে প্রজাতন্ত্র ঘোষিত তুরস্কের সংবিধানে আমূল পরিবর্তন ঘটবে এই সংস্কারের ফলে।
>> পরিকল্পনা অনুযায়ী, তুরস্কের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা ২০১৯ সালের ৩ নভেম্বর। তখন থেকে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর এবং সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ তিনি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। অর্থাৎ এরদোয়ানের ক্ষেত্রে ২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকার পথ খুলবে।
>> এমনিতে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও পার্লামেন্ট প্রয়োজন মনে করলে দ্বিতীয় মেয়াদ সংক্ষিপ্ত করে আগাম নির্বাচন দিতে পারবে এবং সেক্ষেত্রে আগের প্রেসিডেন্ট আরও এক মেয়াদ দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
>> নতুন ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর কোনো ভূমিকা থাকবে না। সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হবে প্রেসিডেন্টের হাতে। অনির্দিষ্ট সংখ্যক ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দিতে পারবেন তিনি।
>> মন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়বে।
>> এখন মন্ত্রিসভা ডিক্রি জারি করতে পারলেও নতুন ব্যবস্থায় সেই ক্ষমতা যাবে প্রেসিডেন্টের হাতে। দেশে কখন জরুরি অবস্থা জারি করতে হবে- সেই সিদ্ধান্তও তিনি নিতে পারবেন।
>> প্রেসিডেন্ট হবেন সরকারের নির্বাহী প্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধান। আবার রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও তিনি সম্পর্ক রাখতে পারবেন।
এক দশকের বেশি সময় তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী থাকার পর ২০১৪ সালে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির তখনকার নেতা রিজেপ তায়িপ এরদোয়ান। সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের পদটি আলঙ্কারিক হলেও এরদোয়ান তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রাখতে পেরেছেন।
এরদোয়ানের সময় তুরস্কের মধ্যবিত্তের হাতে অর্থ এসেছে, অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটেছে, ইসলামপন্থিরা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
তিনি বলছেন, অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার নয় মাস পর তুরস্কের নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জগুলো আমলে নিতে এবং অতীতে জোট সরকারগুলোর সময় যে নাজুক সময় তুরস্ক পার করেছে, তার পুনরাবৃত্তি এড়াতে এ পরিবর্তনগুলো দরকার।
তার ভাষায়, তুরস্কের নতুন এই সরকার ব্যবস্থা হবে অনেকটা ফ্রান্স বা যুক্তরাষ্ট্রের মত। শরণার্থী সঙ্কট থেকে শুরু করে প্রতিবেশী সিরিয়ায় যুদ্ধ, ইসলামি জঙ্গিবাদ, কুর্দি বিদ্রোহের সন্ত্রাসের মত সমস্যা জর্জরিত এই সময়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নতুন সরকার কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
অবশ্য সমালোচকরা বলছেন, এই ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট এতোটাই ক্ষমতাধর হয়ে উঠবেন, যে তুরস্কে কার্যত ‘এক ব্যক্তির শাসন’ শুরু হবে। এরদোয়ান ফ্রান্স বা যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ টানলেও সেসব দেশে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার যেসব ব্যাবস্থা আছে, এখানে তা থাকবে না।

সর্বশেষ সংবাদ