হোম » তিস্তার পানিতে বাংলাদেশের চাহিদা পশ্চিমবঙ্গের তিনগুণ

তিস্তার পানিতে বাংলাদেশের চাহিদা পশ্চিমবঙ্গের তিনগুণ

admin- Wednesday, April 12th, 2017

সরদার আবদুর রহমান : বহুল আলোচিত তিস্তা নদীর পানিতে পশ্চিমবঙ্গের যে চাহিদা তার তিনগুণ চাহিদা হলো বাংলাদেশের। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির প্রস্তাবিত নদীগুলোতেও ভারতের বাঁধ বিদ্যমান রয়েছে। এসব নদীর পানির হিস্যার বিষয়টি যথারীতি বাংলাদেশের দাবির তালিকায় রয়েছে। ফলে এসব নদীর পানি কখনোই তিস্তার বিকল্প হতে পারে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞমহল।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, তিস্তায় পশ্চিমবঙ্গের ৩টি জেলার মাত্র ৯টি থানার ১০ থেকে ১২ হাজার বর্গকিলোমিটার অববাহিকা এলাকার ১০ লাখ লোক উপকৃত হয়ে থাকে। এগুলো হলো, দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং, শিলিগুড়ি, মেখলিগঞ্জ, জলপাইগুড়ি, ভক্তিনগর, ময়নাগুড়ি ও মাল থানা। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ অংশে ৮টি জেলার ২৫টি উপজেলার ২০ থেকে ২২ হাজার বর্গকিলোমিটার অববাহিকা এলাকার প্রায় দেড় কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হয়ে থাকে। এছাড়া বাংলাদেশে তিস্তা প্রকল্পের মতো বৃহদাকার সেচ প্রকল্পও রয়েছে সম্পূর্ণ তিস্তার পানির উপর নির্ভর করে। পানি না পেলে এই প্রকল্প ১০০ ভাগ মুখ থুবড়ে পড়বে।
অন্যদিকে, এমনিতেই তিস্তার পানি দরকষাকষির পর্যায়ে রয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেসব নদীর নাম বলেছেন সেগুলোর পানিও বাংলাদেশের হিস্যা নিয়ে চুক্তির তালিকায় রয়েছে। ফলে এসব নদীকে তিস্তার বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করা বাংলাদেশের দিক থেকে মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে দুধকুমার ও ধরলা নিয়ে পৃথক মীমাংসা হতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে অন্তত ৫টি নদী ভারতে প্রবেশ করেছে। এসব নদীর কোথাও বাংলাদেশ কোন প্রকল্প করে পানি প্রবাহে বাধার সৃষ্টি করেনি।
মমতা ব্যানার্জির উল্লিখিত আন্তঃসীমান্ত নদী ধরলার মূল উৎস হিমালয়ের পূর্বাঞ্চলে বিতাং লেক-এ। ভুটান ও ভারতে প্রথমে ‘জলঢাকা’ ও পরে ‘সিঙ্গিমারি’ নাম নিয়ে বাংলাদেশের লালমনিরহাটের চ্যাংরাবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলা দিয়ে ধরলা নামে ব্রহ্মপুত্রে পতিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং-এর বিন্দু গ্রামে জলঢাকায় (ধরলা) উপর ‘বিন্দু ড্যাম’ নির্মাণ করেছে ভারত। এই ড্যামের মূল লক্ষ্য দার্জিলিং-এর ঝালং-এ নির্মিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য পানি সরবরাহ করা। বর্তমানে ধরলা নিজেই বিপন্ন দশার মধ্যে রয়েছে। ধরলা থেকে তিস্তায় পানি নিতে হলে সুদীর্ঘ খাল খননের প্রয়োজন হবে। যা পরে তিস্তার মতোই আরেক দরকষাকষির বিষয়ে পরিণত হবে।
মমতা ব্যানার্জি ‘তোরষা’ নামে আরেকটি নদীর কথা উল্লেখ করেন। পূর্ব তিব্বতের চুম্বি উপত্যকার টাং-পাস থেকে উৎপত্তি হয়ে ভুটানের পশ্চিম সীমানা ঘেঁষে নদীটি দক্ষিণে নেমেছে। এর আনুমানিক দৈর্ঘ্য ৩২০ কিলোমিটার। উজানের স্রোতধারা চুম্বি নামেও অভিহিত হয়। ভুটানে এর নাম ‘আমোছু’। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায় এবং বাংলাদেশে এই নদীর নাম তোরষা। এই তোরষা বা চুম্বি বা আমোছু নদী বাংলাদেশের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। তোরষা নদী কুচবিহার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ধুবড়ির প্রায় সাড়ে ২২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলিত হয়েছে। কুচবিহারের প্রায় ২৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে রায়ডাক নদীর একটি শাখা তোরষা নদীতে মিশেছে এবং মিলনস্থলের ভাটিতে তোরষা নদীকে রায়ডাক বা দুধকুমার বলে। মমতার কথিত এই তোরষা নদীও বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারের মানুষ এই নদীর তলদেশ ভরাট হওয়া নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। এনিয়ে সেখানে আন্দোলনও হচ্ছে। অন্যদিকে ভুটান তার আমোছু অংশে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রকল্প নির্মাণ করে পানি আটকে রাখে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আরো যে ‘মানসাই’ ও ‘ধানসাই’ নামে নদীর কথা বলেছেন সেগুলো কোন উল্লেখযোগ্য প্রবাহই বহন করে না।
ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকাকে বাংলাদেশের সাবেক একজন কূটনীতিক জানান, নানা কারণে তোরষার পানি কখনোই তিস্তার পানির বিকল্প হতে পারে না। তার মতে, তিস্তা ও তোরষার অববাহিকা এক নয়। তিস্তার প্রবাহ শুকিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে এই নদীর অববাহিকায় একটা বিস্তীর্ণ এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। ভূপ্রকৃতিগত কারণে তোরষার বাড়তি পানি খাল কেটেও আনা সম্ভব নয়। তিনি আরো জানান, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল থেকে তোরষা ছাড়া জলঢাকা ও রায়ডাক নদী বাংলাদেশে বয়ে এসেছে। কিন্তু খুব বেশি দূর না এসেই তারা বিভিন্ন নদীতে মিশে যাওয়ায় তিনটি নদীর অববাহিকা ছোট। এ কারণে এগুলো বাংলাদেশে কোনো গুরুত্বপূর্ণ নদী হিসেবেই বিবেচিত হয় না। তিস্তার অববাহিকা অনেক বড়। আর এই অববাহিকায় দ্বিতীয় কোনো বড় নদী না থাকায় তিস্তার পানির কোনো বিকল্প নেই। তোরষা, জলঢাকা বা রায়ডাকে ভারত বাড়তি পানি দিলেও তিস্তা অববাহিকার দুর্দশা ঘুচবে না। দীর্ঘ প্রায় ৩৬ বছর ধরে ঠেলাঠেলির পর তিস্তার পানি বণ্টন প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত মাঠে মারা যেতে বসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা হতাশার মধ্যে পড়ে গেছেন বলে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়।
এবিষয়ে নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একটা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। চুক্তি হবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে একটি সার্বভৌম দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে। সেখানে একটি রাজ্য সরকার কখনোই একটি পক্ষ বা প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াতে পারে না। এর আগে গঙ্গার পানি নিয়ে যতোই টানাপোড়েন থাকুক- এর মধ্যে রাজ্য সরকার বাধা হয়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়নি। কিন্তু এবার তিস্তার বেলায় কেন হচ্ছে সে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। তিস্তা নিয়ে মমতাকে ঢাল বানিয়ে কেন্দ্র কোন চাল চালছে কি না- সে সন্দেহ ওঠা স্বাভাবিক বলে মনে করেন মাহবুব সিদ্দিকী। তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলের নদীগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান ও গতি-প্রকৃতি বিচার করে দেখা যায়, মমতা ব্যানার্জির তিস্তার বিকল্প প্রস্তাবের কোন সারবস্তু নেই। এটা তিস্তা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়ার একটা কৌশলমাত্র।