হোম » ‘তিস্তার কারণে দুই বাংলার মধ্যে সমস্যার টানাপোড়ন দেখা দিতে পারে’

‘তিস্তার কারণে দুই বাংলার মধ্যে সমস্যার টানাপোড়ন দেখা দিতে পারে’

admin- রবিবার, মে ১৪, ২০১৭

শিতাংশু গুহ :

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর বাংলাদেশ বিরোধিতা এখন ধীরে ধীরে প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। বিশেষত: এবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লী সফরের পর মমতার আসল রূপ বেরিয়ে আসছে। তিস্তা নিয়ে তিনি এখন প্রায়শ: কথা বলছেন। সদ্য মমতা সাফ জানিয়েছেন, “বাংলাদেশকে পানি দিতে পারবো না। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশকে আমি ভালবাসি, পানি দিতে চাই, কিন্তু দেব কোত্থেকে? পানি থাকলে তো দেবো”। মমতার মতে তিস্তায় বাংলাদেশকে দেয়ার মত অত জল নেই? তিস্তা নিয়ে দিল্লিতে শেখ হাসিনা-মোদী ও মমতার ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে তিনি নুতন প্রস্তাব আনেন এবং বলেন, তিস্তার কথা বাদ দেন, এরচেয়ে বরং তোরসা ও উত্তরবঙ্গের অন্য নদী থেকে পানি নেন। শেখ হাসিনা এই প্রস্তাব আমলে আনেননি। মোদিও নন।

এরমানে এই নয় যে মমতা তার প্রস্তাব থেকে সরে গেছেন। বরং তিনি এনিয়ে সমস্যা সৃষ্টি করতে চাইছেন। তিনি এখন আত্রাই নদী ইস্যু তিস্তার সাথে জুড়ে দিতে চাইছেন। সম্প্রতি মমতা আত্রাই নদীর পানি কমে যাওয়ার জন্যে বাংলাদেশকে দায়ী করছেন। তিনি বলেছেন, বালুরঘাটে পানির জন্যে দুর্ভোগের কারণ বাংলাদেশের বাঁধ নির্মাণ। তিনি সম্ভবত: তিস্তার বিপরীতে এই ইস্যুটি হাজির করবেন। মমতার আচরণে দিল্লি নাখোশ। শেখ হাসিনা দিল্লি বসেই তার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি। মমতাকে একহাত নিয়েছেন।  মমতা নাছোড়বান্দা। তিনি বলেছেন, তিস্তার বদলে অন্য নদী নিয়ে আলোচনা হোক। সপ্তাহ দুই আগে মমতা ফারাক্কা নিয়ে কথা বলেন। ছিটমহল প্রসঙ্গেও তিনি বলেন,ছিটমহলে আমাদের ছিলো ১০হাজার একর জমি, বাংলাদেশের ৭ হাজার একর; কিন্তু আমরা বাংলাদেশকে ১০হাজার একর দিলাম, আমরা পেলাম ৭হাজার একর জমি।

মমতা হয়তো একই সাথে শেখ হাসিনা ও মোদিতে হার্ড-টাইম দিতে চাইছেন। মমতা প্রস্তাব করেছিলেন বাংলাদেশ থেকে আরো ইলিশ রফতানির। শেখ হাসিনা পাত্তা দেননি। মমতা এবার মালদা থেকে যাতে বাংলাদেশে কম আম যায় ব্যাবসায়ীদের সেই পরামর্শ দিয়েছেন।পশ্চিমবঙ্গের অনেকের ধারণা, তিস্তার কারণে দুই বাংলার মধ্যে সমস্যার টানাপোড়ন দেখা দিতে পারে। ত্রিপুরার রাজ্যপাল ডঃ তথাগত রায় স্পষ্ট করেই বলেছেন, তিস্তা চুক্তি হতে হবে। মোদীজি এটা চান। তিনি বলেন, অববাহিকায় বাংলাদেশের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে হবে। আমরা এই দায় এড়াতে পারিনা। তিনি বলেছেন, পাকিস্তানের সাথে যদি সিন্ধু নদের চুক্তি হতে পারে তাহলে বন্ধু বাংলাদেশের সাথে তিস্তা হবেনা কেন? তিস্তা না হবার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। তিস্তায় জল নেই, এই যুক্তি ডঃ রায় মানতে রাজি নন। তারমতে, একটি মহল বাংলাদেশ-ভারত সু-সম্পর্ক চায়না। তারা পাকিস্তানকে খুশি করতে চায়।

মমতার রাজ্যে পাকিস্তানপন্থীরা তৃণমূলের ভোটব্যাংক। কদিন আগে কলকাতা গিয়েছিলাম। তিস্তা নিয়ে অনেকের সাথে কথা হয়েছে। তিস্তা চুক্তি হতে কারো তেমন আপত্তি দেখিনি। অনেকের বক্তব্য, মমতা তার ভোটব্যাঙ্ক ঠিক রাখতে তিস্তা দেবেন না। মমতার ভোটব্যাঙ্ক পশ্চিমবঙ্গের ইসলামী মৌলবাদীরা। এই গোষ্ঠীর নেতা ইমরান-সিদ্দিকুল্যা বাহিনী। এরা এন্টি শেখ হাসিনা। এন্টি মোদী। কিন্তু প্রো-পাকিস্তানি। ড: তথাগত রায় সম্ভবত: ঐ ঈঙ্গিত দিতে চেয়েছেন। বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থনে কলকাতায় বিশাল সমাবেশ হয়েছিলো মমতার পূর্ণ সমর্থনে। আমাদের শাহবাগ আন্দোলনের বিরুদ্ধেও কলকাতার মোল্লারা মমতার কাঁধে ভর করে সমাবেশ করেছিলো। মমতা এই ইসলাম পন্থী গোষ্ঠীকে নাখোশ করতে চাচ্ছেন না। এবার এমনকি ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির মধ্যস্থতাও কাজে লাগেনি।

তিস্তা নিয়ে ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ-ভারত ‘এডহক জলবণ্টন চুক্তি’ স্বাক্ষর হয়। সেখানে বাংলাদেশ ৩৬% এবং ভারত ৩৯% জল পাবার কথা ছিলো। ভারতে জল একটি রাজ্য ভিত্তিক ইস্যু। ২০১১-তে মমতার ‘অল-ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ দিল্লীতে ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় সরকারের অংশ ছিলো। মমতার বিরোধিতায় তখন তিস্তাচুক্তি অনুমোদন পায়নি।তার বক্তব্য,এতে শুষ্ক মৌসুমে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল বিরান হয়ে যাব। ২০১১ সালে চুক্তির রূপরেখা ছিলো উভয় দেশ ৫০:৫০ পানি পাবে। দিল্লী তখন চাইছিলো ফারাক্কার মত তিস্তা সমস্যার সমাধান হয়ে যাক। মমতার বিরোধিতা তখন ভারতব্যাপী প্রচন্ড সমালোচিত হয়েছিলো। বাংলাদেশ ও ভারত ৫৪টি নদীর পানি শেয়ার করে থাকে। ১৯৭২ সালে ‘জয়েন্ট নদী কমিশন গঠিত হলেও চুক্তি আছে মুখ্যত একটি, ‘ফারাক্কা বা গঙ্গা ব্যারেজ’, ৩০ বছরের চুক্তি, যা শেখ হাসিনার আমলে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিলো।

২০১১-তে মনমোহন সিং তিস্তা চুক্তি করতে চেয়েও ব্যর্থ হন। বর্তমানে মোদী সরকার ইচ্ছে থাকা সত্বেও তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারছেন না? গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনার পর তিস্তা হচ্ছে দুদেশের মধ্যে প্রবাহিত চতুর্থ বিশাল আন্তঃসীমান্ত নদী। তিস্তার উৎপত্তি ভারতের সিকিম রাজ্যে। সিকিম হতে সেটি পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে এসে ব্রম্মপুত্র নদে  মিলিত হয়। তিস্তার মোট দৈর্ঘ ৪১৪ কিলোমিটার। এরমধ্যে ১৫১ কিমি সিকিমে, ১৪২ কিমি পশ্চিমবঙ্গ এবং ১২১ কিমি বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়। এটি মূলত: বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারীর অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। এশিয়া ফাউন্ডেশনের ২০১৩ রিপোর্ট অনুযায়ী তিস্তা বাংলাদেশের ১৪% কৃষিযোগ্য জমি এবং জনসংখ্যার ৭.৩% মানুষের জন্যে অপরিহার্য।

তাহলে তিস্তা কি হবেনা? সম্ভবত: আপাতত: নয়। ২০১৯ সালটি গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময়টিতে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন আছে। ভারতে লোকসভা নির্বাচনও সমসাময়িক সময়ে। পশ্চিমবঙ্গে মমতার বিদায়ের ঘন্টা বেজে গেছে। সারদা ও জংগী ইস্যুতে তৃণমূলের অবস্থা আরো কাহিল হবে। মমতার মৌলবাদ তোষণ সবার অপছন্দ। তাই তিনি এখন হিন্দু হবার চেষ্টা করছেন। বলছেন, বিজেপি আসল হিন্দু না, তিনিই আসল হিন্দু? এত কাজ হবে বলে মনে হয়না? তিনি গেলে তিস্তা হবে। এমনিতে দিল্লীর পক্ষে একটি নির্বাচিত সরকারকে বরখাস্ত করা বেশ শক্ত। তাই মমতার বিদায় পর্যন্ত অপেক্ষা ছাড়া সম্ভবত: আর কোন পথ খোলা নেই। এরমধ্যে বাংলাদেশে নির্বাচনী দামামা বেজে উঠবে। নির্বাচনটা হোক, একটি জাতির ইতিহাসে দেড়-দুই বছর কিছুই না?

শিতাংশু গুহ, কলাম লেখক।