তারুণ্য ধর্মীয় চেতনা ও যোগাযোগের মাধ্যম

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ দৈনিক ইনকিলাব একটি বড় সংবাদ ছাপিয়েছিল এর প্রথম পৃষ্ঠায়। রাজীব হায়দার (বর্তমানে মৃত) নামে একজন ব্লগারের তথা ব্লগ লেখকের কিছু লেখার সূত্র ধরে ইনকিলাব ওই শিরোনাম করেছিল। সংবাদটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ছিল এবং ফেব্রুয়ারি-মার্চ-এপ্রিল ওই বিষয়ের আলোচনায় উত্তাল ছিল। একাধিক পত্রিকার সংবাদের মূল্যায়ন মতে, রাজীব হায়দার নাস্তিক ছিলেন। কোনো এক পরিস্থিতিতে রাজিব নিহত হন। তখন মৃত রাজীবের বাড়িতে আমাদের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফরে গিয়েছিলেন সমবেদনা জানাতে। তিনি বলেছিলেন, রাজীব হচ্ছে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ। বর্তমানের ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে মতায় অধিষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের জুন মাসে একই কথা বলবেন কি না সেটা আমি নিশ্চিত নই। আমার মূল্যায়নে, রাজীবের বাড়িতে যাওয়া-আসা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সৃষ্ট গণজাগরণ মঞ্চ নামের আন্দোলনের জন্য যেন পরো পৃষ্ঠপোষকতা হয়, সেজন্যই যাওয়া-আসা হয়েছিল।

যদিও আমি ব্লগে লিখি না, কিন্তু ব্লগের অস্তিত্ব, মতপ্রকাশের পদ্ধতি ইত্যাদি প্রসঙ্গে অল্পবিস্তর ধারণা আছে। অতএব, ইনকিলাবের সংবাদটি পড়ে আমি সাংঘাতিকভাবে আশ্চর্যান্বিত হইনি। ইনকিলাব কে ধন্যবাদ, এরা বিষয়টি জনগণের গোচরীভূত করেছিলেন। আমি ইনকিলাবকে ধন্যবাদ জানালেও প্রচুরসংখ্যক ব্যক্তি ইনকিলাবের নাম উল্লেখ বা উল্লেখ না করেই পরোভাবে নানা চরম কটুবাক্য বলেছিলেন এই মর্মে যে, কেন এরা রাজীব নামের এক ব্লগারের বক্তব্য দেশবাসীকে জানাল? ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ থেকে নিয়ে পরবর্তী বেশ কয়েক দিন আমার দেশ এবং নয়া দিগন্তও এই মর্মে দেশবাসীকে অবহিত করেছিল। এ দু’টি পত্রিকাও প্রচুর পরিমাণে কটুবাক্যের শিকার হয়েছে। ইনকিলাব, আমার দেশ ও নয়া দিগন্ত এ তিনটি পত্রিকার বিরুদ্ধে, নাম নিয়ে হোক বা পরোক্ষভাবে নাম না নিয়ে হোক, অভিযোগ ছিল- এরা ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করছেন বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করছেন। বাস্তবে এরা কী করেছেন? বাংলাদেশে এমন একটি সম্প্রদায় আছে বা এমন একটি জনগোষ্ঠী আছে, যারা কাগজে-কলমে কোনো-না-কোনো ধর্মের অনুসারী হলেও বাস্তব জগতে, বিশ্বাসে ও আচার-আচরণে এরা কোনো ধর্মেই বিশ্বাস করেন না। এই সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা বিভিন্ন উপায়ে ও সুযোগে তাদের অবিশ্বাসের মতবাদ প্রচার করেন এবং অন্য যারা বিশ্বাস করেন বা বিশ্বাসভিত্তিক আচরণ করেন, সেই বিশ্বাস ও সেই বিশ্বাসভিত্তিক আচরণের সমালোচনা করেন। আশ্চর্যজনক আবিষ্কার হলো, এই অবিশ্বাসীগণের কর্মকাণ্ড ও চিন্তা-চেতনাকে প্রায়ই প্রগতিশীল বা প্রগতিবাদী চিন্তা-চেতনা বলে চালিয়ে দেয়া হয়। আমার দেশ, ইনকিলাব ও নয়া দিগন্ত এ কথাটিই মানুষের সামনে উদাহরণ দিয়ে তুলে ধরেছে। তাদের তুলে ধরার স্বাধীনতা আছে, কেউ পছন্দ করতে পারেন, কেউ পছন্দ নাও করতে পারেন।

আমি ব্লগে না লিখলেও ফেসবুকে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করি অন্যান্য ব্যস্ততার মাঝে। ইংরেজি ভাষায় আমার ফেসবুকের পেজের শিরোনাম পাঁচটি লাইন পরে আছে। ফেসবুকে যতটুকু সময় দিই, নিবিড়ভাবে মনোযোগের সাথে দিই। কারণ, জনগণের মনের ভাবের সাথে যোগাযোগ রাখার কয়েকটি কার্যকর মাধ্যমের মধ্যে এটাও একটি। তবে ফেসবুকে সীমাবদ্ধতা আছে। ফেসবুকের নিয়ম মোতাবেক কোনো একজন ব্যক্তির ‘পারসোনাল’ পাঁচ হাজারের বেশি ফেসবুক বন্ধু থাকতে পারবে না। একজন ব্যক্তি আরেকজন ব্যক্তিকে ‘ফলোয়ার’ হিসেবে অনুসরণ করতে পারেন। আবার একজন ব্যক্তির একটি পেজও থাকতে পারে, যেখানে অর্থাৎ ওই পেজে ‘লাইক’ দিলে, লাইকদাতার সাথে ওই পেজের স্বয়ংক্রিয় সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ওই পেজে কোনো লেখা প্রকাশ করলে বা সংবাদ প্রকাশ করলে, লাইকদাতাদের স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অবহিত করা হয়। আমার পেজটি Major General (Retd.) Syed Muhammad Ibrahim, Bir Protik এইরূপ শিরোনামে রক্ষিত। তথ্যগুলো এখানে দিলাম এ জন্য যে, যারাই নয়া দিগন্ত পত্রিকার মাধ্যমে আমার লেখালেখির সাথে সম্পর্ক রাখেন, তারা সেই সম্পর্কটাকে আরেকটু গভীর করতে পারেন। আমি যেহেতু রাজনীতি করি, সেহেতু আমার একটি লক্ষ্য আছে। সেই লক্ষ্য হচ্ছে, রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা। তাই আমাদের রাজনৈতিক দলের ‘মটো’ (Motto) হচ্ছে ‘পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি’। রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন এলেই জনগণের জন্য কল্যাণমুখী পদক্ষেপ নেয়া সহজতর হবে। এবং কল্যাণমুখী কাজগুলো সম্মিলিতভাবেই করতে হবে। তাই ভাবের বিনিময় একান্তভাবেই প্রয়োজন।

সেই ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ-এপ্রিলে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে, ঢাকা মহানগরের শাহবাগকেন্দ্রিক তরুণদের আন্দোলন নিয়ে প্রচুর রিপোর্টিং হয়েছিল। লাইভ বা সরাসরি অথবা ধারণকৃত অংশ নিয়ে রিপোর্টিং হয়েছিল। সামগ্রিকভাবে ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা সাংবাদিকতার জগৎ এবং প্রিন্ট মিডিয়া বা পত্রিকার জগৎ উভয়কে একই সাথে গণমাধ্যম নামে অভিহিত করা হয়। বাংলাদেশের ২০১৩ সালের প্রথমার্ধের গণমাধ্যমের বৃহদংশ শাহবাগভিত্তিক তারুণ্যের আন্দোলনের পক্ষে ছিল এবং এই আন্দোলনকে হাইলাইট করেছে বারবার। এই আন্দোলনের শুরুর দিকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভালো আঙ্গিক ছিল বলে অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন। বাংলাদেশের ২০১৩ সালের প্রথমার্ধের গণমাধ্যমের ক্ষুদ্রাংশ শাহবাগভিত্তিক তারুণ্যের আন্দোলনকে বিভিন্ন আঙ্গিকে সমালোচনা করেছিলেন। সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কারণে, যে যেটাই করেছেন সেটার জন্য অভিনন্দন পাবেন তাদের নিজ নিজ প্রিয় দর্শক, শ্রোতা ও পাঠকের কাছ থেকে। শাহবাগভিত্তিক তারুণ্যের আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের রাজনৈতিক মতবাদ নিয়ে গণমাধ্যমের ক্ষুদ্রাংশে প্রচুর লেখালেখি ও বলাবলি হয়েছিল। তাই আমি সামগ্রিকভাবে ওই পরিপ্রেতি নিয়ে অতি অল্প আলোকপাত করছি।

এখন থেকে পঁচিশ বছর আগে ফিরে যাই। ১৯৮৮ সাল। সোভিয়েত রাশিয়া নামে একটি বৃহৎ রাষ্ট্র ভেঙে যাওয়ার এক বছর বাকি। কমিউনিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার ওপর ভিত্তি করে যেই রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৯১৭ সালে, এবং যেই রাষ্ট্রটি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ শক্তি বা সুপার পাওয়ার রূপে আবির্ভূত হয়েছিল, সেই রাষ্ট্রটি ভেঙে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। ১৯১৭ সালের সোভিয়েত রাশিয়া নামের রাষ্ট্র কায়েমের পর পৃথিবীর বহুদেশেই বিভিন্ন সময়ে কমিউনিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক চিন্তাচেতনা ছড়িয়ে পড়ে। ওই চিন্তা-চেতনার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠিত হয়েছিল। নিজ নিজ দেশে, ওইরূপ কমিউনিস্ট পার্টিগুলো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম বা প্রচেষ্টা করেছিল। যেমন চীন, উত্তর কোরিয়া, আলবেনিয়া, যুগোস্লাভিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া, কিউবা, ভিয়েতনাম ইত্যাদি। এসব কমিউনিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো দু’টি বড় সমাজতান্ত্রিক বা কমিউনিস্ট দেশের প্রভাব বলয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। একটি বলয়ে প্রধান দেশ ছিল রাশিয়া এবং আরেকটি বলয়ে প্রধান দেশ ছিল চীন। কালক্রমে পৃথিবীর বহু কমিউনিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হারিয়ে গেছে। এ মুহূর্তের পৃথিবীর কয়েকটি মাত্র রাষ্ট্র খাঁটি কমিউনিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার ওপর না হলেও কিছুটা পরিবর্তিত এবং সহজতর হয়ে যাওয়া চিন্তা-চেতনার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, যথা- চীন, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম, কিউবা এবং সাম্প্রতিকতম সময়ে ভেনিজুয়েলা।

পৃথিবীর অনেক দেশ কমিউনিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক কাঠামো থেকে বের হয়ে গেলেও ওই দেশগুলোতে কমিউনিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল বিদ্যমান আছে। আরো একটি কথা, অনেকগুলো দেশ কমিউনিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক কাঠামোতে কোনো সময় অন্তর্ভুক্ত বা স্থাপিত না হয়ে থাকলেও দেশগুলোতে কমিউনিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার ওপর ভিত্তি করে সংগঠিত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখে। উদাহরণস্বরূপ পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। দলটি প্রকাশ্যে কোনো কর্মকাণ্ড করতে পারত না, কিন্তু এরা গোপনে সংগঠিত ছিল এবং গোপনে কর্মকাণ্ড চালাত। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, সমাজতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার ওপর ভিত্তি করে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি সৃষ্টি হয়েছিল। ৮-১০ বছর পর ওই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বিভক্ত হয়েছিল দুই ভাগে। অপরভাগের নেতৃত্ব নিয়েছিলেন প্রফেসর মোজাফফর আহমদ। দু’টি ভাগের পরিচয় ছিল ন্যাপ ভাসানী ও ন্যাপ মোজাফফর নামে। এ দু’টি দলের মধ্যে ন্যাপ ভাসানী আন্তর্জাতিক গুরু হিসেবে চীনকে গণ্য করত, ন্যাপ মোজাফফর সোভিয়েত রাশিয়াকে গুরু হিসেবে গণ্য করত। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপের ছাত্র সংগঠনের নাম ছিল ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্টস ইউনিয়ন সেেংপ এপসু। রাশিয়াপন্থী এবং চীনপন্থী হিসেবে বিভক্ত হওয়ার পর চীনপন্থী এপসুর প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রনেতা ছিলেন রাশেদ খান মেনন এবং রাশিয়াপন্থী এপসুর প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন মতিয়া চৌধুরী। পৃথিবীর আরো অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ অবধি কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন অব্যাহতভাবে কর্মতৎপর। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এইরূপ রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনগুলোর সমান্তরালে এবং সম্পূরকভাবে অনেক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন অব্যাহতভাবে কর্মতৎপর।

কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রাজনীতিকে আন্তর্জাতিক প্রোপটে পাঁচ দশক ধরে বাম রাজনীতি বলা হয়। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে ডান রাজনীতি কোনটি? উত্তর হলো, মোটা দাগে (কোনোমতেই সূক্ষ্মভাবে বা বিস্তারিতভাবে নয়), পুঁজিবাদের অনুসারী বা পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রের অনুসারী বা ধর্মীয় মূল্যবোধের চেতনার অনুসারী রাজনীতিকে সামগ্রিকভাবেই ডান রাজনীতি বলা হয়। পৃথিবীর বহু দেশের মতো এই মুহূর্তে বাংলাদেশেও ডানপন্থী রাজনীতির প্রাধান্য। বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ডানপন্থী। কিন্তু ডানপন্থী হলেও বাংলাদেশের দু’টি প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি কম এবং আরেকটি বেশি ডানপন্থী। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কম ডানপন্থী হওয়ায় বামপন্থীগণের নিকটতর। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি অধিকতর ডানপন্থী হওয়ায় ধর্মীয় মূল্যবোধের চেতনার রাজনৈতিক দল ও কর্মীদের নিকট নিকটতর। এই অনুচ্ছেদের সর্বশেষ মন্তব্যটি হলো- কমিউনিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনায় ধর্মীয় মূল্যবোধ বা ধর্ম সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য না হলেও গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা অতি ক্ষুদ্র ও গৌণ বা প্রান্তিক। যেহেতু বামপন্থী রাজনৈতিক চিন্তার ভিত্তিই হচ্ছে কমিউনিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনা, তাই তাদেরেে ক্ষেত্রেও ধর্মীয় মূল্যবোধ বা ধর্ম সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য না হলেও গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা অতি ক্ষুদ্র ও গৌণ বা প্রান্তিক।

আমার সীমিত জ্ঞান থেকে অতি ক্ষুদ্র একটি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করছি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের তত্ত্বীয় তথা থিওরিটিক্যাল অনুসরণ প্রসঙ্গে। যে যেই পন্থীই হোন না কেন, তিনি ওই পন্থী সাহিত্যে মনোযোগ দেবেন বেশি, ওই পন্থী সংস্কৃতিকে পৃষ্ঠপোষকতা করবেন বেশি এবং ওইরূপ চিন্তাচেতনার ওপর ভিত্তি করেই নিজের জীবন পরিচালনা করবেন, এটাই স্বাভাবিক এবং এটাই দেখে আসছি। পাঁচ-ছয় দশক ধরে আন্তর্জাতিক বিশ্বে কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা চিন্তাচেতনাকে ‘প্রগতিশীল’ বা প্রোগ্রেসিভ বলে পরিচিতি দেয়া হচ্ছে। দ্বীন ইসলামের মূল চেতনার সাথে বা ইসলামি মূল্যবোধের চেতনার সাথে এই ‘প্রগতিশীল (!!)’ চিন্তাচেতনার প্রচুর তফাত আছে। কালের পরিক্রমায় বর্তমানে যাকে পাশ্চাত্য সভ্যতা বলা হচ্ছে- যা মূলত পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও চিন্তাচেতনার ওপর গড়ে উঠেছে- সেটারও বৃহদংশ ওই প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে সাম্প্রতিক দশকগুলোতে। অতএব, পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে ইসলামি মূল্যবোধের চেতনার পার্থক্য ক্রমান্বয়ে প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। সাম্প্রতিকের বা আধুনিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ইলেকট্রনিক বাহনগুলো অতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় দেশে দেশে কিশোর ও তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজেদের চেতনার ভাব বিনিময় সহজতর হয়েছে। যে যেই চেতনারই ধারক হন না কেন, তার দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে, আচার-আচরণে, কথাবার্তায় ওই চেতনা প্রতিফলিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। ৪৪ বছর ধরে বাংলাদেশে কোনো পরে চেতনাকেই আনুষ্ঠানিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়নি। কিন্তু পারিপার্শ্বিক সুবিধার কারণে বামপন্থী চিন্তাচেতনা দ্রুততরভাবে বাংলাদেশের কিশোর ও তরুণসমাজে ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রকাশ্যে এর প্রতিফলন ঘটানো হয়। এটার জন্য ওই কিশোর বা তরুণকে প্রত্যভাবে দায়ী করা সঙ্গত হবে না। কারণ, ওই কিশোর বা তরুণের মনের দরজা-জানালা খোলা ছিল, যেই চিন্তা আগে দরজা-জানালা দিয়ে প্রবেশ করেছে সেই চিন্তাই মনের ভেতরে আগে শিকড় গেড়েছে।

বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী দ্বীন ইসলামের অনুসারী। কিন্তু এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ভাগ ও উপভাগ আছে। তাদের মধ্যে মতের পার্থক্য আছে। মতের পার্থক্যগুলো উদ্ভাসিত হচ্ছে গত ৫০ বা ১০০ বা ১৫০ বছরের মধ্যে। এর আগে এরূপ মতপার্থক্য ধরা পড়েনি। বর্তমানের ভারত বা পাকিস্তান-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশে দ্বীন ইসলাম প্রচারিত হয়েছে শান্তিপূর্ণ পন্থায় এবং মূল প্রচারক বা দাওয়াতকারী বা শিক ছিলেন সুফি সাধকগণ, দরবেশগণ, পীর-আওলিয়াগণ। শত উদাহরণের মধ্য থেকে মাত্র চারটি উল্লেখ করছি। ভারতের বর্তমান রাজস্থান প্রদেশের আজমীর শরিফে যার রওজা অবস্থিত, সেই বিখ্যাত সুফি সাধক তথা আওলিয়া হজরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি রহ: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা মহানগরীর মিরপুরে যার রওজা অবস্থিত, সেই বিখ্যাত সুফি সাধক তথা আউলিয়া হজরত শাহ আলী বাগদাদী রহ: বাংলাদেশের সিলেট নগরীতে যার রওজা অবস্থিত, সেই বিখ্যাত সুফি সাধক তথা আউলিয়া হজরত শাহজালাল রহ: অথবা বাংলাদেশের বৃহত্তর খুলনার বাগেরহাটে যার রওজা অবস্থিত, সেই বিখ্যাত সুফি সাধক তথা হজরত খানজাহান আলী রহ:। অনানুষ্ঠানিকভাবে খানকাহ-ভিত্তিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে, অনুশীলনের মাধ্যমে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওয়াজ মাহফিল ও মিলাদ শরিফের মাধ্যমে, মসজিদের ইমাম সাহেবদের সু-আচরণের মাধ্যমে দ্বীন ইসলাম প্রচারিত হয়েছে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তেও প্রচুরসংখ্যক খানকাহ আছে এবং পীর-আউলিয়াগণের মাধ্যমে লাখ লাখ লোক দ্বীন ইসলামকে ধরে রাখতে চেষ্টা করছে। সাধারণভাবে এদেরকে তরিকতপন্থী লোক বলা হয়। এই তরিকতপন্থী স্রোতধারার সাথে ব্যক্তিজীবনে আমিও ঐকমত্য পোষণ করি। এবং এটাই দ্বীন ইসলামের মূল ধারা। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা যদি তাওফিক দেন তাহলে সময় ও সুযোগ করে আরেকটু বিশদভাবে এই বহুলপ্রচারিত নয়া দিগন্ত পত্রিকার কলামের মাধ্যমে সম্মানিত দেশবাসীর সাথে মত বিনিময় করব।

আজকে বক্তব্য শেষ করছি এই আবেদন রেখে যে, দ্বীন ইসলামের মূল ধারার অনুসারী তারুণ্য আধুনিক যোগাযোগের মাধ্যম এবং বাহনের সাথে অধিকতর সম্পৃক্ত হওয়া প্রয়োজন। অতএব, চেষ্টা করা প্রয়োজন। এই আবেদনের সপে তথা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত থাকার সপ,ে সেই তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্বীন ইসলামের জ্ঞানার্জন অব্যাহত রাখার সপে আমার যুক্তি আছে। বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যমান লেখাপড়ার সিলেবাসে নিজ নিজ ধর্মকে জানার সুযোগ-সুবিধা অতি সীমিত। উদাহরণস্বরূপ ১৫ বছর বয়েসী বিজ্ঞানের একজন ছাত্র রমজান মাসের রোজার গুরুত্ব জানার জন্য তার সিলেবাসে কিছুই পাবে না। এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষ বাণিজ্যের একজন ছাত্র মহররম মাসের ১০ তারিখের আশুরা বা কারবালার ময়দানের যুদ্ধ সম্পর্কে জানার জন্য তার সিলেবাসে কিছুই পাবে না। সিলেবাসের বাইরে কিছু পত্রিকার কিছুসংখ্যক কলাম, কিছুসংখ্যক টেলিভিশনের কিছু অনুষ্ঠান এবং কদাচিত উপস্থিত থাকা সম্ভব এমন কোনো ধর্মীয় আলোচনা সভা ছাড়া ইসলামি খুঁটিনাটি বিষয় জানার আর কোনো মাধ্যম কিশোর বা তরুণদের সামনে উপস্থিত নেই। সে জন্যই আমি মনে করি, আগ্রহী সচেতন মুসলমানগণ নিজেদের জীবনের অন্য সব কর্ম করার পাশাপাশি নিজেদের ধর্মীয় জ্ঞান বাড়ানোর প্রয়োজনে সহযোগিতার ত্রে প্রস্তুত রাখবেন বা করবেন। ক্রমান্বয়ে অধিকতর বিকাশমান তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে স্যোশাল মিডিয়া যথা ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদি অবশ্যই ভূমিকা রাখতে পারে। টেলিভিশন তথা ইলেকট্রনিক মাধ্যম এবং পত্রিকা তথা মুদ্রণমাধ্যম ব্যক্তিগতভাবে আমাদের কারো নিয়ন্ত্রণেই নয়, সেগুলো কর্তৃপরে তথা পরিচালনাকারী নির্বাহীদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু স্যোশাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এখনো ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে আছে। যার যতটুকু প্রয়োজন বা আগ্রহ, সেই ব্যক্তি ততটুকুই জড়িত হবেন, উপকার সংগ্রহ করবেন অথবা নিজে অবদান রাখবেন।

চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

You Might Also Like