তরুণী চালকের আসনে, তরুণ নিহত, নানা প্রশ্ন

এটা বিশেষ এক সড়ক দুর্ঘটনা। কারণ দুর্ঘটনায় কবলিত প্রাইভেট কারটির চালকের আসনে ছিলেন এক তরুণী। আর যিনি নিহত হয়েছেন তিনি এক তরুণ। এই দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্বের বাইরেও ছিল ব্যবসায়ীক সম্পর্ক। আর সেই কারণেই এই সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সন্দেহের জন্ম হয়েছে। দুর্ঘটনাটি যখন শেষ রাতে, তখন সন্দেহ আরো ঘনিভূত। ঘটনার পরপর পুলিশের সন্দেহ না হলেও নিহত তরুণের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার পর তারাও এখন সন্দেহে ঘুরপাক খাচ্ছেন। প্রতিবছর শ’ শ’ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলেও কোনটির তদন্ত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) তদন্ত করতে দেখা যায় নি। এটা এতই বিশেষ এবং আলাদা দুর্ঘটনা যে এর তদন্ত করছে সিআইডি। তাই এই দুর্ঘটনাটি অনেকের কাছে আরো বিশেষ জায়গা পেয়েছে।

নিহত তরুণের চাচার দায়েরকৃত হত্যা মামলাটির তদন্তের দায়িত্বে থাকা সিআইডি কর্মকর্তার মনেও সৃষ্টি হয়েছে সন্দেহ। তরুণীর পরিবারের দু’টি গাড়ি থাকা সত্ত্বেও কেনো তরুণের গাড়িতে উঠেছিল তরুণী? তাও আবার এত রাতে?

তবে দু’জনের পরিবারের সঙ্গেই কথা বলে জানা গেছে, রেস্টুরেন্ট ব্যবসার কারণে তারা প্রায়ই রাত করেই বাসায় ফিরতেন। তারপরও হিসাব মিলছে না অনেকের। কারণ ব্যবসা, তরুণ-তরুণীর বন্ধুত্ব এবং তরুণীটি ছিল চালকের আসনে। তাই এই দুর্ঘটনা নিয়ে জল ঘোলা হচ্ছেই।

অবশ্য এ ব্যাপারে সচেতন মহলের জিজ্ঞাসা, তাহলে কি নারী-পুরুষের ব্যবসা, বন্ধুত্ব এবং ওঠাবসা সব সময় সন্দেহের তীরে দেখা হবে?

পাঠক এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন, কোন দুর্ঘটনার কথা বলছি। গত ১১ জুলাই মহাখালীর বিএফ শাহীন কলেজের সামনে কালো রঙের একটি প্রাইভেট কার (ঢাকা মেট্রো গ- ২৯০৩৫০) রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা তেজগাঁও থানার একটি ভ্যানকে সজোরে ধাক্কা দেয়। নিহত হন চালকের বামপাশের আসনে বসে থাকা তরুণ মোস্তামসির আশরাফ শুভ্র (২৭)। আহত হন পিকআপ ভ্যানে থাকা এক পুলিশ ও দুই আনসার সদস্য এবং চালকের আসনে থাকা তরুণী জান্নাতি হোসেন নেহা (২৩)। এ ঘটনার পর গাড়িচালক শুভ্রর বান্ধবী জান্নাতি হোসেনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কয়েকদফা রিমাণ্ড শেষে তিনি পাঁচ মাস ধরে কারাগারেই আছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত শুভ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) থেকে এমবিএ পাস করেছিলেন। তার বাবার নাম আবদুল মান্নান। তিনি সর্বশেষ ফরিদপুরের জেলা ও দায়রা জজ ছিলেন। বর্তমানে সচিবালয়ের কাছে অবস্থিত ভূমি নিবন্ধন অধিদফতরের মহাপরিচালক বা আইজিআর (ইন্সপেক্টর জেনারেল অব রেজিস্ট্রেশন) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি পরিবারের সবাইকে নিয়ে রাজধানীর উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরের ২ নম্বর রোডের ২৭ নম্বর বাসার তিনতলা ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। তার গ্রামের বাড়ি ঢাকা জেলার দোহার থানার মোকছেদপুরে।

ঘটনার এক বছর আগে জান্নাতি হোসেনের সঙ্গে শুভ্রর পরিচয় হয়। জান্নাতি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সম্মানের ছাত্রী। তার বাসা রাজধানীর নিকুঞ্জে। জান্নাতির পিতার নাম ডিএম দেলোয়ার হোসেন। তিনি ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা করেন। তাদের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলায়।

দু’জনের পরিচয়ের পর জান্নাতি ও শুভ্র ব্যবসায়িক পার্টনারশিপে অনলাইন মিউজিক ও গেম শপ চালু করেন। দুর্ঘটনার আগ পর্যন্ত তাদের ছিল উষ্ণ বন্ধুত্ব ও ব্যবসায়ীক সম্পর্ক। কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনা সব উলোট-পালট করে দিয়েছে। বন্ধু না ফেরার দেশে, বান্ধবী কারাগারে। বাহির জগতে নানান রসালো গল্প ছড়াচ্ছে বিভিন্নজন। অথচ জান্নাতির সঙ্গে রেমন সিদ্দিকী নামে এক তরুণের বিয়ে হয়েছে। ঘটনার আগে তাদের বিবাহোত্তর সংবর্ধনার প্রস্তুতি চলছিল। এরই মধ্যে এই দুর্ঘটনা। দুই পরিবারের এখনও সম্পর্ক অটুট রয়েছে।

দুর্ঘটনার পর পুলিশ বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের করে। এর ১১ দিন পর নিহতের চাচা আবদুল হান্নান খান আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। দু’টি মামলার তদন্ত করছে পরিদর্শক (সিআইডি) উত্তম কুমার বিশ্বাস। তবে মামলা তদন্তের কোনো অগ্রগতির খবর তিনি জানাতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘তদন্তের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অনেক সাক্ষী থাকলেও তাদের কারো ঠিকানা লিখে রাখেনি পুলিশ। তাই প্রত্যক্ষদর্শী কোনো সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু তিন পুলিশ সদস্যের সাক্ষ নেয়া হয়েছে। আসামি জান্নাতিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি।’

তিনি আরো বলেন, ‘অন্যান্য আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের সাক্ষী নেয়া যাচ্ছে না। তাই তদন্ত কাজে বিলম্ব হচ্ছে। এদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে প্রতিবেদন দেয়া হবে। তাতে অনেক সময় লাগবে।’

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘ঘটনার দিন রাতে শুভ্রর গাড়ি চালককে বিদায় দেয় জান্নাতি। এরপর গভীর রাতে শুভ্রকে নিয়ে জান্নাতি নিজেই গাড়ি চালিয়ে বাসার দিকে যাচ্ছিল।’

সিআইডি কর্মকর্তা জান্নাতিকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে আলাপকালে বলেন, ‘কেনো শুভ্রর গাড়ি চালককে বিদায় দিয়ে জান্নাতি নিজেই গাড়ি চালিয়েছিল? জান্নাতির বাবার দু’টি গাড়ি, স্বামীর দু’টি গাড়ি থাকতেও কেনো শুভ্রর গাড়িতে তিনি আসছিলেন? কিন্তু জান্নাতি এর কোনো উত্তর দিতে পারেনি।’

এই প্রশ্নের উত্তর না দিতে পারায় তদন্ত কর্মকর্তার সন্দেহ আরো বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে শুভ্রই মারা গেল অথচ জান্নাতি একটুও আহত হলেন না। এটাও রহস্য।’

ঘটনার পরপর জান্নাতি এবং তার পরিবার শুভ্রর পরিবারকে খবর না দিয়ে তারা থানায় গেল কেনো? এই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

ঘটনার পর জান্নাতি আদালতে জবানবন্দিতে বলেছিল, ‘বনানী থেকে তাদের গাড়িটি ফ্লাইওভার হয়ে জাহাঙ্গীর গেটের দিকে যাচ্ছিল। মহাখালী ফ্লাইওভার থেকে গাড়িটি নিচে নামার সময় একটি সিএনজি অটোরিকশাকে বাঁচাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। দুর্ঘটনার সময় তার সিটবেল্ট বাঁধা ছিল। কিন্তু আশরাফের সিটবেল্ট বাঁধা ছিল না।’

অপরদিকে একমাত্র পুত্র সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ শুভ্রর বাবা-মা। শুভ্রর চাচা আব্দুল হান্নান খান জানান, শুভ্রর আইন পড়াশোনা শেষ হলে ব্যারিস্টারি পড়তে লন্ডনে যাওয়ার কথা ছিল। সেই অনুযায়ী প্রস্তুতিও চলছিল। শুভ্রর ছোট তিন বোন আছে।

তিনি আরও বলেন, ‘শুভ্র খুবই ধার্মিক ছিল। তার হজে যাওয়ার কথা ছিল। এজন্য সে নিজেই হজের কাপড় কিনে রেখেছিল। সেই হজের কাপড়ে কাফন পরিয়েই ঢাকা জেলার দোহার থানাধীন মোকছেদপুরের গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

শুভ্রর মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়া দরকার। বন্ধুত্বের নামে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।’

এদিকে জান্নাতির মা শাকিলা হোসাইন নিহত শুভ্রকে অত্যন্ত ভদ্র ও বিনয়ী ছেলে উল্লেখ করে বলেন, ‘শুভ্র একজন মেধাবী ছেলে আমার মেয়েও মেধাবী। তারা দু’জনই প্রাপ্ত বয়স্ক। তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও ব্যবসায়ীক সম্পর্ক ছিল। দুর্ঘটনা আজ সব কিছু শেষ করে দিয়েছে। আমাদের কোনো পরিবার সুখে নেই।’

দুর্ঘটনাকে নিয়ে একটি পক্ষ ষড়যন্ত্র করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ঘটনার ১১ দিন পর হত্যা মামলা হয়েছে। আসলে এটা কখনো হত্যাকাণ্ড না। দুর্ঘটনার পর পুলিশও এটাকে দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখছে, কিন্তু এখন হত্যা বলা হচ্ছে। এর পেছনে শুভ্রর চাচা ও আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান জড়িত। তিনি শুভ্র ও জান্নাতির পার্টনারশিপের অনলাইন মিউজিক ও গেম শপটিও দখল করে নিয়েছেন। ’

তিনি বলেন, ‘শুভ্রর চাচা আবদুল হান্নান খান তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এতে আসামি করা হয়েছে, জান্নাতি, তার বাবা ডি এম দেলোয়ার হোসেন, দুই ভাই জুবায়ের, জুনায়েদ এবং স্বামী রেমন সিদ্দিকীকে।’

জান্নাতির মা বলেন, ‘মেধাবী ছাত্রী জান্নাতি তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে এরই মধ্যে নজর কেড়েছেন। সে ভ্যালোসিটি কোম্পানির সিইও, টর্ক ম্যাগাজিনের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত ছিল।’

শুভ্রর পরিবারের পক্ষ থেকে দায়েরকৃত মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, গত ১১ জুলাই রাত ১টায় মোস্তাসির আশরাফ মিশু সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার কথা বলা হলেও তিনি কোনো সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হননি। কারণ প্রাইভেট কারটি পুলিশের যে গাড়িটিকে ধাক্কা দেয়ার কথা বলা হয়েছে সে গাড়িটি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, পুলিশের গাড়িটির সামনের দু’টি চাকা পাংচার, সামনের বাম্পারটি মাটিতে বসানো, গাড়ির ব্যাটারি উল্টানো, তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন, সামনের দরজা আটকানোর কোনো ব্যবস্থা নেই এবং ড্রাইভিং সিটসহ সব স্থানে ধুলার স্তুপ পড়ে আছে।

গাড়িটির সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাইভেট কারের একটি দিক প্রায় এক হাত ভেতরে ঢুকে গেলেও ভিকটিম এবং জান্নাতির শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়নি।

আরো অভিযোগ করা হয়, আসামিরা ভিকটিমের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আত্মসাৎ করার জন্য পরস্পর যোগসাজসে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডটি পুলিশের সহায়তায় ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে আইনি সুবিধা পাওয়া থেকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী জান্নাতি হোসেন বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন দেশের ৩১ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা জান্নাতির আইনি সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।

বিবৃতিদাতারা হলেন- খুশী কবির, অধ্যাপক সাদেকা হালিম, রোকেয়া আফজাল রহমান, ড. গীতিআরা নাসরীন, ড. কাবেরী গায়েন, ড. সামিনা লুৎফা, নাসরিন খন্দকার, শ্যামল শীল, রাজীব মীর, কাজী কৃষ্ণকলি ইসলাম, মাসকাওয়াথ আহসান, সুপ্রীতি ধর, ফারুক ওয়াসিফ, সুলতানা রহমান, আংগুর নাহার মন্টি, নাজিম ফারহান চৌধুরী, তাসলিমা মিজি, নিলুফার এইচ করিম, সাদেকা রহমান সেঁজুতি, আইভি হক রাসেল, তানিয়া ওয়াহাব, মিনহাজ আনোয়ার, মিথিলা মাহফুজ, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, আফরোজা সোমা, নাহিদ সুলতানা, ফারজান রহমান শাওন, হানা শামস আহমেদ, শামীম আরা শিউলী, বরকত উল্লাহ মারুফ ও নুসরাত শিহাব।

শেষ পর্যন্ত এ ঘটনা কোন দিকে মোড় নেয় তা এখনো কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। তবে সার্বিক ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করে পুরো বিষয়টিকে জটিল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অপরাধ বিশ্লেষকরা।

You Might Also Like