ডিটেনশন সেন্টারে আটক বাংলাদেশীদের আমরণ অনশন কর্মসূচি অব্যাহত

শিবলী চৌধুরী কায়েস : যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের দায়ে আটক প্রায় ৯০জন বাংলাদেশী নাগরিক টেক্সাসের এলপাসো কারাগারের ডিটেনশন সেন্টারে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করছে। বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত চতুর্থ দিনের মতো চলা তাদের এই আমারণ অনশনে নড়েচড়ে বসেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার’সহ দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংগঠনগুলো। দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দী থাকাবস্থায় যথাযথ আইনী সহায়তা না পাওয়া এবং জোরপূর্ব দেশে ফেরত পাঠানোর প্রতিবাদে এই অনশন কর্মসূচি পালন করে বাংলাদেশীরা। প্রথমদিনে অনশনে ৪৬ অংশ নিলেও চতুর্থ দিনে তা এসে দাঁড়ায় ৬০ জনে। যদিও ইতোমধ্যে ১১জনকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। বেশ কয়েকজন গুরুতর অসুস্থ্য হয়ে পড়লে তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

অবৈধভাবে আমেরিকা প্রবেশকারি ও রাজনৈতিক আশ্রয় প্রত্যাশী এসব বাংলাদেশী নাগিরক। শুরু থেকেই দ্য রিপোর্টের নিউইয়র্ক প্রতিনিধি ও সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি শিবলী চৌধুরী কায়েস’র সাথে যোযোগ অব্যাহত রাখে বন্দী বাংলাদেশীরা। ওইসময় কারাগারে বন্দী বাংলাদেশীদের পক্ষে পত্র লেখক মাহবুবুর রহমান যোগযোগ করে আসছিলেন। কারাগার থেকে পাঠানো চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন হয় যে, প্রায় ৮৫-৯০ জন বাংলাদেশী এলপাসোর ডিটেনশন সেন্টারে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। হোমল্যান্ড সিকিউরিটির ভুল রিপোর্টে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রচলিত আইনী সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। এ নিয়ে গেল ২৯ মে ২০১৫ দ্য রিপোর্টেও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। যেখানে তুলে ধরা হয় গেল কয়েক মাস ধরেই টেক্সাসের কারাগারে বন্দি বাংলাদেশীরাদের দূবিসহ যন্ত্রনার কথা।

এরই মধ্যে গেল ২৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ফয়েজ আহম্মেদ নামে একজন বন্দীকে জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এরপর পর থেকেই বন্দী বাংলাদেশীদের মাঝে দেশে ডিপোর্টেশন আতঙ্ক শুরু হয়। যার ফলশ্রুতিতে আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করে এসব বাংলাদেশীরা। গেল ১৪ অক্টোবর বুধবার থেকে ৪৬জন প্রথমে অনশন কমূসচি শুরু করে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ১৭ অক্টোবর শনিবার চতুর্থ দিনের কর্মসূচিতে ছিল প্রায় ৬০ জন। টানা না খেয়ে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন যাদের অনেকে। যদিও কয়েকজনকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

আমরণ অনশনের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে যোগাযোগ করা হয় কর্মসূচির মূল উদ্যোক্তা মাহবুবুর রহমানের সাথে। যিনি শুরু থেকেই এই প্রতিবেদকের সাথে যোগাযোগ করে চলেছেন। শনিবার সন্ধ্যার ৭টার দিকে টেলিফোনে সবশেষ ঘটনার বিবরণে মাহবুবুর রহমান জানান, আমাকে এখন ডিটেনশন সেন্টারের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। আমরা চারদিন কোন কিছুই খাইনি। বুধবার যখন আমরা অনশন শুরু করি তখন থেকেই সংশ্লিষ্ট বাহিনী আমাদের বিভিন্ন ভাবে চাপ প্রয়োগ করছে অনশন ভাঙ্গার জন্য। কিন্তু আমরা তাদের কথা শুনছি না।’

মাহবুব আরো বলেন, অনশনরতবস্থায় বেশ কয়েকজনকে জোরপূর্বক অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। তবে মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবাদে ১১জনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আমাদের অবস্থা খুবই খারাপ কথা বলতে পারছি না। আমি এখন আবারো ডিটেনশন সেন্টারের অনশনে ফিরে যাবো ওদের বলেছি। আমি কিছুই খাচ্ছি না এবং খাবো না; যতক্ষণ না মুক্তি দেয়া হয়। মাহবুব কমিউনিটির সবার সহযোগিতা কামনা করেনন।’

এ বিষয়েটিকে চ্যালেঞ্জ করে সাউথ এশিয়ান মানবাধিকার সংগঠন ‘ডেসিস রাইজিং আপ এন্ড মুভিং-ড্রাম’। মাহবুবের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে ড্রামের কর্মকর্তারাও। এ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশীর বহিষ্কার অমানবিক উল্লেখ করে ড্রাম’সহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো। বর্তমানে অনশনকারীদের পক্ষে আন্দোলনে মাঠে নেমেছে এসব সংগঠন। টেক্সাসের এলাপাসোর ডিটেনশন সেন্টারে বাংলাদেশী বন্দী’সহ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানীদের জীবন রক্ষা এবং আইনী সহায়তায় কাজ করে যাচ্ছে ড্রাম’সহ বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন। এলপাসো কারাগারে অনশনরতদের পক্ষে অবস্থন নেয় এসব সংগঠনগুলো। যাদের সঙ্গে যোগ দেয় দেশী-বিদেশী আরো বেশ কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনও। সাউথ এশিয়ান ও বিশ্ব মানবাধিকার সংগঠনের তৎপড়তার ফলে ৬০জন থেকে ১১জনকে মুক্তি দেয়া হয় শনিবার পর্যন্ত। বর্তমানে তারা টেক্সাস থেকে নিউইয়র্কের পথে রয়েছেন।

এদিকে, আমেরিকার অভিবাসন সংস্থা ও তথা ‘ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি-ডিএইচএস’র আদালতে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপিকে টিআর থ্রী সন্ত্রাসী দল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপি জামায়াতকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দিয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্ট, হোমল্যান্ড সিকিউরিটিসহ আমেরিকান গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থাগুলোতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করে আসছিল। বিষষয়টি অমানবিক এবং মানবাধিকার লংঘন বলে অভিহিত করে নিন্দা জানায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

তাই, গেল কয়েকমাস ধরে বিএনপি সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনগুলো নাকচ করে আসছেন আদালত। বিএনপির মতো গণতান্ত্রিক দলকে সন্ত্রাসী আখ্যা দেয়া অন্যায় এবং অযৌক্তিক দাবি করে এর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে কাজ করেছে ‘ড্রাম’ এবং ‘ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন প্রজেক্ট অফ দ্য ন্যাশনাল ল’ইয়ার্স গিল্ড’।

তারা বলছে, বিএনপি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে অভিবাসীদের অধিকার ক্ষুণœ করা ঠিক হয়নি। এ ছাড়াও আমেরিকার আইনে সবাই নাগরিক অধিকার পাওয়ার যোগ্যতা রাখে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, অভিবাসীদের আইনগত অধিকার সমুন্নত রাখার আহবান জানিয়েছেন। পাশাপাশি এলপাসোতে বন্দী বাংলাদেশীদের সহায়তা তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রাখছেন।

You Might Also Like