ট্রাম্প দুর্বল, হিলারি শক্তিশালী

টার্গেট ২৭০টি ইলেক্টোরাল ভোট। ঝোলায় পুরতে পারলেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। হোয়াইট হাউজের পথে যাত্রা। আগামী ৮ নভেম্বরের সেই লড়াইয়ের হিসাব-নিকাশ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্য। রিপাবলিকান দলের এই প্রার্থী এখন ২৭০টি ইলেক্টোরাল নিশ্চিত করতেই তার ছক কাটছেন। সে জন্য প্রধান যে নীতি নিয়েছেন তা হচ্ছে, গোটা আমেরিকা নয়, অর্থ ঢালবেন কিংবা সময় ব্যয় করবেন সেই সব রাজ্যে যেখানকার ভোট নির্বাচনের জন্য বিশেষ গুরুত্ব রাখে। আর এই তালিকায় রয়েছে মোটেই তিন থেকে চারটি রাজ্য।

তবে বিশ্লেষকরা তথা সিনিয়র রিপাবলিকানরাও এখন মনে করছেন, প্রয়োজনীয় ২৭০টি ইলেক্টোরাল ভোট ঝোলায় পুরে, হোয়াইট হাউজের দিকে রওয়ান দেওয়া এখন ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্য ‘দিল্লি বহুত দূর কি বাত’। তারা দেখছেন সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণতর হয়ে আসছে। আর তা হয়ে উঠছে আরও দুর্মূল্য, আরও ব্যয়বহুল।
ট্রাইফেক্টা বলে যুক্তরাষ্ট্রে একটা কথা রয়েছে। তিনটি অঙ্গরাজ্য এখানে প্রধান ফ্যাক্টর। ফ্লোরিডা, ওহাইও আর পেনসিলভানিয়া। এই ট্রাইফেক্টায় হিলারিকে হারাতে না পারলে ডনাল্ড ট্রাম্পের ভাগ্যের শিকে যে ছিঁড়বে না, তা এখনই বুঝে ফেলেছেন পার্টির উর্ধ্বতনরা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা বিচার বিশ্লেষণে এমনটাই বলা হচ্ছে।

দেখানো হয়েছে, এই তিন রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের ইতিহাস সুখষ্পদ। ২০০৮ আর ২০১২ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ওবামা তিনটি রাজ্যের ইলেক্টোরাল ভোটই নিজের ব্যাগে পুড়ে হোয়াইট হাউজের পথ ধরেছিলেন। আর যদি কেবল পেনসিলভানিয়ার কথা বলা হয়, সেখানে তো গত প্রায় তিন দশক ধরেই কোনও রিপাবলিকান প্রার্থী হালে পানি পান নি।

এরমধ্যে অংকে আরও জটিল জটিল প্যাঁচ ডনাল্ড ট্রাম্প নিজেই সৃষ্টি করেছেন। অনেক নারী আর হিসপ্যানিকদের তিনি আগেই ক্ষেপিয়েছেন। ফলে যেসব রাজ্যে রিপাবলিকানরা সহজেই জিতে যেতো এমন ঐতিহ্য রয়েছে সেখানেও ট্রাম্পের জয় নিয়ে এখন সবাই সন্দিহান। কোনও কোনওটা এরই মধ্যে হাতছাড়া হয়ে গেছে বলেই বোধ করছেন বিশ্লেষকরা।

দুই পক্ষ্যের কৌশল পর্যালোচনা থেকে জরিপগুলোতে দেখাচ্ছেই হিলারি ক্লিনটন এরই মধ্যে কলোরাডো আর ভার্জিনিয়ায় আপারহ্যান্ড নিয়ে আছেন। কলোরাডো তার রানিং মেট সেনেটর টিম কাইনের নিজের এলাকা। এই দুই রাজ্যে জর্জ ডব্লিউ বুশ বেশ কায়দা করে হিসপ্যানিক ভোটার আর সাবআরবান মডারেটসদের ভোট বাগিয়ে জিতে নিয়েছিলেন। যা করতে ট্রাম্প ব্যর্থ হয়েছেন।

এর বাইরে ট্রাম্পের লোকেদের নর্থ ক্যারোলিনায়ও একটু বেশি জোর দিতে হচ্ছে। এটিও কিন্তু রিপাবলিকাদের রাজ্যই ছিলো। এখানে কালো ভোটারদের কমিউনিটিটা বেশ বড়সড়। কলেজ-শিক্ষিত সাদারাও রয়েছে। আর এই দুই শ্রেণির কাছেই ডনাল্ড ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তা অনেক গভীরে প্রোথিত।

যুদ্ধক্ষেত্রগুলোর কোনওটিতেই ছেড়ে কথা বলবেন না, এমন ঘোষণা ট্রাম্প আগেই দিয়েছেন। সুতরাং উপদেষ্টারাও দেখছেন, এই তিন প্রধান রাজ্যে যদি বিজয় বাগিয়ে নেওয়া যায় তাহলে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজ গমনের পথ সুগম হবে বৈকি। গোটা ম্যাপে এই তিন রাজ্যের ইলেক্টোরাল ভোট সবচেয়ে বেশি। আর নর্থ ক্যারোলিনাকেও রিপাবলিকানদের করে রাখতে হবে, এটাও তাদের চাওয়া।
ট্রাম্প ও তার রানিং মেট ইন্ডিয়ানার গভর্নর মাইক পেন্স তাদের ক্যাম্পেইন নিয়ে এই চার রাজ্য চষে বেড়াবেন এমটাই প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ট্রাম্প গণমাধ্যমের সহায়তায় একের পর এক ট্রাম্প খেলে যাবেন আর পেন্স রক্ষণশীল, ডান ও মধ্যপন্থি শেতাঙ্গদের দিকে বেশি নজর দিয়ে তাদের দ্বারে দ্বারে যাবেন।

হিলারি ক্লিনটনের টেলিভিশন বিজ্ঞাপনগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একই রকম কিছু করার পরিকল্পনা তাদের নেই। তারা চাইছেন, বাণিজ্য, সন্ত্রাস, আর অভিবাসন নিয়ে ট্রাম্প তার উষ্কানিমূলক কথাগুলো বলে যাবেন। আর তাদের ধারনা তাতেই কাজ হবে।

প্রাইমারির দিনগুলোতে ট্রাম্প সে ‘আমেরিকা পুনর্গঠন এখনই’ স্লোগান তুলে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন এখনও সেটাই করবেন। এরই মধ্যে ওহাইও, ফ্লোরিডা ও পেনসিলভানিয়ায় টেলিভিশনগুলোর সঙ্গে প্রচারের জন্য সময় কিনে নিয়েছেন।

অন্যদিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অগ্রাধিকার’ স্লোগানকে সামনে রেখে হিলারির জন্য যারা কাজ করছেন তারা এই তিন রাজ্যের বাইরে আরও অন্তত আধা ডজন রাজ্যে এরই মধ্যে তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

রিপাবলিকান স্ট্রাটেজিস্ট জন ব্রাবেন্ডারের কথাটি প্রণীধানযোগ্য। একটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পেনসিলভানিয়ায় তিনি ব্যাপকভিত্তিক কাজ করছেন। তিনিই বলছেন, এখানে ট্রাম্পের জয়ের পথটি বেশ দুর্বল। হোয়াইট হাউজের স্বপ্ন পূরণে ট্রাম্পকে পেনসিলভানিয়ায় জিততেই হবে। ১৯৮৮ সালের পর এই রাজ্যে জয়ের মুখ দেখেনি রিপাবলিকানরা। আর সত্যি কথা বলতে কি আমরা যখন পেনসিলভানিয়ায় জয় নিয়ে চিন্তিত হয়ে যাই তখন আসলে গোটা জয়ের বিষয়টিই হয়ে পড়ে দুষ্কর, বলেন ব্রাবেন্ডার।

অন্যদিকে হিলারি শিবিরে আলোচনাটি ভিন্ন। ভার্জিনিয়ার গভর্নর টেরি ম্যাকঅলিফ ক্লিনটনদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্রতা বজায় রেখে চলেছেন। অপর একটি সংবাদমাধ্যম তাকে উদ্ধৃত করেছে এভাবে, ‘ভার্জিনিয়া জিতে নিলে ট্রাম্প ক্যাম্পেইনকে সহজেই ধরাশায়ী করে দিতে পারবেন হিলারি। আরেকটি রাজ্য তার কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে সেটি ফ্লোরিডা। আর ম্যাকঅলিফ বললেন, কোনওভাবে যদি ভার্জিনিয়া ও ফ্লোরিডার ইলেক্টোরাল ভোট ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে নিশ্চিত করা যায়, তাহলে রিপাবলিকানদের এবারের প্রেসিডেন্সি জয় হবে আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব।’

ইলেক্টরাল কলেজের হিসেবে এখন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন খুবই শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন, বলেন ম্যাকঅলিফ।

প্রতিটি রাজ্যেই বড় বড় শহর-নগরী যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে স্বল্প জনবসতির বিস্তীর্ণ কৃষি এলাকা। আবার সাবেক শিল্প এলাকাও রয়েছে এসব স্থানে ট্রাম্প খুব একটা সুবিধা করতে পারবেন না। কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে স্লোগান ডনাল্ড ট্রাম্প তুলেছেন তা স্রেফ শিল্পাঞ্চলগুলোতেই তাকে কিছুটা সুবিধা দিলেও দিতে পারে।

পেনসিলভানিয়াকে বাদ রাখলে, যেখানে বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে কিছুটা বেশি, বাকি সুইং স্টেটগুলোতে বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের সমান কিংবা কম। সুতরাং কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্লোগানে এখানকার ভোটারদের মন গলবে বলে মনে হয় না।
সুতরাং ডেমোক্র্যাটরা ডনাল্ড ট্রাম্পের এসব স্লোগানে ভীত নন। তবে তারা বেশ সতর্ক এই কারণে যে, তারা আসলে ট্রাম্পকে স্রেফ ওয়াইল্ড কার্ড প্রার্থী হিসেবেই দেখছেন, আর যে কোনও কিছু ঘটে যেতে পারে বলে তারা মনেও করেন। বিশেষ করে ইলেকশন মৌসুমে এসে রাজনৈতিক দৃশ্যপট পাল্টে যেতে পারে, এমনটা তারা ভেবে রাখছেন।

আরো কিছু হিসাব-নিকাশ সামনে রয়েছে। মোট ৫০টি রাজ্যের মধ্যে ১৮টিতে ১৯৯২ সাল থেকে টানা জয় পেয়ে আসছে ডেমোক্র্যাটরা। এই রাজ্যগুলো থেকে তারা অনায়াসেই পেয়ে যাচ্ছেন ২৪২টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট। কখনো কখনো সুইং স্টেটগুলো দুই-একটি বাদ থাকার অবস্থাতেই তাদের এই ভোট নিশ্চিত হয়ে যায়। এরই ফলে রিপাবলিকানদের সবশেষ দুই প্রার্থী মিট রমনি ও জন ম্যাককেইনকে জয়ের জন্য সবগুলো প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ রাজ্যে জয় নিশ্চিত করতে হতো। যা তারা করতে ব্যর্থ হন।

ক্যাম্পেইনের প্রথম দিকে ডনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে ডেমোক্র্যাট স্টেটগুলোতে, বিশেষ করে নিউইয়র্ক ও ম্যাসাচুসেটসে কর্মজীবী শেতাঙ্গ আর নিরপেক্ষ ভোটারদের ভোট পেয়ে যাওয়ার একটা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিলো।

ট্রাম্প ক্যাম্পেইনের চেয়ারম্যান পল ম্যানফোর্ট এ মাসের গোড়ার দিকে বলেছিলেন নিউ জার্সি আর ওরেগনে ডনাল্ড ট্রাম্প কঠোর লড়াইয়ে সামিল হবেন। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার এক ই-মেইল বার্তায় তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক দৃশ্যপট পাল্টে যাচ্ছে, ফলে জয়ের অনেক পথই খোলা হয়ে যাচ্ছে ডনাল্ড ট্রাম্পের সামনে।

আমাদের অনেক ভিন্ন ভিন্ন পথ রয়েছে এই নির্বাচন জয়ের, যা মিট রমনির চেয়েও অনেক বেশি, বলেন ম্যানফোর্ট।

তবে, ভেতরের খবর হচ্ছে ট্রাম্প ক্যাম্পেইনের উপদেষ্টারা ইলেক্টরাল ম্যাপের হিসাব নিকাশে আরও শীতল পরিস্থিতিই দেখতে পাচ্ছেন। ২৭০টি ইলেক্টরাল কলেজ ভোট নিশ্চিত করার জন্য তাদের সামনে এখন পথ অনেক কম। এমনকি তা মিট রমনি বা জন ম্যাককেইনের চেয়েও দুদর্শাগ্রস্ত। নারী ভোটার আর অশেতাঙ্গদের মধ্যে জনপ্রিয়তা হারানোই এর প্রধান কারণ।

এর বাইরে ডনাল্ড ট্রাম্পকে অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক দিক থেকেও হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে প্রকট অসুবিধা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। প্রার্থীতার লড়াইয়ে মিট রমনি যেসব রাজ্যে তার প্রতিযোগী ছিলেন যেসব রাজ্যে তহবিলের কিছুই আর ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্য অবশিষ্ট নেই। জুনের শেষ নাগাদ ট্রাম্পের কাছে ক্যাম্পেইন তহবিল ছিলো ২০ মিলিয়ন ডলারেরও কম। সেখানে হিলারির তহবিল ছিলো ৪৪ মিলিয়ন ডলার।

সুইং স্টেটগুলোর কয়েকটিতেই ট্রাম্প ক্যাম্পেইন তাদের রাজ্য পর্যায়ের অপারেশনে প্রয়োজনীয় বাজেটের অনুমোদনই এখনো নিতে পারেনি। আর রিপাবলিকানদের ভেতরের খবর হচ্ছে, আসলে অঙ্গরাজ্য কিংবা জাতীয় পর্যায়ে বিজ্ঞাপনের যে বাজেট তা কোথা থেকে আসবে সে নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।

এর বাইরে বেশ কয়েকটি স্টেটে ডনাল্ড ট্রাম্প তার নিদের দলের ভেতরের ঝামেলাই এখনো সামাল দিয়ে চলেছেন। ওহাইওতে জনপ্রিয় রিপাবলিকান গভর্নর জন কাশিকের সঙ্গে তিনি নিজেই বসচায় জড়িয়েছেন। প্রাইমারিতে কাশিক তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। আর ট্রাম্পের ক্যাম্পেইনকে তিনি এখনো এনডোর্স করেননি, করবেন না বলে ঘোষণাও দিয়েছেন। ফ্লোরিডার দক্ষিণাংশের বেশ কিছু প্রভাবশালী হিসপ্যানিক রিপাবলিকান তাদের সমর্থন তুলে নিয়েছেন, আর ট্রাম্পেরই প্রার্থীতাই তারা মানছেন না।

এখানেই শেষ নয়। আইওয়ায়ও তার পরিস্থিতি ইতিবাচক কিছু নয়। এখানকার ৬টি ইলেক্ট্ররাল ভোট প্রেসিডেন্ট ওবামা জিতে নিয়েছেন গত দুই দফাতেই। আর মিশিগানেও ১৯৮৮ সালের পর কোনও রিপাবলিকান প্রার্থী জয়ের মুখ দেখেনি।

অনেকগুলো ননট্র্যাডিশনাল সুইং স্টেটে এখনো ট্রাম্পের পা-ই পড়েনি। তবে ট্রাম্পের রানিং মেট পেন্স কিছুটা ইতিবাচক বার্তা হয়তো বয়ে আনতে পারবেন বলে ধারনা অনেকের। এরই মধ্যে তিনি ডেট্রোইটের উপ-শহর এলাকাগুলোতে ঘুরে ঘুরে ভোট চাইতে শুরু করেছেন। ইন্ডিয়ানার এই গভর্নর ওহাইও এবং পেনসিলভানিয়াতে তার অধিকাংশ সময় কাটাবেন বলেই জানা গেছে।

এছাড়াও জর্জিয়া, আরিজোনার মতো রাজ্যগুলোতে হিলারির বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা গড়ে তুলতে পেন্সের ভূমিকাই মুখ্য হয়ে উঠবে।

একসময়ের রেডিও হোস্ট মাইক পেন্স সেদিক থেকে অর্জিত জনপ্রিয়তাও কাজে লাগাতে পারবেন।

তবে এসব করলেও এবারেও ভোটে ট্রাইফেক্টায় জয় নিশ্চিত করতে না পারলে ট্রাম্পের সকল বাগাড়ম্বর ধুলোয় মেলাবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

You Might Also Like