জেলে বসেই নিরাপদে কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে জঙ্গিরা

গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার এক আসামি কারাগার থেকে মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে হুমকি দিয়েছিলেন। আবার রায় ঘোষণার আগে আরেক আসামি জাহাঙ্গীর হোসেন (রাজীব গান্ধী) আদালতে দায় স্বীকার করবেন, এমন সিদ্ধান্তও জঙ্গিরা নিয়েছিলেন কারাগারে বৈঠক করে। পুলিশের সর্বশেষ তথ্য হলো, ‘আইএস টুপি’ জঙ্গিরা পেয়েছেন কারাগার থেকেই।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) কর্মকর্তারা বলছেন, কারাগারের ভেতরে থাকা জঙ্গিদের সঙ্গে বাইরের জঙ্গিদের নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। এই মুহূর্তে কারাগারে আইএসপন্থী নব্য জেএমবির নেতৃত্ব দিচ্ছেন আকরাম হোসেন খান (নিলয়) ও আসলাম হোসেন (র‍্যাশ)। আকরাম হোসেন হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে আত্মঘাতী হামলা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। আর আসলাম হোলি আর্টিজানে হামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।

সিটিটিসির অন্তত তিনটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই আসলামই মাসখানেক আগে হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীরের মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠান। বার্তায় তিনি তাঁর পরিচয় দিয়ে হুমায়ুনকে একা দেখা করার কথা বলেন। নম্বরটি ধরে এখন অনুসন্ধান চালাচ্ছে পুলিশ।

প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, আসলাম কোনো একজন কারারক্ষীর মুঠোফোন থেকে খুদে বার্তাটি পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জাহাঙ্গীর হোসেন হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালতে পৌনে এক ঘণ্টা ধরে বক্তৃতা দেন। ওই বক্তৃতায় তিনি হোলি আর্টিজানে হামলাকারী সরবরাহের কথা স্বীকার করেন। কিন্তু তিনি দাবি করেন, আসামিদের অন্য কেউ এই হামলা সম্পর্কে জানতেন না, তাঁরা নির্দোষ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিটিটিসির ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা বলেন, জাহাঙ্গীর হোসেন বেশ কয়েকটি হত্যা মামলার আসামি। তাঁর মৃত্যুদণ্ড এড়ানোর সুযোগ ছিল না। তাই শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি অন্যদের বাঁচাতে বক্তব্য দেন। এই সিদ্ধান্তও সাংগঠনিক এবং কারাগারেই নেওয়া হয়েছিল।

২৭ নভেম্বর হোলি আর্টিজানে হামলা মামলার রায়ে সাত জঙ্গির ফাঁসি হয়। সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের এজলাস থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান বের হওয়ার সময় আইএসের মনোগ্রামসংবলিত টুপি মাথায় দিয়ে বের হন। এরপরই সিটিটিসির অন্তত চার কর্মকর্তা কারাগারের জঙ্গি ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় তাঁদের বক্তব্যের সমর্থনে তথ্য দেন।

তাঁরা বলেন, কারাগারে জঙ্গিবাদ থেকে হাজতিদের ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ নেই। একই মতাদর্শের অনুসারী কারাবন্দীরা একসঙ্গে থাকেন। আলাপ-আলোচনা করেন। আদালতের হাজতখানাতেও তাঁদের ওপর যথেষ্ট নজরদারি হয় না। এ জন্যই ঝুঁকি এড়াতে রায়ের ছয় মাস আগেই আসামিদের কাশিমপুর থেকে কেরানীগঞ্জ কারাগারে আনা হয়।

সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক শহীদুল হক বলেন, কারা ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন দরকার। সাবেকি চালে কারাগার পরিচালনার আর সুযোগ নেই। কিন্তু উদ্যোগের ঘাটতি আছে। নিয়ম অনুযায়ী কারাগারে কেউ বন্দীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে পুলিশের বিশেষ শাখা ও কারাগারের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকার কথা। এটা কঠোরভাবে পালিত হচ্ছে কি না, দেখা খুব জরুরি। নইলে বন্দীদের কাছে সবকিছু পৌঁছাচ্ছে কী করে?

অবশ্য কারা কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গত বৃহস্পতিবার কারা অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক টিপু সুলতান বলেন, কারাগারের ভেতরে মুঠোফোন ব্যবহার করা, বৈঠক করা বা জঙ্গিদের মেলামেশার কোনো সুযোগ নেই।

কারা অধিদপ্তরের দুজন কর্মকর্তা দোষ চাপিয়েছেন পুলিশের ওপর। তাঁরা বলেন, শুধু আদালতে হাজিরা দেওয়ার সময়ই জঙ্গিদের কথা বলার সুযোগ হয়। আদালতে হাজিরার সময় তাঁরা বন্দীকে তল্লাশি করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। আদালত থেকে ফেরার পর তল্লাশি করে ঢোকান। তাঁদের কাছে কেউ চিঠি লিখলে বা তাঁরা কাউকে চিঠি লিখলে সেগুলো কারারক্ষীরা পড়ে তারপর ব্যবস্থা নেন। বাড়ি থেকে কাপড়চোপড় পাঠালেও সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া হয় না। জঙ্গিদের কার্যক্রম দেখাশোনার জন্য সিসি ক্যামেরা রয়েছে। মুঠোফোনও ব্যবহার করার সুযোগ পান না। তাই পুলিশ যে অভিযোগ তুলছে, তা অসত্য।

তবে সিটিটিসির দুজন কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের ওপর এ বছরের এপ্রিল থেকে ধারাবাহিক হামলার পর বেশ কিছু জঙ্গি গ্রেপ্তার হন। তাঁদের একজনের ল্যাপটপ থেকে হামলার লক্ষ্যস্থলের একটি তালিকা উদ্ধার করা হয়। ওই তালিকা কারাগার থেকে আসা বলে জিজ্ঞাসাবাদে নিশ্চিত করেছেন গ্রেপ্তার জঙ্গিরা।

কারাগার থেকে জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনার ইতিহাস পুরোনো। এর আগে ২০১৪ সালে ত্রিশালে হামলা চালিয়ে জেএমবির তিন নেতাকে ছিনিয়ে নেন দলটির কর্মীরা।

কথা বলা বা মেলামেশার সুযোগ নেই বললেও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার হয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরে হাই সিকিউরিটি কারাগারে ছিলেন এবং এখন জামিনে মুক্ত, এমন এক ব্যক্তি বলেন, কয়েকটি কক্ষ নিয়ে কারাগারে একেকটি ব্লক রয়েছে। প্রতিটি কক্ষে চারজনের থাকার ব্যবস্থা। তাঁরা একতলা থেকে অন্য তলায় যেতে পারেন না ঠিকই, তবে ব্লকে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান। কারণ, দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সেলগুলো খুলে দেওয়া হয়।

সূত্র – প্রথম আলো

You Might Also Like