জেরুজালেম ইস্যুতে বিস্ফোরণ ঘটালেন ট্রাম্প

আহমদ রফিক

মধ্যপ্রাচ্যের নানা সংকট বোধ হয় শেষ হওয়ার নয়। একদিকে সৌদি আরব জোট, অন্যদিকে ইয়েমেন।

আর গাজা-রামাল্লা এলাকায় পরবাসীর মতো অবস্থানরত ফিলিস্তিনি আরবদের অবস্থা তো অবরুদ্ধ এলাকার বাসিন্দাদের মতো। গ্রেপ্তার, অত্যাচার, নির্যাতন, জেল-জুলুম ও গোলাগুলিতে মৃত্যু নিয়মিত ঘটনা। সে গোলন্দাজি বিমান থেকে হোক বা স্থলবাহিনীর অভিযানে হোক। ফিলিস্তিনি বাসস্থানে নরক-গুলজারে ইসরায়েলি বর্বরতা হিটলারি আমলের নািস বর্বরতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে মানবিক বিবেচনায় মিত্রশক্তির তিন প্রধান—রুজভেল্ট-চার্চিল-স্তালিন নিপীড়িত, যাযাবর-প্রায় ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠী ইহুদিদের প্রতি সমবেদনাবশত বিতর্কিত এলাকায় ইহুদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় একমত হন। গড়ে ওঠে ইসরায়েল রাষ্ট্র ফিলিস্তিনি আরব ভূখণ্ডে। এর অনেক আগে থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিনিরা সাম্রাজ্যবাদী চতুরতায় বাস্তুহারা, সহায়হীন। দীর্ঘকালের রাজনৈতিক-রাষ্ট্রনৈতিক ষড়যন্ত্র ও দুর্বৃত্তপনার প্রধান হোতা উপনিবেশবাদী ব্রিটেন।

উপনিবেশবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও ‘ভাগ করে শাসন করা’ বা প্রাধান্য বিস্তারে সর্বাধিক চতুর ব্রিটেনের ‘বেলফোর ঘোষণা’র শত বছর পর আজ সেই ধারায় নতুন করে নারকীয় আগুন জ্বালাল যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর জেরুজালেম বিষয়ক ঘোষণায় (ডিসেম্বর, ২০১৭)।

এ ঘোষণায় জেরুজালেমকে ইসরায়েল রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েই ক্ষান্ত হননি ট্রাম্প। তিনি ইসরায়েল রাষ্ট্রের রাজধানী তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর করার কথাও বলেছেন।

প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ মধ্যপ্রাচ্য, ক্ষুব্ধ মুসলিম বিশ্ব। এমনকি খ্রিস্টীয় ভুবনও অসন্তুষ্ট। তা বোঝা যায় ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপের প্রতিক্রিয়ায়। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রবল প্রতিবাদী প্রতিক্রিয়া, যা আরো স্পষ্ট দৈনিক পত্রিকাগুলোর ক্ষুব্ধ শিরোনামে এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনে। এসবের মূলকথা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভুবনে আগুন জ্বেলে দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এর বড় কারণ ফিলিস্তিনি আরবদের স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন নিয়ে টানাপড়েন চলছিল ক্যাম্প ডেভিড শান্তিচুক্তির পরও। ফিলিস্তিনি জননেতা ইয়াসির আরাফাতের সে চুক্তি মেনে নেওয়া সত্ত্বেও। সেই সঙ্গে যুক্ত ছিল এমন প্রশ্ন: জেরুজালেম কাদের? তখন এমন ধারণা প্রচলিত ছিল যে দ্বিভাজিত জেরুজালেম হবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের রাজধানী।

ইতিহাসের পরিহাস যে না ইহুদি, না ফিলিস্তিনি কেউ এমন সমঝোতা প্রস্তাবে রাজি ছিল না। যেমন ছিল না একদা উগ্রপন্থী ফিলিস্তিনি আরব জাতীয়তাবাদীরা সদ্য গঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে এবং বিনিময়ে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করে নিতে। তারা তখন বুঝতে চায়নি যে সাম্রাজ্যবাদী বৃহৎ শক্তিগুলোর আন্তরিক সমর্থন তাদের পক্ষে নেই। তাই সেই পরিপ্রেক্ষিতে তাদের রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তারা তা করেনি।

দুই.

ফিলিস্তিনি আরব রাজনীতির জটিলতা আজকের নয়, দীর্ঘ সময় আগেকার। সেখানে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, বিশেষ করে ব্রিটিশ রাজশক্তির কূটরাজনীতি, ছলনা, চক্রান্ত ইত্যাদি। পরিণামে ফিলিস্তিনি আরবদের বঞ্চনা, প্রতারিত যন্ত্রণা এবং জাতিগত বিপর্যয় ও যাযাবর জীবন। স্বভাবতই জাতীয়তাবাদী চেতনার উদ্ভাস, মূলত উগ্রপন্থী সংগঠনের আবির্ভাবে।

ফিলিস্তিনি অতীতের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, তত্কালীন ফিলিস্তিন ছিল তুর্কি অটোমান সাম্রাজ্যের অংশবিশেষ। এ ভূখণ্ডে ছিল তিন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে পবিত্র স্থান রূপে বিবেচিত জেরুজালেম, হেবরন, বেথেলহেম ও নাজারেথ। অধিবাসীরা সংখ্যায় যথাক্রমে কম-বেশি ইহুদি, খ্রিস্টান ও ফিলিস্তিনি আরব মুসলমান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৮) তুর্কি সাম্রাজ্যের পতন ও ব্রিটিশ মিত্রশক্তির জয় ফিলিস্তিনি আরবদের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করে।

বিশাল তুর্কি অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার ফলে একদিকে তুর্কি জাতীয়তাবাদী, সেক্যুলার, আধুনিক তুরস্ক রাষ্ট্র গঠিত হয় কামাল আতাতুর্কের সংগ্রামী নেতৃত্বে। অন্যদিকে বিশাল ভূখণ্ড ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো সেগুলোর নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করে। জেরুজালেমসহ ফিলিস্তিনে ব্রিটেনের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ফিলিস্তিনে  প্রত্যক্ষ ব্রিটিশ শাসন চলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।

এ সময়পর্বে ফিলিস্তিনকে ঘিরে চলেছে ব্রিটিশ শাসনসুলভ রাজনৈতিক চাতুর্যের অনেক খেলা, দুর্বোধ্য কারণে তা ছিল ফিলিস্তিনি আরববিরোধী নীতির। অথচ আরবরা তখন সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিসত্তা, যাদের বেশির ভাগ মুসলমান এবং বাকি সংখ্যালঘু খ্রিস্টান। জাতিসত্তার এ পরিস্থিতিতে অদ্ভুত ঘটনা হলো বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইহুদিদের, নানা কারণে ছোট ছোট গ্রুপে ফিলিস্তিনে অভিবাসী হিসেবেই স্থায়ী বসবাস।

একটি বাস্তব সত্য মনে রাখার মতো যে ইহুদিদের অর্থশক্তি এবং বৈষয়িক ও জ্ঞানচর্চার বুদ্ধিবৃত্তি ছিল তত্কালীন প্রতিবেশী আরবদের তুলনায় উচ্চমাত্রার। বিশ শতকে ইহুদিদের জ্ঞানবিজ্ঞান ও রাজনীতিচর্চা তেমন প্রমাণ দেয়, গুটিকয়েক বিখ্যাত ব্যক্তির উদাহরণ যদি না-ও ধরা হয়। সবাই জানেন, জার্মানি থেকে হিটলারের ইহুদি বিতাড়নের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল জার্মানির আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে ইহুদিদের প্রাধান্য। সে কারণে হিটলারের জার্মান, জাতীয়তাবাদী প্রচার প্রবল ইহুদিবিরোধী রাজনীতির জনপ্রিয় রূপ ধারণ করে। জনসমর্থনপুষ্ট এ উগ্রতার অমানবিক পরিণাম হিটলারের নির্দেশে গ্যাস চেম্বারে বিপুলসংখ্যক ইহুদি নারী-পুরুষ-শিশুর শোকাবহ মৃত্যু। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষে এ ঘটনা ইহুদিদের পক্ষে বিশ্বব্যাপী সমবেদনার ঢেউ তোলে। আর প্রেক্ষাপট তৈরি করে স্বতন্ত্র ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের। এসব অনেক পরের কথা।

তিন.

আবারও পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে রাজনীতির নানা ডামাডোলের মধ্যেই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি বসতির সংখ্যা বাড়তে থাকে, সম্ভবত তাদের ধর্মীয় জাতিগত ঐক্যবোধের ভিত্তিতে। এর মধ্যেই ইতিহাসের কুখ্যাত বেলফোর ঘোষণা, ১৯১৭ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ শাসকদের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য ‘স্বতন্ত্র বাসভূমি প্রতিষ্ঠার’ লক্ষ্যে। ঘোষণায় এমন কথাও বলা হয় যে ব্রিটিশ সরকার এ বিষয়টিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনায় রাখবে।

সাম্রাজ্যবাদী কূটনীতির এ ঘোষণা ইহুদি সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে যেমন উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন ঘিরে, তেমনি ব্যাপক হতাশা ও ইহুদিবিরোধী বিরূপতা সৃষ্টি করে মূলত ফিলিস্তিনি  আরবদের মধ্যে। তৈরি হয় আরব-ইহুদি সংঘাতের পটভূমি। বলা বাহুল্য, এর পেছনে ছিল মধ্যপ্রাচ্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা এবং তা আরব-ইহুদি দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের মাধ্যমে। সেই সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনার সাফল্য এখনো দৃশ্যমান। চতুর ইহুদি তোষণে তৈরি হয় চতুর সাম্রাজ্যবাদী নীতি।

জ্ঞানবিজ্ঞান-প্রযুক্তিচর্চা ও শিল্পবিপ্লব ইউরোপীয় রাজশক্তিগুলোকে  শক্তিশালী উপনিবেশবাদী চরিত্রে  পরিণত করে। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা তাদের আগ্রাসনভূমিতে পরিণত হয়। সম্পদ ও বিত্তের প্রাচুর্যে তাদের রাজনৈতিক শক্তি অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। আঠারো থেকে উনিশ শতক অবধি তাদের এই দাপট অব্যাহত ধারায় চলেছে। চলেছে বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত অধিকৃত দেশগুলোতে জাতিসত্তার মুক্তিসংগ্রাম প্রবল হওয়ার কারণে।

মধ্যপ্রাচ্য এদিক থেকে খুব একটা ভিন্ন নয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক জটিলতা সেখানকার জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের সাফল্য অনেকাংশে ব্যাহত করেছে। করেছে সেখানে জাতিরাষ্ট্র বা রাজ্যগুলো গড়ে ওঠার পর পরস্ফুিট অনৈক্যে এবং ধর্মীয় তরিকার ভিন্নতায়। এ সুযোগ বরাবর নিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো। ফিলিস্তিনও এ রাজনৈতিক টানাপড়েনের শিকার, সম্ভবত সর্বাধিক মাত্রায়। তাই তাদের বিলম্বিত যাত্রা প্রতিবাদী আন্দোলন তৈরিতে।

একদিকে তাদের মধ্যে স্থানীয় ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের তাগিদে জাতীয়তাবাদী চেতনার উদ্ভব ও বিকাশ, তেমনি ধর্মীয় জাতীয়তার টানে সৃষ্ট প্যান-ইসলামিজমের প্রভাব ও বিস্তার, দুই বিপরীতের অবাঞ্ছিত প্রকাশ। এর ফলে জাতিসত্তার আন্দোলন ও সংগ্রাম যে দুর্বল ও ব্যাহত হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। এ দুর্বলতার পরিণামে ব্যর্থতা। সেই সঙ্গে সক্রিয় থেকেছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির রাজনৈতিক কূটচাতুর্য ও শক্তির প্রভাব।

তবু ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী শক্তি ও সংগঠন এই জটিলতার মধ্যে গড়ে উঠেছে। তাদের লড়াই করতে হয়েছে দুই ফ্রন্টে—একদিকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, অন্যদিকে দ্রুত বিকাশমান ইহুদি জাতীয়তাবাদ তথা জিওনিজমের বিরুদ্ধে। এর মধ্যেও ছিল অভ্যন্তরীণ বিভাজন। ইহুদিদের সে সমস্যা খুব একটা ছিল না। ফিলিস্তিনি আরবদের লড়াইয়ের আরেক দুর্বল দিক ছিল এর ধর্মীয় চেতনার প্রভাব। প্রসঙ্গত, জেরুজালেমের গ্র্যান্ড মুফতির প্রতিবাদী সংগ্রাম স্মর্তব্য।

এমন সব ঘটনার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় ফিলিস্তিনি আরব জাতীয়তাবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ফিলিস্তিনি আরবদের জন্য স্বতন্ত্র বাসভূমির দাবি জোরদার হতে থাকে। এ সময়পর্বে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান ব্যক্তি আমিন আল হোসাইনি। ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী শক্তির সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ইহুদি রাষ্ট্রপন্থীদের সংঘাত অব্যাহত ধারায় চলতে থাকে। এর বিস্তার ঘটে কিছুটা হলেও তৃণমূল পর্যায়ে। একাধিক অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ হয় আধুনিক অস্ত্রধারী যুদ্ধবাদী ব্রিটিশ রাজশক্তির সক্ষম চাতুর্যে।

গত শতাব্দীর বিশ ও তিরিশের দশকের সময়-পরিসর ফিলিস্তিনে আরব-বনাম ইহুদি দ্বন্দ্বের পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামও চলতে থাকে আরব জাতীয়তাবাদীদের তরফে। তবে তত্কালীন বিশ্বরাজনীতির ঘটনাবলি তাদের পক্ষে ছিল না। ইউরোপে, বিশেষ করে জার্মানিতে ইহুদি বিতাড়নে ফিলিস্তিনে ইহুদি জনসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। অন্যদিকে নািস দমননীতির অমানবিকতায় বিশ্ব সহানুভূতি ইহুদিদের পক্ষে যায়।

চার.

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পুরোপুরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নািস বর্বরতার কারণে এবং যুদ্ধে তাদের পরাজয়ে। ইহুদি পুনর্বাসনের তাগিদ অনুভব করেন বিজয়ী রাষ্ট্রনেতারা। সহানুভূতি-পুরস্কার হিসেবে ফিলিস্তিনে ১৯৪৮ সালে গঠিত হয় ইসরায়েলি রাষ্ট্র। চরিত্র বিচারে এটি ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী উগ্রপন্থী রাষ্ট্র। হতভাগ্য ফিলিস্তিনিদের গতি হয় জর্দানসহ সন্নিহিত আরব রাজ্যগুলোতে, অনেকটা যাযাবর বসবাসকারীদের মতো। তাদের পুনর্বাসনের কথা ভাবা হয়নি।

তবে উল্লেখ্য, ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে ফিলিস্তিনকে বিভাজিত করে আরব ও ইহুদি রাষ্ট্র গঠন এবং জেরুজালেমকে স্বতন্ত্র রাখার জাতিসংঘের প্রস্তাব কোনোপক্ষই গ্রহণ করেনি। এ প্রস্তাব  ফিলিস্তিনি আরবদের জন্য ছিল মন্দের ভালো। যেমন—১৯৪৬ সালে ভারতবর্ষে কেবিনেট মিশন প্রস্তাব, অখণ্ড ভারত রাষ্ট্রের পরিপ্রেক্ষিতে, যা নানা রাজনৈতিক জটিলতায় ফলপ্রসূ হয়নি।

এর আগে ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের প্রসার ও বিভাজন—দুই-ই ঘটে। সবশেষ পর্যায়ে ফিলিস্তিনি মুক্তির পক্ষে সংগ্রামরত দুটি রাজনৈতিক সংগঠনের নাম উল্লেখযোগ্য। প্রধান সংগঠনটির নায়ক বহু পরিচিত ইয়াসির আরাফাত, যিনি সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নীতিতে বিশ্বাসী (পিএলও তথা প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন)। অপেক্ষাকৃত ছোট সংগঠনটি মার্ক্সবাদী আদর্শে সমাজতান্ত্রিক ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনে বিশ্বাসী। মূল পরিচালক ব্যক্তিটির নাম জর্জ হাবাস। এসব ক্ষেত্রে অর্থাৎ জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদই প্রাধান্য পায়, যেমন দেখা গেছে ষাটের দশক হয়ে সত্তরের দশকের শুরুতে পূর্ববঙ্গে।

তাই আরাফাতকে কেন্দ্র করেই ফিলিস্তিনি আরবদের মুক্তিসংগ্রামের তত্পরতা। মার্কিন প্রেসিডেন্টের তত্পরতায় ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি ও ফিলিস্তিনিদের সাময়িক আবাসন ক্ষুদ্র আয়তনের ভূমিতে জর্দান নদীর পশ্চিম তীরে ও গাজায়। কিন্তু ইসরায়েলি চাতুর্যে ও অর্থশক্তির দাপটে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা সফল হয়নি। ইহুদি চক্রান্তে আরাফাতের অপঘাত মৃত্যু। অন্যদিকে তাঁর উত্তরসূরি নরমপন্থী মাহমুদ আব্বাস ও চরমপন্থী ফিলিস্তিনি তরুণদের ইহুদিবিরোধী সংগঠন ‘হামাস’ পরস্পরবিরোধী অবস্থানে। তাই সুযোগ-সুবিধা ইসরায়েলের ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালানোর। জেল-জুলুম-নির্যাতন-হত্যার শিকার অসহায় ফিলিস্তিনিরা। বিশ্ব-আরব রাষ্ট্র, বিশেষ করে সৌদি আরব জোট এ ব্যাপারে নীরব দর্শক। জয় ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের। সম্প্রতি হামাস ও আব্বাসের সমঝোতা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে।

ফিলিস্তিনি আরবদের ‘ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র’ গঠনের সংগ্রাম এভাবে বিভাজিত হয়ে, শক্তিমান আরব রাষ্ট্রের সমর্থনের অভাবে রক্তপাতেই আত্মরক্ষায় ব্যস্ত। ইরান, একদা ইরাক, লিবিয়া ও যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া ফিলিস্তিনি আরবদের পক্ষে দাঁড়ানো সত্ত্বেও সুফল মেলেনি। মিসর অন্যদিকে, অর্থাৎ ইসরায়েলের মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদার। একই পথে তুরস্ক। আর সৌদি আরব প্রভাবিত ওআইসি তো নীরব। এ পরিস্থিতিতেও ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা জেরুজালেমের দাবিতে বরাবর সোচ্চার।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু উগ্র ইহুদিবাদী। তাঁর অযৌক্তিক দাবি, জেরুজালেমে তাঁদের ঐতিহ্যবাহী অধিকার। এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার চেষ্টা ছিল সমঝোতার ভিত্তিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠন পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে। কিন্তু তাঁর চেষ্টা সফল হয়নি তাঁর স্বদেশে সক্রিয় জোরালো ইহুদি লবির কারণে।

এবার হোয়াইট হাউসে বসে বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বোমা ফাটালেন ইসরায়েলের পক্ষে দামামা বাজিয়ে যে জেরুজালেমই ইসরায়েল রাষ্ট্রের রাজধানী, সব তথ্য এর আগে পরিবেশিত। প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্য পরিবেশ কিছুটা  ভিন্ন, মূলত পবিত্র শহর জেরুজালেমের কারণে।

সম্প্রতি ওআইসির ঘোষণা : ‘পূর্ব জেরুজালেম হবে ফিলিস্তিনের রাজধানী। ’ এ ব্যাপারে তত্পর তুরস্কের রাষ্ট্রনায়ক এরদুয়ান। তাঁরও বক্তব্য জেরুজালেম শুধু ইহুদিদের নয়। আরব লীগ উদ্বিগ্ন শান্তি প্রক্রিয়ার মৃত্যু ঘটার কারণে। বিশ্ব বিশ্লেষকদের সমর্থন এখন ফিলিস্তিনি আরবদের দিকে। স্মর্তব্য, রবার্ট ফিস্ক প্রমুখ সাংবাদিকের বয়ান। মুসলিম বিশ্বের ক্ষোভের মুখে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা এখন সময়ের ব্যাপার। দেখার বিষয় সৌদি আরব জোট কী ভূমিকা নেয়। কতটা আন্তরিকতা নিয়ে।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

You Might Also Like