হোম » জেরুজালেম ইস্যুতে কার কী প্রতিক্রিয়া

জেরুজালেম ইস্যুতে কার কী প্রতিক্রিয়া

ঢাকা অফিস- Wednesday, December 6th, 2017

জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি ও তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য ঘোষণার বিষয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়।

মুসলিম বিশ্বের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সতর্ক বার্তা উপেক্ষা করেই বাংলাদেশ সময় বুধবার মধ্যরাতে এ-সংক্রান্ত ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ফিলিস্তিনের ঘোরতর আপত্তি ও আরব বিশ্বে টানটান উত্তেজনার মধ্যেই মঙ্গলবার ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এবং অন্য আরব নেতাদের টেলিফোন করে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ইচ্ছার কথা জানিয়ে দিয়েছেন।

সম্ভাব্য এই ঘোষণা না দিতে ট্রাম্পকে অনেকে সতর্ক করেছেন। তাদের ভাষ্য, এই পদক্ষেপে মধ্যপ্রাচ্য ও যেকোনো ক্ষেত্রে এবং ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রক্রিয়ায় প্রকৃত স্থিতিশীলতার বিষয়ে ‘ভয়ংকর পরিণতি’ ঘটাবে।

এখনো পর্যন্ত জেরুজালেমে কোনো দেশের দূতাবাস নেই এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে এবং তাদের একচ্ছত্র সার্বভৌম শহর হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে ১৯৬৭ সালে সিরিয়া, জর্ডান ও মিশর- এই তিন দেশের সঙ্গে যুদ্ধ জয়ের পর পূর্ব জেরুজালেম অধিগ্রহণ করে ইসরায়েল এবং তারা মনে করে, জেরুজালেম হবে একটি ‘অখণ্ড’ শহর। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা বিশ্বাস করে, তাদের ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম।

এই পরিস্থিতিতে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের প্রতিক্রিয়া কেমন- তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক।

মঙ্গলবার ট্রাম্প টেলিফোন করে কথা বলার পর মাহমুদ আব্বাসের মুখপাত্র নাবিল আবু রুদেইনা এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট আব্বাস সতর্ক করে দিয়েছেন, এ ধরনের পদক্ষেপে শান্তি প্রক্রিয়া এবং এ অঞ্চল ও বিশ্বের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।’

জর্ডানের বাদশা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ ট্রাম্পকে যেভাবে সতর্ক করেছেন, তাতে মাহমুদ আব্বাসের উদ্বেগেরই প্রতিফলন দেখা গেছে। বাদশার প্রাসাদ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘তিনি ট্রাম্পকে বলেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তায় ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে।’ ট্রাম্পকে হুঁশিয়ার করে বাদশা আরো বলেছেন, এ ধরনের পদক্ষেপে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সৃষ্টির পথ বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যে রাষ্ট্রের রাজধানী হওয়ার কথা পূর্ব জেরুজালেম। বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘এই অঞ্চলে ও বিশ্বে শান্তি এবং স্থিতিশীলতা অর্জনের ক্ষেত্রে জেরুজালেমই কেন্দ্রবিন্দু।’ মাহমুদ আব্বাসকে ফোন করে বাদশা আবদুল্লাহ বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্তের ফলে পরিস্থিতি যা-ই হোক, তারা একত্রে তা মোকাবিলা করবে।

এক বিবৃতিতে ট্রাম্পকে সতর্ক করে দিয়ে মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি বলেছেন, ‘এ ধরনের পদক্ষেপ নিলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ ভূলুণ্ঠিত হবে।’ বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘আন্তর্জাতিক ফ্রেমওয়ার্কের মতামতের ভিত্তিতে ও জাতিসংঘের প্রাসঙ্গিক প্রস্তাবের মধ্যে থেকে জেরুজালেমের বৈধ মর্যাদা সংরক্ষণের বিষয়ে মিশরের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন মিশরীয় প্রেসিডেন্ট।’

পৃথক টেলিফোন আলাপে সৌদি বাদশা সালমান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে বলেছেন, ‘জেরুজালেম পরিস্থিতি নিয়ে স্থায়ী সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে আমেরিকার যেকোনো ঘোষণা শান্তি আলোচনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং এই অঞ্চলে অশান্তি বাড়াবে।’

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসপিএ বাদশাকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, তিনি ফিলিস্তিনের জনগণ ও তাদের ঐতিহাসিক অধিকারকে সমর্থন করেছেন এবং দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, জেরুজালেম ও আল-আকসা মসজিদের পবিত্র মর্যাদার কারণে এ ধরনের ভয়ংকর পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের ভাবাবেগে আগুন ছড়িয়ে দেবে।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, ‘অযোগ্যতা ও ব্যর্থতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের কাজ করছে।’ এদিকে, সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘ফিলিস্তিন দখল ও ফিলিস্তিনিদের উদ্বাস্তু করার ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ চূড়ান্ত রকমের অপরাধ।’

রোমান ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস তার সাপ্তাহিক ভাষণে বলেছেন, যেভাবে আল-আকসা মসজিদ পরিচালিত হয়, তার প্রতি সম্মান দেখানো উচিত। ১৯৯৪ সাল থেকে জেরুজালেমে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের সব স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব জর্ডানের ওপর।

মঙ্গলবার তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান কড়া ভাষায় হুশিয়ার করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিলে এবং দূতাবাস স্থানান্তর করলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে তুরস্ক। তিনি আরো বলেন, জেরুজালেম মুসলিমদের জন্য ‘রেড লাইন’। রেড লাইন অতিক্রম না করতে ট্রাম্পর্কে সতর্ক করেছেন তিনি। এ ছাড়া তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আবারো সনির্বন্ধ অনুরোধ করছি : আপনারা এই পদক্ষেপ নিতে পারেন না।’

জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিগমার গ্যাব্রিয়েল মঙ্গলবারের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার এই পদক্ষেপ সংঘর্ষ থামাবে না, বরং তাতে আরো জ্বালানি জোগাবে। তিনি আরো বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপের পরিণতি খুবই ভয়াবহ হবে এবং এমন কিছু না ঘটুক- সবাই তাই চায়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক ফেডেরিকা মোগেরিনি বলেছেন, ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের জন্য দুটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া নস্যাৎ করে, এমন যেকোনো পদক্ষেপ অবশ্যই এড়িয়ে যাওয়া উচিত।

মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টেফান ডুজারিক সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘সম্ভাব্য দুই ‘রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান’ ভণ্ডুল করে, এমন যেকোনো একতরফা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন মহাসচিব।’

হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তের ফলে উপনিবেশের বিরুদ্ধে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠবে এবং জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তরিত হলে, তা হবে ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করার শামিল।

আরব বিশ্বের শীর্ষ সংগঠন আরব লিগের প্রধান আহমেদ আবুল গেইত মঙ্গলবার বলেন, জেরুজালেমের বর্তমান বৈধ ও রাজনৈতিক মর্যাদায় পরিবর্তন আসে, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া ঠিক হবে না। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এমন ঘোষণায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি ছড়িয়ে পড়বে।

তথ্যসূত্র : আলজাজিরা অনলাইন