হোম » জালালুদ্দিন রুমি ও সুফি সাধনা

জালালুদ্দিন রুমি ও সুফি সাধনা

admin- শনিবার, এপ্রিল ১, ২০১৭

কাজী জহিরুল ইসলাম

জালালুদ্দিন রুমির সাহিত্যকর্ম, যা মূলত কবিতা, নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই জেনে নিতে হবে সুফিজম কি। রুমিকে বলা হয় সুফি মাস্টার। কেন তিনি সুফি মাস্টার? আর সুফি জিনিসটাই কি? নবী মোহাম্মদ (সঃ) এর জামাতা এবং ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলী সুফিজমের চর্চা শুরু করেন বলে কেউ কেউ দাবী করলেও অনেকেই আবার ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকরকেই সুফিজমের প্রথম গুরু হিশেবে শনাক্ত করেছেন। যিনিই শুরু করুন না কেন, সুফিজমের উৎপত্তি যে ইসলাম থেকে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রথম দিকে শরিয়া চর্চাই সুফিজম হিশেবে বিবেচিত হতো। কারণ শরিয়া চর্চার মাধ্যমেই খোদার সান্নিধ্য বা নৈকট্য লাভ করা সম্ভব বলে মনে করা হতো। খোদার নৈকট্য লাভই সুফি চর্চার মূল লক্ষ্য। এখনো অনেকে এই চিন্তার সমর্থক। তবে বাহ্যিক ইবাদত ছাড়াও আধ্যাত্মিক চর্চার মাধ্যমে খোদার নৈকট্য লাভ করা সম্ভব বলে যারা মনে করেন তাদের কাছে সুফিজম এসেছে ভিন্ন রূপ নিয়ে। আর এই রূপটি ক্রমশ ধর্মের সীমানাও ছাড়িয়ে গেছে। ইশকের সাধনাই সুফিজম। ইশক মানে প্রেম। খোদার প্রেমে দিওয়ানা হয়ে যাওয়া, বিলীন হয়ে যাওয়ার নামই ইশকের সাধনা। শরিয়া ভিত্তিক সুফিজমের চর্চাকারীরা কোরআন সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করেন বেহেশতে যাওয়ার জন্য। আর বেহেশতে গেলেই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব হবে। আধ্যাত্মিক সুফি সাধকেরা মনে করেন এই পৃথিবীতে থেকেই খোদার নৈকট্য লাভ করা সম্ভব, তাঁরা ক্কালবে খোদার জিকির-ধ্বনি তোলেন, মগ্ন হয়ে খোদার সান্নিধ্য লাভের অভিপ্রায়ে এক স্থানে দাঁড়িয়ে ঘুরতে থাকেন, চোখ বন্ধ করে খোদার প্রেমে ঘন্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন নাওয়া-খাওয়া ভুলে নিমগ্ন থাকেন, সঙ্গীতের তাল-লয়-সুরের মধ্য দিয়ে কেউ কেউ খোদাকে খোঁজেন। সফল আধ্যাত্মিক সুফি সাধকেরা হৃদয়ে খোদার অস্তিত্ব অনুভব করেন। জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন নবী মোহাম্মদ (সঃ) এর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে খোদাকে খোঁজো।
সুতরাং তার কাছে প্রার্থনা করো, “প্রভূ আমাদের প্রকৃত রুপ দেখাও,/যাতে আমরা বিভ্রান্ত না হই এবং ভুল না করি।”/এই বিবেচনায় স্থির হও, যা কিছু ভাল আর পরিষ্কার তা মুহাম্মদের চেয়ে/ ভাল আর কে বলতে পারে, কারণ তিনি তা-ই করেন, যা তিনি বলেন।/ নিজের চিন্তা আর বিবেচনা দ্বারা তাড়িত হয়ো না/ বরং ঈশ্বরের কাছে নতজানু হও এবং তার বিবেচনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হও। (ফিহি মা ফিহি বক্তৃতামালা-১)
সুফিজমকে কেউ কেউ গান বাজনার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক ভাবধারায় গান-বাজনা করলেই হবে না, এটিকে খোদাভজনের সাধনায় নিয়ে যেতে হবে, তবেই সুফিবাদের চর্চা বলে বিবেচিত হবে। যেমন রুমি বলেছেনঃ “খোদার সঙ্গে আমার একটি মুহূর্ত আছে, যেখানে কোনো বার্তাবাহক নবী/ বা খোদার নিকটবর্তী পবিত্র ফেরেশতাদেরও প্রবেশাধিকার নেই।/ জেনে নাও, সেটাই হলো প্রার্থনার আত্মা/ এবং সেই মুহূর্তটি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের এবং অচেতন হয়ে পড়ার।” রুমি মোহাম্মদের প্রদর্শিত পথে হাঁটতে বলেছেন কিন্তু ধর্মান্ধ হতে নিষেধ করেছেন। তিনি আত্মাকে, চিন্তাকে সর্বদা মুক্ত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। “আবরণ মুক্ত করো/ মানুষের মন একটি ঘরের মতো/ সবগুলো দরোজা এবং জানালার কপাট নির্দ্বিধ খুলে দাও/ চিন্তাকে রেখো না বেঁধে সোনার শেকলে/ মুক্তচিন্তা হচ্ছে সেই প্রচেষ্টা যা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ খোদার প্রতি/ তাঁর অগণন উপহারের জন্যে/ মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে অবস্থান খোদার মহানুভবতার প্রতি নির্মম অবজ্ঞা।” তিনি জাগতিক লোভ-মোহ থেকে মুক্ত হতেও পরামর্শ দিয়েছেন। এর সবই হলো সুফি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া।
পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের আত্মা এক সুবৃহৎ পরমাত্মার ভগ্নাংশ, এই বোধের সাথে আমি একমত। সুতরাং সকল আত্মাই কানেক্টেড। মানবাত্মার সেবা করার মধ্য দিয়ে পরমাত্মার সান্নিধ্যলাভ করা সম্ভব, আমি এটা মানি। সেই দিক থেকে মানবতাবাদীরাও সুফি। কোনো না কোনো একটি উপায়ে খোদার নৈকট্য লাভের সাধনায় নিমগ্ন হওয়ার নামই সুফিজম। এটাই সুফিজমের সর্বশেষ বিবর্তন।
ত্রয়োদশ শতকের ফার্সি কবি জালালুদ্দিন রুমি ছিলেন সুফি সাধক এবং কালক্রমে হয়ে ওঠেন সুফি গুরু। তিনি ৩০ সেপ্টেম্বর ১২০৭ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। রুমি কোথায় জন্মগ্রহণ করেন তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তাঁর পুরো নাম জালাল আদ-দীন মুহাম্মদ রুমি বলখি। খোরাশানের বলখ শহরে জন্মেছেন বলেই তাঁর নামের সাথে বলখি যোগ হয়েছে। জায়গাটি বর্তমান আফগানিস্তানে। তবে মতান্তরে বৃহত্তর বলখ অঞ্চলের বখশ নদীর তীরে অবস্থিত ওয়াখশ গ্রামে তাঁর জন্ম, যেটি বর্তমান তাজিকিস্তানে অবস্থিত।
তৎকালীন আফগানিস্তানে জন্ম হলেও কিশোর রুমি তাঁর পরিবারের সাথে বাগদাদ, মক্কা, দামেস্ক হয়ে পৌঁছে যান তুরস্কের কোনিয়াতে এবং সেখানেই থিতু হন। তাঁর বেশিরভাগ সাহিত্যকর্ম কোনিয়াতেই রচিত। এখানেই তিনি ১২৭৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ৬৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তার রচনাসমূহ মাতৃভাষা ফার্সিতে রচিত হলেও তিনি প্রচুর আরবী এবং তুর্কি শব্দ এবং কিছু গ্রীক শব্দ ব্যবহার করেছেন। রুমির শ্রেষ্ঠ কাজ হলো “মসনবী”, যাতে প্রায় ২৭০০০ পঙক্তি রয়েছে। তাঁর অন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ “দিওয়ান-ই-শামস-ই-তাবরিজি”। এর বাইরেও তিনি আনুমানিক ৩৫০০০ ফার্সি শ্লোক এবং ২০০০ রুবাইয়াৎ লিখেছেন।
এ যাবৎ প্রায় পঞ্চাশটিরও অধিক ভাষায় রুমির কবিতা অনুদিত হয়েছে। গত শতাব্দীর শেষ দিকে পাশ্চাত্যে তাঁর কবিতার অনুবাদ প্রকাশিত হলে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। Harper One প্রকাশিত “Essential Rumi” সারা বিশ্বের ২৩টি ভাষায় অনুদিত হয় এবং দুই মিলিয়নের অধিক কপি বিক্রি হয়। ইউনেস্কো ২০০৭ সালে রুমির ৮০০ তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে তাঁর নামে একটি মেডেল চালু করে।
রুমির নামের সাথে মাওলানা দেখে কেউ কেউ তাঁকে না বুঝেই মুখ ফিরিয়ে নেন। প্রকৃতপক্ষে রুমি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের কবি নন। তিনি মানবতার এবং আধ্যাত্মিকতার কবি। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে তিনি ঈশ্বর, মানুষ, আত্মা এবং মহাবিশ্বের প্রেমের জয়গান করেছেন। বিষয়বস্তু হিশেবে তিনি সূক্ষ্ম অর্ন্তদৃষ্টিতে তুলে এনেছেন ফুল, পাখি, নক্ষত্র, চাঁদ, সূর্য, নদী, মাছ এমন কি মহাকাশ বিজ্ঞানীর এস্ট্রোল্যাব পর্যন্ত। ইতিহাস, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, মহাবিশ্ব থেকে শুরু করে মানব জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় তাঁর নিবিড় পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
শুধু মুসলিম বিশ্বেই নয়, রুমি ব্যাপক জনপ্রিয় পশ্চিমাবিশ্বেও। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং বেস্ট সেলার কবি এখন মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি। ইশকের সাধনা যে রহস্যময়তার ঘোর তৈরী করেছে রুমির কবিতায় সেই ঘোরে এখনো, আট’শ বছর পরের আধুনিক মানুষও, বুঁদ হয়ে থাকে। সম্প্রতি আমি জালালুদ্দিন রুমির ৫০টি কবিতা ইংরেজী থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছি। সেই কবিতাগুলোর আলোকে কবি রুমিকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করবো।
“তিনিই শুধু জানেন কোথায় আছে জ্ঞানের দরোজা/ সবই যে তার নিয়ন্ত্রণে গোপনেও করো যা/ ভেবে দেখো রেশম পোকা কোথায় এমন শিক্ষা পায়/ হাতির পালও লজ্জা পায় রেশম পোকার দক্ষতায়/ আদম-পিতা গড়ে তোলেন আবাসভূমি দুনিয়ায়/ খোদার জ্ঞানে শিক্ষা পেলেন নইলে ছিলেন অসহায়/ জ্ঞান হলো বিদ্যুতের চমক অন্ধকারে পথ দেখায়/ সাত স্বর্গ ভেদ করে সে ক্কালবের ওপর চমকায়।”
এই কবিতার শেষ লাইন দুটোতেই পুরো কবিতার অর্থটি পরিস্ফুট হয়েছে। কবিতাটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে জ্ঞান। জ্ঞানহীন মানুষ বেহেশতে যেতে পারে না। তাই জ্ঞানকে আলোকবর্তিকা হিশেবে দেখানো হয়েছে। অন্ধকার রাতে জ্বলে ওঠা বিদ্যুচ্চমকের মতোই জ্ঞান। যা আমাদের পথ দেখায়। সেই আলো সাত স্বর্গ ভেদ করে, এই কথার অর্থ হলো জ্ঞান মানুষকে পথ দেখিয়ে বেহেশতে নিয়ে যায়। জ্ঞানই মানুষকে খোদার সন্ধ্যান দেয়, খোদার অবস্থান লওহে মাহফুজে নিয়ে যায়। এক বৃহৎ আত্মার প্রতিনিধি হলো মানবাত্মা। যদি তাই হয় তাহলে মানুষের ক্কালবেই লওহে মাহফুজ, এখানেই খোদা আছেন। জ্ঞানই মানুষকে এই শিক্ষা দেয়, তাই বলা হয়েছে ক্কালবের ওপর চমকায়।
রুমি এক চতুস্পদিতে বলেছেন, “আমি কেন তোমাকে খুজবো? আমিইতো তুমি। আমার মধ্য দিয়েই তুমি প্রকাশিত। আমি আমাকেই খুঁজি।” এই দর্শনের আলোকে অনেক সুফি সাধক সারা জীবন তপস্যা করেছেন। আবার অনেকে এর বিরুদ্ধাচারণও করেছেন, নাস্তিক আখ্যা দিয়েছেন সেইসব সুফি সাধকদের। এই গুঢ় রহস্য বোঝার জন্য, এই দর্শন বোঝার জন্য বা বলা যেতে পারে এর মর্মার্থ আত্মস্থ করার জন্য, মনের ঔদার্য দরকার। রুমি তাঁর অনেক লেখায় জ্ঞান অর্জনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন, মুক্ত মন নিয়ে জ্ঞান আহরণের কথা বলেছেন। তিনি পবিত্র পাত্র থেকে শারাব পান করে মাতাল হতে বলেছেন। অর্থাৎ খোদার নৈকট্য লাভের কথা বলেছেন। আবার আরেক কবিতায় তিনি বলেছেন, “তোমার সাথে আমার মিলন হবে এটা মিথ্যা।” এইটুকু শুনে আমরা চমকে উঠি। পরক্ষণেই যখন তিনি বলেন, “তুমিতো প্রথম থেকেই আমার সাথে ছিলে।” তখন আমাদের ভাবনা এক মহাঘূর্ণাবর্তের মধ্যে পড়ে যায়। এবং এক সময় আমাদের দৃষ্টি স্পষ্ট হয়ে আসে, আমরা সত্যকে দেখতে পাই। রুমি এক অমোঘ সত্যের নাম, সেই সত্যকে আবিস্কার করার জন্য রুমিনেশায় বুঁদ হয়ে যেতে হয়।
তিনি কোনো কোনো কবিতায় কোরানের আয়াত ব্যবহার করেছেন। যেমন সুরা আহজাবের ৭২ নম্বর আয়াতটির উদ্ধৃতি দিয়েছেন “একটি বিশেষ দায়িত্ব” কবিতায়। আয়াতটির বঙ্গানুবাদ এরকম “এই আমানত দেয়া হয়েছিল ওদের, আকাশমণ্ডলীকে, মর্ত্যের মৃত্তিকালোক এবং সুউচ্চ পর্বত শৃঙ্গমালাকে। সকলেই প্রত্যাখ্যান করলো এবং ভীত হলো; শুধু মানুষই এগিয়ে এলো সহাস্যে; নিশ্চয়ই সে বোকা এবং অজ্ঞ ছিল।” আমানতটি হলো “স্বাধীনতা”। আমরা জানি যে মানুষ ছাড়া আর কোনো প্রাণীর যা খুশি তা করার স্বাধীনতা নেই। ফেরেশতারা চাইলেও পাপ করতে পারবে না। ওদের সেই স্বাধীনতা নেই। শয়তান চাইলেও ভাল কাজ করতে পারবে না। ওকেও সেও ক্ষমতা দেওয়া হয় নি। পশু–পাখির জীবনচক্র একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়। শুধু মানুষই ব্যতিক্রম, যা খুশি তাই করতে পারে। এখন অবাক হতে পারেন আয়াতটির শেষে একথা কেন বলা হলো যে “নিশ্চয়ই মানুষ বোকা এবং অজ্ঞ ছিল”। হ্যাঁ, মানুষ অজ্ঞই ছিল, তাকে স্বাধীনতা দেওয়ার সাথে সাথেই জ্ঞান দেওয়া হলো যাতে সে তার বিবেচনাবোধ বা বিবেক ব্যবহার করে স্বাধীনতা উপভোগ করে। “একটি বিশেষ দায়িত্ব” কবিতায় রুমি সেই “বিবেচনাবোধ”কেই বিশেষ দায়িত্ব বলেছেন। মানুষকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে এই বিশেষ দায়িত্বটি দিয়ে যে সে তার বিবেচনাবোধকে সারা জীবন ধরে কাজে লাগাবে। যদি সে তা না করে তাহলে সে কিছুই করলো না।
“প্রিয়তমা উজ্জ্বল সূর্যের মতো/ প্রেমিকেরা আবর্তিত গ্রহ/ বসন্ত-হাওয়ায় প্রেম বহে অবিরত/ ভেজা ডাল নৃত্যে করে বিদ্রোহ।(দিওয়ানে শামস-ই তাবরিজিঃ চতুষ্পদী ৪৬৬)”
এই ছোট্ট চার লাইনের কবিতাটিতে তিনি একজন মাত্র প্রেমিকা এবং তার অসংখ্য প্রেমিকের কথা বলেছেন, যারা প্রিয়তমার চারদিকে গ্রহের মতো আবর্তিত হচ্ছে। তিনি খোদাকে এখানে প্রেমিকা বলেছেন। আর প্রেমিকেরা হচ্ছে সুফি সাধক। ঠিক এই কবিতার মতোই ইরানি সুফি সাধকেরা সুফি নৃত্য করেন। শাদা পোশাক পরে ক্রমাগত ঘুরতে থাকেন। এই ঘুর্ণাবর্তের মধ্য দিয়ে তারা খোদার নৈকট্য লাভের চেষ্টা করেন। মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা থেকেই প্রকৃতপক্ষে এই ঘূর্ণন নৃত্যের উদ্ভব এবং সুফি নৃত্য হিশেবে এখন ব্যপকভাবে পরিচিত। এই ঘুর্ণাবর্তের সঙ্গে বিজ্ঞানের চমৎকার যোগসাজশ রয়েছে। বিজ্ঞান মনে করে বিগ ব্যাঙউত্তর কালে এক মহাজাগতিক ঘুর্ণাবর্তের মধ্য দিয়ে তৈরী হয়েছে এই বিশ্বব্রহ্মান্ড। ধর্মচর্চায়ও ঘুর্ণন প্রক্রিয়ার উপস্থিতি প্রবল। ক্কাবা ঘরকে কেন্দ্রে রেখে হজ্বব্রত পালনকারীরা ঘুরতে ঘুরতে তাওয়াফ করে, অগ্নি উপাসকেরা আগুনের চারপাশে ঘোরে, হিন্দুরা আগুণকে প্রদক্ষিণ করেই ধর্মমতে বিয়ে করে। নানান আদিবাসীরাও তাদের দেব-দেবীকে প্রদক্ষিণ করে নৃত্য করে। এভাবেই সুফিচর্চা ক্রমশ সুনির্দিষ্ট ধর্মের বলয় থেকে বেরিয়ে এসে সার্বজনীন হয়ে উঠেছে, যে কারণে পশ্চিমা বিশ্বে সুফিবাদ দিন দিন আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তবে অনেক কট্টর সুফিবাদীর মতে, যেভাবেই খোদার নৈকট্যলাভের চর্চা করা হোক না কেন, এর কেন্দ্রে যদি ইসলাম না থাকে তাহলে তা সুফিচর্চা বলে বিবেচিত হবে না।
এই কবিতার পরের দুই লাইনে বলা হয়েছে, বসন্ত-হাওয়ার মতো তখন খোদার প্রতি প্রেম বহে অবিরত, কেননা এই ঘূর্ণন প্রক্রিয়াটি অবিরাম চলতে থাকে। কিন্তু ভেজা ডাল, অর্থাৎ রিপু (ভুল চিন্তা, মন্দ চিন্তা) বিদ্রোহ করে। এই ভেজা ডাল হচ্ছে জাগতিক মোহ, লোভ। অনেক কবিতায় তিনি সুফি সাধনার বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন আবার কোনো কবিতায় খোদার গুণকীর্তন করেছেন। একটি কবিতায় তিনি খোদার মহানুভবতার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবেঃ
“হাঁটতে গিয়ে অসাবধানে পড়ছে ফাঁদে পা/ প্রভাব প্রতিপত্তি লোভে প্রলুব্ধ ক্ষেপা/ ছোঁয় না তবু বিপদ আমায় ছোঁয় না অঘটন/ সঙ্গে আছো প্রভূ তুমি কৃপা অকৃপণ।/ প্রতি রাতেই আত্মাটাকে মুক্ত করে দাও/ দেহের খাঁচা ফেলে পাখি উড়াল দিয়ে যাও/ মনকে ধুয়ে সাফ করে দাও, পৃষ্ঠা শাদা এক/ সেই কাগজে আবার বলো, নতুন করে লেখ/ রাত্রী গভীর হলেই কারা মুক্ত হয়ে যায়/ মুক্ত মাঠে বন্দি মানুষ অন্দরে ঘুমায়/ প্রতাপশালী বাদশাহ তখন বড়ই অসহায়/ দম্ভ-দাপট প্রাসাদ ছেড়ে অরণ্যে পালায়/ সুখের নদী তরঙ্গহীন দুঃখ ডুবে তল/ মোহ-মায়ার পৃথিবীটা পাথর জগদ্দল/ নিদ্রাহীন এক সাধু দেখো মগ্ন অচেতন/ কেউ জানে না এই ঘুমে তার কাটবে কতক্ষণ/ এমনোতো কেউ রয়েছে ঘুমন্ত মানব/ জগত জীবন তুচ্ছ শুধু নিদ্রাদেবীই সব/ মহান প্রভূর কলম সে লোক যাচ্ছে লিখে রোজ/ তিনিই কেবল জানেন জগত-রহস্যটার খোঁজ।/ (মসনবী একঃ ৩৮৭-৩৯৪)”
খোদার মহানুভবতার বর্ণনা করার পাশাপাশি এক ঘুমন্ত মানবের কথা বলেছেন। কে এই ঘুমন্ত মানব? তিনিই সুফি। তিনিই আশেক। ইশকের সাধনায় দিয়েছেন ডুব। তিনি কি লিখে যাচ্ছেন রোজ, প্রেমের রোজনামচা? জগত–রহস্যের খোঁজ কেবল তিনিই জানেন। প্রকৃত সুফি তিনিই যিনি এমনি অচেতন হয়ে পড়েন, অর্থাৎ পার্থিব চাহিদা থেকে নিজেকে মুক্ত করে ফেলেন।
রুমি-শিক্ষার প্রধান দিকটি হচ্ছে ইন্টিগ্রেশন। সকল মতবাদকেই তিনি গ্রহণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। একজন প্রসিদ্ধ মুসলমান কোনাভি একবার রুমিকে চ্যালেঞ্জ করেন এই বলে যে, “আপনি বলেন যে ৭২টি ধর্মীয় ফেরকার সাথে একমত হয়ে আপনি চলতে পারেন। কিন্তু আমরা দেখি ইহুদিরাতো খ্রিস্টানদের সাথে একমত হয় না এবং খীস্টানরা মুসলমানদের সাথে প্রায়শই মতৈক্যে পৌঁছাতে পারে না। তারা যদি একে অন্যের সাথে একমত হতে না পারে তাহলে তাদের সকলের সাথে কি করে একমত হওয়া সম্ভব?” তার এই প্রশ্নের জবাবে রুমি বলেন, “জি হ্যাঁ, আপনি যথার্থ বলেছেন। আমি আপনার সাথেও একমত।” আরেকটি ঘটনা জালালুদ্দিন রুমির সহনশীলতার দৃষ্টান্ত হিশেবে এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। একদিন রুমি ধ্যানমগ্ন ছিলেন। তাঁর অনুসারীরা তাকে বেস্টন করে ছিল। তখন এক মাতাল স্খলিত পায়ে চিৎকার করতে করতে সেখানে প্রবেশ করে। লোকটি রুমির দিকে অগ্রসর হয়ে তার ওপর আপতিত হয়। এহেন বেয়াদবির জন্যে রুমির ভক্তরা উত্তেজিত হয় এবং লোকটিকে প্রহার করতে উদ্যত হয়। রুমি তখন তার ভক্তদের থামিয়ে দিয়ে বলেন, “আমিতো ভেবেছিলাম ওই লোকটি মাতাল কিন্তু এখন দেখছি যে সে নয় বরং আমার নিজের শিষ্যরাই মাতাল।”
জালালুদ্দিন রুমি তার সময়কালের সব শ্রেণীর মানুষের সাথে খোলামেলাভাবে মিশতেন, কথা বলতেন, যখন শ্রেণী বৈষম্য একটি সামাজিক প্রথা ছিল। শুধু মিশতেনই না, নিম্নশ্রেণীর মানুষের প্রতি ছিল তার বিশেষ দুর্বলতা। জগত সংসার পরিত্যাগ করে তিনি কেবল খোদার ধ্যানে মগ্ন ছিলেন এ কথা কেউ বলতে পারবে না। বরং তার মানবতাবোধ, মানুষের প্রতি মমতা ছিল প্রখর। আর্তপিড়িতের সেবা করার পরামর্শ তিনি কবিতাতেই দিয়েছেন।
“মর্জি খোদার অহমিকার ভাঙতে পাথরখন্ড/ নতজানু করেন তাকে চাপিয়ে লঘুদন্ড/ এ দন্ডতো আর কিছু নয় আর্তপীড়িতের সেবা/ কে ছাড়ে এ সুযোগ বলো এমন পাষন্ড কে-বা/ দুঃসহ বিত্ত – বৈভব/ দগদগে ঘা ভুলগুলো সব/ কোথায় এমন মলম আছে সারাবে এ পাপের ক্ষত/ খোদার যদি ইশারা হয় জাগে মৃত শত শত/ যার ওপরে নূরের ছায়া তার কিরে আর পাপের ভয়/ বিনম্র তার হৃদয়খানি কান্না ভেজা, কি বিস্ময়/ চোখের জলের ঢেউ পেরুলেই সুখের সবুজ স্বর্গদ্বীপ/ এ-ভেদ যে বুঝেছে তার ঘরেই জ্ঞানের নীল প্রদীপ/ যেখানে জল প্রবাহিত সেই খানে প্রাণ হয় বিকাশ/ কান্নাস্রোতে পাপ ভেসে যায়, ঢেউ পেরুলেই স্বর্গবাস।”
অসহায়ের ব্যাথায় ব্যথিত হতে বলেছেন। তাহলে পাপ ভেসে যাবে। চোখের জলের ঢেউ পেরুলে, অর্থাৎ জল শুকিয়ে গেলেই স্বর্গ, মানে আনন্দ। অসম্ভব কাব্যিক এবং জনহিতৈষী এই কবিতাটি রুমির জন্মের ৮০০ বছর পরেও আজকের সমাজের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। রুমির মানবহিতৈষী উপদেশ বা শিক্ষামূলক আরও একটি কবিতার উদ্ধৃতি দেওয়া যেয়ে পারে।
“ক্ষমতাধর হে মান্যবর মওকা যদি পাও/ মানবতার কল্যাণে বল প্রয়োগ করে যাও/ অনুসরণ করো নবী-রসুলদেরই পথ/ মন থেকে দূর করো তোমার অশুভ দ্বৈরথ/ হয়ত তুমি রেখেছিলে কয়েক পদক্ষেপ/ হয়ত তুমি হেঁটেছিলে খানিকটা পথ, স্রেফ/ যঠেষ্ঠ নয় পা ফেলা-ই কাজটিতো শেষ করো/ হাসিল হওয়া অব্দি তাকে আঁকড়ে তুমি ধরো/ লক্ষ্যটিই আরাধ্য, নয় পথের ব্যাপ্তিখানি/ পথে পথে ছড়িয়ে থাকে পথেরই ঘষটানি/ কেউ কি ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছিলেন কভু/ বিশ্বাস ও প্রার্থনার পথে, যে পথ দিলেন প্রভু?/ প্রমাণ পেলে আমিও হবো অবিশ্বাসী এক/ অবিশ্বাসী বলেই রুমির নাম হবে উল্লেখ/ মাথা যদি না ভেঙ্গে যায় পট্টি বেঁধো না/ ভুলের অতল তলে ডুবে বন্ধু কেঁদো না/ কষ্ট করো যখন পারো মানব-কল্যাণে/ শেষ হাসিতো হাসবে তুমি সক্কলে তা জানে”।
সকল প্রধান ধর্মগ্রন্থেই অদৃষ্টে বিশ্বাসের কথা আছে। এমন কি হিন্দু ধর্মগ্রন্থ শ্রীমতভগবত গীতার মূল শিক্ষাও নিস্কাম কর্ম। অর্থাৎ অদৃষ্টে আস্থা। খোদার প্রতি পূর্ণ আস্থা ব্যক্ত করেই রুমি বলেছেন, বি রেজাল্ট অরিয়েন্টেড। যেটা আজকের আধুনিক ব্যাবস্থাপনার একটি বড় শিক্ষা। রুমি বলেন, তুমি পথে নেমেছো এটাই যথেষ্ট নয়, লক্ষ্যে পৌছাতে হবে। কাজ শুরু করলেই হবে না, কাজ শেষ করতে হবে। পাশাপাশি আবার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছেন, বিশ্বাস ও প্রার্থনার পথে অর্থাৎ খোদার পথে পরিচালিত হয়ে কেউ কি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে কখনো? যদি কেউ প্রমাণ দিতে পারে তাহলে আমিও অবিশ্বাসী হয়ে যাব।
রুমি-শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাস্তববাদিতার সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার সংমিশ্রণ। সুদৃঢ় বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে খোদার নৈকট্যলাভের চর্চা করতে বলেছেন তিনি। কেন বলেছেন? এতে আত্মশুদ্ধি হবে, মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা সহজ হবে। হৃদয় ইতিবাচক আলোতে আলোকিত হবে। তখন, এমন কি হিমশীতল মৃত্যুকেও মনে হবে আনন্দময় ঘটনা।
জালালুদ্দিন রুমির কিছু কবিতার বঙ্গানুবাদ এখানে উপস্থাপন করছি, এতে করে রুমিকে আরও ভালো করে বুঝতে পাঠকের সুবিধা হবে। (অনুবাদঃ কাজী জহিরুল ইসলাম)
হৃদয়ের নতুন মদ
মাটির এই দেহখানি হৃদয়ের পাত্রবিশেষ
আমার গেঁজেল ভাবনারস হৃদয়ের মদ
বীজ ফেটে তাতে হয় জ্ঞানের উন্মেষ
বলেছি যা আমি, তা-ই দিলের রসদ।
(দিওয়ানে শামস-ই তাবরিজিঃ চতুষ্পদী – ২৬০)
ছায়া ও সাধু
একটি পাখি দূর আকাশে যাচ্ছে উড়ে উড়ে
ভুতলে তার ছায়া শুধু চরকি হয়ে ঘোরে
নির্বোধেরা সারাক্ষণই ছায়ার পিছে ছোটে
আসল ভেবে তারা শুধু ছায়ার মজা লোটে
ছায়ার কায়া কোথায় আছে, কোথায় ডানা-ঠোট?
ছায়াশিকার মিথ্যে মায়া পার্থিব হোঁচট
ছায়াটিকে লক্ষ্য করে যাচ্ছ ছুঁড়ে তীর
পিঠের ওপর তাকিয়ে দেখো শূন্য যে তূণীর
প্রান্তরেখার ওপর তুমি দাঁড়িয়েছ আজ
পেছন ফিরে দেখো শুধু ভুলের কারুকাজ
ক্লান্ত দুপা, ক্লান্ত বাহু, ক্লান্ত দেহ-মন
কাঁপছ ভয়ে যাচ্ছে কেটে পার্থিব বন্ধন
কিন্তু যখন তোমার ওপর খোদার ছায়া পড়ে
ভ্রান্ত-মোহ কেটে আলো জ্বলে যে অন্তরে।
নূরের ছায়া খোদার সে দাশ মৃত দুনিয়াতে
কিন্তু তিনি আশে-পাশেই আছেন তোমার সাথে
পবিত্র তার জামাখানি জড়িয়ে নাও গায়ে
পথ চেনাবে জামার আলো পারাপারের নায়ে।
(মসনবী একঃ ৪১৭-৪২৪)
সকল সৃষ্টিই জীবন্ত
খোদাকে যে জানে, মৃত্যুর প্রলয় তার কাছে মোলায়েম ও আনন্দময়
ইউসুফের সৌরভ ছড়ানো কোমল হাওয়া যেন এক পশলা
ইব্রাহীম দেখো পোড়েনি আগুনে
আগুনের কি সাধ্য পোড়ায় খোদার পেয়ারা নবী
যে দেহ পূর্ণ খোদার দরুদে আগুন কি করে পোড়াবে তাকে
হোক না তা যতোই গহন তাপের কুন্ড
দেখোনি খোদার ইশারায় সাগর দু’ভাগ?
মূসার লোকেরা বিভক্ত হঠাৎ ফেরাউনের ভূমিতে?
যখন পবিত্র নির্দেশ এসেছে
নিরীহ মৃত্তিকা খেয়ে ফেলেছে মাইডাসের প্রাসাদ-প্রাচুর্য
হীরার উজ্জ্বল দ্যুতি নিপতিত হলো অন্তহীন অন্ধকারে।
আবার যখন ঈসা দিলো ফু জল-কাদার দলা হয়ে গেল পাখি
ডানা মেলে উড়ে গেল দূরের আকাশে
তোমার জেকের ঈসার ফু’য়ের মতো
জল-কাদার নশ্বর দেহখানি পাখি হয়ে মেলে দেবে ডানা বেহেশতের পথে
এমন কি সিনাই পাহাড় করেছিল নৃত্য খোদার নূরের স্পর্শ পেয়ে
হয়ে উঠেছিল মরমী ও শুদ্ধ
এতে অবাক হবার কি আছে যে পাথরের পাহাড় একদা হয়েছিল সুফি
মূসার দেহখানিও কি নয় মাটিরই গড়া?
(মসনবি একঃ ৮৬০-৮৬৯)
করো, যখন পারো
ক্ষমতাধর হে মান্যবর মওকা যদি পাও
মানবতার কল্যাণে বল প্রয়োগ করে যাও
অনুসরণ করো নবী-রসুলদেরই পথ
মন থেকে দূর করো তোমার অশুভ দ্বৈরথ
হয়ত তুমি রেখেছিলে কয়েক পদক্ষেপ
হয়ত তুমি হেঁটেছিলে খানিকটা পথ, স্রেফ
যঠেষ্ঠ নয় পা ফেলা-ই কাজটিতো শেষ করো
হাসিল হওয়া অব্দি তাকে আঁকড়ে তুমি ধরো
লক্ষ্যটিই আরাধ্য, নয় পথের ব্যাপ্তিখানি
পথে পথে ছড়িয়ে থাকে পথেরই ঘষটানি
কেউ কি ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছিলেন কভু
বিশ্বাস ও প্রার্থনার পথে, যে পথ দিলেন প্রভু?
প্রমাণ পেলে আমিও হবো অবিশ্বাসী এক
অবিশ্বাসী বলেই রুমির নাম হবে উল্লেখ
মাথা যদি না ভেঙ্গে যায় পট্টি বেঁধো না
ভুলের অতল তলে ডুবে বন্ধু কেঁদো না
কষ্ট করো যখন পারো মানব-কল্যাণে
শেষ হাসিতো হাসবে তুমি সক্কলে তা জানে।
চূড়ান্ত
আবাস ভাসে বানের জলে শূন্য তবু পাত্রখানি
অসুন্দর এই ভূ-সংসারে সাজিয়ে দেবে কে ফুলদানি?
এক পলকেই পাল্টে যাবে, তোমার মুখে ফুটবে হাসি
তল্পিবাহক দাঁড়িয়ে আছে, ‘সময়’ হবে তোমার দাসী।
(দিওয়ান-এ শামস-এ তাবরিজিঃ চতুষ্পদী ৯২২)
নিজের কাঁধে তুলে নাও
দাস হও; হও অনুগত ঘোড়া, যাতে কেউ
সহজেই চড়তে পারে তোমার ওপর
কখনো হয়ো না লাশ; যাতে কেউ তোমাকে বহন করে।
স্বার্থপর মানুষই শুধু চায় কেউ তার ভার বহন করুক
অন্যেরাতো তাঁকে মৃতদেহের মতোই বয়ে নিয়ে যায় ক্রমশ কবরের দিকে।
যদি স্বপ্নে দেখো কারো শবাধার বয়ে নিয়ে যাচ্ছে ক’জন মানুষ
জেনে নাও, ওই ব্যক্তি উঁচু আসনে বসবে; এটাই স্বপ্নের ব্যাখ্যা
তবে একথাও জেনে রাখো, সে মৃতদেহের মতোই অন্যের কাঁধে
নিজের লোভের বোঝা চাপিয়ে নিশ্চিত করে উঁচু আসন, পদমর্যাদা।
কখনো অন্যের কাঁধে চাপিয়ো না নিজের দায়িত্ব
বরং আত্মবিশ্বাসের সাথে তা নিজের কাঁধে তুলে নাও। উঁচু
আসন খোঁজো না, যার ভার অন্যের কাঁধের ওপর
বরং দারিদ্রকেই আলিঙ্গন করো।
(মসনবি ছয়ঃ ৩২৪-৩২৯)
তথ্যসূত্রঃ
১. রুমির সংলাপ। বঙ্গানুবাদঃ আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
২. জালালুদ্দিন রুমির কবিতা। ভাষান্তরঃ কাজী জহিরুল ইসলাম
৩. দি রুমি ডে বুক। ইংরেজী অনুবাদঃ কবির হেলমিনস্কি এবং কামিল হেলমিনস্কি
৪. ডিসকোর্সেস অব রুমি। ইংরেজি অনুবাদঃ এ. জে. আরবেরি
(মাসিক শব্দঘর অক্টোবর ২০১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত)
(অসীম শূন্যতে তিষ্ঠ – গ্রন্থ থেকে)