জাতিসংঘ মহাসচিব পদে সাক্ষাৎকার শুরু

জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের কাজ শুরু করেছে সাধারণ পরিষদ। পূর্বঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার পরিষদের ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের সামনে তিন প্রার্থী তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন এবং বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

গতকাল ‘সাক্ষাৎকার পরীক্ষা’ দেন মন্টেনেগ্রোর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইগর লুকসিচ, ইউনেসকোর মহাপরিচালক ও বুলগেরিয়ার ইরিনা বোকোভা এবং জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক সাবেক হাইকমিশনার পর্তুগালের আন্তোনিন গুতেরেস।

মোট আটজন প্রার্থী এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের মহাসচিবের পদের জন্য নিজ নিজ সরকারের মনোনয়ন পেয়েছেন।

আজ বুধবার আরও তিনজন প্রার্থী সাক্ষাৎকারে অংশ দেবেন। তারা হলেন স্লোভেনিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দানিলো তুর্ক, ক্রোয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভেসনা পুসিচ ও মলদোভার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাতালিয়া ঘেরম্যান। আগামী বৃহস্পতিবার যে দুজন সাক্ষাৎকারে অংশ নেবেন, তারা হলেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬২তম অধিবেশনের সাবেক সভাপতি মেসেডোনিয়ার স্রাগান কেরিম ও নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানে ইউএনডিপির প্রশাসক হেলেন ক্লার্ক।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি মগেন্স লিকটফট স্বাক্ষরিত এক ঘোষণায় বলা হয়েছে, ১২, ১৩ ও ১৪ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা সংস্থার ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সামনে মুখোমুখি সাক্ষাৎকারের জন্য উপস্থিত হবেন।

এবারই প্রথম মহাসচিব পদের প্রার্থীদের জন্য উন্মুক্ত সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এত দিন নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা প্রার্থীদের সঙ্গে মুখোমুখি প্রশ্নোত্তরের সুযোগ পেতেন। মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় অধিক স্বচ্ছতা আনার জন্যই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

সাক্ষাৎকারে সব প্রার্থী মহাসচিবের ভূমিকার বিষয়ে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করা ছাড়াও সদস্যরাষ্ট্রগুলোর যেকোনো প্রশ্নের জবাব দেবেন। সুশীল সমাজের বিভিন্ন সংগঠনকেও প্রশ্নোত্তরে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। প্রতি প্রার্থীর জন্য বরাদ্দ দুই ঘণ্টা।

সাক্ষাৎকারে প্রথম প্রার্থী ৩৯ বছর বয়সী ইগর লুকসিচ তার দেশের বহুজাতিক চরিত্র তুলে ধরে দাবি করেন, বিশ্ব সংস্থার নেতৃত্ব দানের সব যোগ্যতা তার রয়েছে। এর আগে তিনি তার দেশের প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। কাজের ভেতর দিয়েই তিনি এই দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

জাতিসংঘের নেতৃত্বে এবার একজন নারী আসা উচিত এমন কথা বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রার্থী ইরিনা বোকোভা সে কথা সরাসরি উল্লেখ না করে বলেন, জাতিসংঘের উচিত হবে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা রোধে আরও অধিক ভূমিকা পালন করা। এ ছাড়া চাকরি ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা অর্জনকেও অগ্রাধিকার সহকারে জাতিসংঘের বিবেচনা করা উচিত।

তৃতীয় প্রার্থী আন্তোনিন গুতেরেস কূটনৈতিক শিষ্টাচার পরিহার করে সরাসরি এই সংস্থার কিছু কিছু দুর্বল দিক তুলে ধরেন। নিজে এই সংস্থার উচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, জাতিসংঘ নিয়মতান্ত্রিকতার জালে আটকে আছে। এখানে প্রচুর বৈঠক বসে, বড্ড বেশি লোক এখানে কর্মরত এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছাড়াই কথার ফুলঝুরি বয়। এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া দরকার। তিনি সদস্যদেশগুলোকে আশ্বাস দেন, এই দায়িত্ব তাকে দেওয়া হলে তিনি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেবেন।

আটজন প্রার্থী সাক্ষাৎকারে অংশ নিচ্ছেন। এদের মধ্যে চারজন পুরুষ ও চারজন নারী। অনেকেই মনে করেন ইরিনা বোকোভা সম্ভবত প্রতিযোগিতায় অন্যদের চেয়ে এগিয়ে আছেন। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাশিয়া তাকে সমর্থন দিচ্ছে। তিনি চমৎকার ফরাসি বলেন, সে কারণে পরিষদের অপর স্থায়ী সদস্য ফ্রান্স তার প্রতি সমর্থন জানাতে পারেন।

কোনো লিখিত নিয়ম না থাকলেও ঐতিহ্য অনুসারে আঞ্চলিক আবর্তনপ্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচিত হয়ে থাকেন। সে অনুযায়ী, পরবর্তী মহাসচিব পূর্ব ইউরোপ থেকে আসার কথা। পর্তুগালের আন্তোনিন গুতেরেস ও নিউজিল্যান্ডের হেলেন ক্লার্ক ছাড়া সব প্রার্থীই পূর্ব ইউরোপের।

প্রার্থীরা সাধারণ পরিষদের সামনে সাক্ষাৎকারে মিলিত হলেও এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে নিরাপত্তা পরিষদ। আগামী জুলাই মাসের শেষ নাগাদ সেখানে এই প্রশ্নে অনানুষ্ঠানিক ‘স্ট্র পোল’ হওয়ার কথা। নিরাপত্তা পরিষদ স্থায়ী সদস্যদের সম্মতির ভিত্তিতে যে ‘সুপারিশ’ পাঠাবে, এর ভিত্তিতেই এ বছর সেপ্টেম্বরে পরবর্তী মহাসচিব নির্ধারিত হবেন। চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব বান কি মুনের দ্বিতীয় মেয়াদ।

এর আগেই সিদ্ধান্ত নিতে হবেকে হবেন তার উত্তরসূরি। ইংরেজি নতুন বছরের প্রথম দিনে বান কি মুনের কাছ থেকে দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন নতুন মহাসচিব।

You Might Also Like