জনগনকে জিম্মি করে নিজেদের ফায়দা হাসিল

আন্দোলনের চাপের মুখে সরকার নমনীয় হয়ে কিছু ছাড় দিয়ে পরিবহন মালিক–শ্রমিক দাবি অনেকটা মেনে নিয়ে আর কিছু বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে গণপরিবহন ধর্মঘট বন্ধ করেছেন। এটা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন শাহজাহান-রাঙ্গা-এনাম-শিমুল বিশ্বাস ও বাম শ্রমিক নেতাদের কাছে সরকার হেরে গিয়ে সমঝোতা করেছেন।

২০১৮ সেপ্টেম্বরে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় যে সব মিডিয়া আর বুদ্ধিজীবী বা সুশীল সমাজ খুব সোচ্চার ছিলেন পরিবহণ মালিক-শ্রমিকদের বিরুদ্ধে তাঁরা এই কয় দিন মুখে কুলূপ এঁটেছেন। অনেকে বলছেন তাঁরা পরোক্ষভাবে দেশকে জিম্মি করায় পরিবহন মালিক–শ্রমিকদের পক্ষ নিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২০১৮ তড়িঘড়ি পাস করা হয় সড়ক পরিবহন আইনটি কার্যকর করা হলে এর বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেন পরিবহনশ্রমিকেরা। নতুন ঐ সড়ক পরিবহন আইনের ৪ নম্বর ধারাটি ড্রাইভিং লাইসেন্স সংশ্লিষ্ট। এ ধারার ৩ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, ‘মোটরযানের শ্রেণি বা ক্যাটাগরি ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয় বিধি দ্বারা নির্ধারিত হইবে।’

ঠিক একইভাবে মোটরযানের নিবন্ধন, ফিটনেস সনদের মেয়াদ, গণ-পরিবহনের চলাচলের অনুমতি (রুট পারমিট)সহ আরও বেশ কিছু ধারায়ও বিধির কথা বলা আছে। এই ধারাগুলো নিয়েই মূলত আলোচনায় সমঝোতা হয়েছে। পারফেক্ট আইন কখনোই করা সম্ভব নয়, সময়ের সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট আইনের বিভিন্ন ধারার পরিবর্তন দুনিয়া জুড়েই একটা চলমান প্রক্রিয়া।

শ্রমিক নেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বুধবার রাত বৈঠক করে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। পরে সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মালিক ও শ্রমিকেরা ৯ দফা দাবি উত্থাপন করেছিলেন। এগুলোর মধ্যে যেসব দাবি যৌক্তিক মনে হবে, সেগুলো বিবেচনার আশ্বাস এবং যে লাইসেন্স দিয়ে তাঁরা এখন গাড়ি চালাচ্ছেন, তা আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। এর মধ্যে তাঁরা যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে কাগজপত্র হালনাগাদ করবেন। এই ছিল সমঝোতার মোদ্দা কথা।

সমঝোতা করা ছাড়া সরকারের কোন বিকল্প ছিল না। কারণ দেশ এখন চলছে হুজুগে। পিঁয়াজের পরে চাল ও লবণ নিয়ে যে সংকট তৈরির চেষ্টা ছিল তা বিফলে যেতে দেখেই পূর্ব পরিকল্পনা মত বুধবার কমপক্ষে ২৭টি জেলায় ধর্মঘট পালন করানো হয় পরিবহনশ্রমিকেদের দিয়ে। ধর্মঘটের নামে বিভিন্ন স্থানে জবরদস্তিও হয়েছে। যেমন, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে ধর্মঘট না মেনে যাঁরা যানবাহন চালিয়েছেন, তাঁদের অনেকে শ্রমিকদের মারধরের শিকার হয়েছেন।

পরিবহনমালিক–শ্রমিক সূত্রগুলো বলছে, ‘পরিবহন খাতের মালিক–শ্রমিকদের মূল লক্ষ্যই ছিল চাপ দিয়ে নতুন সড়ক পরিবহন আইনের কিছু ধারা সংশোধন করা, আইনের প্রয়োগ কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া ও শিথিল করা। ইতিমধ্যে তারা এই কাজ করতে পেরেছে। কারণ, নতুন আইনে এখনো কাউকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়নি। আইন অমান্যে পুলিশ মামলা দিচ্ছে না। বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম দিন দিন শিথিল হচ্ছে’।

২০১৬ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, বর্তমানে দেশে তালিকাভুক্ত পরিবহনের সংখ্যা ২৭ লাখের বেশি। লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক আছে প্রায় ১৬ লাখ। এই হিসেবে ১১ লাখের বেশি চালক অবৈধ। এর পরে আছে ফিটনেস বিহীন গাড় সংখ্যা। যাই হউক উপরোক্ত তথ্যের ভিত্তিতে অনুমান করা যায় যে, নতুন আইন কার্যকর করতে গেলে বৈধ লাইসেন্সের অভাব আর ফিটনেস বিহীন গাড়ি না চালাতে পেরে কম করে হলেও ২৫ লাখ শ্রমিক পরিবার (ড্রাইভার, হেল্পার সহ) অর্থাৎ ১ কোটিরও বেশি মানুষ খাদ্য ঝুঁকিতে পড়বেন। তাই তাঁরা বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের হাতের পুতুল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পিছপা হবেন না। সরকারকে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের মত মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে কিছু ছাড় দেবেন, দিতে হবে।

শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এক গবেষণায় ২০১৮ সালে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ চালক প্রতিদিন গড়ে ১৩ ঘণ্টা বা তার বেশি গাড়ি চালান। পাশাপাশি শ্রমিক হিসেবে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকেও তাঁরা বঞ্চিত।

যে সমঝোতা হয়েছে তাতে জানা যায় যে, যে লাইসেন্স দিয়ে তাঁরা এখন গাড়ি চালাচ্ছেন তা আগামী বছর মানে ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। এর মধ্যে তাঁরা যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে কাগজপত্র হালনাগাদ করবেন। পরিবহন শ্রমিকরাও এই ছাড় নিয়ে খুশি কারণ গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলে দেশের সব খাতেই আঘাত আসবে, তাঁর মধ্যে ভোগ্যপণ্যও আছে। যার সংকট হলে পরিবহন শ্রমিকরা সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ২০২০ সালের ৩০ জুনের মধ্যে পরিবহন খাতে যদি মোটামুটি একটা শৃঙ্খলা আসে তাতে দেশের ও দেশের জনগণের লাভ। এই খাত থেকে যে সব মাফিয়ারা আর্থিক ফায়দা নিচ্ছে তারাও আস্তে আস্তে কিছুটা হলেও একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আসবে। এটাই আমাদের দেশের বাস্তবতা, এটা শুধু রাজনীতিবিদ নন, আমলাদেরও আন্তরিকভাবে আমলে মিতে হবে।

পরিবহনের রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করে বিআরটিএ। তাঁদের ক্যাপাসিটি আর আন্তরিকতা দুটতেই অভাব আছে। তাঁদের বিরুদ্ধে হয়রানির ও অন্যান্য অভিযোগ আছে। আছে পর্যাপ্ত জনবল সমস্যা, লাইসেন্স নেওয়ার সেন্টারের স্বল্পতা, ইত্যাদি। আশা করা যায় যে, উল্লেখিত সময়ে বিআরটিএ ও তাঁদের সীমাবদ্ধতা অনেক্তা কাটিয়ে উঠবে অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে। প্রয়োজনে তাঁরা উপজেলা পর্যায়ে তাঁদের অফিস চালু করবে।

সমঝোতা বলতে একটা কথা প্রচলিত আছে দুনিয়া জুড়ে। ‘বোথ সাইড উইন উইন’ মানে উভয় পক্ষের জয় জয় পরিবেশ না হলে সমঝোতা হয় না, ভেস্তে যায়। এক পক্ষের লাভে কোন দেশে কোন ইস্যুতেই কখনোই কোন সমঝোতা হয় না, হয়নি। শ্রমিক নেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বুধবার রাত বৈঠক করে সমঝোতায় পৌঁছে ধর্মঘট প্রত্যাহারের যে ঘোষণা ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ দিয়েছে তাতে দুই পক্ষই অল্প অল্প জিতেছে, হেরেছেও। কিন্তু জিতেছে দেশের সাধারণ মানুষ।

You Might Also Like