জঙ্গি প্রজননের উর্বর মাঠ

জসিম উদ্দিন :

তিন দিনের ব্যবধানে দু’টি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে ভারতে। গত সপ্তাহের সোমবার ভোরে পাঞ্জাবে জঙ্গি হামলা হয়েছে। তাদের আক্রমণে রাজ্যের গুরুদাসপুরের পুলিশ কর্মকর্তা বলজিৎ সিংসহ আরো তিনজন পুলিশ নিহত হয়েছে। ওই হামলায় মোট ১০ জন প্রাণ হারায়। সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। এর তিন দিন পর মুম্বাই বিস্ফোরণের জন্য সন্দেহভাজন ইয়াকুব মেমনকে ফাঁসি দিয়েছে সরকার। তার অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে কি না, সেই বিতর্ক সামনে এলো, যখন তার গ্রেফতার নিয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার লুকোচুরির বিষয়টি জানা গেল। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাকে দিল্লি রেলস্টেশন থেকে গ্রেফতার করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সাবেক কর্মকর্তা বি রমণের ধারণায় ইয়াকুব নেপালে ভারতীয় কর্মকর্তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। তদন্তকাজে সহযোগিতা করবেন এমন আশ্বাসের ভিত্তিতে তিনি তাদের কাছে ধরা দেন। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিশ্রুতি পূরণের কোনো দায়বোধ করে না। পাপপুণ্যের ভেদাভেদ তাদের কাছে নস্যি।

রাষ্ট্র হিসেবে ভারত সাম্প্রদায়িক নীতি অবলম্বন করে মেমনের ফাঁসির পর এমন অভিযোগ আরো জোরালো হয়েছে। বলা হচ্ছে, রাজীব গান্ধীর খুনি, বাবরি মসজিদ ধ্বংসকারী ও গুজরাট দাঙ্গার খলনায়কদের বিচার তো দূরের কথা, বরং এসব ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তারা আরো প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভারতের জন্য। কংগ্রেস সংসদ দিগি¦জয় সিং ও শশী থারুরের বক্তব্যে এমন মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। তারা বলেছেন, সরকার দল, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সন্ত্রাসীদের ফাঁসি দিয়ে দেখাক তারা সবার ক্ষেত্রে ন্যায় করে। এটা ঠিক, গুজরাটের সংখ্যালঘু নির্মুল, মুম্বাইয়ের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও বাবরি মসজিদ ধ্বংসের হোতাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা কংগ্রেস সরকারও নেয়নি। উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ও বিকাশের জন্য এই দলটির অনুদার নীতিই প্রধানত দায়ী।

পার্লামেন্টে এক ঝাঁজালো ভাষণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং দাবি করেছেন, পাঞ্জাবে হামলাকারী তিন ব্যক্তি পাকিস্তান থেকে এসেছিল। এ হামলার ‘উপযুক্ত জবাব’ দেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। ভাষণে তিনি বলেন, হামলাকারীদের সাথে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম যন্ত্র পাওয়া গেছে। ওই যন্ত্রের তথ্যে এটা স্পষ্ট এরা পাকিস্তান থেকে রাভি নদী পাড়ি দিয়ে ভারতে পৌঁছে ছিল। সামরিক বাহিনীর পোশাক পরে আসা হামলাকারীদের হাতে চীনে তৈরি গ্রেনেড ও একে ৪৭ রাইফেল ছিল। ওই যন্ত্রের রেকর্ড থেকে মন্ত্রী হামলাকারীদের পথনকশার দীর্ঘ বর্ণনা দেন। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সন্ত্রাসীদের পাকিস্তান থেকে ভারতে প্রবেশের চিত্রকল্প তুলে ধরেন তিনি। মাত্র তিনজন হামলাকারী কিভাবে একটি থানায় হামলা চালিয়ে সব লণ্ডভণ্ড করে দিলো। হামলাকারীদের রুখতে কেন ১২ ঘণ্টা লেগে গেল তার ব্যাখ্যা তিনি দেননি।

সন্ত্রাস মোকাবেলায় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে বারবার। জঙ্গি হামলার পূর্বাভাস দিয়ে বড় হামলা রুখে দেয়ার ঘটনা দেশটিতে দেখা যায় না। ভারতে প্রতিনিয়ত সাম্প্রদায়িক হামলা ও জঙ্গি সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটছে। সন্ত্রাস মোকাবেলায় ব্যর্থ হলেও অভিযোগের তীর সব সময় তড়িঘড়ি তৈরি থাকে। হামলাকারীরা কোন দেশের মদদ পেয়েছে, অস্ত্রে কোন দেশের সিল লাগানোÑ এই ভাঙা রেকর্ড বাজাতে নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো দুর্বলতা দেখা যায় না। ভারত ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে সম্প্রতি রাশিয়ায় বৈঠক হয়েছে। সেখানে এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে পুনরায় আলোচনা শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়। রাজনাথ যখন পাকিস্তানেরে বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিচ্ছিলেন, তখন খবর পাওয়া যাচ্ছে দেশটি পাকিস্তানি শীর্ষনেতার সঙ্গে বৈঠক আয়োজনের জন্য ভেতরে ভেতরে জোর তদবির চালাচ্ছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, আলোচনার জন্য চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দিন তারিখ ঠিক করার চেষ্টা করছে ভারত।

সাম্প্রদায়িকতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার ক্ষেত্র সৃষ্টিতে ভারতের বড় রাজনৈতিক দলগুলো ভূমিকা রাখছে। সরাসরি না হলেও রাষ্ট্রযন্ত্র পরোক্ষে হলেও দেশটিতে সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গি কর্মকাণ্ডে প্রণোদনা দিচ্ছে। মেমনকে ফাঁসির বিষয়টি পর্যালোচনা করলে সেটা স্পষ্ট হবে। ১৯৯২ সালে ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার ঘটনাটি জমানার বড় সাম্প্রদায়িক ঘটনা। বর্তমান ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির মিলিটেন্ট শাখাগুলো ওই সময় ঘটনাস্থলে দেড় লাখ কট্টর সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মানুষের সমাবেশ ঘটায়। ওই সমাবেশে দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতা এল কে আদভানি তখন উত্তেজনাপূর্ণ ভাষণ দেন। ওই ভাষণ ইউটিউবে এখনো রয়েছে। স্থানীয় মানুষের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছিল বিভিন্ন গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে, সেটাও আছে। স্থানীয় হিন্দুরা মসজিদ ভেঙে দেয়ার বিপক্ষে ছিল। সারা দেশ থেকে আসা উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী বিজেপির অঙ্গ সংগঠন ও গোপন সংগঠনের সদস্যরা স্থানীয় মানুষের মনোভাবের কোনো মূল্য দেয়নি। সেদিন আদভানির সাথে ছিলেন দলটির গুরুত্বপূর্ণ আরো দু’জন নেতাÑ মুরলি মনোহর যোশি ও উমাভারতি।

নিরাপত্তা বাহিনী বাবরি মসজিদ ঘিরে রেখেছিল। একজন তরুণ করসেবক (বিজেপির কট্টর মৌলবাদী যুব শাখা) নিরাপত্তা লাইন ভেদ করে মসজিদ চত্বরে ঢুকে পড়ে। সে মসজিদের শীর্ষে উড়িয়ে দেয় তাদের বর্ণবাদী প্রতীকখচিত পতাকা। এরপর উগ্র জনতা ঝাঁপিয়ে পড়ে মধ্যযুগে নির্মিত ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্নটির ওপর। বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র বহন করলেও নিরাপত্তা বাহিনী সেদিকে নজর দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। নিরাপত্তা বলয় এমন ঠুনকো ছিল, তারা সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে প্রতিরোধ করতে পারেনি।

মুম্বাই বিস্ফোরণের বারুদ জোগাড় হয়েছিল বাবরি মসজিদ হামলার পর। ৬ ডিসেম্বর পর ভারতজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। মুম্বাইয়ে সেটা হয়ে যায় সংখ্যালঘু নির্মূল অভিযান। ১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ সিরিজ বোমা হামলার পূর্বে ধারাবাহিকভাবে বোম্বেতে মুসলিম নিধন চলতে তাকে। যে কারণ দেখিয়ে মেমনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হলো, কিন্তু মুম্বাইয়ের সংখ্যালঘু হত্যার কোনো বিচার হলো না। স্থানীয় পুলিশ মুম্বাইয়ের এই নিষ্ঠুর অভিযানের ব্যাপারে পুরোপুরি অবহিত ছিল। ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী তখন সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেয়নি। জঙ্গিগোষ্ঠীর ধারাবাহিক এথনিক কিনজিংকে থামিয়ে দিতে মুম্বাই বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল, এ বিষয়টি এখন নিশ্চিতভাবে বলা যায়। সেটা না ঘটলে মুম্বাইয়ের সংখ্যালঘু নিধন অব্যাহত চলতে থাকত। মুম্বাইয়ের ৯০০ মানুষ হত্যা, তাদের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, অর্থ সম্পদ অব্যাহতভাবে কেড়ে নিয়েছিল জঙ্গিগোষ্ঠী শিবসেনা। সামরিক কায়দায় নিধন ও সম্পদ কেড়ে নেয়ার জন্য শিবসেনার বিচারের কাজটি গণতান্ত্রিক ভারতের প্রথম দায়িত্ব ছিল। তারও আগে নিষ্পন্ন করার দরকার ছিল বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সাথে জড়িতদের বিচার।

২০০২ সালে গুজরাটে সংখ্যালঘু নিধন রাজ্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ঘটেছিল। তখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। সবরমতি ট্রেনে আগুন দিয়েছে মুসলিমরাÑ এ রিউমার ছড়িয়ে দিয়ে দাঙ্গার সূচনা করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বিষয়টি প্রমাণ হয় ওই ট্রেনে আগুনের সূত্রপাত্র যান্ত্রিক গোলযোগ থেকে হয়েছিল। গুজরাটে ওই সময় ২০০০ মুসলিমকে হত্যা করা হয়। গুলবাগ সোসাইটি ম্যাসাকারসহ তিনটি বিশেষ পাড়াকে নিঃশেষ করে দেয়া হয়। গুলবাগে কংগ্রেসের পার্লামেন্ট মেম্বার এহসান জাফরিকে নিকৃষ্ট কায়দায় হত্যা করা হয়। তার ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক ভাবমর্যাদা তখন কোনো কাজে আসেনি। স্থানীয় মুসলমানরা নিষ্ঠুরতা থেকে বাঁচার জন্য সংসদ সদস্য এহসান জাফরির গুলবাগ সোসাইটিতে জড়ো হয়। এরা ভেবেছিল এই সংসদ সদস্যকে আক্রমণ করার দুঃসাহস হত্যাকারীরা পাবে না।

বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। রায়টারদের হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রথমে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কাছে সাহায্য চান জাফরি। কেউ সাড়া দেয়নি জীবন রক্ষার ওই আহ্বানে। এরপর তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে নিরাপত্তার আর্জি জানান। সবকিছুই ব্যর্থ হয়ে যায় সাম্প্রদায়িকতার কাছে। এর মধ্যে ওই পল্লীটি ঘিরে রাখে খুনিরা। বিকেলের দিকে পুরো পল্লীতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। আশ্রয় নিতে যাওয়া শত শত মানুষের সামনে জাফরিকে উলঙ্গ করে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। কোপানো জীবন্ত দেহ তারা আগুনে নিক্ষেপ করে। তারা দেখল না তার ‘অসাম্প্রদায়িক’ মনটাকে, তারা বিবেচনায় নিলো ‘এহসান জাফরি’ নামটাকে।

বাবরি মসজিদ নির্মূলে নেতৃত্ব দেয়ার পর আদভানি বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে পদোন্নতি পেয়ে বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে ভারতের উপপ্রধানমন্ত্রী হন। দশম লোকসভায় তিনি বিরোধী দলের নেতা ছিলেন। উমাভারতি এখন কেন্দ্রীয় পানিসম্পদ মন্ত্রী। এর আগেও তিনি বিজেপি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পান মানবসম্পদ উন্নয়ন, পর্যটন, যুবক্রীড়া এবং কয়লা ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের। মুরলি মনোহর যোশি বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। বর্তমানে তিনি কানপুর থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। তিনি মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী ছিলেন। কট্টর গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের নীতিনির্ধারক তিনি।

অন্ধ্র প্রদেশের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি লিবারহ্যান ১৭ বছর সময় নিয়ে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেন। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিজেপির একেবারে শীর্ষ নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়িও রয়েছেন এ ঘটনার পেছনে। মূল কারিগর হিসেবে ৬৮ জনকে চিহ্নিত করা হয়। এদের বেশির ভাগ বিজেপি নেতা। অসাম্প্রদায়িক দল কংগ্রেসের কিনমেন মনমোহন সিং লিবারহ্যানের কাছ থেকে তদন্ত রিপোর্টটি গ্রহণ করেছেন ঠিক কিন্তু বিচারের উদ্যোগ নিতে একটুও আগ্রহ দেখাননি। গুজরাট ও মুম্বাই ঘটনার তদন্ত রিপোর্টের মতো এটিও ঘটনার বিচারে কোনো অবদান রাখেনি।

তদন্ত প্রতিবেদনে গুজরাট ও মুম্বাইয়ের সাম্প্রদায়িক হামলায় অভিযুক্তদের আরো স্পষ্টভাবে চেনা গেছে। সবরমতি ট্রেনে আগুনের পরদিন বিজেপি গুজরাট শাখার পক্ষ থেকে বন্ধ-এর ডাক দেয়া হয়। সংখ্যালঘু নির্মূল ভয় থাকায় উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে এ ধরনের বন্ধ-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। ট্রেনে আগুন দেয়ার জন্য স্থানীয় মিডিয়ায় কয়েকজন মুসলিমকে অভিযুক্ত করে স্টোরি ছাপিয়ে একই সাথে উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশের মিডিয়া যেমন সুযোগ পেলেই জঙ্গিবাদের উত্তাল তরঙ্গ দেখাতে অভ্যস্ত। দাড়ি-টুপি, মসজিদ-মাদরাসা অভিযুক্ত করে একাকার করে ফেলা হয়। সবরমতি এক্সপ্রেসে আগুনের ঘটনার সাথে পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনীর ইন্ধন রয়েছে এমন প্রচারণা চালানো হয়। বিজেপির মৌলবাদী গ্রুপ সংগঠিত হয়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে সংখ্যালঘুদের নিধন করে। পুলিশ নিষ্ক্রিয় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। তদন্তে পুলিশের নির্লিপ্ততার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। গুজরাট পুলিশের সেকেন্ডম্যানকে গ্রেফতার করা হলেও বিচারের বিষয়টি বেশিদূর এগোয়নি। অন্য দিকে, মুম্বাইয়ের ঘটনায় পুলিশ সরাসরি খুনি গ্রুপগুলোর সাথে মিলে সংখ্যালঘুদের হত্যায় অংশ নেয়। শ্রীকৃষ্ণ মিশনের তদন্ত রিপোর্টে এমন অনেক ঘটনার উল্লেখ করা হয়। দীর্ঘ দিন ধরে চলা নির্মূল অভিযানের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মুম্বাইয়ে সিরিয়াল বিস্ফোরণ ঘটে।

সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতবিক্ষত ভারতের ইতিবাচক দিক হচ্ছে দেশটিতে এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হচ্ছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিচারপতিদের বিবেকের দায় থেকে অপরাধীরা সঠিকভাবে চিহ্নিত হচ্ছে। দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দাঁড়ানোর সুফল এটি। গুজরাটের সংখ্যালঘু নিধন, মুম্বাইয়ে বাবরি মসজিদ ধ্বংস-পরবর্তী কয়েক মাস ধরে চলা সংখ্যালঘু হত্যা ও তাদের সম্পত্তি লুটপাট এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পেছনের কারণ থেকে বোঝা যায়, দেশটির রাজনৈতিক নেতারা শতভাগ সাম্প্রদায়িক রয়ে গেছেন। একেবারে শীর্ষপর্যায় থেকে পৃষ্ঠপোষকতার কারণে অপরাধীরা চিহ্নিত হলেও বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে না। যার ফলে সাম্প্রদায়িক পাশবিকতা নারকীয়তা দেশটিতে বাড়ছ। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘটছে জঙ্গি কর্মকাণ্ড।

খ্রিষ্টান বৌদ্ধ মুসলিমসহ অন্য সংখ্যালঘুরা ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর আলাদা জাতীয়তাবাদী পরিচয় রয়েছে। পশ্চিমে রয়েছে স্বাধীনচেতা কাশ্মিরিদের অবস্থান। ভাষাও দেশটিতে হয়ে উঠছে জাতি স্বাতন্ত্র্যবাদের মানদণ্ড। এ ধরনের একটি পরিস্থিতিতে করসেবক, বজরং, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ ও শিবসেনাসহ অনেক কট্টর সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ভারতকে বানাতে চাচ্ছে হিন্দু রাষ্ট্র। এ কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই তারা নিষ্ঠুর কায়দায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে বিভিন্ন সংখ্যালঘু গোষ্ঠী মূলোৎপাটনে। এরা সবাই বর্তমান ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের অঙ্গ ও গোপন সংগঠন। বড় প্রত্যেকটি সন্ত্রাসী ঘটনার পেছনে দলটির নেতাদের ইন্ধন রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছে। এদের জন্য সুবিধার দিক হচ্ছে, পাকিস্তানে ধর্মের নামে চালানো সন্ত্রাসকে যেভাবে জঙ্গিবাদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, অন্য দিকে ভারতে তাদের নিষ্ঠুর সব কর্মের পরও দেশটির মিডিয়া তাদের সেভাবে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে না। আন্তর্জাতিক মিডিয়াও হিন্দু জঙ্গিবাদকে মাথাব্যথা মনে করে না।

অসাম্প্রদায়িক কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকার সময় সাম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডের কোনো বিচার হয়নি। এখন বিজেপি নিজেরাই ক্ষমতায়। অন্য দিকে, যারা নির্মূলের শিকার সন্দেহাতীতভাবে তাদের অপরাধ প্রমাণ না হলেও তারা শাস্তি পাচ্ছে। বিশাল দেশে এটি একটি দম বন্ধ হওয়া পরিস্থিতি, যা প্রকৃতপক্ষে জঙ্গি প্রজননের উপযুক্ত মাঠ হিসেবে তত দিন বিরাজ করবে যত দিন না তাদের নেতারা সাম্প্রদায়িক মনোভাব পরিবর্তন না করবেন।

jjshim146@yahoo.com

You Might Also Like