হোম » ‘ছিয়ানব্বইয়ের নির্বাচনের চেয়ে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন কয়েক শ গুণ বেশি খারাপ’ : রনি

‘ছিয়ানব্বইয়ের নির্বাচনের চেয়ে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন কয়েক শ গুণ বেশি খারাপ’ : রনি

এখন সময় ডেস্ক- Sunday, February 16th, 2014

গোলাম মাওলা রনি। রাজনীতিবিদ। সাবেক সংসদ সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সাংবাদিক হিসেবেও পরিচয় দিতে তিনি ভালোবাসেন। বর্তমান সরকারের বিগত টার্ম শুরুর সময় থেকেই সংসদ ও সংসদের বাইরে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। বিশেষ করে, টেলিভিশন ‘টক শো’তে সরকারের সমালোচনা তাকে ব্যাপক আলোচিত করে। জনগণের সমর্থন পান, জনপ্রিয় হন। আবার সাংবাদিক নির্যাতন করে নিন্দিতও হন তিনি। ২০১৩ সালের ২০ জুলাই, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ইনডিপেনডেন্টের সাংবাদিককে প্রহার করলে দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ ঘটনার জের ধরেই তাকে কারাগারে যেতে হয়। আলোচিত, বিতর্কিত এই তরুণ রাজনীতিক সম্প্রতি মুখোমুখি হয়েছিলেন সাপ্তাহিক কাগজের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আশিক রহমান।

প্রশ্নঃ আপনার একাধিক পরিচয় রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে। কোন পরিচয়ে আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?

গোলাম মাওলা রনিঃ নিজেকে আমি মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমরা সবাই মানুষ। মানুষ যে কারণে মানুষ, সেটা মানবিক গুণাবলির কারণেই মানুষ। আমরা সমাজে অনেকেই নিজেকে অনেক বড় মানুষ হিসেবে পরিচয় দিই, কিন্তু মানবিক গুণাবলি সংরক্ষণ করা বা মানবিক গুণাবলির প্রচার-প্রসার করার ক্ষেত্রে আমরা প্রচণ্ড স্বার্থপর। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কিছু মানবিক গুণাবলি সঞ্চিত থাকে, আবার অমানবিক গুণাবলিও সঞ্চয় থাকে। কিন্তু আমরা কী করি- মানবিক গুণাবলি লুকিয়ে রেখে, অমানবিক গুণাবলিই প্রকাশ করি। আর সেই সব মানুষই সমাজে সবচেয়ে বড় মানুষ হিসেবে পরিচিত হন। অমানবিক গুণাবলিকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসতে সাহস পান। যা বেশির ভাগ মানুষই করেন না, তা-ই তারা করেন। আমরা সৃষ্টির সেরা জীব। আমাদের মানুষ হওয়ার চেষ্টা থাকা দরকার। মানুষের বিবেক, মানুষের ভদ্রতা, মানুষের ধর্মবোধ, মানুষের জ্ঞান যা কিছু আলস্নাহ তাআলা দিয়েছেন, তার সঠিক ব্যবহার করার চেষ্টা করছি আমি। তার পরও যদি জানতে চান, কোন কাজটি করতে আমি পছন্দ করি কিংবা কোন পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, তাহল বলব, সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কারণ সাংবাদিকতা হলো যোগ্যতা, মেধাবী ও সৃষ্টিশীল মানুষের কাজ। সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি আমার আগ্রহ সব সময়ের।

প্রশ্নঃ দশম সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন নিতে চাননি কেন? আগে থেকেই কি বুঝতে পেরেছিলেন, দল আপনাকে মনোনয়ন দেবে না ?

গোলাম মাওলা রনিঃ দলের মনোনয়ন নেওয়াটা ব্যাপার ছিল না। মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আমার বিশ্বাস ছিল। মনোনয়ন না চাওয়ার কয়েকটি কারণ রয়েছে। তার মধ্যে দলের হাইকমাণ্ডের সঙ্গে আমার যে সুসম্পর্ক ছিল, বিশ্বাস ও আস্থা ছিল, কারাগারে যাওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে আমার প্রতি তাদের আস্থাটা কমে গেছে। ফলে ওই অবস্থাতে দলের মনোনয়ন চাওয়াটা আমার কাছে অসম্মানজনক মনে হয়েছে। আর, সব দল যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করত, তাহলে হয়তো আমি মনোনয়ন চাইতাম। সার্বিক পরিস্থিতিতে আমি হয়তো স্বতন্ত্র প্রার্থীও হতাম। সব দল অংশগ্রহণ না করার কারণে আমার কাছে মনে হলো যে এবারের নির্বাচনে যারা অংশগ্রহণ করবেন, তারা কখনো জাতির কাছে, দেশের মানুষের কাছে সম্মানিত মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত হবেন না, বরং ভবিষ্যতে যখন তারা বলবেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আমি একজন এমপি ছিলাম, তখন মানুষ এমপিকে ঠাট্টা-মশকরা করবেন। সমালোচনা করবেন। যেমন অতীতের ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করতে শুনি, এটা ’৯৬ সালের নির্বাচনের চেয়েও অধিকতর খারাপ। ’৯৬ সালের নির্বাচনকে যেভাবে মানুষ খারাপ মনে করছে, খারাপের দিক থেকে ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালের নির্বাচন কয়েক শ গুণ বেশি খারাপ।

প্রশ্নঃ দল কিংবা প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান কি তাহলে ভুল ছিল? প্রধানমন্ত্রী ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন···

গোলাম মাওলা রনিঃ আমি মনে করছি, এই রকম একটি দলের কর্তাব্যক্তিরা যারা সব সময় নেতা-কর্মীদের উদ্দীপনা জুগিয়েছেন, দলের কোটি কর্মী-সমর্থক যারা দলের মালিক, তারা কেউ ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করতে চায়নি। ফলে দলকে দায়ী করা যায় না। দলের কিছু কর্তাব্যক্তি, কর্মকর্তা- যারা বুঝেছিলেন যে তাদের জনপ্রিয়তা নেই। ওই ব্যক্তিরাই প্রধানমন্ত্রীকে প্রভাবিত করেছেন, উদ্বুদ্ধ করেছেন, উৎসাহিত করেছেন নির্বাচনে যাওয়ার জন্য। আমাদের দলে আড়াই শর মতো সংসদ সদস্য ছিলেন, এর মধ্যে শ দুয়েক এমপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে আস্থাশীল ছিলেন না। সরাসরি ভোট যুদ্ধে জয়লাভ করার ব্যাপারে নিজেরাই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন। সেই লোকগুলোই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল নীতিনির্ধারক পর্যায়ে। ওই লোকগুলোই একটি ভোটারবিহীন নির্বাচনে দলকে ঠেলে দিয়ে, এত বড় ঐতিহ্যবাহী একটি দলকে কলঙ্কিত করেছে, অসম্মানের মুখে ফেলেছে। দেশের লাখ লাখ আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক আছেন, যারা এই কথাগুলো ভাবছেন, কিন্তু বলতে পারছেন না। বলার জায়গা পাচ্ছেন না। আমি তাদের পক্ষে হয়ে কথা বলেছি, দল থেকে মনোনয়ন পেপার না নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছি।

প্রশ্নঃ বর্তমানে আওয়ামী লীগে আপনার অবস্থান কী ?

গোলাম মাওলা রনিঃ আমি একজন সংসদ সদস্য ছিলাম। এর আগে আমি আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী ছিলাম, কিন্তু আমার কোনো পদ-পদবি ছিল না। আমি এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় কর্মী আছি। তাই মনে করি আমি। আর, আমার যে চরিত্র, আমি যদি কখনো কর্মী-সমর্থকদের থেকে বিছিন্ন হয়ে যাই, তাহলে আমি দেশবাসীকে জানিয়ে প্রকাশ্য বলব, আমি আর টিকতে পারছি না। আমি দল ছেড়ে দিলাম। আমি যতক্ষণ না তা বুঝছি, ততক্ষণ আমি দলের চিন্তা-চেতনায়, আদর্শের প্রতি আস্থাশীল আছি। দলের সঙ্গেও আছি। দলের সবার সঙ্গেও আমার যোগাযোগ রয়েছে।

প্রশ্নঃ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও কি যোগাযোগ আছে?

গোলাম মাওলা রনিঃ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ কিংবা কথা- কোনোটাই হয় না আমার। কেন কথা হয় না, আমার মনে হয়েছে তার নির্দেশেই আমাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। উনি আমাকে স্নেহ করতেন। আমিও তাকে সম্মান করি, শ্রদ্ধা করি। কিন্তু আমি কোনো কারণ খুঁজে পাইনি, কেন তিনি আমাকে কারাগারে পাঠালেন? আমি অপেক্ষায় আছি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার, কথা বলার জন্য। আমার অভিমানের জায়গাটা পরিষ্ড়্গার করার জন্য। আর, প্রধানমন্ত্রী আমার ওপর অভিমান করেননি, রাগ করেছেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর ওপর অভিমান করেছি। কারণ, তিনি আমাকে জোর করে কারাগারে পাঠিয়েছেন। আমার ওপর জুলুম করেছেন। আমি জুলুমের শিকার হয়েছি। তিনি আমাকে শাস্তি দিয়েছেন। তিনি তো আমার ওপর রাগ কিংবা অভিমান করতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী তার কর্মীদের ওপর অভিমান করেন না, ক্ষুব্ধ হন। তিনি আমার ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন। ক্ষুব্ধ হয়ে শাস্তি দিয়েছেন। শাস্তি দেওয়ার ফলে আমার মনে হয়েছে, উনার ওপর আমার একটা অধিকার তৈরি হয়েছে। উনি আমার মান ভাঙাবেন। এটা আমার পাওনা। এখন আমি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। তিনি যদি মনে করেন, রনিকে আওয়ামী লীগে দরকার রয়েছে, তাহলে আমি থাকব। যদি তিনি মনে করেন, রনির দরকার নেই, আমি থাকব না। তিনি যদি চুপচাপ থাকেন, আমিও চুপচাপ থেকে কাজ করে যাব দলের জন্য।

প্রশ্নঃ শোনা যাচ্ছে, বিএনপি থেকে তো আপনাকে প্রস্তাব দিয়েছে···। নতুন দল গঠন কিংবা দল বদল করছেন?

গোলাম মাওলা রনিঃ হঁ্যা, আমার কাছে প্রতিনিয়ত প্রস্তাব আসছে। নতুন নতুন প্রস্তাব আসছে। বিএনপি থেকে এসেছে, জাতীয় পার্টি থেকে এসেছে, ছোট ছোট দলগুলো থেকেও এসেছে। আমি চিন্তা করছি, দেশে যদি গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তাহলে ভারতের আম আদমীর মতো নতুন কোনো দল গঠন করা যায় কি না, যেখানে থাকবেন তরুণেরা। আমার যে পরিচিতি গড়ে উঠেছে, আমি ডাকলে অনেকেই আসবেন। দেশ-বিদেশে থাকা অনেক তরুণেরা আসবেন। কিন্তু তাদেরকে জায়গা দেওয়ার মতো যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ দরকার, সে পরিবেশটা যদি সৃষ্টি না হয়, তাহলে তো তারা উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন। আর গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করা যায় না, পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে যায়। ঊনসত্তরের কথাই ধরুন- ঊনসত্তরের গণ-অভুøত্থান বঙ্গবন্ধু সৃষ্টি করেননি, বঙ্গবন্ধুই ঊনসত্তরের সৃষ্টি। এ দেশের গণতন্ত্র কেউ সৃষ্টি করেননি, নব্বইয়ের গণ-অভুøত্থান সৃষ্টি হয়েছে। তারপর এ দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আম আদমীর দলটির সৃষ্টির জন্য ভারতকে ৬০-৭০ বছর ধরে গণতন্ত্রচর্চা করতে হয়েছে। তা সম্্‌ভব হয়েছে তাদের দীর্ঘ গণতান্ত্রিক চর্চায়। আজ যদি আমি ঢাকা শহরে এক লাখ কর্মী নিয়ে সমাবেশ করি, বর্তমান দেশে যে রাজনৈতিক সংস্ড়্গৃতি আছে, যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা কখনোই এ ধরনের একটি সমাবেশ করতে দেবে না। আর যদি কোনো কারণে সরকার সমাবেশ করতে দেয়, তাহলে সরকারি দল ও বিরোধী দল এক হয়ে, সমাবেশের বিরুদ্ধাচরণ করবে। এর ফলে যে তরুণেরা আছেন, তারা আরও অনুৎসাহিত হবেন। এমনিতেই তারা রাজনীতিতে আসতে চান না, এ রকম ঘটনা হলে তারা আরও রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়বেন। তারা একটি সুন্দর গণতান্ত্রিক পরিবেশ চান। আমিও অপেক্ষা করছি, অপেক্ষা করব, জীবনের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করব এমন একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের। আর, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমার রক্তের সম্পর্ক। আমার রাজনৈতিক বোধ এবং বুদ্ধি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি এই দলের রাজনীতি করছি। আমার পরিবারের এই দলের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। এই দলের প্রতি ভালো লাগা-মন্দে পাশে থাকা, ভালোবাসা-স্নেহ, প্রেম-প্রীতি সবই রয়েছে। আমি এক গোলাম মাওলা রনি না থাকলেও আওয়ামী লীগের কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ, এই দলের সঙ্গে হাজার হাজার, লাখ লাখ কর্মী-সমর্থক রয়েছে। তারা এই সংগঠনটিকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন। আর আমি এখন যে অবস্থানে আছি, দেশের গতানুগতিক রাজনৈতিক ধারায় এক পদ-পদবি ধরে রাখার জন্য বড় দলগুলোতে মর্যাদার হানি করে, মাথা নিচু করে, আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে থাকতে হয়। এই অবস্থাটা শিক্ষার কারণে, অবস্থার কারণে হয়ে থাকে। অন্যরা তা পারে, কিন্তু আমি সেটা পারছি না। এখন যদি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সক্রিয় কর্মী হিসেবে আমাকে নির্বাচন করতে হয়, আমি দলের জন্য কাজ করব। দলও একই অবস্থার সৃষ্টি করবে যে, হঁ্যা, রনিকে আওয়ামী লীগের দরকার আছে। কিন্তু দেখা গেল- আমি সকালে একটা লাথি খাচ্ছি, বিকেলে অপমানিত হচ্ছে। এরপর বছরের পর বছর বয়োবৃদ্ধ সিনিয়র নেতৃবৃন্দের মতো পড়ে থাকা, সেই মানসিক অবস্থায় আমি নেই। সেই ক্ষেত্রে আমি যেটা করব, স্বতন্ত্র কিছু একটা করার চেষ্টা করব। নিজের ও দেশের জন্য। আর সেটা নির্ভর করবে পরিস্থিতির ওপর। সেটাও যদি না হয়, শুধু এমপি হওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কের দরকার নেই। জনপ্রিয়তা থাকলে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেও এমপি হওয়া যায়। স্বতন্ত্র এমপি হয়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক মতাদর্শ চিন্তা-চেতনা আমার মতো করে প্রচার করতে পারব। এতে করেও অনেক লোককে উজ্জীবিত করা যাবে। তবে হুট করে দল পরিবর্তন কাউকে স্বাচ্ছন্দ্য দেয় না, বরং সময় প্রতিকূলে চলে যায়।

প্রশ্নঃ আপনার সমসাময়িক অনেকেই রাজনীতি করছেন। মন্ত্রীও হয়েছেন। শাহরিয়ার আলম, জুনাইদ আহমেদ পলকের কথা আমরা বলতে পারি। তাদেরকে মন্ত্রী হিসেবে দেখে আপনার কেমন লাগে? কোনো রকম হতাশা কিংবা ঈর্ষা কাজ করে?

গোলাম মাওলা রনিঃ না, আমার সে রকম কোনো হতাশা কিংবা ঈর্ষা হয় না। আমার মধ্যে এই সব ক্ষুদ্রতা কাজ করে না। তারা সবাই আমার সহকর্মী ছিলেন। ছোট ভাইয়ের মতো ছিলেন। আলস্নাহই তাদের ওই পদে বসিয়েছেন। আমি তাদেরকে অভিনন্দন জানাই। স্বাগত জানাই। দোয়া করি, তারা যেন অনেক ভালো করতে পারেন। তবে যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারা এমপি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন, সেই মানসিকতাটা আমি এখন পর্যন্ত অর্জন করতে পারিনি। সে জন্য আমার কোনো আফসোস নেই। আজকের এই পর্যায়ের আসার জন্য শাহরিয়ার ও পলককে যে শ্রম দিতে হয়েছে, মেধা খরচ করতে হয়েছে, ওই শ্রম ও মেধা দুটোর একটাও আমার নেই। এটা কোনো অভিমানের কথা নয়, সত্য কথা। কারণ, তারা রাজনীতির জন্য যে শ্রম দিয়েছেন, দিয়ে যাচ্ছেন- মন্ত্রিত্ব পাওয়ার জন্য যে সাধনা করেছেন, এর একটা কাজও আমি করিনি, কখনো করতেও পারব না। আমাকে মন্ত্রী বানাতে চাইলেও আমি মন্ত্রী হতে পারতাম না! কারণ- এত স্পষ্ট কথা বলে, মাথা উঁচু করে সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলে দলীয়ভাবে কোনো পদ-পদবি ধরে রাখা আমাদের সমাজে এখনো অসম্্‌ভব ব্যাপার।

প্রশ্নঃ সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী ?

গোলাম মাওলা রনিঃ নির্বাচন নিয়ে আমার দল আওয়ামী লীগ খুব তাড়াতাড়ি করে ফেলেছে। আমাদের ৪০% ওপরে ভোটার আছে। এই ৪০% ভোটারকে কিন্তু আমরা ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত করতে পারতাম। কারণ, আওয়ামী লীগের এই ৪০% ভোট একরকম নিশ্চিত ছিল, তারা ভোটকেন্দ্রে গেলে নৌকায়ই পড়ত সেসব ভোট। আমাদের প্রস্তুতি ও কৌশলগত ভুলের কারণে তা করতে ব্যর্থ হয়েছি। কেন্দ্রীয় অফিস থেকে প্রার্থীদের সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা ছিল না, এর ফলেই ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিল কম। ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেলেন, এটাও ছিল একটা ভুল সিদ্ধান্ত। দলের উচিত ছিল নির্বাচনটাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করা। করার ব্যবস্থা করা। নির্বাচনের তারিখ যদি একটু পরিবর্তন করে পিছিয়ে দিত, তাহলে সরকারকে একতরফা নির্বাচনের অভিযোগের দায় নিতে হতো না। বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতার কারণে দ্রুত নির্বাচন করা জরুরি ছিল সরকারের এই যুক্তি ঠিক হলেও তা খুব দুর্বল যুক্তি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জন নির্বাচিত হওয়ার ফলে মানুষ সব সহিংসতা ভুলে যাবে। মনে রাখবে একতরফাভাবে ১৫৩ জনের জয়ী হওয়ার বিরল ঘটনাকেই। এই দায় আওয়ামী লীগকে নিতে হবে। দলের কর্মী-সমর্থক ও দেশের মানুষকে আস্থায় নিয়ে নির্বাচন করলে আমরা জয়লাভ করতে পারতাম। এতে, এত বড় কেলেঙ্কারির বোঝা দলকে বইতে হতো না। আমরা এখন যে জয়ের ওপর বসে আছি, তার জন্য অসংখ্য বদনাম মাথায় নিতে হচ্ছে কেবল পরিকল্পনার অভাবে। আমাদের লোক ছিল, সহযোগী ছিল। কর্মী-সমর্থকেরও কোনো অভাব ছিল না। মহাজোটের সবাইকে আমরা বাইরে ঠেলে দিতে পারতাম। আলাদা নির্বাচন করতে পারতাম। সবটা কাজ একটা সমঝোতার মাধ্যমে হতে পারত। আমাদের সঙ্গে সতেরো-আঠারোটা দল আছে, এর সঙ্গে আরও ২০-২৫টা দলকে আমরা নির্বাচনে নিয়ে আসতে পারতাম। ৪০-৪৫টা দলকে যদি আমরা নির্বাচনে নিয়ে আসতে পারতাম, ৪০-৪৫ পার্সেন্ট ভোটও নিশ্চিত করতে পারতাম। তাহলে বিএনপিকে এক ঘরে করতে পারতাম। আওয়ামী লীগের বড় ব্যর্থতা হলো, বিএনপিকে এক ঘরে করতে না পারা। বিরোধী দল যেসব অভিযোগ উত্থাপন করেছে- আমরা সরকারি দল, আমাদের টেলিভিশন আছে, পত্রিকা আছে, আমরা সবই বলছি। বিরোধী দলের অভিযোগের জবাব দিচ্ছি, কিন্তু মানুষ সেসব বিশ্বাস করছে না।

প্রশ্নঃ নির্বাচনের আগে ও পরে মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে আপনার ভাবনা কী? যদি নির্বাচন হয়, তা কত সময়ের মধ্যে হলে ভালো হয়?

গোলাম মাওলা রনিঃ আমি মনে করি, নির্বাচনটা যদি কাল হয়, বেশ ভালো হয়। মধ্যবর্তী নির্বাচন দিলে আওয়ামী লীগ পরাজিত হবে, নিঃসন্দেহে আওয়ামী লীগ পরাজিত হবে। দ্বিতীয়বার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ের কোনো সম্্‌ভাবনা নেই। কারণ, দেশের মানুষ একটা পরিবর্তনের মানসিকতার মধ্যে আছে। একমাত্র যারা আওয়ামী লীগ করে, আওয়ামী লীগই করে। বিএনপি করলে, বিএনপির মধ্যেই তারা থাকে। আর, যারা সুইং ভোটার, তারা একটা দল বা লোককে বেশি দিন ভোট দেন না। দিতে চান না। কিছু কিছু এলাকা ছাড়া বেশির ভাগ মানুষই পরিবর্তন চায়। মানুষের এই মানসিকতা আরও পরে পরিবর্তন হবে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আপাতত পরাজিত হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তার সুফল পাবে। সংকটের স্থায়ী সমাধানে না গেলে, ব্যথা-বেদনার ট্যাবলেট খেয়ে খেয়ে দেহকে দীর্ঘ মেয়াদে মারাত্মক অসুখের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া নিশ্চয়ই কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

প্রশ্নঃ আপনার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তো একটা বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই বিপর্যয়ের কারণ কি আপনি আবিষ্ড়্গার করতে পেরেছেন?

গোলাম মাওলা রনিঃ আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কোনো বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েনি। আমি বিপর্যয়েও নেই, বরং আমি ও আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার আগের চেয়ে ভালো রয়েছে। ভালোভাবেই চলছে সবকিছু। আর মানুষের আবেগও আমি শ্রদ্ধা করি। যারা মনে করেন ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, ক্ষমতার সঙ্গে থাকতে হবে, এসবকেই যদি মনে করেন রাজনীতি, তাহলে আমি বিপর্যয়ের মধ্যে আছি। এ ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে আমার দ্বিমত নেই। আর যারা মনে করেন, রাজনীতি বলতে গণমানুষের কথা বলা, রাজনীতি বলতে মানুষের উন্নয়ন করার মনমানসিকতা, রাজনীতি করতে হলে প্রজ্ঞা, মেধা ও অভিজ্ঞতা থাকা দরকার- এই রকম একটা মানুষ যে কিনা সমাজে তার কর্মকাণ্ড বন্ধ করেনি। এসব জিনিস আমার মধ্যে থাকায় আমি কোনো রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে নেই। এসব বিবেচনায় আমি অতীতের চেয়েও অনেক ভালো অবস্থায় আছি। কেন ভালো অবস্থায় আছি, তার আরও কারণ হলো, আমার কাছে মনে হয় এখন আমি আগের চেয়ে অনেক মুক্তভাবে কথা বলতে পারছি। পদ-পদবি হারানোর ফলে আমার একটি আত্ম-উপলব্ধি এসেছে। আমি যেসব মানুষের চেহারা-সুরত এত দিন দেখে এসেছি, এখন বাস্তব অবস্থা দেখতে পাচ্ছি। যা আমি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বুঝতে পারিনি।

প্রশ্নঃ ‘টক শো’ দিয়ে যে গোলাম মাওলা রনির উত্থান, সেই ‘টক শো’তে মিডিয়া ক্রেজ রনিকে আগের চেয়ে কম দেখা যায়, কেন?

গোলাম মাওলা রনিঃ ‘টক শো’তে কম দেখার মূল কারণ হলো, যারা বিটিভির মতো কট্টর সরকারের সমর্থক, তাদের টেলিভিশনে আমি যাই না। তারা আমাকে দাওয়াত করছে, কিন্তু আমি যাচ্ছি না। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে আমি কারাগারে যাওয়ার আগে- যেমন একাত্তর, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে কখনো আমি যাইনি। এটিএননিউজে তিন-চারটি অনুষ্ঠানে গিয়েছি। তবে সর্বশেষ তিন বছর এটিএননিউজ, ইনডিপেনডেন্ট, একাত্তর টেলিভিশনে যাইনি। ‘সময় টিভিতে’ মাঝেমধ্যে যেতাম, আমি কারাগার থেকে বের হওয়ার পর ‘সময়’ আমাকে সস্ত্রীক দাওয়াত করেছিল, আমি যাইনি। যাইনি কারণ আমি কারাগারে যাওয়ার আগে আমার একটি রেকর্ডটি ছিল···। মোহনাতে যাই না, ওদের যে টিআরপি তাতে আমার পোষায় না। আমি মাছরাঙায় যাই না, কারণ তাদের ‘টক শো’ জনপ্রিয় নয়। সবকিছুকে মাথায় রেখে, চিন্তা করে আমাকে পথ চলতে হয়। যেমন আগে আমি সবার সঙ্গে ‘টক শো’তে বসতে পারতাম। পাপিয়ার সঙ্গে বসতাম, মনির সঙ্গেও বসতাম। এখন আমি সবার সঙ্গে বসি না। বসতে চাইও না। আগে ফোন করলে সঙ্গে কে আছেন জিজ্ঞাসা করতাম না, এখন জিজ্ঞেস করি। যখন বলেন, ওমুকে আছেন। যদি দেখি ওই মানুষটার সঙ্গে আমার মিলে না, তখন আমি কৌশলে তা এড়িয়ে যাই। তবে সম্পর্ক রাখি কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে। ফলে আগের মতো আমার অনুষ্ঠান হচ্ছে না। এখন অনুষ্ঠান করছি হাতে গোনা কয়েকটি টিভিতে। এর মধ্যেঃ এসএটিভি, আরটিভি, এনটিভি, একুশে, চ্যানেল আই, বাংলাভিশনে।

প্রশ্নঃ মিডিয়ার সহযোগিতাতেই আজকের গোলাম মাওলা রনিকে সবাই চেনে। কিন্তু সেই মিডিয়ার সংবাদকর্মীদের সঙ্গেই আপনার বিরোধ। এমনটা কেন হলো?

গোলাম মাওলা রনিঃ আমার সঙ্গে পাঁচ-ছয়টা পত্রিকার মামলা চলছে। প্রথম শ্রেণীর পত্রিকা, যেমন প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, যুগান্তর ও সমকাল- এই কয়টি পত্রিকার সঙ্গে আমার মামলা চলছে সেই ২০০৯ সাল থেকে। এর কারণ হলো- পত্রিকার ও টেলিভিশনের যারা মালিক, এই বেনিয়া গোষ্ঠী এখানে স্বার্থসংশিস্নষ্ট ব্যাপারে কাজ করে থাকে। আমার কিছু কথাবার্তা, আচার-আচরণ বেনিয়া গোষ্ঠীকে আঘাত করেছে। ফলে প্রথম থেকেই ওই বেনিয়া গোষ্ঠী মনে করেছে, এই ছেলেটাকে দূর বা স্টপ করা দরকার। ফলে আমার ওপর যে মিডিয়ার কিংবা বেনিয়া গোষ্ঠীর আক্রমণ, তা ২০০৯ সাল থেকেই ছিল। প্রথমে ছিল প্রিন্ট মিডিয়া, পরবর্তীকালে ইলেকট্রনিক মিডিয়া। এরপরে দেখা গেল, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মধ্যে আমার যারা ভালোবাসার মানুষ, আমার ব্যক্তিগত শুভাকাঙ্ড়্গী যারা, তাদেরকে বোঝাতে পারলাম যে তোমাদের মালিকেরা আমাকে যা মনে করেন, আমি আসলে সে রকম মানুষ নই। ফলে ওই সমস্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা, সাংবাদিক তাদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করেছি। বাংলাদেশের চ্যানেল, নিউজ এডিটর, তাদের একটা অ্যাসোসিয়েশন আছে, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের ওই ঘটনার পরে তারা কিন্তু প্রকাশ্যে আমাকে নিষিদ্ধ করেছিল। টেলিভিশন মালিক সমিতিও আমাকে নিষিদ্ধ করেছিল, যে গোলাম মাওলা রনিকে কোনো টেলিভিশনে আনা যাবে না। এই রকম অবস্থাতে যে আমি সব টেলিভিশনে যাচ্ছি, এটা কিন্তু সহজ ব্যাপার না। তারপর আবার বেছে বেছে অনুষ্ঠানে যাচ্ছি। আলস্নাহই ভালো জানেন, এর রহস্য কোথায়। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, এসব ‘টক শো’ কেবল ফেইস চেনায় মানুষকে। ‘টক শো’তে বলা আমার কোনো কথা, কোনো ডায়ালগ কিন্তু দেশের মানুষের মুখে মুখে ফিরেনি। আমি হয়তো এক হাজার ডায়ালগ দিয়েছি চমকিত হওয়ার মতো, কিন্তু একটা ডায়ালগও মানুষের মুখে মুখে ফিরছে না। কিন্তু আমি লেখালেখিতে যে শব্দগুলো ব্যবহার করছি, সেগুলোর অনেকগুলোই কিন্তু এখন মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। তাই আমি এখন আমার মেধা, বুদ্ধি ও বিদ্যার পুরোটাই ব্যয় করছি শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে। সেখানেই আমি সময় বেশি দিচ্ছি। এখন আমি প্রতি সপ্তাহে বাংলাদেশ প্রতিদিনে লিখছি। ফেসবুকে লিখছি। নাটকও লিখছি। বইমেলার জন্যও বই লিখেছি।

প্রশ্নঃ ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সাংবাদিকের সঙ্গে আসলে ওই দিন কী হয়েছিল? টেলিভিশন স্ত্র্নিনে দেখা গেল আপনি আঘাত করছেন, আবার আপনি তা অস্বীকারও করেছেন।

গোলাম মাওলা রনিঃ নিঃসন্দেহে কিছু একটা হয়েছে সেদিন। তবে যা কিছু হয়েছে তা আমি আদালতে প্রমাণ করব। আদালতে এসবের প্রমাণ আছে। আর বিচারাধীন বিষয় নিয়ে আমি কোনো কথা বলব না। আমি এই মামলাটাকে ছাড়বও না, চালিয়ে যাব। আমার যতক্ষণ সামর্থø থাকবে, শেষ পর্যন্ত তা আমি দেখব। আদালতে আমি প্রমাণ করে দেব, আসলে সেদিন সেখানে কী ঘটেছিল।

প্রশ্নঃ ইনডিপেনডেন্টের সঙ্গে আপনার বিরোধের কারণ কি সালমান এফ রহমান? শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি সম্পর্কে লেখালেখির কারণেই কি ওই টেলিভিশনের সঙ্গে আপনার দ্বন্দ্ব?

গোলাম মাওলা রনিঃ শেয়ারবাজার নিয়ে আমার বক্তব্য স্পষ্ট। শেয়ারবাজারের এই কেলেঙ্কারিটা আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন মহাজোট সরকারকে মারাত্মক বিব্রত করেছে। এ ঘটনার সঙ্গে দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীর কোনো সংযোগ নেই। এর সঙ্গে দল যুক্ত নয়। সরকারেরও এতে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। দলের নাম ব্যবহার করে কিছু দুর্বৃত্ত শেয়ারবাজারকে ম্যানুপুলেট করেছে। দুবৃêত্তদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি সালমান এফ রহমান। অভিযুক্ত এই ব্যক্তি যখন দলের নীতিনির্ধারণী বৈঠকে, নীতিনির্ধারণী জায়গায় তার উপস্থিতি দেখি, দেশের মানুষের মতো আমার শরীরও জ্বলে। জ্বালা থেকেই আমি একটা লেখা লিখেছিলাম, দরবেশ বলেছিলাম, ওটার কারণেই জনাব সালমান এফ রহমান আমার ওপর বিক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এই লেখার প্রতিক্রিয়ায় তিনি যা করেছেন, তা দেশবাসী দেখেছেন।

প্রশ্নঃ কাদের মোলস্নাকে নিয়ে আপনার লেখা চিঠি বিতর্ক তৈরি করেছে···

গোলাম মাওলা রনিঃ যারা চিঠি নিয়ে আমার সমালোচনা করেছেন, তারা না বুঝে সমালোচনা করেছেন। ওই চিঠি কিংবা লেখাটা একান্তই একজন মৃতুøপথযাত্রী মানুষের অন্তিম ইচ্ছেপূরণ। এই ইচ্ছেপূরণের মধ্যে আমি মনে করি না কোনো অন্যায় আছে। এর সঙ্গে কাদের মোলস্নার যুদ্ধাপরাধ, পাকিস্তানের সঙ্গে তার সম্পর্ক, এসবে গোলাম মাওলা রনির কোনো দায়দায়িত্ব নেই। কারাগারে আমি ছিলাম, উনিও ছিলেন। আলাদা কক্ষে ছিলাম। কারাগারে কী হয়, ঈদের দিন সবাইকে একসঙ্গে নামাজ পড়তে হয়। সেই ঈদের দিন সকালবেলা তিনি নামাজ পড়তে এসেছিলেন। আর, ওই দিনই উনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। কারাগার থেকে আমার বের হওয়ার সংবাদ পেয়ে, তিনি আমাকে একটি চিঠিটা পাঠিয়েছিলেন তার দায়িত্বে থাকা সেবকের মাধ্যমে। তিনি বলেছেন, আমার মৃতুøর পরে তোমার যদি সম্্‌ভব হয়, তাহলে আমার এ কথাটি সবাইকে বলো, আমি কসাই কাদের নই। কাদের মোলস্নার রায়টা যখন বাস্তবায়িত হয়ে গেল, কিংবা যেকোনো মৃতুøদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির রায় যখন কার্যকর হয়ে যায়- তখন সংক্ষুব্ধ পক্ষ, আলোচক-সমালোচক তাদের বক্তব্য দিতে পারেন। আইনে এই সুযোগ আছে। বিচারাধীন কোনো বিষয় যদি ঝুলে থাকে, তখন সেটা নিয়ে আলোচনা করা যায় না। ফলে আমি যে বক্তব্য দিয়েছি, তা আইন-আদালত অবমাননা নয়। আমি লিগ্যাল বলেছি। এতে বিভ্রান্তিরও কোনো সুযোগ নেই।

প্রশ্নঃ জামায়াত, যুদ্ধাপরাধ, পাকিস্তান···

গোলাম মাওলা রনিঃ বাংলাদেশের কাছে স্বাধীনতাযুদ্ধের সেই পরাজয় পাকিস্তান এখনো মেনে নিতে পারেনি। তার কারণ হলো, পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধকালীন যে অপকর্ম করেছে, তার জন্য এখনো বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চায়নি। জামায়াতও তার অতীতের কর্মকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেনি। জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি। এবং এই বাংলাদেশে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের অকৃত্রিক বন্ধুও জামায়াত। কাদের মোলস্নাও অন্য জামায়াতিদের মতো একাত্তরের কর্মকাণ্ডের জন্য কখনো মর্মাহত ছিলেন না। দেশের মানুষের মতো আমারও দাবি, একাত্তরের সব ঘাতকের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। যে যেখানে আছে, ধরে ধরে এনে বিচার করতে হবে। সে যে দলের মানুষই হোক, তার বিচার সম্পন্ন করতে হবে।

প্রশ্নঃ আপনার কারাগার জীবন সম্পর্কে যদি কিছু বলেন···

গোলাম মাওলা রনিঃ কারাগার কখনোই একটা মানুষের জন্য কাঙ্ড়্গিত জায়গা নয়। বিশেষ করে, নিরপরাধ কোনো মানুষের কারাগারে দেওয়া উচিত নয়। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে যেন কোনো অবস্থাতেই কারাগারে যেতে না হয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত, যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি কারাগারে না যায়। কেননা অন্যায়ভাবে কারাগারে যাওয়ার ফলে, ওই নিরপরাধ ব্যক্তির যত ভালো গুণ আছে, ইতিবাচক ইচ্ছেশক্তি আছে, ভালো দিক আছে, প্রতিটি নষ্ট হয়ে যাবে। কারাগারে বন্দী থাকার যে বেদনা, তা তাকে প্রতিটি মুহূর্ত আহত করে। তার ভেতরে যে সুগুণাবলি আছে, তা ধ্বংস করে দেয়। অন্যদিকে প্রত্যেক অপরাধীকে একবারের জন্য হলেও কারাগারে যাওয়া উচিত। অপরাধী মানুষ সমাজে বসবাস না করে, কিছু দিনের জন্য হলেও তাদের কারাগারে যাওয়া বসবাস করা দরকার। সেখানে শুদ্ধি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আত্ম-উপলব্ধি করার সুযোগ হয়। কারাগার শুদ্ধিতার জায়গা। শুদ্ধ হওয়ার জায়গা।

প্রশ্নঃ আপনার অনলাইন নিউজ পোর্টাল ডিনিউজ নিয়ে সমালোচনা আছে। অনেকেই বলছেন, আপনি এই সংবাদমাধ্যমকে নিজের প্রচারমাধ্যম বানিয়েছেন···

গোলাম মাওলা রনিঃ ডিনিউজের আমি একজন শেয়ারহোল্ডার। আমার সঙ্গে এখানে আরও অনেকেই আছেন। আমার প্রচারের জন্য ডিনিউজের দরকার নেই। এটা কোনো প্রথম শ্রেণীর অনলাইনও নয়। বাংলাদেশে যেসব প্রথম শ্রেণীর অনলাইন নিউজ পোর্টাল আছে তার মধ্যে বাংলানিউজ, বিডিনিউজ আছে। তাদের যে প্রচারণার, যেকোনো একটা নিউজ প্রচারণার একটা মাধ্যম, বিশেষ করে ইন্টারনাল ভার্চুয়াল যা ঘটে, তার চেয়ে বেশি হলো গোলাম মাওলা রনির কানেকটিভিটি। আমি যদি ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিই, সেটা অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়ে। বহু লোক পড়ে। যেকোনো অনলাইন নিউজের চেয়ে আমার ফেসবুক বক্তব্য বেশি প্রচারিত হয়। ডিনিউজ যেটা করে- দেখা গেল আমার কোনো একটা লেখা হাজার হাজার শেয়ার হচ্ছে, তখন ডিনিউজও তাদের পোর্টালে তা প্রচার করে। আমার যেকোনো একটা লেখা, আমার বক্তব্য নিতে পারলে ওদের টিআরপি বেড়ে যায়। তাদের লাভ হয়। এই কারণেই ডিনিউজ কর্তৃপক্ষ এই জিনিসগুলো করে থাকে। এসব ক্ষেত্রে আমার কোনো নির্দেশনা থাকে না। আমি বরং তাদের নিষেধ করি। এসব তারা আমার অজান্তেই করে থাকে। ডিনিউজ গোলাম মাওলার রনির প্রচারের জন্য দরকার নেই। ডিনিউজ কিংবা অন্যদের প্রচারের জন্যই গোলাম মাওলা রনির দরকার হয়।

প্রশ্নঃ আপনার ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে জানতে চায় মানুষ। আপনি তো ব্যবসা করেন···

গোলাম মাওলা রনিঃ ১৯৯১ সাল থেকে আমি ব্যবসা করি। আমার তিনটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল শিপিং এজেন্সি স্টেইট ফরোয়ার্ডিং, ড্রি শিপমেন্ট অ্যান্ড পোস্ট ল্যান্ডিং ইনসফেকশন, যাকে সার্ভে কোম্পানি বলে সেটা আছে, অ্যাডফার্ম আছে এবং একটি কম্পোজিট টেঙ্টাইল আছে। আমার ব্যবসায় কোনো শেয়ারহোল্ডার নেই। পুরোটাই নিজের। সমস্তই আমার গড়া। ধীরে ধীরে সেসব প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের শ্রম ও ঘামের বিনিময়ে এসব প্রতিষ্ঠানকে আমি প্রতিষ্ঠিত করেছি। সেসব প্রতিষ্ঠান এখন খুব ভালো করছে। ভালো চলছে। স্টাফদের ভালো বেতন দিতে পারছি। সচ্ছল আছি, সবল আছি। আল্লাহ আমাকে ভালোই রেখেছেন। পত্রিকা কিংবা টেলিভিশন প্রতিষ্ঠাতা করে ব্যবসা করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই।

প্রশ্নঃ আপনার পেশাগত জীবন···

গোলাম মাওলা রনিঃ আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছি। ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়েছি। আমার চাকরি জীবনের শুরুই হয়েছিল পত্রিকার মাধ্যমে। সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে। ইনকিলাব হলো আমার পেশাগত জীবনের প্রথম পত্রিকা। সেটা ১৯৮৭ সালের কথা। তারপর কাজ করেছি দেশ বাংলা, ডেইলি স্টারে। আজকের কাগজের ফাউন্ডার মফস্বল বার্তা সম্পাদক ছিলাম, সেটা হলো ১৯৯০ সালের কথা। আজকের প্রশ্ন থেকে চলে যাই খবরে।

প্রশ্নঃ আপনার পরিবার সম্পর্কেও পাঠকের আগ্রহ অনেক···

গোলাম মাওলা রনিঃ আমার পরিবার হলো, আমার স্ত্রী গৃহিণী। তিনি আমার সহপাঠী ছিলেন। আমরা প্রেম করে বিয়ে করেছি। সেটা ১৯৮৬ সালে। আমার তিন ছেলেমেয়ে। বড় ছেলে ঢাকা কলেজে পড়ে ইন্টারমিডিয়েটে, বিজ্ঞানে। মেয়ে পড়ে ভিকারুননিসায়, দশম শ্রেণীতে। ছোট ছেলে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্ড়্গুলে। তিন ছেলেমেয়েকেই আমি আবহমান বাংলার সংস্ড়্গৃতিতে অভ্যস্ত করছি। সে কারণেই তাদেরকে ইংরেজি মাধ্যমে না পড়িয়ে বাংলা মাধ্যমে পড়াচ্ছি। সমাজের যারা একটু বিত্তবান ও প্রভাবশালী হয়ে যান, তাদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়ান। যা পছন্দ কিংবা বিশ্বাস কোনোটাই করি না।

প্রশ্নঃ অবসরে কী করেন?

গোলাম মাওলা রনিঃ অবসর সাধারণত খুব কমই পাই। তবে যতটুকু পাই, অবসরে সব সময় আমি পড়ি। আর পৃথিবীর যত নামকরা চলচ্চিত্র আছে, বিখ্যাত সব চলচ্চিত্র, বিশেষ করে মিলিটারি ব্যাটল, পৃথিবীতে বিখ্যাত যেসব সামরিক যুদ্ধগুলো হয়েছে, সেসব চলচ্চিত্র আমি দেখে থাকি। বাংলা চলচ্চিত্র আমাদের প্রাণ। সেসবও আমি দেখি। বিশেষ করে পুরোনো চলচ্চিত্রগুলো। হারানো সুর, উত্তম-সুচিত্রার চলচ্চিত্র দেখি। মোট কথা হলো, ক্ল্যাসিক যত চলচ্চিত্র আছে, তার প্রতি আমার আগ্রহ সব সময় থাকে। নামকরা যত ভালো সাহিত্য আছে, সেসবও আমি পড়ি। সময় পেলে গান শুনি। অনেক ধরনের গান শুনি। লোকগীতির প্রতি বিশেষ টান আছে। লালনও আছে। তবে রবীন্দ্রসংগীত শুনি বেশি। কারণ রবীন্দ্রসংগীতের প্রতি বরাবরই আমি দুর্বল। রবীন্দ্রসংগীতে আমার মন ভরে। পাহাড় আমাকে অনেক বেশি আকর্ষণ করে। পাহাড় দেখতে আমি অনেক ভালোবাসি। পছন্দ করি। দেশের ভেতরে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম আমার পছন্দের তালিকায় সবার আগে। সমুদ্রসৈকতের মধ্যে কঙ্বাজার আমার অনেক প্রিয়। ভীষণ ভালো লাগে তার নোনা জলে পা ভেজাতে। আমি পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছি, বহু পাহাড়-পর্বত দেখেছি। সমুদ্রসৈকত দেখেছি। আমার দেখা সবচেয়ে আকর্ষণীয় সমুদ্রসৈকত হলো কঙ্বাজার। তার ঢেউ, তার সান্নিধ্য আমাকে অনেক বেশি আন্দোলিত করে। পুলকিত করে। মনে শিহরণ জাগায়।

প্রশ্নঃ আপনার খাবারদাবার, প্রিয় ফুল···

গোলাম মাওলা রনিঃ আমি বিচিত্র ধরনের খাবার খেয়ে থাকি। বাংলা খাবারের মধ্যে ডাল-ভাত, মাছ-মাংস সবই আমার পছন্দ। তবে খাসির রেজালা খেতে আমার খু্‌ব ভালো লাগে। পশ্চিমা খাবারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পছন্দ পিৎজা। ফুল সবাই ভালোবাসে, আমি সব ফুল ভালোবাসি। কেন জানি না, রজনীগন্ধার প্রতি একটা বিশেষ টান অনুভব করি। রজনীগন্ধা ফুলই আমার সবচেয়ে প্রিয়।

প্রশ্নঃ আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

গোলাম মাওলা রনিঃ রাজনীতির মধ্যে আছি, রাজনীতিতেই থাকব। থাকতে চাই। রাজনীতি করব, সক্রিয় রাজনীতি। মানুষের জন্য রাজনীতি করে যাব। মানুষের সেবা করে মরতে চাই। মানুষের সঙ্গে থাকার, তাদের সঙ্গে কাজ করার আনন্দই অন্য রকম। মানুষের সঙ্গে ভালোবাসার বাঁধনটা দৃঢ় করতে চাই। রাজনীতি আমাকে অনেক দিয়েছে। এই রাজনীতিই আমার সামাজিক একটা পরিচিতি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ এখন আমাকে চেনে। যাদের কারণে আমি আজকের এই রনি, সেই জনগণের জন্য আমৃতুø আমি কাজ করে যাব। যত দিন আমার কাজ করার সুযোগ আছে, স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, যত দিন বেঁচে থাকব- তত দিন মানুষের জন্য কাজ করে যাব। অর্থকড়ি যা পাওয়ার ছিল তা আমার হয়েছে। সবকিছুই আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। আমার আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই।
উৎসঃ সাপ্তাহিক কাগজ