ছিঃ মমতা দিদি, ছিঃ মোদিজি, ছিঃ রাজনীতি

অজয় দাশগুপ্ত:  মূর্তি ভাঙার ইতিহাস আমাদের চাইতে কলকাতায় পুরানো। আমার বয়স তখন এগার  কি বারো, একাত্তরে মা-বাবার হাত ধরে কলকাতায় যাওয়া বালক আমি দেখেছি নকশাল আন্দোলনের নামে মূর্তি ভাঙার উল্লাস। দমদম এলাকায় আমার এক আত্মীয় বাড়িতে যাবার পথে ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলাম মা আর আমি। চারদিকে কালো ধোঁয়া, পাইপ গান নামের নি:শব্দ এক অস্ত্রে শব্দহীন মৃত্যু আর বোমার আওয়াজ। তার সাথে মূর্তি ভাঙ্গার প্রতিযোগিতা। কে ভাঙ্গতো, কারা ভাঙ্গাতো- সে তর্ক থাকলেও সত্য এই, ভেঙে গুঁড়িয়ে পড়তেন রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ রামমোহনেরা। তখন কলকাতার শাসনে ছিলেন সুদর্শন সিদ্বার্থ শংকর বাবু।  ধুতি পাঞ্জাবির এই ভদ্রলোক পশ্চিম বঙ্গের শেষ কংগ্রেস শাসক। রাস্তায় রাস্তায় বিবেকানন্দের ছবিসহ পোস্টারে লেখা থাকতো- নিজে বাঁচুন, অন্যকে বাঁচতে দিন। সে দু:সময় তারা কাটিয়ে উঠলেও মূর্তি ভাঙ্গা যে থামেনি তার প্রমাণ আবারো মিললো ভোটের আগে।

বুদ্ধদেব বসুর শাসন আমলের পর সবাইকে চমকে দিয়ে সেখানকার শাসনে এলেন মমতা বন্দোপ্যাধ্যায়। অদ্ভুত এক মহিলা। পূর্বাপর বিশ্লেষণ করলে ‘চমক’-ও চমকে যাবে। কথা আর কাজে মিল খুব সামান্য। ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ আর সেখানকার ভোট আমাদের চাইতে অনেক বেশি নিরপেক্ষ। সব মিলিয়ে সেখানকার মানুষের মনে আচরণে এক ধরনের শান্তি আর নিরাপত্তা আছে যে কারণে, এই মহিলার উৎপাতে অনেক সময় ধরা পড়েনা। তার বড় কৃতিত্ব ওপার বাংলার বুকের ওপর চেপে বসা ট্রেড ইউনিয়ন ও বামের নামে পাথরের অপসারণ। কিন্তু সে গিমিক বেশিদিন টেকেনি। শুরু হয়ে গেল তার অসাধারণ হবার যতো অপচেষ্টা। আমাদের দেশের নেতা-নেত্রীরা এর তুলনায় শিশু। ইনি কি না পারেন? গান গাইতে জানেন, ছবি আঁকতে জানেন, ছড়া লিখতে পারেন, কি পারেন না সেটাই বরং ভাবনার বিষয়। একবার কি হলো, সরাসরি চলমান এক টিভি শোতে তাকে ইজেলে একটা ছবি আঁকতে দিয়েছিলেন ঘোষক। মমতাদি কী করলেন জানেন? তুলি ব্রাশ নিয়ে ইজেলের কাছে গিয়ে দু একটা আঁচড় কেটে রাগ করে সব ছুঁড়ে ফেলে চিৎকার করে জানালেন এসব বাজে তুলিতে হবেনা। বেচারা উপস্থাপক হাসি লুকিয়ে ম্যানেজ করার জন্য বললেন, ঠিক আছে দিদি আমরা পরে ভালো রং তুলি কিনে আপনার কাছে পাঠিয়ে দেব, আপনি এঁকে পাঠিয়ে দেবেন।

আরো আছে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুবার্ষিকীতে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, গান্ধীকে রবীন্দ্রনাথের ফলের রস খাইয়ে অনশন ভাঙানোর গল্প। তাও সাতচল্লিশে। সমবেত সবার মুখে হাসি দেখে ধমক দিয়ে দিদি বলেছিলেন, আমি জেনে বলছি। পড়ে বলছি। পরে আনন্দবাজার লিখলো- দিদি জানেন না রবীন্দ্রনাথ কত আগে ১৯৪১ সালেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এতগুলো গল্প বলার কারণ মমতাকে ছোট করার জন্য না।

কেবল বোঝানোর জন্য তিনি কতটা অঘটনঘটনপটিয়সী। আমি কলকাতায় গিয়ে দেখেছি তার বিরাট বিরাট কাট আউটের পায়ের তলায় গড়াগড়ি খাচ্ছেন নেতাজী সুভাষ বোস, রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন দত্ত। বিশ্বাস না হয়তো কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে বেরুতেই দেখবেন স্বয়ং বিবেকানন্দের একখানা ছবি এবং তার ওপর সগর্বে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দোপ্যাধ্যায়। এগুলো কি সম্মান? না মর্যাদার পরিচায়ক? দিনের পর দিন বছরের পর বছর কলকাতা ও ওপার বাংলায় এমন ধারা চলে আসার পর আজ হঠাৎ করে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্য মায়াকান্না আর ‘ছিঃ’ এর মানে বুঝতে পারছি না তাই।

আমি বিজেপি সমর্থন করি না। করার প্রশ্নও ওঠেনা। দাঙ্গায় যাদের হাতে রক্ত তারা আমার আদর্শ বা আপন হতে পারে না। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন কাণ্ডটা কি বিজেপি করেছে না ষড়যন্ত্রের ফসল? অমিত শাহ এর শো ডাউনের শেষ পর্যায়ে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার রহস্য কোনকালেও উদঘাটিত হবে না। কারণ সে ইতিহাস বাঙালির নাই। দোষারোপ আর তর্কাতর্কি করতে করতেই ভুলে যাবো সব। পশ্চিম বাংরার বাঙালিদের কাছে আমার একটা বিনীত প্রশ্ন- আসলে কি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আছেন ওখানে? থাকলে দেখি না কেন? রাস্তার সাইনবোর্ডে-মানুষের মুখের কথায়, সিনেমা থিয়েটারে কিংবা জীবনে একেবারেই অনুপস্থিত একজন মণীষীর মূর্তি ভাঙলে কি আর না ভাঙলেই বা কি? তবে মূর্তি যে পাওয়ার ফুল সেটা কিন্তু আবারো প্রমাণিত হলো। তা যদি না হবে ঢাকা কলকাতা সর্বত্র ভাঙার পর মানুষের বিবেক জেগে উঠবে কোন দু:খে?

মহাশয় বিদ্যাসাগর অতিশয় ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি মন মননে আধুনিকতার জন্য অপমান মাথা পেতে নিয়ে কাজ করতেন। অনেকে জানে তার বিধবা বিবাহ, সতীদাহ বন্ধের আন্দোলন সহ্য করতে না পারা বাঙালি তার চলার পথে বাড়ি থেকে হওয়ার পর বিষ্ঠা-ময়লা ছুঁড়ে অপমান করা  হতো তাকে। এসব ছিল তার গা সওয়া। তিনি এগুলো মনে নিয়েই বাঙালির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা এখন যেমন তখনো ছিলাম এক অসহিষ্ণু অবোধ্য জাতি। এমন জাতি যেখানে থাকুক, যে দেশে থাকুক, এমন আচরণ করবে এটাই স্বাভাবিক।

ওপার বাঙালার রাজনীতি এখন কেমন তার একটা বড় উদাহরণ বিজেপির শো ডাউন। এককালে বামদের লালে লাল করে দেওয়া কলকাতা এখন দিদির রঙে নীল। সে নীলের ভেতর যে গেরুয়ার প্রভাব আর আছড় ঢুকেছে এ শো ডাউন তার বড় প্রমাণ। আমি কথা বলে দেখেছি বহু যৌক্তিক কারণে মানুষ মোদির ওপর ভরসা রাখে চাইছেন। যার বড় একটি  কারণ হলো বিশ্বাসহীনতা। কারণ তারা কোনভাবেই রাহুল বা প্রাদেশিক দলগুলোর নেতাদের বিশ্বাস করতে পারছে না। ওপার বাংলায় মমতা তার বাইরের কিছু না। মানুষ বাধ্য হয়ে মানে বটে ভেতরে কী চায় তার বড় প্রমাণ ভোট বাক্স। কয়দিন পর সে বাক্স খুলে যারা জিতবে বা যারা শাসনে আসবে তারাই ঠিক করে দেবে কে বা কারা ভেঙেছিল বিদ্যাসাগরের মূর্তি।

তবে আপাতত আমি একথা বলতেই পারি এর পেছনে ভোটারদের মন আর মননে সামান্য হলেও সুড়সুড়ি জাগানোর অপচেষ্টা ছিল। মধ্যবিত্ত আর মননশীল নামে পরিচিত বিবেক বিক্রিতে অভ্যস্ত আমাদের মন জাগাতে ভাঙার বিকল্প নাই। এটা জেনেই রাজনীতি এমন করে। এমন সব খেলাধুলা করে থাকে। তবে  এটা বলতেই হবে ‘ছিঃ’, ‘ছিঃ’ বলার ভেতর হয়তো কোনও একসময় মানুষের মনে বোধ জাগতে পারে আসলেই তো। ‘ছিঃ’, ‘ছিঃ’- এর নাম রাজনীতি? তখন যদি তারা- ‘ছিঃ দিদি, ছিঃ মোদি’ বলে, আমরা কি সত্যি অবাক হবো?  আসলে শেষ কথা এই. যে যাই করুক টার্গেট বিদ্যাসাগর টার্গেট আমাদের দেশে লালন সাঁই এর মত মানবিক মানুষেরা।

আর কবে আমরা জেগে উঠবো? আর কবে জানবো এসব করার নাম নিজেদের অপমান , কবে শিখবো সবাই মিলে কাউকে সম্মান করা?

You Might Also Like