ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর মারামারি, তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি

ছাত্রলীগের সদ্যগঠিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে আপত্তি তুলতে গিয়ে পদ পাওয়া নেতাদের মারধরের শিকার হয়েছেন পদ না পাওয়ারা। সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে এই হামলায় নারীকর্মীসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। অপরদিকে ছাত্রলীগের দুগ্রুপের মারামারির ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। কমিটিকে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

সম্মেলনের এক বছর পর সোমবার ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদনেই এই কমিটি হয়েছে বলে জানান ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। তবে কমিটিতে স্থান না পাওয়ারা দাবি করছেন, সংগঠনের গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে ‘বিবাহিত ও অছাত্রদের’ কমিটিতে স্থান দেওয়া হয়েছে।

নতুন কমিটি ঘোষণা কয়েক ঘণ্টা পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনে আসেন প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী; যাদের কেউ পদ পাননি, কেউবা কাঙ্ক্ষিত পদ না পেয়ে ক্ষুব্ধ। সংবাদ সম্মেলন শুরুর পরপরই সেখানে হামলা চালিয়ে তা পণ্ড করে দেয় আগে থেকেই সেখানে অবস্থান নেওয়া পদ পাওয়া শতাধিক নেতা।

প্রকাশ্যেই চালানো এই হামলায় তারা সংবাদ সম্মেলনের ব্যানার ছিঁড়ে নিয়ে যায় এবং মারধর করে সংবাদ সম্মেলনকারীদের। রক্তাক্ত মুখে কয়েকজনকে মধুর ক্যান্টিন ছাড়তেও দেখা যায়।

আহতদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান কমিটির সংস্কৃতি বিষয়ক উপ সম্পাদক ও ডাকসুর সদস্য তিলোত্তমা শিকদার, ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক ও ছাত্রলীগের সাবেক কমিটির উপ বিজ্ঞান সম্পাদক তানভীর আহমেদ, রোকেয়া হলের সাধারণ সম্পাদক শ্রাবনী দিশা, রোকেয়া হলের সভাপতি ও ডাকসুর কমন রুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক বিএম লিপি (নতুন কমিটিতে উপ সাংস্কৃতিক সম্পাদক), শামসুন্নাহার হলের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসমিন শান্তা, শামসুন্নাহার হলের সভাপতি ও ডাকসু সদস্য নিপু ইসলাম তন্বী (বর্তমান কমিটির উপ সাংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক), কুয়েত মৈত্রী হলের সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী শায়লা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক আইন সম্পাদক সাইফুর রহমান।

‘যোগ্যদের বঞ্চিত করে বিবাহিত, বিতর্কিত, অছাত্র ও অযোগ্যদের দিয়ে গঠিত কমিটি’ বাতিলের দাবিতে এই সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন তারা।

এদের অন্যতম নেতা ও সাবেক প্রচার সম্পাদক সাইফ বাবু বলেন, “বিবাহিত, অছাত্র ও চাকরিজীবীদের দিয়ে যেই কমিটি আজকে করা হয়েছে তা বতিলের সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে আমাদের ওপর হামলা হয়। আমাদের অন্তত ১৫ জন আহত হয়। আমরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।” কমিটিতে যাদের নিয়ে আপত্তি, সেই ‘বিবাহিত ও চাকরিজীবীদের তালিকা’ অচিরেই প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি।

সাবেক কমিটির উপ-প্রচার সম্পাদক সাইফুর রহমান বলেন, “আমি ছাত্রলীগের হল ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছি। পাশাপাশি নির্যাতিত আওয়ামী পরিবারের সন্তান আমি। তাহলে কোন অযোগ্যতায় আমাকে বাদ দেওয়া হল?”

নতুন কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামস ই নোমান, মাহবুব খান, সাংগঠনিক সম্পাদক সোহানুর রহমান, সহ সভাপতি সাদিক খানকে হামলার নেতৃত্বে দেখা গেছে।

শামস ই নোমান হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার কথা অস্বীকার করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা কয়েকজন ঘটনাস্থলে ছিলাম, এটা সত্য। কিন্তু হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার মতো লোক আমরা নই, এই কাজ আমি করিনি।”

ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন কিংবা সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি সংঘর্ষের বিষয়ে।

তবে রব্বানী তার ভেরিয়াইড ফেইসবুক পাতায় সোমবার রাতে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, “যেদিন আপনি সবার মন জুগিয়ে চলতে পারবেন, সেদিন বুঝবেন আপনি আর মানুষ নেই, মূর্তি না হয় দেবতা বনে গেছেন।”

আহতদের দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে বিক্ষুব্ধদের তোপের মুখে পড়েন ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী আহতদের দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে বিক্ষুব্ধদের তোপের মুখে পড়েন ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী

হামলায় আহতদের দেখতে রাত ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান ছাত্রলীগ সভাপতি শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। তবে সেখানে উপস্থিত বিক্ষুব্ধ নেতারা দুই শীর্ষনেতাকে আহতদের কাছে ভিড়তে দেননি।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দুজনকে দেখেই স্লোগান দিতে থাকেন বিক্ষুব্ধ নেতারা; ‘মানবতার কথা বলে, বোনদের উপর হামলা কেন’, ‘বিবাহিতরা কমিটিতে কেন, মানি না মানব না, ‘রাজাকারপুত্র কমিটিতে কেন, মানি না মানব না’ শোর তোলেন তারা। শোভন-রাব্বানীর সঙ্গে থাকা নেতারাও তোলেন পাল্টা স্লোগান।

শোভন ও রাব্বানীর পথ আটকে দাঁড়ান রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সভাপতি ডাকসুর ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক বিএম লিপি। তিনি বলেন, “রাজাকারপুত্র, বিবাহিত, অছাত্রদের কমিটিতে রেখেছেন, আমাদের মতো ত্যাগীদের কেন মুল্যায়ন করেননি?” জবাবে সাধারণ সম্পাদক রাব্বানী বলেন, “সামনে মুল্যায়ন করা হবে।” এসময় বঙ্গবন্ধু হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আল আমিন বলেন, “যাদের কমিটিতে রেখেছেন, তারা কোন বিবেচনায় আমাদের চেয়ে যোগ্য?” শোভন বলেন, “সব কিছু বিবেচনা করা হবে, এখন আমরা আহতদের দেখতে আসছি।”

এ সময় সাবেক কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সাইফুদ্দিন বাবু বলেন, “ত্যাগী নেতাদের মারধর করে কোন সিম্পেথি নেওয়ার জন্য এসেছেন। কোনোভাবেই এই নাটক করতে দেওয়া হবে না।” প্রায় আধা ঘণ্টা বাক-বিতণ্ডার পর আহতদের দেখতে না পেরে হাসপাতাল থেকে ফিরে আসেন শোভন ও রাব্বানী।

মধুর ক্যান্টিনে মারামারির ঘটনা তদন্তে ছাত্রলীগের ৩ সদস্যের কমিটি

এদিকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর সোমবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রলীগের দুগ্রুপের মারামারির ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করেছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। কমিটিকে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

মঙ্গলবার ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটিতে রয়েছেন- ছাত্রলীগের নতুন কমিটির সহসভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়, আইনবিষয়ক সম্পাদক ফুয়াদ হোসেন শাহাদাৎ ও তথ্য গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক পল্বব কুমার বর্মণ।

ছাত্রলীগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সোমবার ইফতার-পরবর্তী সময়ে মধুর ক্যান্টিনে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত ঘটনা হয়েছে, আমরা ছাত্রলীগ পরিবার তার তীব্র নিন্দা জানাই। সেই সঙ্গে ওই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির লক্ষ্যে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো।

তদন্ত কমিটিকে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরেজমিন অনুসন্ধান করে তথ্য-উপাত্তসহ প্রতিবেদন দফতর সেলে জমা দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত দীর্ঘ নাটকীয়তা শেষে সম্মেলনের এক বছর পর সোমবার ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে বিবাহিত, অছাত্র, হত্যা ও মাদক মামলার আসামিদের পদ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পদবঞ্চিতদের।

সোমবার দুপুরের দিকে কমিটির তালিকা নিয়ে গণভবনে যান ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তারা ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির সদস্যদের সম্পর্কে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অবহিত করেন।

গণভবন থেকে বের হয়ে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী যুগান্তরকে জানান, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন। এর পর ফেসবুকে কমিটি প্রকাশ করা হয়।

যদিও প্রকাশিত কমিটির ওপরে তারিখ লেখা রয়েছে ১১ মে। ফলে এ নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয় প্রথম। কমিটি প্রকাশের পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জড়ো হতে থাকে পদবঞ্চিত ও প্রত্যাশিত পদ না পাওয়া নেতা-নেত্রীরা।

তারা কমিটি প্রত্যাখ্যান করে ইফতারের পূর্বেই বিক্ষোভ শুরু করেন। ওই বিক্ষোভে অংশ নেয়া নারী নেত্রীদের ওপর পদপ্রাপ্ত নেতারা হামলা করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

ছাত্রলীগের নবঘোষিত ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের একটি অংশ বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বর থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে মধুর ক্যান্টিনের সামনে গেলে নতুন কমিটিতে পদ পাওয়া একজন সহসভাপতি ও দুজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে মিছিলে হামলা চালানো হয়।

লাঞ্ছিত করা হয় ডাকসুর সদস্য ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় অর্থবিষয়ক উপসম্পাদক ও ঢাবির সুফিয়া কামাল হলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক তিলোত্তমা শিকদার এবং ডাকসুর কমনরুম ও ক্যাফেটারিয়া সম্পাদক এবং রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সভাপতি বিএম লিপি আক্তারকে। পরে তারা সেখান থেকে বিক্ষোভ করে রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হন।

মিছিলে পদবঞ্চিত অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী অংশ নেয়। পদবঞ্চিত নেতারা সবাই সাবেক সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইনের অনুসারী। যাদের অধিকাংশই সর্বশেষ সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী ছিলেন। ইফতারের পর ফের মধুর ক্যান্টিনের উত্তর পাশে জড়ো হন পদবঞ্চিতরা।

সেখানে তারা কমিটি পুনর্গঠন করে সবার সমন্বয়ে তা গঠনের দাবি জানান। তারা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে অবস্থান তুলে ধরবেন বলে জানান। অন্যদিকে মধুর ক্যান্টিনের দক্ষিণ পাশে ও ক্যান্টিনের বাইরে অবস্থান নেন বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীরা।

পরে সদ্য বিদায়ী কমিটির প্রচার সম্পাদক সাইফ উদ্দিন বাবু সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য শুরু করলে বর্তমান নেতাদের অনুসারীরা ব্যানার ছিঁড়ে নেয় এবং চেয়ার উঠিয়ে হামলা চালায়। এর পর শুরু হয় দুপক্ষের হাতাহাতি।

এ সময় বর্তমান নেতৃত্বের অনুসারীদের হামলায় আহত হন- ডাকসুর কমনরুম ও ক্যাফেটারিয়া সম্পাদক বিএম লিপি আক্তার, ক্রীড়া সম্পাদক তানভীর শাকিল, সদস্য তিলোত্তমা শিকদার, সদস্য নিপো ইসলাম তন্বী, সদ্য বিদায়ী কমিটির কর্মসূচি ও পরিকল্পনা সম্পাদক রাকিব হোসেন, রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী দিশা, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের সাধারণ সম্পাদক শ্রাবণী শায়লা।

প্রসঙ্গত গত বছরের ১১ ও ১২ মে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন ছাড়াই ছাত্রলীগের দুই দিনব্যাপী ২৯তম জাতীয় সম্মেলন শেষ হয়। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলন হয় ২৯ এপ্রিল। সম্মেলনের আড়াই মাস পর ৩১ জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি এবং গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

You Might Also Like