হোম » চীন-ভারতের পাওয়ার গ্যাপের দিকে চোখ রাখেন

চীন-ভারতের পাওয়ার গ্যাপের দিকে চোখ রাখেন

admin- Wednesday, August 16th, 2017

গৌতম দাস

ভুটানের ডোকলাম উপত্যকায় মুখোমুখি হয়ে থাকা ভারতীয় ও চীনা সেনার অবস্থান আরো উত্তেজনাময় হয়ে উঠেছে। কেউই অবস্থান ছেড়ে ফেরত যায়নি। কূটনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে চীনা দাবি হলো, ভারতীয় সেনাদের সবার আগে ওই অবস্থান ছেড়ে ফিরে যেতে হবে। কারণ চীনের দাবি, ব্রিটিশ ও চীনা রাজশক্তির ১৮৯০ সালের চুক্তি অনুসারে তখন থেকে ওই স্থান অবিতর্কিতভাবে চীনের চিহ্নিত ভূখণ্ড। তাই এখানে ভারত চীনা ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশকারী। এর বিপরীতে ভারতীয় কূটনৈতিক অবস্থান হলো, ওই স্থান অবিতর্কিত নয়, বরং ভুটানের দাবিকৃত ভূখণ্ড। ভারত ভুটানের পক্ষ থেকে চীনাদের বাধা দিয়েছে। কিন্তু ভারত বোঝাতে চাইছে, তবু এগুলো ভারতের জন্যও আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। আসলে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ‘‘আসেন চীনা ভাইয়েরা ‘একসাথে’ সেনা প্রত্যাহার করি।’’ভারতের এই অবস্থান বদল কেন?

কারণ রাস্তা তৈরি করাতে চীনকে বাধা দেয়া নয় এবং ভারতের মূল ইস্যু এখন ‘সম্মানজনক পশ্চাৎ অপসারণ করা’র সুযোগ সে পেতে চাচ্ছে। অর্থাৎ ভারতীয় সেনা যে এখনই ফিরে যেতে চায়, এ ব্যাপারে তারা রাজি। কিন্তু চুপচাপ ফিরে গেলে নিজের বেইজ্জতি হয়, তাই ভারতের মুখ রক্ষার স্বার্থে ভারত-চীন একসাথে ফিরে যাওয়ার ভারতীয় প্রস্তাবে চীন রাজি হলে ভারতের ইজ্জত বাঁচে। বিপরীতে চীনের অনড় ভূমিকা এবং তারা অনবরত হুমকি দিয়ে বলে চলছে, ভারতীয়রা বিতর্কহীন চীনা ভূখণ্ডে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী। অতএব সবার আগে তাদেরকে চুপচাপ ফিরে যেতে হবে। সারকথায়, সব বাদ দিয়ে ভারত এখন মরিয়া হয়ে একটা সম্মানজনক পশ্চাৎ অপসারণের সুযোগ খুঁজে ফিরছে। তাদের দশা এমন দুস্থ অবস্থায় পৌঁছল কেন?

কারণ এক. নির্বাচনী অভ্যন্তরীণ ইমেজ তৈরির কথা ভেবে মোদি সরকার আগের যেকোনো সরকারের চেয়ে চীনের বিরুদ্ধে বেশি তৎপরÑ এটা দেখানো। এই উগ্র জাতীয়তা প্রদর্শন করাই মোদির লক্ষ্য ছিল। এমনটা দেখাতে পারলে আগামী ভোটে এটা তাকে প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে বেশি সুবিধা দেবে, এই ছিল বিজেপি ও মোদির হিসাব। ভুটান-চীন সীমান্তে চীন রাস্তা তৈরি করতে গেলে তাই মোদি সরকার অন্য কোনো উপায়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশের পথ না খুঁজে সরাসরি নিজ সৈন্য পাঠিয়ে উগ্রতা প্রদর্শন করতে গিয়েছিল। কিন্তু মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা এতটাই কাঁচা ছিল যে, ঘটনা তিন সপ্তাহে না গড়াতেই তৈরী করা টেনশন সামলাতে না পেরে আপসের পথে যেতে অস্থির হয়ে উঠেছে। এ কারণে, মোদি এক সর্বদলীয় পরামর্শ বৈঠকের আয়োজন করেন। ওই সভায় সবার কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যায়, মোদি সরকার সেনা পাঠিয়ে সামরিক টেনশন তৈরি করেছে অথচ কূটনৈতিক পদক্ষেপের সম্ভাব্য বন্ধুদের সাথে রাখার ব্যাপারে তেমন প্রস্তুতি নেয়নি। যেমন জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে ডোকলাম প্রসঙ্গ ইস্যু হলে, সেখানে রাশিয়া কি ভারতের পক্ষে অবস্থান নেবেÑ এমন কোনো প্রস্তুতি বা নিশ্চয়তা নেই। সে পরিস্থিতিতে সম্ভবত রাশিয়া চীনের দিকে তাকিয়ে অবস্থান নেবে।

অপর দিকে এত আশা-ভরসাস্থল, বন্ধু মনে করা আমেরিকার ট্রাম্প প্রশাসন কি ভারতের পক্ষে অবস্থান নেবে? এরও কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। আমেরিকা সম্ভবত নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে দেখবে। ফলে ভারতের বিরোধী দল, বিশেষ করে কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী মোদিকে এই বলে অভিযুক্ত করেন, তার আমলে এসে আমাদের ট্র্যাডিশনাল বন্ধুরা দূরে অনিশ্চিত অবস্থানে চলে গেছে। এসব মিলিয়ে ওই সর্বদলীয় মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত হয় সরকার সম্মানজনক সেনা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেবে। এতে মোদির লাভ হলো, অন্তত সম্মানজনক সেনা প্রত্যাহারের অবস্থান নেয়ার দায় একা মোদির নয়, সবার বা সর্বদলীয়। আসলে মোদির লক্ষ্য হলো, নির্বাচনী অভ্যন্তরীণ ইমেজ তৈরি। সে কাজ ইতোমধ্যে অর্জন হয়েই গেছে। তবে এখন বিরাট সমস্যা হলো, চীন তাকে সম্মানজনক সেনা প্রত্যাহারের অবস্থান নিতে দিচ্ছে না, বরং এর বদলে সীমিত আকারে যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে অনবরত চীনা হুমকি।

ভারতের থিংকট্যাংক ডোকলাম ইস্যুকে কিভাবে দেখছে?

প্রত্যেক সামর্থ্যবান রাষ্ট্র, মানে একাধিক থিংকট্যাংকের খরচ জোগাতে সক্ষমÑ এমন রাষ্ট্রের জন্য একাধিক থিংকট্যাংক গড়ে তোলা প্রয়োজনীয় কাজ বলে বিবেচিত হয় এ কালে। থিংকট্যাংকের অর্থ হলো এ কালের রাষ্ট্রের কৌশলগত যেসব স্বার্থ থাকে, সেসব স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা চালানো, যাতে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা ওই গবেষণার ফলাফল বা সুপারিশের আলোকে সঠিক নীতি গ্রহণ করতে পারে। যেহেতু রাষ্ট্রস্বার্থে এই গবেষণার ফলে এসব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় বা দাতব্যভাবে সাধারণত নিজের খরচ জুগিয়ে থাকে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের বাইরের অর্থের ওপর নির্ভরশীল হয়ে এ প্রতিষ্ঠান সাধারণত চলতে পারে না। যেমন আমেরিকার রেওয়াজ হলো, অভ্যন্তরীণ দান দাতব্যে অর্থ সংগ্রহ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ভারত এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে। সে আমেরিকান থিংকট্যাংকের পয়সায় নিজের থিংকট্যাংকের এক্সপার্ট ও গবেষক তৈরি করছে। অর্থাৎ এখানে ধরে নেয়া হয়েছে, আমেরিকান থিংকট্যাংক ভারতের স্বার্থে কাজ করতে পারে। এটা কি সম্ভব? ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশের ভারত সফর থেকে প্রথম আমেরিকা-ভারত পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থের প্রয়োজনে কাছে আসা শুরু হয়েছিল। ‘ওয়ার অন টেরর’ ইস্যুতে তা শুরু হয়েছিল, কিন্তু খুব দ্রুত আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ ইস্যুতে ভারতের সাগরেদ হয়ে যাওয়া মুখ্য ইস্যু হয়ে যায়। সেকালে অবশ্য থিংকট্যাংকের ধারণাই ভারতে তেমন প্রতিষ্ঠিত ছিল না; কেবল যুদ্ধ-কৌশল অর্থে কিছু প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু বুশের ওই সফরের ফলে আমেরিকান থিংকট্যাংকগুলো তাদের ভারতীয় শাখা খুলতে শুরু করে দেয়। এ যেন প্রেম-রোমান্সকে কারো থেকে কোচিং বা ট্রেনিংয়ে শিখার বিষয় মনে করা। অথচ এটা প্রেমিক-প্রেমিকার বাইরের কারো কাছ থেকে নেয়া কোনো ট্রেনিং ছাড়াই নিজেরা ‘সরাসরি স্টেজে পারফর্ম করতে করতে শিখে ফেলার বিষয়। এ জন্যই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের কৌশলগত নীতি-পলিসি কী হবে, সে গবেষণার খরচ রাষ্ট্রের অভ্যন্তর থেকেই সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু তা না করে কোনো আমেরিকান থিংকট্যাংকের অর্থ ও গাইডে ভারতীয় থিংকট্যাংক গড়ে তোলার খায়েশ করা হয়েছে। আমেরিকানরা খরচ বহন করছে, ভারতীয় মধ্যবিত্তকে আমেরিকায় নিয়ে যাচ্ছে পিএইচডি, মাস্টার্স করাতেÑ এতেই তারা খুশি। আর ভাবছে, আমেরিকান থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান যেন ভারতের কৌশলগত স্বার্থ দেখবে। ব্যাপারটা দাঁড়ায় এমন, আমেরিকার স্বার্থচোখ দিয়ে কেউ ভারতের কৌশলগত স্বার্থ দেখছে।

যা হোক, ১০-১২ বছর আগে থেকে আমেরিকান থিংকট্যাংক ভারতে গড়ে তোলা শুরু হওয়ার পর এ ব্যাপারে প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে। এমন একজন হলেন সি রাজামোহন। বর্তমানে তিনি আমেরিকান থিংকট্যাংক ‘কার্নেগি ইন্ডিয়া’র ডিরেক্টর। এ ছাড়া ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় ‘মন্ডোলা’ শিরোনামে তিনি নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন। এক্সপার্ট হিসেবে বাংলাদেশেও এসেছিলেন। ডোকলাম ইস্যুতে তার কয়েকটি কলাম লেখা আছে। একটি হলোÑ ‘মাইন্ড ইওর পাওয়ার গ্যাপ’। অর্থাৎ প্রভাব-ক্ষমতার দিক থেকে চীনের সাথে ভারতের তুলনীয় সক্ষমতার অর্থে, ভারত পিছিয়ে পড়া দেশ, এক বিরাট পাওয়ার গ্যাপ আছে দুই দেশের মধ্যে, ফলে সাবধানে পা ফেলো! এটাই বলতে চাইছেন তিনি। তার এই কলামের প্রথম বাক্য হলো, ‘উপমহাদেশে একের পর একটি ক্ষেত্রে চীনের ঢুকে পড়ার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নবাবি চিন্তা করার অবস্থায় ভারত নেই।’ তিনি শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার আর ভুটানের ডোকলাম, এ তিন ইস্যুতে চীনের সাথে ভারতের নিজেকে তুলনা করার কথা ভাবাকে ‘নবাবি চিন্তা’ বলছেন। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় নির্মিত গভীর সমুদ্রবন্দর চীনা মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অপর দিকে মিয়ানমারও একটা গভীর সমুদ্রবন্দর করতে যাচ্ছে, ওই পোর্ট থেকে চীনের কুনমিং পর্যন্ত পাইপলাইনে জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। এটা এর মূল উদ্দেশ্য। রাজামোহন বলতে চাইছেন, ওই দুই পোর্টের মাধ্যমে চীনা প্রভাব যেভাবে ভারতের পড়শি রাষ্ট্রের ওপর বাড়বে, সে তুলনায় ডোকলামে কিছু জায়গাজমির মারামারি খুবই তুচ্ছ ঘটনা। অর্থাৎ পোর্ট ইস্যু ভারতের অনেক বড় স্বার্থ হারানোর বিষয়। আমেরিকান থিংকট্যাংকগুলোর কাজ হলোÑ নিজেদের ‘চীন ঠেকাও’ বুলি ভারতীয় শাখায় জড়ো হওয়া ইন্টেলেক্টদের মনে গেঁথে দেয়া। সে কাজে যেসব বয়ান রাজামোহন ও অন্য ভারতীয়দের মনে তারা গেঁথে দিয়েছে, সেটা হলো অবাস্তব কিছু হাহাকার। যেমনÑ ‘সব চীন নিয়ে গেল’, ‘চীন ভারতকে ঘিরে ধরছে’। ভারত যেন চাইলেই চীনা অর্থনৈতিক প্রবল প্রভাব উপেক্ষা বা অস্বীকার করতে পারে। অথচ চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব বা সক্ষমতা এগুলো অবজেক্টিভ। চীনের কিছু ব্যক্তি এমন দাবি করেন বলেই এটা সত্য, তা নয়। এটা হলো অনস্বীকার্য বাস্তবতা।

ধরা যাক, চীনের সব নিয়ে যাওয়া বা ঘিরে ধরা শতভাগ সত্য। কিন্তু এসব তৎপরতা কি বেআইনি, অবৈধ কাজ? না। ভারতও তা বলছে না। অভিযোগ করছে না। বাস্তবতা হলো, চীনের পরাশক্তিগত সক্ষমতার সাথে ভারতের সক্ষমতা তুলনাযোগ্য নয়। কিন্তু সেটা তো চীনের অপরাধ নয়। পরাশক্তিগত সক্ষমতা মানে যার মূল ভিত্তি হলো, অর্থনৈতিক অগ্রসরতা। রাজামোহনেরই ওই লেখায়, ‘চীনের বর্তমান জিডিপির আকার ভারতের চেয়ে পাঁচগুণ বড় এবং চীনের সামরিক খাতে ব্যয়ও ভারতের চেয়ে চারগুণ বেশি।’ গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের শেয়ার সবচেয়ে বড়, চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সবার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। ফলে তার বিনিয়োগ সক্ষমতার সাথে কেউ তুলনীয় নয়। ফলে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এশিয়ায় চীনের প্রভাব ভারতের চেয়ে অনেক বেশি হবে। এমনকি যারা ভারতের পড়শি রাষ্ট্র তাদের ওপর চীনা প্রভাব, তাদের অর্থনীতিতে চীনের বিনিয়োগ অনেক বেশি হবে এবং তা বিরাট ভূমিকা নেবে। কিন্তু এরপরই আবার রাজামোহনসহ ভারতীয়দের আহাজারি আমরা শুনতে পাবোÑ ‘ভারতের প্রভাবাধীন এলাকায়’, ভারতের ‘পড়শি রাষ্ট্রে’ চীন ঢুকে পড়ছে।

এখানে ভারতের প্রভাবাধীন এলাকা কথাটি বড়ই তামাশার। এর অর্থ কী? এর অর্থ হলো, যেন সেটা ভারতেরই তালুক। আসলে তারা বোঝাতে চান, ওইসব এলাকা ভারতের বাপ-দাদা ব্রিটিশদের ‘তালুক’ ছিল, তাই এখন ওগুলো ভারতের তালুক! কিন্তু সেটাই বা কী অর্থে? একই ব্রিটিশ শাসকের অধীনে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ছিল। কিন্তু সে জন্য কি ১৯৪৭ সালের পর এসব দেশের ওপর নেহরুর ভারতের কোনো মৌরসি তালুক-প্রভাব বর্তায়? অথচ ভারতের ইঙ্গিত এমন যেন কলোনিয়াল ব্রিটিশ-প্রভাবের উত্তরসূরি হলো নেহরুর ভারত। ব্রিটেন যেন ভারতের বাপ-দাদা। অথচ ‘প্রভাবাধীন এলাকা’ কথাটির একটিই মানে হতে পারে আর তা হলো অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রভাব আশপাশে যতটুকু। এটা লিগ্যাল প্রভাব না, কোনো বৈধ মালিকানাবোধও এখানে নেই। আবার আজ আমার অর্থনীতি প্রভাবশালী বলে এর প্রভাব থাকলেও কাল যদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে যায়, তবে প্রভাব কমে শূন্য হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া অন্য কেউ আমার চেয়ে অর্থনীতিতে বড় প্রভাবশালী হিসেবে হাজির হলে আমার প্রভাব শূন্য হয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভারতের কাছে তার পড়শি মানেই ব্রিটিশ কলোনি সূত্রে নেহরুর ভারতের ‘স্থায়ী প্রভাবাধীন এলাকা’ বলে কিছু একটা। সবচেয়ে আজব ব্যাপার হলো, এত যুক্তিবুদ্ধি নিজেই দেয়ার পরও খোদ রাজামোহন একইভাবে চীনের বিরুদ্ধে হা-হুতাশ করছেন। অথচ ব্যাপারটা হলো আগামীতে যদি ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা চীনের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে কখনো, তবে ‘ভারতের প্রভাবাধীন’ কথাটি অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেটা এখনই হয়ে গেছে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। ঝালসুলভ আবদার করার মানে হয় না।

এ ছাড়া আর একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট আছে। যখন দুনিয়া কলোনি দখলের প্রতিযোগিতার যুগে ছিল, আর ব্রিটিশরা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় সবার শ্রেষ্ঠ ছিল, সে যুগের পড়তি দিকে ১৮৮০-এর দশকে আমেরিকা প্রথম অর্থনৈতিকভাবে ব্রিটিশ অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খেয়াল করতে হবে, তবু দুনিয়ার মাতবর হয়ে উঠতে আমেরিকার আরো ৬০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। কার্যত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালের পর আমেরিকা দুনিয়াকে নিজের নেতৃত্বের অধীনে নিতে পেরেছিল। আরো লক্ষণীয়, এই ৬০ বছরে আমেরিকানরা কোনো যুদ্ধে নিজেকে বিরাটভাবে জড়ায়নি। যুদ্ধ একবারই করেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেটা নির্ধারক যুদ্ধ, যার শেষে আমেরিকা ‘দুনিয়ার রাজা’ হয়েছে। এর মাঝে আমেরিকা কোনো নাকি কান্না করেনি, সব নিয়ে গেল বলে হাত-পা ছোড়েনি। আজকের চীনের উত্থান সেই আমেরিকাকে অনুসরণ করেই।

কিন্তু ভারত? আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতির সমর্থক হওয়ায় বড় ভাই পিঠ চাপড়ে দিয়েছে আর ভারত মনে করছেÑ সে পরাশক্তি হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা গায়ে-গতরে খেটে অর্জন করার জিনিস। বড় ভাই পিঠে হাত রাখলেই এটা অর্জিত হয়ে যায় না, যাবে না। অতএব ভারতের একেবারে পড়শির ওপর চীনের লংটার্ম কোনো অর্থনৈতিক প্রভাব যদি এসে হাজিরও হয়, তবে এ নিয়ে নাকিকান্নার সুযোগ নেই, কারণ এটা বেআইনি বা অবৈধ নয়। আর চীনের এই প্রভাব ছুটানোর জন্য ভারতের একটাই করণীয়, চীনের চেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করে ফিরে আসতে পারা। কিন্তু পড়শি দেশের রাজনীতিতে, নির্বাচনে হাত ঢুকিয়েও এই পাল্টা প্রভাব অর্জন করা যায় না। এমন শর্টকাটে কিছুই অর্জন হয় না, বরং এই কূটকৌশল পুরোটাই ভারতের বিরুদ্ধে যেতে বাধ্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

goutamdas1958@hotmail.com