চীন-ইরান কৌশলগত সম্পর্কের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব

২৫ বছরের জন্য কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে ইরান আর চীন। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে এই অংশীদারিত্বের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সামরিক সহযোগিতা এবং সম্ভবত চীনা সামরিক ঘাঁটি থাকবে।

চীন ও ইরান চুপচাপ একটি ব্যাপক সামরিক ও বাণিজ্য অংশীদারিত্বের খসড়া করেছে বলে বলা হচ্ছে। এই চুক্তি আগামী ২৫ বছরের মধ্যে ইরানের জ্বালানি ও অবকাঠামোর মতো মূল খাতগুলোতে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগের পথ তৈরি করবে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই চুক্তি ইরানের চীনা সামরিক ঘাঁটিগুলোর জন্যও এ অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। চুক্তির খসড়ার যে ১৮ পাতা ফাঁস হয়েছে, সেটার তথ্যানুযায়ী তেহরান আর বেইজিংয়ের কর্মকর্তারা এই চুক্তির খসড়াটি চূড়ান্ত করেছেন। এর আওতায় সহযোগিতার মধ্যে থাকবে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ, উৎপাদন, জ্বালানি ও পরিবহন সুবিধাগুলোর উন্নয়ন, বন্দর, শোধনাগার এবং অন্যান্য স্থাপনার আধুনিকীকরণ। এ সময়টাতে চীনে তেল আর গ্যাসও সরবরাহ করবে ইরান।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, চীন ও ইরানের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত বন্ধন দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ায় একটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের ভূ-রাজনৈতিক খেলার ওপরও এর বড় আকারের প্রভাব পড়তে পারে। মূলত ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে তেহরানে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরের সময় হওয়া চুক্তির ভিত্তিতে চীন ও ইরান ২৫ বছর মেয়াদি এই ব্যাপকভিত্তিক অংশীদারিত্বে আবদ্ধ হতে যাচ্ছে। ওই সফরের পর ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন যে, দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে এবং আগামী ১০ বছরের মধ্যে তাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ৬০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাবে।

ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জারিফের ২০১৯ সালে চীন সফরের সময় চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং লি ২০১৬ সালের চুক্তির আলোকে ২৫ বছর মেয়াদি চীন-ইরান কৌশলগত অংশীদারিত্ব রূপরেখা উপস্থাপন করেন বলেও সম্প্রতি ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট শি তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আলোকেই ইরান-চীন কৌশলগত এ অংশীদারিত্ব চুক্তি করতে যাচ্ছেন।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইরানের পরিবহন অবকাঠামো আধুনিকায়নের জন্য চীন ১২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। এর শুরু হবে তেহরানকে চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের উরুমকির সাথে সংযুক্তকারী ২,৩০০ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের মাধ্যমে। এই রাস্তা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের (সিপিইসি) সাথে যুক্ত হবে। সিপিইসি আবার নতুন সিল্ক রোডের অংশ। এটি কাজাখস্তান, কিরঘিজস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান এবং সেখান থেকে তুরস্ক ও চূড়ান্ত পর্যায়ে ইউরোপকে যুক্ত করবে।

চীনা বিনিয়োগে তেহরানকে মোশাদের সাথে যুক্তকারী রেললাইন আধুনিকায়নের একটি প্রকল্পও রয়েছে। এ ছাড়া তেহরান-কোম-ইসফাহান দ্রুতগতির রেললাইন নির্মাণের একটি প্রকল্পও আছে। এ রেললাইনটি তাবরিজ পর্যন্ত সম্প্রসারণের কথা রয়েছে। এখানে তেল, গ্যাস ও পেট্রোক্যামিকেলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে।

ইরানের পেট্রোক্যামিক্যাল, তেল ও গ্যাস শিল্পেও বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে এই চুক্তিতে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে এসব শিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানে নিজের প্রকল্পগুলো সুরক্ষিত রাখতে পাঁচ হাজার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীন। চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন অবরোধ উপেক্ষা করেই ইরান থেকে তেল আমদানি বাড়াবে চীন।

কৌশলগত অংশীদারিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা। এর মধ্যে রয়েছে অস্ত্র উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্যবিনিময়। চীনকে নিজের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতেও দেবে ইরান।

দুশ্চিন্তার ভাঁজ ভারতে
ইরান-চীন কৌশলগত চুক্তি ভারতের জন্য এক মহা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চুক্তির খসড়া ফাঁসের পরপরই ভারতীয় পত্রিকা দি হিন্দুতে চাবাহার বন্দর সংযোগ নির্মাণের একটি ভারতীয় বিনিয়োগ প্রস্তাব ইরান বাতিল ঘোষণা করেছে বলে খবর প্রকাশ হয়েছে। ইরানের চাবাহার বন্দর থেকে আফগানিস্তান সীমান্তের নিকটবর্তী জাহেদান পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের জন্য ভারত আর ইরানের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছিল, সেখান থেকে ভারতকে বাদ দিয়েছে ইরান। প্রকল্প শুরুর জন্য অর্থায়নে ভারতের বিলম্বের বিষয়টি উল্লেখ করে ইরান সরকার বলেছে যে, তারা নিজেরাই এটির নির্মাণকাজ করবে।
মূলত চীনের সাথে ২৫ বছর মেয়াদি ৪০০ বিলিয়ন ডলারের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি চূড়ান্ত করার পর এ সিদ্ধান্ত নিলো ইরান। চীনের সাথে এ চুক্তিটি সেখানে ভারতের পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তায় ফেলতে পারে। ইরানিয়ান রেলওয়েজ এবং ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ইন্ডিয়ান রেলওয়েজ কনস্ট্রাকশান লিমিটেডের মধ্যে যে রেলওয়ে প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, সেটি ছিল ভারত, ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির ব্যাপারে দেয়া ভারতের প্রতিশ্রুতি। আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সাথে বিকল্প বাণিজ্য রুট গড়ে তোলার জন্যই এই রেলওয়ের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল।

২০১৬ সালের মে মাসে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তেহরান সফরকালে ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এবং আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির সাথে চাবাহার চুক্তি করেন। সে সময় ইরানের রেল মন্ত্রণালয়ের সাথে ভারতের আইআরসিওএনের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ভারত, ইরান আর আফগানিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুসারে ট্রানজিট আর পরিবহন করিডোরের অংশ হিসেবে চাবাহার-জাহেদান রেলওয়ে নির্মাণের কথা। এ প্রকল্পের জন্য সব ধরনের সেবা, পরিকাঠামোর কাজ এবং প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য ১.৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ভারতের আইআরসিওএন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করলে দিল্লি এ ব্যাপারে বেশ খানিকটা পিছিয়ে যায়। তেহরান মনে করে যে ভারত কৌশলগতভাবে ইরানের বিপরীত পক্ষের সাথে সমীকরণের মিলিত হচ্ছে।

ইরান থেকে ভারত এলএনজি আমদানি করার ব্যাপারে তেমন আগ্রহী না হওয়ার প্রেক্ষাপটে গত সেপ্টেম্বরে ভারতে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত প্রকাশ্যেই বলেন যে তার দেশ চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) দিয়ে চীনে এলএনজি পাইপলাইন বসানো নিয়ে আলোচনা করছে। এটি কার্যত ইরানের সিপিইসি-সমান্তরাল পাইপলাইন পরিকল্পনা ভারতের একই ধরনের পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দেবে এবং সেইসাথে সিপিইসিতে ইরানের স্বার্থ আঞ্চলিক একীভূত জোরদার করবে।

এ ছাড়া ইরানি নেতৃত্ব আরো হতাশ হয় গত ডিসেম্বরে ইসরাইলি একটি পরিকল্পনা প্রকাশের পর। তাতে ইসরাইল ও ইরানের কয়েকটি মধ্যপ্রাচ্য প্রতিপক্ষের সাথে ট্রান্স-অ্যারাবিয়ান করিডোরের কথা ছিল। এই পরিকল্পনা হাতে পাওয়ার পর ভারতের আর নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর বা আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার চাবাহার করিডোরের পূর্ব শাখার ব্যাপারে আগ্রহ বহাল থাকেনি। ট্রান্স-অ্যারাবিয়ান করিডোরের মাধ্যমে ইউরোপের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে ভারত বেশি গুরুত্ব দেয়। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন মানে আন্তর্জাতিকভাবে ইরানের ক্রমবর্ধমান হারে একঘরে হয়ে যাওয়া।

বিষয়টি ধরতে পেরে রাশিয়াও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ হতে থাকে। তারা এখন যুদ্ধপরবর্তী আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে রুশ-পাক করিডোরের কথা চিন্তা করছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী পাকিস্তান হবে রাশিয়ার গ্রেটার ইউরেশিয়ান পার্টনারশিপের অংশ।

মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধের পর থেকে ইরানের সাথে ভারতের সম্পর্ক বেশ শীতল হয়ে পড়েছে। আর ভারত-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত গভীর সম্পর্ক দিল্লির সাথে তেহরানের সম্পর্কের কফিনে শেষ পেরেকটি মেরে দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে ইরানের সাথে ভারতের সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা এক প্রকার শেষ হয়ে যাচ্ছে।

আর চাবাহারের ঘটনাটিতে যে বার্তা পাওয়া যায় তা হলো ইরানের কৌশলগত অবস্থান ভারতের প্রতিকূলে চলে যেতে পারে। ইরানের চাবাহার বন্দর ভবিষ্যতে ভারত কতটুকু ব্যবহার করতে পারবে, তা নিয়েও সংশয়ের সৃষ্টি হবে। তা ছাড়া চীনের সমর্থন পাকিস্তান-ইরান-তালেবান জোট ভারতের জন্য আরো উদ্বেগের কারণ হবে। ইরানে চীনের অবস্থান বাড়লে তা কেবল তেহরানের সাথে দিল্লির সম্পর্কের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে না, সেই সাথে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর ওপরও তা অনুভূত হবে।

যুক্তরাষ্ট্র্র ছাড়াও ইসরাইল আর সৌদি আরবের সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রভাবও পড়ছে দিল্লি-তেহরান সম্পর্কের ওপর। ইসরাইলের সাথে ভারতের ব্যাপকভিত্তিক কৌশলগত সম্পর্ক সৃষ্টির পর এমন অভিযোগও উঠেছে যে ভারতের মিশন ও স্থাপনা থেকে তেল আবিবের পক্ষে গোয়েন্দাবৃত্তি হয়েছে। এর আগে বেলুচিস্তান ও করাচিতে অন্তর্ঘাতী তৎপরতা চালানোর জন্য কুলভূষণ যাদব নামে এক ভারতীয় সেনাকর্মকর্তার বিচার করা হয়েছে। চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক হওয়ার পর ইরানের মাটিকে কোনোভাবেই পাকিস্তানবিরোধী তৎপরতায় ব্যবহার হতে দেবে না তেহরান। এসব কারণে ভারতীয় কূটনৈতিক তৎপরতায় গোয়েন্দাবৃত্তির মতো কোনো কিছু না ঘটার ব্যাপারে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরানকে চীনমুখী করেছে আমেরিকা?

২০১৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৫ সালের ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসেছেন, যা দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে সরে আসার সাথে সাথে ইরানের ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যাতে অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখন তেহরানের হতাশা দেশটিকে চীনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

ইরান ও চীন উভয়ই এ চুক্তিটিকে তাদের নিজস্ব স্বার্থকে সম্প্রসারণের চেয়েও আমেরিকার মোকাবেলায় কৌশলগত অংশীদারিত্ব হিসেবে দেখছে। বেইজিংয়ের চীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আলি গলিজাদেহ বলেছেন, এটি ইরানের পক্ষে সর্বপ্রথম মিত্র হিসেবে একটি বিশ্বশক্তিকে পাওয়ার জন্য আগ্রহের সুনির্দিষ্ট প্রকাশ। এত দিন অবধি ইরান বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য ইউরোপীয় সহযোগিতা চাইত। এখন তেহরান ইউরোপের ব্যাপারে ক্রমেই হতাশ হয়ে উঠেছে বলে জানা যাচ্ছে।

পাত্তা দেয়া হচ্ছে না মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে?
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র বলেছেন যে, আমেরিকা ইরানকে সহায়তা করে এমন চীনা সংস্থাগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করবে। এর পরও ইরানের সাথে চুক্তির খসড়া হওয়ার অর্থ হলো চীন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে অস্বীকার করার মতো অবস্থানকে অনিবার্য বলেই ধরে নিয়েছে এবং মনে করছে আমেরিকান ব্যবস্থা প্রতিরোধ করার পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে দেশটি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, কয়েক দশক ধরে মার্কিন বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা বিধানে আধিপত্য বিস্তার করেছে। তবে এ চুক্তিটি এখন চীনকে এ অঞ্চলে একটি পা রাখার ব্যবস্থা করতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, চীন যখন বিভিন্ন দেশে কৌশলগত বন্দর উন্নয়ন করে তখন সম্ভাবনা থাকে যে এটি তারা একপর্যায়ে সামরিকীকরণ করতে পারে।

প্রস্তাবিত খসড়ায় চীন ইরানে বেশ কয়েকটি বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে, যার মধ্যে একটি হলো হরমুজ উপসাগরের ঠিক বাইরে পার্ক উপসাগরের প্রবেশপথ জাস্কে। বিশ্বজুড়ে ৯টি মূল মেরিটাইম চোকপয়েন্টগুলোর মধ্যে হরমুজ উপসাগর রয়েছে। এসব চোকপয়েন্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যা অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, বিশ্বজুড়ে মার্কিন কৌশলগত আধিপত্যের এক একটি চিহ্ন।

এখন জাস্কের একটি চীনা বন্দর চীনাদেরকে পানিতে একটি কৌশলগত সুবিধা সৃষ্টি করে দেবে। এই এলাকা দিয়ে বিশ্বের বেশির ভাগ তেল পরিবহন হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ উন্নয়নটিকে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত বিবেচনার সাথে নেয়ার কথা। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার পঞ্চম নৌবহরটি এর অদূরে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাহরাইনে অবস্থিত।

মধ্য প্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি
ইরানের সাথে চীনের এই কৌশলগত সমঝোতার আরেকটি দিক হলো বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগতভাবে আরো সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রধান শক্তি সৌদি আরব ও ইসরাইলের সাথে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও দেশ দু’টির কৌশলগত সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রের সাথে। অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক স্বার্থে বেইজিং এ অঞ্চলে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করলে মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের কৌশলগত সহযোগী হবে ইরান ও তার মিত্ররা।

চীনা ও ভারতীয় জ্বালানি বাজারগুলো সবসময় সৌদি আরবের আগ্রহের বিষয় ছিল। এই বাজারগুলোতে আরো সক্রিয় হওয়ার জন্য রিয়াদ জ্বালানি অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করেছে এবং উভয় দেশকে একটি বিশেষ ছাড় দিয়েছে। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ২০১৯ সালে চীন সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি চুক্তি সই হয়েছিল। চুক্তির আওতায় আরামকো এবং চাইনিজ নরিনকো উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় চীনা শহর পাঞ্জিনে একটি শোধনাগার এবং একটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করে। এ ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতাগুলো চীন-ইরান কৌশলগত চুক্তি হলে কতটা আগাবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

এত দিন মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে আমেরিকার বিপরীতে কৌশলগতভাবে সক্রিয় ছিল রাশিয়া। বৈশ্বিক ফোরামে করোনা ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে চীনবিরোধী প্রচারণা ও উদ্যোগ দিন দিন বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র্র। ইরানের সাথে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষরের পর এই প্রয়াস আরো জোরালো হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও এক ধরনের মেরুকরণ সৃষ্টি হবে।

অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা ও ট্রান্স এশিয়ান অঞ্চল
চীনে সরকারের যেকোনো উদ্যোগের অভ্যন্তরীণ সমালোচনার সুযোগ নেই। কিন্তু ইরানের অবস্থা ভিন্ন। চীনের সাথে এই অংশীদারিত্ব চুক্তির বিরুদ্ধেও সমালোচনা আছে। সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বলেছেন, ইরানি জাতি এই ২৫ বছর মেয়াদি কৌশলগত চুক্তি মানবে না। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জাতিকে না জানিয়ে কোনো গোপন চুক্তি করা হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। অবশ্য ইরানের সরকার ঘোষণা করেছে চুক্তিটি সংসদে উপস্থাপন করা হবে। দেশটির ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করলে অবশ্য শেষ পর্যন্ত এর বাস্তবায়ন নিয়ে বড় কোনো সমস্যা হবে না। আর সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলি খামেনির অনুমোদনক্রমেই সরকার এ নিয়ে অগ্রসর হয়েছে বলে মনে হয়।

ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের আগে চীন ছিল ইরানের প্রধান তেল গ্রাহক, প্রতিদিন এক মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল কিনছিল বেইজিং। চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির জ্বালানির জন্য নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে শক্তি সংগ্রহ করা এবং জ্বালানি সম্পদের বৈচিত্র্যকরণ বেইজিংয়ের জাতীয় জ্বালানি নীতিটির মূল বিষয়। নতুন কৌশলগত চুক্তি এটি বেশ খানিকটা নিশ্চিত করবে। একই সাথে চীন-রাশিয়ার প্রভাবাধীন ট্রান্স এশিয়ান অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্য বাস্তবায়নেও তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হতে পারে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রে করিবকোর ধারণা, ‘চীন-ইরান নতুন সম্পর্কের পর ইউএস-ইন্ডিয়ান রিমল্যান্ডের সমান্তরাল গতিতে ইউরেশিয়ান পশ্চাৎভূমিতে চীন, পাকিস্তান ও রাশিয়াকে নিয়ে নতুন মাল্টিপোলার ট্রাইলেটারাল আত্মপ্রকাশ করবে। সিরিয়ায় আইআরজিসি ও হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইলি মিত্রের নিয়মিত বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও চীনের দিকে ইরানের ঝুঁকে পড়াটা এই চার দেশ ও তুরস্ককে নিয়ে ‘গোল্ডেন রিং’ সৃষ্টির রুশ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নেই সহায়ক হবে।’

বলার অপেক্ষা রাখে যে, চীন-ইরান কৌশলগত সম্পর্কের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে এটি হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যার প্রভাব এই অঞ্চলের জন্য হবে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।

You Might Also Like