চাকরি পেতে ছাত্রলীগে নাম লেখান!

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, সেদিনই তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ঢাকায় ছাত্রলীগের ভূমিকায় দারুণ স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। ভার্সিটি এক্সপ্রেস বা ভিএক্স গ্রুপ ও ক্যাম্পাস গ্রুপ নামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের বিরোধ বেশ পুরোনো। এর মধ্যে উপাচার্য প্রথম গ্রুপকে প্রশ্রয় দিয়ে দ্বিতীয় গ্রুপকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৩ সালের নভেম্বরে ভিএক্স গ্রুপের কর্মী রুবেল লাঞ্ছিত হন ক্যাম্পাস গ্রুপের হাতে। গত ৫ এপ্রিল ভিএক্স গ্রুপ তার জবাব দেয় প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির হায়দারকে লাঞ্ছিত করে। এ নিয়ে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা মহিউদ্দিন চৌধুরী ও উপাচার্য আনোয়ারুল আজিম পরস্পরকে দোষারোপ করছেন। আরও কিছুদিন গেলে হয়তো একে অপরকে স্বাধীনতাবিরোধী বলে গালাগাল দিতে শুরু করবেন। কেননা এটাই এখন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মোক্ষম অস্ত্র।

প্রধানমন্ত্রী গত বুধবার চট্টগ্রাম সফরকালে আওয়ামী লীগের নেতাদের ডেকে বিরোধ মেটানোর নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি ছাত্রলীগের কেউ যদি শৃঙ্খলা না মানেন এবং অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়েন, সংগঠন থেকে তাঁদের বের করে দেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি এ-ও জানিয়ে দিয়েছেন যে ছাত্রলীগে যাঁরা শৃঙ্খলা মানবেন না, তাঁদের দরকার নেই।

এর সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হোসেন তৌফিক ইমাম (যিনি এইচ টি ইমাম নামে সমধিক পরিচিত) বক্তব্যটি পাশাপাশি রাখলে বিস্তর ফারাক লক্ষ করা যায়। প্রধানমন্ত্রী যেখানে ছাত্রলীগের শৃঙ্খলা না মানা নেতা-কর্মীদের দল থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেন, সেখানে তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ছাত্রলীগের শৃঙ্খলায় গর্ববোধ করেন। কী আশ্চর্য বৈপরীত্য! জনগণ ও দলের নেতা-কর্মীরা কার কথায় আস্থা রাখবেন?

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার কথা ঠিক হলে ছাত্রলীগে কোনো সমস্যা নেই। সবকিছু সুশৃঙ্খলভাবে চলছে। গণমাধ্যম ও ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচারকারীদের সম্পর্কে তিনি সজাগ থাকতে বলেছেন। এ প্রসঙ্গে মাননীয় উপদেষ্টাকে জিজ্ঞেস করি, সবই যদি অপপ্রচার হবে, তাহলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনের পর দিন ছাত্রলীগের মধ্যে মারামারি-ধাওয়াধাওয়ি লেগে আছে কেন? কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সব অঘটনের মূলে ছাত্রলীগের নাম আসে? কেনই দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হাতে নিগৃহীত হন?
এখানেই থেমে থাকেননি এইচ টি ইমাম। রাষ্ট্রীয় সব আইন ও রীতি-নীতি ভূলুণ্ঠিত করে তিনি চাকরিপ্রার্থী ছাত্রলীগের কর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘তোমরা লিখিত পরীক্ষায় পাস করে আসো, তারপর আমরা দেখব।’ অর্থাৎ ছাত্রলীগের কর্মী হলে নাকি তাঁদের মৌখিক পরীক্ষা বা ভাইভা নেওয়ারই প্রয়োজন হবে না। সে বিষয়টি পিএসসির পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা দেখবেন। পিএসসি বা পাবলিক সার্ভিস কমিশন চলে নির্দিষ্ট আইন ও বিধি দ্বারা। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হলেই কেউ তা পাল্টে দিতে পারেন না। যাঁরা ছাত্রলীগ করেন, তাঁদের জন্য এক বিধান, আর যাঁরা করেন না, তাঁদের জন্য আরেক বিধান—পিএসসির আইনে নিশ্চয়ই এমনটি লেখা নেই।

তবে দুর্মুখেরা বলেছেন, এইচ টি ইমামের এই বক্তব্যে খুব উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। কেননা, ছাত্রলীগের সোনার ছেলেরা পাঠ্যবইবহির্ভূত বিষয়ে (ক্যাম্পাসে মারামারি, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি) এতটাই ব্যস্ত যে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার কর্মীর সংখ্যাও সেখানে বেশি নেই। উপদেষ্টার এই বক্তব্যের পর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা লিখিত পরীক্ষা দেওয়াটাকেও তঁাদের প্রতি অন্যায় মনে করতে পারেন। যে আওয়ামী লীগের জন্য, নেতা-মন্ত্রীদের জন্য তাঁরা এত কিছু করেছেন, সেই আওয়ামী লীগের আমলে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি নিতে হবে কেন? তাঁরা দেশপ্রেমের পরীক্ষায় যেহেতু উত্তীর্ণ, সেহেতু তাঁদের অন্য কোনো পরীক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। পিএসসি এসএসবি ইত্যাদি সবই অন্যদের জন্য।

তবে এইচ টি ইমাম সবচেয়ে ভয়ংকর যে কথাটি বলেছেন তা হলো, ‘নির্বাচনের সময়, বাংলাদেশ পুলিশে, প্রশাসনে যে ভূমিকা, নির্বাচনের সময়ে আমি তো প্রতিটি উপজেলায় কথা বলেছি। সব জায়গায় আমাদের যারা রিক্রুটেড, তাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের দিয়ে মোবাইল কোর্ট করিয়ে আমরা নির্বাচন করেছি। তারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তারা বুক পেতে দিয়েছে। আমাদের যে ১৯ জন পুলিশ ভাই প্রাণ দিয়েছে, এই জামায়াত-শিবিরের আক্রমণে, কী নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তোমাদের মনে আছে? এরা কারা? সব আমাদের মানুষ।’ (প্রথম আলো, ১৩ নভেম্বর ২০১৪)

এর মাধ্যমে তিনি এত দিন বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দল প্রশাসন দলীয়করণের যেসব অভিযোগ করেছিল, সেটাই সর্বাংশে সত্য প্রমাণ করলেন। তিনি এ-ও বলেছেন, ‘নির্বাচনের আগে যেটা সহ্য করেছি, নির্বাচনের পরে সেটা সহ্য করব না। এ কাজে একটা বড় শক্তি আমাদের সহযোগী সংগঠনগুলো, যার একটি আমাদের ছাত্রলীগ। মিডিয়া অনেক সমালোচনা করেছে, অনেক কিছু দেখাচ্ছে, সেগুলো নিয়ে অত মাথা ঘামাই না। আমরা কর্মসংস্থান ব্যাংক করে দিয়েছি। যাদের চাকরির বয়স নেই; তোমরা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলো। সব আছে। আমরা আগেও তোমাদের সঙ্গে ছিলাম, এখনো আছি, ভবিষ্যতেও থাকব।’

সেই সঙ্গে তিনি যদি বেসিক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, শেয়ারবাজার থেকে কারা কোটি কোটি টাকা লুট করে নিয়েছেন, তাঁদের নাম বলতেন, তাহলে ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা জনপ্রশাসন সম্পর্কে একটি ধারণা পেতেন। উপদেষ্টা মহোদয় ছাত্রলীগের কর্মীদের কোচিং করানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন; এটি যার প্রথম পাঠ হতে পারত। তিনি কোন ছাত্রলীগের সঙ্গে থাকবেন, সেটি খোলাসা করেননি। কিন্তু আমরা ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের কর্মীদের দেখি একজন খ্যাতিমান আলোকচিত্রীকে লাঞ্ছিত করে হাসপাতালে পাঠাতে। ছাত্রলীগকে দেখি আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হতে।
এইচ টি ইমাম আগে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা। আমরা জানি না তাঁর উপদেশের কারণে, নাকি অন্য কোনো কারণে, দেশের জনপ্রশাসন এভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। জনপ্রশাসনের কোথাও এখন শৃঙ্খলা নেই, নীতি–নৈতিকতা নেই। এখন তিনি রাজনৈতিক উপদেষ্টা হয়েছেন। আর সেই উপদেশের বহর যেভাবে ছাত্রলীগ থেকে শুরু হয়েছে, তাতে শঙ্কিত না হয়ে পারি না। দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোয় এখন ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য কোনো সংগঠনের অস্তিত্ব নেই, তৎপরতা নেই। ছাত্রলীগের কর্মীরা নিজেরা মারামারি করেছেন, জুবায়ের ও সায়াদের মতো ছাত্রলীগের বহু কর্মীর রক্তে হাত রাঙিয়েছেন, কথায় কথায় শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করতেও দ্বিধা করেননি।

উপদেষ্টা মহোদয় সেই মারামারির জন্য বিসিএস কোর্সে একটি পেপার সংযুক্ত করলে ভাইভায় বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। কেননা, ওই বিষয়ে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য কোনো সংগঠনের কর্মীরা পাস মার্কও পাবেন না।

পরদিন গণভবনে ছাত্রলীগের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ছাত্রলীগের কর্মীদের সম্পর্কে যাঁরা অপপ্রচার চালাবেন, তাঁদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। এটি দ্ব্যর্থক। তিনি কি বলতে চেয়েছেন, ছাত্রলীগের নামে এসব করা যাবে না কিংবা ছাত্রলীগ যা-ই করুক না কেন, তাদের সম্পর্কে কিছু বলা যাবে না? প্রথমটি হলে ছাত্রলীগকে সামলানোর একটি চেষ্টা আছে বলে ধরে নিতে পারি; কিন্তু দ্বিতীয়টি হলে বিপদের কারণ আছে বৈকি।
ছাত্রলীগ যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলা চালায়, ক্যাম্পাসে আসা প্রাক্তন ছাত্রী ও ছাত্রের ওপর হামলে পড়ে, তখন যদি কেউ প্রতিবাদ করে, সেটি কি ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার হবে? কোন ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে, এক্সপ্রেস গ্রুপ, না ক্যাম্পাস গ্রুপ? ছাত্রলীগ নিজের কর্ম ও কথা, আচরণ ও ভঙ্গি দিয়ে যে ভাবমূর্তি তৈরি করেছে, সে জন্য বাইরের কোনো ব্যক্তির আর অপপ্রচারের প্রয়োজন হবে না; এই তাণ্ডব চলতে থাকলে ছাত্রলীগই ফ্রাংকেনস্টাইন হয়ে দাঁড়াবে।

আবার এইচ টি ইমামের কথায় ফিরে আসি। তিনি ছাত্রলীগের কর্মীদের লিখিত পরীক্ষায় পাস করে আসতে বলেছেন। মৌখিক পরীক্ষার বিষয়টি তাঁরা দেখবেন। এখন যদি বিসিএস বা যেকোনো চাকরিপ্রার্থী ছাত্রলীগে নাম লিখিয়ে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন; তিনি কী করবেন? সে ক্ষেত্রে কি লিখিত ও মৌখিক দুটো পরীক্ষাই বাদ দিয়ে সবাইকে উত্তীর্ণ ঘোষণা করবেন?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
( প্রথম আলো )

You Might Also Like