ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আড়াই হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি

ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদক কার্যালয়ে সম্প্রতি এ অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই দুদকের এক উপ-পরিচালককে এ অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিশন সূত্র এ সব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, ঘোড়াশাল ৬ নম্বর ইউনিটে রি-পাওয়ারিং বা পুনরায় ক্ষমতায়নের নামে প্রায় দুই হাজার ৬০০ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, নতুন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, এর চেয়েও বেশি ব্যয়ে পুরনো কেন্দ্র সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যা লুটপাটের মহাপরিকল্পনা। ইতোমধ্যে ঘোড়াশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি কোম্পানিকে কার্যাদেশ দেওয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

ঘোড়াশাল ৬ নম্বর ইউনিট রি-পাওয়ারিংয়ের জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় দুই হাজার ৬০০ কোটি টাকা। যেখানে ভূমি অধিগ্রহণ ও কেন্দ্র নির্মাণ থেকে শুরু করে উৎপাদনে যাওয়া পর্যন্ত মেগাওয়াটপ্রতি ব্যয় হয় প্রায় ছয় কোটি টাকা। সেই হিসেবে ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্র স্থাপনে খরচ হয় ৬০০ কোটি টাকা ও ৫০০ মেগাওয়াটে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। ভূমি অধিগ্রহণ, উন্নয়ন, বেজমেন্ট নির্মাণ- এ সব খাতে কোনো ব্যয় না থাকার পরও ৪০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ঘোড়াশাল ৬ নম্বর ইউনিটের রি-পাওয়ারিং ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে দুই হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওই ইউনিটটি অত্যন্ত পুরনো। এর সনাতন প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি মেরামত কঠিন ও খুচরা যন্ত্রাংশ দুষ্প্রাপ্য। ফলে রি-পাওয়ারিং না করে সম্পূর্ণ নতুন কেন্দ্র স্থাপনে খরচ অনেক কম হওয়ার কথা। অন্যদিকে নতুন কেন্দ্রটির মেয়াদও অনেক বেশি হবে। তাই নতুন কেন্দ্র নির্মাণের ফলে দেশ দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সুবিধা পেত। কিন্তু পুরাতন কেন্দ্র রি-পাওয়ারিং করলে ওই সুবিধা পাওয়া যাবে না।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র আরও জানায়, ঘোড়াশাল ৬ নম্বর ইউনিট ছাড়া ঘোড়াশাল ইউনিট ৩ ও চট্টগ্রাম বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২টি ইউনিটও একইভাবে রি-পাওয়ারিং এর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। যার মধ্যে ঘোড়াশাল ৩ নম্বর ইউনিটে রি-পাওয়ারিং এর মাধ্যমে ক্ষমতা বাড়ান হবে ২২০ মেগাওয়াট। আর এর পেছনে সুদাসলে খরচ হবে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি।

২০১২ সালে ইপিসি কনট্রাক্টের মাধ্যমে ঘোড়াশাল ৬ নম্বর ইউনিটের কাজ সম্পন্ন করার শর্তে দরপত্র আহ্বান করা হয়। তখন একটিমাত্র দরপত্র জমা পড়ায় সেটি অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। ২০১৩ সালের ১৮ ফেব্র“য়ারি ফের দরপত্র আহ্বান করার মাধ্যমে কনসোর্টিয়াম অব অ্যালোসথাম (সুইজারল্যান্ড) লিমিটেড ও সিএমসি চায়নাকে কাজ দেওয়া হয়। দরপত্রে এমন সব শর্ত রাখা হয়েছিল যে, এই বিশেষ দুটি কোম্পানি ছাড়া অন্য কেউ অংশ নিতে পারেনি।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, একশ’ মেগাওয়াটের একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করতে হলে জমি ক্রয়, সঞ্চালন লাইন স্থাপন করার পরও সর্বোচ্চ ৬০০ কোটি টাকা খরচ হবে। ঘোড়াশালের কেন্দ্রে এ সব কিছুই আছে। সে ক্ষেত্রে ১০০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র নির্মাণে সর্বোচ্চ ৪০০ কোটি টাকা খরচ হওয়ার কথা। সেখানে ২২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হওয়াটা এক কথায় লুটপাটের আয়োজন বলে ওই সূত্র জানায়।

You Might Also Like