হোম » গোলটেবিলে বিশিষ্টজনরা : আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা বিপজ্জনক প্রবণতা

গোলটেবিলে বিশিষ্টজনরা : আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা বিপজ্জনক প্রবণতা

admin- Thursday, August 10th, 2017

বুধবার ৯ জুলাই রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে নাগরিক ঐক্য আয়োজিত ‘সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ প্রদত্ত রায়’-এর ওপর এক গোলটেবিল আলোচনায় বিশিষ্টজনরা অভিমত ব্যাক্ত করেন যে, বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির চেষ্টা একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। এর পরিণতি কী ভয়াবহ হতে পারে, তা কল্পনাও করা যায় না।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া রায় মাঠে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। এটা খুবই বিপজ্জনক প্রবণতা। বিচার বিভাগ সামগ্রিকভাবে সরকারের বিরুদ্ধে কোনো রায় দেননি। এই ঐতিহাসিক রায়ের জন্য রাজনৈতিক, সামাজিক সব ধরনের সংগঠন ও সাধারণ মানুষের উচিত বিচার বিভাগকে ধন্যবাদ দেওয়া। তাদের পক্ষে দাঁড়ানো উচিত। পক্ষ মানে দলবাজি করা নয়।

আলোচনা সভায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষণা আমি দিয়ে শুরু হয়নি, আমরা দিয়ে। এটা আমাদের দেশ। এটা আমির দেশ নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘…পাকিস্তানের ১৯৬২ সালের সংবিধান আমি দিয়ে শুরু হয়েছিল। এই যে আমরা আর আমিত্বের পার্থক্য, আইয়ুব খান আর মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে যে পার্থক্য—চিফ জাস্টিসের কথা পড়ে আমার মনে হয়েছে, আমরা বোধ হয় এই পার্থক্য ভুলে গেছি। আমরা আইয়ুব খানের জমানায় ফিরে যাচ্ছি।’

এই আইনজীবী বলেন, ‘যতই দলীয় নিয়োগের কথা বলা হোক না কেন, ওখানের পরিবেশটাই ন্যায়বিচারের জন্য উদ্বুদ্ধ হতে বাধ্য করে। আপিল বিভাগের সাতজন বিচারপতির সবাই আওয়ামী লীগের আমলে নিয়োগ পাওয়া। এই সাতজনই কিন্তু রায়ে একমত হয়েছেন। বিচার বিভাগের যে এখনো স্বাধীনতা আছে, স্বাধীনভাবে রায় দেওয়ার দৃঢ় মনোভাব আছে, তা উচ্চভাবে প্রমাণিত হলো। ৭০ অনুচ্ছেদের ভবিষ্যৎ আমার কাছে উজ্জ্বল ঠেকছে না। হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ মানতে বাধ্য। এখন দেখা যাক কী হয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, মন্ত্রীদের কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে, তাঁরা তিনটি কথা বলতে চান। একটি হচ্ছে, আদালতের এত সাহস কী করে হলো যে তাঁরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গড়া সংশোধনী বাতিল করে দিল। দ্বিতীয় বক্তব্য হচ্ছে, বিচারপতিদের তো আমরা নিয়োগ দিই, আমাদের ওপর কথা বলার এত সাহস তাঁরা কোথায় পান? তৃতীয় হচ্ছে, ১৯৭২ সালের সংবিধানের একটি বিধান আমরা ফিরিয়ে আনলাম সেটা কেন বাদ দিয়ে দিল, কীভাবে তাঁরা এটা করতে পারেন।

অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘আদালত এর আগে পাঁচটি সংশোধনী বাতিল করেছিলেন। তার মধ্যে তিনটি সংশোধনী আপনারা অত্যন্ত আনন্দিত চিত্তে গ্রহণ করেছিলেন। ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল হওয়ার পর কত খুশি হয়েছিলেন। কোনো ভোট হয়নি, কোনো নির্বাচন হয়নি। আপনারা নিজেদের কীভাবে জনপ্রতিনিধি ভাবেন?’

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, সরকারে যাঁরা আছেন, তাঁরা আদালত অবমাননার আওতায় পড়ে গেছেন। সংসদের বাইরে বিচার বিভাগকে হুমকি দেওয়া বিপজ্জনক। এটা কল্পনাই করা যায় না, এর পরিণতি কী ভয়াবহ হতে পারে। আইনের শাসন, সাংবিধানিক শাসন ও গণতান্ত্রিক শাসন কিছুই থাকবে না। এর সঙ্গে তিনি যুক্ত করেন, ‘কেবল সংসদ ইমেচিউরড (অপরিপক্ব) নয়, গভর্নমেন্টও ইমেচিউরড। সরকারের পক্ষ থেকে বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে বলতে পারে না। এমপি সাহেবরা আপনারা জনমত গড়ে তোলেন, এটা কীভাবে বলা যেতে পারে? ক্ষমতার দম্ভে মাথা খারাপ হয়ে গেলে এ রকম করে।’বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করা আদালতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে মন্তব্য তাঁর।

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিষয় তুলে ধরে রব বলেন, ‘বিচার বিভাগের সঙ্গে কথা বলেন। শান্তভাবে কথা বলেন। উত্তেজিত হবেন না। উত্তেজিত হলে পাকিস্তানে কী অবস্থা হয়েছে দেখেছেন? তারপরও পাকিস্তানি সরকার চুপ হয়ে আছে, কিছু বলেনি—রায় মেনে নিয়েছে।’ তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অত্যন্ত শান্ত মাথায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরামর্শ দেন।

গত ২৮ জুলাই পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট দেশটির প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করে রায় দেন। রায়ের কিছুক্ষণ পরই প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন নওয়াজ শরিফ। পানামা পেপারসে ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, নওয়াজ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছিল।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, জেএসডির সাধারণ সম্পাদক মালেকুজ্জামান, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক আহ্বায়ক এস এম আকরাম প্রমুখ বক্তব্য দেন।