হোম » গৃহকর্মী মৃত্যুর ঘটনায় উত্তাল বনশ্রী : গৃহকর্তাসহ আটক ২

গৃহকর্মী মৃত্যুর ঘটনায় উত্তাল বনশ্রী : গৃহকর্তাসহ আটক ২

admin- Friday, August 4th, 2017

রাজধানীর বনশ্রীতে লাইলী বেগম (৩০) নামের এক গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে শুক্রবার দুপুর থেকে দফায় দফায় হামলা-ভাংচুর ও ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এলাকাবাসী অভিযুক্ত গৃহকর্তার বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছিলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, টিয়ার শেল ছুড়েছে। রাত পৌনে ৮টার দিকে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলিও ছুড়েছে পুলিশ। এ সময় পুলিশের সঙ্গেও বিক্ষুব্ধদের সংঘর্ষ হয়।

লাইলী বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় গৃহকর্তা মুন্সি মঈনুদ্দিন ও বাড়ির কেয়ারটেকার মো. টিপুকে খিলগাঁও থানা পুলিশ আটক করেছে।

লাইলী বেগমের দুই সন্তান

জানা গেছে, মঈনুদ্দিনের বাসার গৃহকর্মী লাইলী বেগমকে শুক্রবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর অভিযোগ মঈনুদ্দিন লাইলী বেগমকে হত্যা করেছে। তবে গৃহকর্তা মঈনুদ্দিন দাবি করেছেন তিনি লাইলীকে হত্যা করেননি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লাইলী বেগমকে ‘হত্যার খবর’ ছড়িয়ে পড়লে শুক্রবার দুপুরে স্থানীয় নিম্নআয়ের লোকজন বনশ্রীর জি-ব্লকের চার নম্বর রোডে মঈনুদ্দিনের সাততলা বাড়িটির (১৪ নম্বর বাড়ি) সামনের রাস্তা অবরোধ করেন।

এরপর ওই বাড়িতে হামলা চালান। রাস্তায় যানবাহন ভাংচুর করেন। বাড়িওয়ালার একটি প্রাইভেটকারে তারা আগুন দেন। ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।

প্রত্যক্ষদর্শী রিকশাচালক সোহরাব হোসেন যুগান্তরকে বলেন, দুপুরে লাইলীর মৃত্যুর খবরে আশপাশের লোকজন ওই বাড়ির সামনে এসে জড়ো হন। এ সময় বাড়ির দারোয়ান সবাইকে সরে যেতে বলেন। একপর্যায়ে গেটে তালা দিয়ে দারোয়ান উপরে চলে যান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে লোকজন মুন্সি মঈনুদ্দিনের প্রাইভেটকারে আগুন লাগিয়ে দেন। পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে এলাকাবাসীর সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

প্রতিবেশী জুয়েল অভিযোগ করে বলেন, ‘মুন্সি মঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে কাজের বুয়া নির্যাতন ও বেতন না দেয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর আগেও আরও দু’গৃহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে তার বাসায়।’

লাইলী বেগমের জা নুরুন্নাহার জানান, সাত তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় মুন্সি মঈনুদ্দিনের বাসায় কাজ করতেন লাইলী বেগম। আর তৃতীয় তলায় তার মেয়ের বাসায় কাজ করি আমি। লাইলী প্রতি মাসে ৬ হাজার টাকা বেতনে কাজ করতেন। সকালে বাসায় ঢুকতেন আর রাতে ফিরতেন। কিন্তু বাড়িওয়ালা ঠিকমতো বেতন দিতেন না। তার ৫ মাসের বেতন পাওনা ছিল। শুক্রবার সকাল ৬টায় আমি কাজে যাই। সকাল ৮টার দিকে মুন্সি  মইনুদ্দিনের বাসায় যান লাইলী বেগম। আমার ধারণা, পাওনা টাকা চাওয়ায় মুন্সি মঈনুদ্দিন লাইলীকে মারধর করেন ও শ্বাসরোধে হত্যার পর আত্মহত্যার নাটক করেছেন।

নুরুন্নাহার আরও বলেন, সকাল সাড়ে ৮টায় হঠাৎ শুনি লাইলী বেগমের লাশ নামাচ্ছে গেটে। তারা প্রথমে তাকে স্থানীয় হাসপাতাল ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেছে। সেখানে ডাক্তার সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে বলেছেন আরও অনেক আগেই মারা গেছেন লাইলী বেগম।

অভিযুক্ত গৃহকর্তা মঈনুদ্দিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভ্যাট কর্মকর্তা পদে চাকরি করেন।

তিনি দাবি করেন, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টায়  লাইলী বেগম তার বাসায় কাজে আসেন। একটি রুমে ঢোকার পর তিনি আর বের হচ্ছিলেন না। ডাকাডাকি করেও তার কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। এ অবস্থায় বাড়ির ম্যানেজার টিপুকে ডাকেন। তিনি এসে রুমের দরজা ভাঙেন। এরপর দেখা যায় লাইলী গলায় ফাঁঁস দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আছেন। পরে তাকে নামিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

বাড়িওয়ালার এ ভাষ্য মানতে নারাজ লাইলী বেগমের ভাসুর শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, পাওনা টাকা নিয়ে ঝগড়া করে বাড়িওয়ালা লাইলীকে হত্যা করেছে। তিনি জানান, তাদের বাড়ি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়িয়া উপজেলার আজুয়াটালীতে। লাইলীর স্বামী নজরুল ইসলাম ৪ বছর আগে ভারতে কাজ শেষে ফেরার পথে ভারতীয় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। এরপর তার আর কোনো খোঁজখবর নেই। এরপর লাইলী এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাদের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসে। বনশ্রীর হিন্দুপাড়া বস্তিতে নুরুন্নাহারের বাসায় থাকতেন লাইলী। আর কাজ করতেন মুন্সি মঈনুদ্দিনের বাসায়।

লাইলী বেগমের খালা আয়শা আক্তার জানান, লাইলীর মেয়ের নাম মরিয়ম (৫) ও ছেলের নাম আতিকুল (৩)। তাদের ঘুমে রেখে শুক্রবার বাসা থেকে বের হয়েছিলেন লাইলী বেগম।

ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, গাড়িতে আগুন দেয়ার খবর পেয়ে তাদের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। কিন্তু উত্তেজিত জনতা ফায়ার সার্ভিসের গাড়িকেও বাধা দেয়। পরে আগুন নেভানো হয়। পুলিশ ওই বাড়ির সামনে থেকে জনতাকে সরানোর চেষ্টা করলেও দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ চলতে থাকে। একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ার শেলও ছোড়ে।

খিলগাঁও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এখনও ঝামেলা চলছে। আগের চেয়ে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। খবরের সূত্র: যুগান্তর।