গুম হওয়া স্বজনদের ফিরে পেতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন

আমার বাবাকে ফেরত চাই। আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন। অন্যদের মতো আমিও বাবার হাত ধরে হাঁটতে চাই। বাবার সাথে ঈদ করতে চাই। আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন। এরপর কেঁদে ফেলে শিশু লামিয়া আক্তার মীম। কান্নার দমকে আর কিছুই বলতে পারেনি মেয়েটি। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাবার সন্ধান চাইছে নিখোঁজ ড্রাইভার কাওসারের ছোট্ট মেয়েটি। নিখোঁজ সেলিম রেজা পিন্টুর বোন মুন্নি কাঁদছেন আর বলছেন, ৫ বছর ৬ মাস ধরে ভাইয়ের অপেক্ষায় দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি। এই বুঝি ভাই আমার এসে ডাক দিবে। কিন্তু অপেক্ষা যে আর ফুরায় না। আমার মা, আমার বাবা ছেলের পথ চেয়ে বসে আছেন। তারা খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তাদের ক বলে সান্ত্বনা দিবো ভাষা খুঁজে পাই না। কিভাবে যে আমাদের দিন কাটছে বলে বুঝাতে পারবো না। আমরা প্রতিদিন মরছি। আমার ভাইকে ফেরত দিন নয়তো আমাদেরও মেরে ফেলুন। এমন করে আর বাঁচতে চাই না।

শুধু বাবা হারানো ছোট্ট মীম আর ভাই হারানো বোন মুন্নিই নয়, স্বজন হারিয়ে নিজেদের দুঃসহ কষ্টের কথা তুলে ধরেন গত কয়েক বছরে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বেশ কয়েকজন স্বজন। স্বজন হারানো বেদনা, গুম হওয়ার পরের পরিস্থিতি, নিজেদের বদলে যাওয়া জীবনের কথা বলতে গিয়ে অঝোরে কেঁদেছেন তারা। কেউ সন্তান হারিয়ে, কেউবা স্বামী হারিয়ে, কেউ ভাই হারিয়ে স্বজন হারিয়েছে। আজ তাদের ফিরে পেতে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে নিখোঁজ হওয়া-গুম হওয়া স্বজনের ছবি বুকে নিয়ে। তাদের একটাই দাবি, ঈদের আগে তাদের স্বজনদের কাছে ফিরে পাওয়া।

শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আন্তর্জাতিক গুম সপ্তাহ উপলক্ষে মায়ের ডাক-এর উদ্যোগে ঈদুল ফিতরের আগে গুম পরিবারের সদস্যদের মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে এ দাবি জানান তারা। এ সময় নিখোঁজ ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের ব্যাপারে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানান মানবাধিকার কর্মীরা।

মায়ের ডাকের সমন্বয়ক ও গুম হওয়া সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন আফরোজা ইসলাম আখির সভাপতিত্বে এবং জাতীয় মানবাধিকার সমিতির চেয়ারম্যান মঞ্জুর হোসেন ইসার সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিচালক নাসির উদ্দিন এলান, মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন, গণস্বস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রমুখ। গুম হওয়া পরিবারের মধ্যে বক্তব্য দেন নিখোঁজ সাজেদুল ইসলাম সুমনের বড় বোন মারুফা ইসলাম ফেরদৌসি, বংশালের নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা পারভেজ হোসেনের মেয়ে আদিবা ইসলাম প্রমুখ।

অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে যারা গুম হয়েছে তাদের খুঁজে বের করা। তাদের ফেরত নিয়ে আসা। যারা এই জঘন্য কাজটি করছেন, তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা। কিন্তু আমরা যখন দেখি দিনের পর দিন, বছরের পর বছর রাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না, এমনকি মামলা করতে গেলে মামলা নিতে চায় না, তদন্ত করে না। বিচার কার্য ঝুলিয়ে রাখে। অভিযোগ পত্র দেয় না। উল্টো যারা ভুক্তভোগী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। তখন অবশ্য আমাদের সন্দেহ করার কারণ আছে যে, এ গুমের সঙ্গে রাষ্ট্র জড়িত।

গুমে সরকারের প্রভাবশালীরা জড়িত এমন প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমরা কয়েক দিন আগে আল জাজিরায় সরকারের একজন অত্যান্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি সম্পর্কে অভিযোগ শুনেছি, তিনি সরাসরি গুমের নির্দেশের সাথে জড়িত। কিন্তু এ বিষয়ে প্রতিবাদ বক্তব্য পাইনি। আমরা দেখলাম আল জাজিরা বাংলাদেশে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তাহলে আমরা আপনাদের সন্দেহ করবো না তো কী করবো। এতবড় একটা অপরাধের বিচার যে রাষ্ট্র করতে পারে না, সে রাষ্ট্রের মুখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শোভা পায় না। সে রাষ্ট্রের মুখে ৭২-এর সংবিধানের চেতনা শোভা পায় না।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিচালক নাসির উদ্দিন এলান বলেন, এ দেশে যে গুমের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে এবং দেশের বর্তমান যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, সেখান থেকে আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আমরা মনে করি সরকারের নির্দেশেই আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এদেরকে (নিখোঁজ ব্যক্তিদের) উঠিয়ে নিয়ে গেছে। এটা মনে করার কারণ হলো, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে যদি তুলে নেয়া হয়, তাকে ফিরিয়ে দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। তাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু আজ পর্যন্ত ৫শ’র উপরে গুমের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ফিরে আসার সংখ্যা হতে গোনা কয়েকজন।

গুম একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ সরকারকে বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আমরা আশা করবো পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে নিখোঁজ ব্যক্তিরা তাদের স্বজনদের কাছে ফিরে আসবেন।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, কখনো পাহাড়ী জনপদের কেউ গুম হচ্ছেন, কখনো সমতলের, কখনো বা রাজনৈতিক কর্মী, কখনো সমাজকর্মী, কখনো ব্যবসায়ী নিখোঁজ হচ্ছে। গুমকে নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় দেশে এক ধরনের ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পাঁচশর অধিক লোক গুম হয়েছে এ পর্যন্ত। কিন্তু ফিরে এসেছে হাতে গোনা দু একজন। যারা ফিরে আসছেন তারা একটি শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করতে সাহস পাচ্ছেন না।

তিনি বলেন, একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে সরকারের কাছে দীর্ঘ দিন ধরে একটি দাবি আমরা করছি যে, এই নিখোঁজ মানুষগুলো বাংলাদেশের নাগরিক। সে কোন দলের কোন মতের সেটি বিবেচনা না করে তাদের উদ্ধার করুন। তাদেরকে ফিরে পেতে সহায়তা করুন। তিনি বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে একটি আহ্বান থাকবে গুম হওয়া মানুষগুলোকে ফিরে পেতে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক। যে তদন্ত কমিশনের ওপর আমরা আস্থা রাখতে পারি। এমন একটি সময় আসবে প্রত্যেকটি গুমের বিচার হবে বাংলাদেশে। প্রতিটি ঘটনার দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি অনতিবিলম্বে এদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত হবে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বছরের পর বছর গুম হওয়া পরিবারের কাঁন্না আপনার কানে পৌছায়নি। কারণ, এ গুমের জন্য যারা দায়ী তারা আপনার চার পাশেই আছে। এ গুম খুনের জন্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়ী উল্লেখ্য করে তিনি বলেন, এরা কেবল আমাদের ভাই বোনদের নিয়ে যাচ্ছে তা না। এরা যে আবার আপনার পরিবারের ওপরও আঘাত করবে না, এমনটি বলা যাচ্ছে না। দেশে গণতন্ত্র নেই উল্লেখ করে জাফরুল্লাহ বলেন, গণতন্ত্র না থাকলে দেশে গুম খুনের মত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর উপর সরকার ভর করলে এই গুমের ঘটনা বাড়তেই থাকবে। এটা কোনো জাতির জন্যই মঙ্গলজনক নয়।

মানববন্ধনে সন্তান হারা এক মা প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি স্বজনহারা। আপনি বুঝেন স্বজন হারানো বেদনা কেমন। আমরাও মা হিসেবে আপনার কাছে আমাদের সন্তানদের ফেরত চাই। আমরা আশাবাদী আপনি চাইলে আমাদের সন্তান ফিরে পাবো। সন্তানকে ফিরিয়ে দিয়ে আমাদের বাঁচতে দিন। নয়তো আমাদেরও নিয়ে নিন।

নিখোঁজ সাজেদুল ইসলাম সুমনের বড় বোন মারুফা ইসলাম ফেরদৌসি বলেন, আমার মা ছেলের শোকে কাঁদতে কাঁদতে কুজো হয়ে গেছেন। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। আপনারা জানেন সুমনের মতো আজকে এখানে যারা উপস্থিত রয়েছেন সবারই একই অপেক্ষা। আমরা আমাদের প্রিয় মানুষকে কাছে পেতে চাই। তাদের সাথে ঈদ করতে চাই। প্রধানমন্ত্রী আপনি তো আপনার স্বজনকে নিয়েই ঈদ করেন। তবে আমাদেরকে কেন ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত করবেন।

মায়ের ডাকের সমন্বয়ক আফরোজা ইসলাম আখি বলেন, গত ৫/৬ বছর ধরে বছরের পর বছর দিনের পর দিন বলেই আসছি আমাদের স্বজনরা নিখোঁজ। আমরা বিভিন্নভাবে সরকারকে বলে আসছি যে আমাদের স্বজনদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের খোঁজ মিলছে না। আমাদের স্বজনদের ফিরিয়ে দেন। রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান ফিরে আসার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমরা কিছুটা আশার আলো দেখছি। আমাদের স্বজনহারাদের মধ্যে এক-দুজন ফিরে আসছে। মাঝ রাতে মারুফ জামানকে বাসার সামনে ফেলে রেখে গেছে। মারুফ জামানের মেয়েও আমাদের সাথে রাস্তায় দাড়িয়ে বিভিন্নভাবেই দাবি জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু তাদের তো অনেক ভালো পরিচয় আছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আমরা যারা এখানে সাধারণ জনতা আমাদের ভাই বাবাদের খুঁজে পেতে দাঁড়িয়েছি। মারুফ জামানের মত আমাদের স্বজনদেরও ফিরিয়ে দিন। না হয় আমাদের সবাইকে মেরে ফেলুন। এভাবে তিলে তিলে মৃত্যুবরণ না করে একসাথে মরে যেতে চাই। এত কষ্ট আর সহ্য হয় না।

You Might Also Like