‘গুন্ডে’ ছবি ও একজন মুক্তিযোদ্ধা কলাম লেখক

পত্রপত্রিকায় কলাম লেখা একই সাথে একটি আনন্দেরও কাজ, আবার পরিশ্রমেরও। এটি আত্মসন্তুষ্টি এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে। অনেক সময় কলামের কোনো কথা বা বক্তব্য সুনাম কুড়িয়ে আনে, আবার অনেক সময় সমালোচনাও আনে কুড়িয়ে। পৃথিবীতে কোনো কিছুই একতরফা নয়, অতএব সব কিছু মিলিয়ে লেখককে সামনে এগোতে হয়। আমি পেশাদার কলাম লেখক নই। মনের টানে, বিবেকের তাগিদে, আবেগের তাড়নায় এবং গণমানুষের সাথে মিশব বলেই কলাম লেখা অব্যাহত রেখেছি ১৬ বছর ধরে। আজকের কলামে দু-একটি কথা বলবÑ কেন কলাম লেখা শুরু করলাম বা কেন এসেছি লেখালেখির জগতে, এ প্রসঙ্গে। এমন কোনো রথী-মহারথী আমি নই লেখালেখির জগতে; সাধারণদের মধ্যেই একজন। তবু যে পেশায় নিয়োজিত ছিলাম ওই পেশার ব্যক্তিরা লেখালেখির জগতে সংখ্যার হিসাবে অতি নগণ্য। তাই সেই নগণ্য ক’জন শুধু ওই একটি আঙ্গিকেই কিঞ্চিত ‘অসাধারণ’ হতেও পারি। সব কিছুই নির্ভর করে কলামের পাঠকরা কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখককে গ্রহণ করেন। সচরাচর শুভেচ্ছা পাই, অভিনন্দন পাই আবার হঠাৎ হঠাৎ পাই কঠোর সমালোচনাও।

১৯৯৬ সালের জুন মাসের ৭ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত মাত্র আট দিন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) মহাপরিচালক ছিলাম। ৯ জুন সকালে আকাশপথে প্যারিস নগরীর উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করি। ইউনেস্কোর উদ্যোগে নিরাপত্তাবিষয়ক একটি সম্মেলন সেখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক ওই সম্মেলনে উদ্যোক্তাদের যাওয়া-আসার খরচেই নিমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন। ২০ মে ১৯৯৬ সালের অপ্রীতিকর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যশোরের জিওসির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলাম। বিআইআইএসএসের তৎকালীন মহাপরিচালক যশোর সেনানিবাসে আমার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। অতএব মানসিকভাবে প্রস্তুত না থাকলেও, প্যারিস যেতে বাধ্য ছিলাম আন্তর্জাতিক সৌজন্যের খাতিরে। যেহেতু দেশের বাইরে যাচ্ছিলাম, সেহেতু আমার উপরিস্থ উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে আমি বাংলাদেশের বাইরে কাটানোর জন্য ছয় দিন ছুটি নিয়েছিলাম (সেনাবাহিনীর পরিভাষায় বলা হয় এক্স বাংলাদেশ লিভ)। ২০ মে ১৯৯৬ সালের দ্বিপ্রহর পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধান ছিলেন লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম, বীর বিক্রম। ওই দিনের অপ্রীতিকর ঘটনার পরিপ্রেেিত তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস, সেনাবাহিনীর তৎকালীন সিজিএস লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমানকে একই দিনের অপরাহ্ন থেকে নতুন সেনাপ্রধান নিযুক্ত করেছিলেন। ওই দিন রাত ১১টা থেকে সদ্য পদচ্যুত সেনাবাহিনীপ্রধান লে. জেনারেল নাসিমকে বন্দী করা হয়েছিল।

আমি যশোর সেনানিবাস থেকে বদলি হয়ে ঢাকা মহানগরীতে এসেই ১৪ দিন আগে নিযুক্ত সেনাপ্রধান লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করি। তাকে জানাই, আমার ইচ্ছা না থাকলেও আমাকে প্যারিস যেতে হচ্ছে। তিনি শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। প্যারিস নগরীতে সেমিনার শেষ করে আমি আমার পরিকল্পনা মোতাবেক প্যারিস থেকে জেদ্দার উদ্দেশে রওনা হই। ছুটি নিয়েছিলাম সৌদি আরবে এসে পবিত্র মক্কা নগরীতে পবিত্র ওমরাহ এবং পবিত্র মদিনা নগরীতে মহানবী সা:-এর পবিত্র রওজা মোবারক জিয়ারত সম্পন্ন করার জন্য। জেদ্দা এয়ারপোর্টে নেমে আনুষ্ঠানিকতা শেষে গেটের বাইরে এসে পেয়েছিলাম বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনসুলেট থেকে আসা একজন কনিষ্ঠ অফিসার এবং আমার কয়েকজন বন্ধুবান্ধবকে। তারা সবাই আমাকে একটি কঠোরতা ও বিব্রতবোধমিশ্রিত (ইংরেজিতে আন-ইজি) স্বাগত জানায়। অতঃপর কনসাল জেনারেল সাহেবের বাসায় যাই। তারিখটি ছিল ১৫ জুন ১৯৯৬। একই তারিখে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের জেদ্দা নগরীতে নিযুক্ত তৎকালীন কনসাল জেনারেল মোহসীন আলী খানের হাত থেকে আমি এক পৃষ্ঠা কাগজ পেয়েছিলাম। কাগজটি ছিল সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে আমাকে অব্যাহতি প্রদানের আদেশ। পরবর্তী এক বছর এ দিক-ও দিক ব্যস্ততার মধ্যে কেটেছে। ফেব্রুয়ারি ২০১১ সালে বইমেলায় প্রকাশিত আমার লেখা ১১তম পুস্তকে (নাম : মিশ্র কথন) এ প্রসঙ্গে বেশ বিস্তারিত আলাপ করেছি।

এলপিআর বা প্রাক-অবসর ছুটি শেষ হয়ে যায় ১৫ জুন ১৯৯৭ তারিখে। সেনাবাহিনীর জন্য প্রযোজ্য আইনের নাম ‘বাংলাদেশ আর্মি অ্যাক্ট’। ওই আইন মোতাবেক, এলপিআরে থাকাকালেও সেনাব্যক্তিত্বদের ওপর ওই আইনের বহুলাংশ প্রযোজ্য। মত প্রকাশের স্বাধীনতা এলপিআরে থাকাকালেও খর্ব থাকে। এলপিআর শেষ হওয়ার পরপরই তৎকালীন প্রসিদ্ধ দৈনিক পত্রিকা ভোরের কাগজের সম্পাদক মতিউর রহমানের আমন্ত্রণে আমি ভোরের কাগজে জীবনের প্রথম কলাম লিখি নিজের নামে। ওই প্রথম আত্মপ্রকাশের সুবাদে পরবর্তী পাঁচ মাসে তখনকার আমলের প্রখ্যাত পত্রিকা ইত্তেফাক ও জনকণ্ঠ উভয়টিতে আমন্ত্রিত হয়ে কলাম লিখি। কলাম লেখার প্রক্রিয়া হালকাভাবে চালু থাকে। অতঃপর কোনো এক সময় ভোরের কাগজের সম্পাদক মতিউর রহমান ওই পত্রিকা থেকে বিযুক্ত হয়ে নতুন প্রকাশিত প্রথম আলোর সম্পাদক পদে দায়িত্ব নেন। সেখানে তিনি আজও সসম্মানে আছেন। মতিউর রহমানের আহ্বানে আমি প্রথম আলো পত্রিকায় ২৩তম দিবস থেকে পরবর্তী ১৯-২০ দিন ধারাবাহিকভাবে কলাম লিখি। এ ক্ষেত্রে মতিউর রহমান ছিলেন প্রধান উৎসাহদাতা, আজো সেটা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ রেখেছি। সে সময় মতিউর রহমান যদি আমাকে উৎসাহিত না করতেন এবং মহান আল্লাহর করুণা ও সহযোগিতা না থাকত, তাহলে হয়তো বা অভ্যাসরত একজন কলাম লেখক হতাম না। যেহেতু কলাম লিখি, সেহেতু প্রিয় এবং অপ্রিয় অনেক বিষয় নিয়ে লিখতেই হয়। আজকে কলামের বাকি অংশে যেটা নিয়ে লিখব সেটা অনেকের কাছে অপ্রিয় কিন্তু বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে একটি প্রিয় বিষয় এবং মনের আকুতি। বিষয়টি হচ্ছে অতি সম্প্রতি বাজারে আসা একটি হিন্দি সিনেমা।

এবার বলিউড ছবি গুন্ডে যেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। ছবিটির শুরুতে নেপথ্য কণ্ঠে বলা হয়েছেÑ ‘১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, শেষ হলো ভারত-পাকিস্তানের তৃতীয় যুদ্ধ। প্রায় ৯০ হাজার পাকিস্তানি ফৌজ আত্মসমর্পণ করল ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে সে দিন। এটা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় আত্মসমর্পণ। এই যুদ্ধের ফলে জন্ম নিলো একটি নতুন দেশ, বাংলাদেশ।’

বাংলাদেশের প্রতিটি সচেতন মানুষ পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন, তারা এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ইন্টারনেটসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় এর প্রতিফলন দেখা গিয়েছে।

কেউ কেউ বলেছেন, ছবিটি যেহেতু ভারতীয় সেন্সর বোর্ড হয়ে এসেছে, বোর্ড মেম্বাররাই ছবিটির সেন্সর ছাড়পত্র দিয়েছেন এবং তারা যেহেতু সরকারেরই নিযুক্ত, সুতরাং ভারত সরকার সচেতনভাবেই কাজটি করেছে। তবে আমি মনে করি না যে, ভারত সরকার ‘সচেতনভাবে’ এই কাজটি করেছে। আমি মনে করি ভারতের জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশের মনের অবচেতন অংশে এরূপ ধারণা বিদ্যমান এবং সেই ধারণাটাই এই সিনেমার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। গুণ্ডে ছবির সমালোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সরকারেরও সমালোচনা হচ্ছে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হয়েছে দেখার পরও বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের প থেকে এখন পর্যন্ত যথেষ্ট প্রতিবাদ জানানো হয়নি।

আমাদের চলচ্চিত্র জগতের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব গাজী মাজহারুল আনোয়ার অনেকটা এ রকম বলেছেন, ‘আমরা স্বীকার করি, স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত আমাদেরকে সহায়তা করেছে। স্বাধীনতা, বাংলাদেশের লাখ লাখ সংগ্রামী মানুষের রক্তের বিনিময়ে আমাদের অর্জন। কারো দয়ায় নয়। গুন্ডে ছবিতে বলা হয়েছে, ভারত, পাকিস্তানকে যুদ্ধে হারিয়ে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে। আমি তাদের এই মনোভাবে বিস্ময় প্রকাশ করে তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন কলমসৈনিক হিসেবে আমার রক্ত, ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, আর ৩ লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের কি কোনো মূল্য নেই?’ আমাদের চলচ্চিত্র জগতের আরেকজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব চাষী নজরুল ইসলাম অনেকটা এ রকম বলেছেন, গুণ্ডে ছবির উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত’। বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী যা বলেছেন তার মধ্যে একটি বক্তব্য হচ্ছে, ‘এই ছবির প্রতি আমার ঘৃণা জন্মেছে। মুক্তিযুদ্ধের ৪৩ বছর পর বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের চলচ্চিত্রের মতো একটি বড় ক্যানভাস থেকে এমন মেসেজ সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক এবং অ্যালার্মিং।’ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এই কলামে কিছু কথা তুলে ধরতে চাই এবং গুন্ডে ছবিতে প্রকাশিত মনোভাবের কারণে এই কথাগুলো অতিরিক্ত তাৎপর্য বহন করে বলে মনে করি। আমার কথাগুলো নতুন নয়।
মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য বিভিন্ন বয়সী ও বিভিন্ন পেশাজীবীর কাছে কম-বেশি ভিন্নভাবে প্রতিফলিত বা উদ্ভাসিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। বর্তমান বাংলাদেশের জনসংখ্যার অতি ুদ্র একটি অংশ মাত্র ১৯৭১ সালের সেই ঐতিহাসিক ঘটনা তথা মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর সাী। বয়সের ভারে এবং সাংসারিক চাপে তারা অনেকেই কান্ত। তাদের কাছে বিজয় দিবসের তাৎপর্য এবং ’৭১ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ওই দিবসটির তাৎপর্য কম-বেশি ভিন্ন হওয়ায় স্বাভাবিক। প্রতি বছর যখন মার্চ বা ডিসেম্বর মাস আসে তখন মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের দেশে যুদ্ধ শুরু এবং শেষ হয়েছিল। আমরা যুদ্ধ করেছিলাম এবং যুদ্ধের মাধ্যমে আক্রমণকারী বা হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে বিজয় অর্জন করেছিলাম। আমরা কিছু অনুভূতি ও চেতনাকে অন্য কিছু অনুভূতি ও চেতনার ওপর অধিকতর মূল্য দিয়ে স্থাপন করেছিলাম। বিজয়ের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা শুরু করেছিলাম ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সন্ধ্যা থেকে। মরুভূমিতে রাতে পথ চলার সময় পথিক যেমন বারবার আকাশের উত্তরাংশে উজ্জ্বলভাবে স্থিত, ধ্র“ব তারার দিকে তাকায় নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে তার গন্তব্যের দিক ঠিক আছে কি না, অথবা আধুনিক যুগে সৈনিক বা নাবিক কম্পাসের কাঁটা মিলিয়ে দেখে গন্তব্যের দিক ঠিক আছে কি না, তেমনই রাজনৈতিকভাবে আমরা প্রতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর এলে অন্তত একবার হিসাব মেলানোর সুযোগ পাই। কিসের ওপর বিজয় অর্জন করেছিলাম, অর্জনটুকু ঠিক আছে না য়ে গিয়েছে এবং পথভ্রষ্ট বা ল্যভ্রষ্ট হয়ে থাকলে কী করা যেতে পারে? তবে এই ২০১৪ সালের ফেব্র“য়ারি মাসের শেষে তথা মার্চের আগমন মুহূর্তে এই তাৎপর্য আর কী অতিরিক্ত গুরুত্ব পায় এবং কেনই বা অতিরিক্ত গুরুত্ব পায়, সেটা অতি সংপ্তিভাবে তুলে ধরতে চাই।

দর্শনীয়ভাবে (ইংরেজি ভাষায় ‘ভিজিবলি’) পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগিতাকারীদের ওপর বিজয় অর্জন করেছিল মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ড। দর্শনীয়ভাবে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের ওপর বিজয় অর্জন করেছিল ভারত ও বাংলাদেশ নামক দু’টি রাষ্ট্র। দার্শনিক বা তত্ত্বীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে : এক. পাকিস্তানি সামরিক শাসন তথা স্বৈরশাসনের ওপর বিজয় অর্জন করেছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণের শক্তি ও ইচ্ছা। দুই. পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের কর্তৃপ বাধ্য করছিল বাঙালিদের পাকিস্তানে থাকতে। ওই প্রক্রিয়াকে অস্বীকার (ইংরেজি ভাষায় ডিনাই) করত স্বাধীন ও সার্বভৌম হওয়ার অধিকার আদায় হয়েছিল। তিন. পাকিস্তানি অগণতান্ত্রিক অভ্যাস ও রেওয়াজের বিপরীতে বিজয় অর্জন করেছিল গণতান্ত্রিক অভ্যাস ও চিন্তাচেতনা। চার. পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানি বাঙালি জনগোষ্ঠী কর্তৃক পরিচালিত প্রতিবাদের বিজয় হয়। পাঁচ. পাকিস্তানি সরকার ও শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক, শান্তি ও সাম্যের মহান ধর্ম ইসলামের নাম ব্যবহার করে জনগণের ওপর বর্বরতা ও অসাম্যের ধারা বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জয় হয়, তথা মানবিকতা বা মানবতাবাদের জয় হয়।

স্থানাভাবে এই সংপ্তি কলামে সব কিছু আলোচনা করা যাবে না এবং তা করতে গেলে গুরুত্বপূর্ণ একটি বা দু’টি বিষয়ের ওপর থেকে ‘ফোকাস’ হারিয়ে যেতে বাধ্য। তাই বিরাজমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য থেকে শুধু রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আলোচনায় সামনে আনছি।

প্রায় ২২-২৩ বছরের বিভিন্ন মাত্রার ও আঙ্গিকের সংগ্রামের সর্বশেষ ধাপ হলো, ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ। সূক্ষ্ম হিসেবে ২৬৬ দিন। ২৫ মার্চ ১৯৭১ দিবাগত রাত ১২টা বা ১২টার পর তথা ২৬ মার্চ প্রত্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। ক্রমান্বয়ে ভারতের সাহায্য-সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। অক্টোবর মাসে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশী সরকার ও ভারত সরকারের মধ্যে একটা গোপন চুক্তি হয়। নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে পরো সহযোগিতার মাত্রা চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। ডিসেম্বরের ৩ তারিখ থেকে ভারত এবং পাকিস্তান প্রত্যভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর অপরাহ্ন ৪টা পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের মাটিতে ভারতীয় সামরিক বাহিনী ও পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধারা যথা ‘জেড’ ফোর্স, ‘এস’ ফোর্স, ‘কে’ ফোর্স এবং বিভিন্ন সেক্টরের সেক্টর ট্রুপসরা যেমন যুদ্ধ চালাচ্ছিলেন তেমনি চালাতে থাকলেন। তবে ৩ ডিসেম্বর থেকে সেটা চালানো হলো ভারতীয় বাহিনীর যুদ্ধের সাংগঠনিক কাঠামোর [ইংরেজিতে সামরিক পরিভাষায় : অর্ডার অব ব্যাটল (অরব্যাট)] সাথে তাল মিলিয়ে, যৌথ কমান্ডের অধীনে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। মুক্তি বাহিনীর গেরিলা যোদ্ধারা, যারা সারা বাংলাদেশে গ্রামেগঞ্জে, শহরে-নগরে ছড়িয়ে থেকে যুদ্ধরত ছিলেন তারা বিগত মাসগুলোর মতো প্রচণ্ড আক্রমণাত্মক গেরিলা তৎপরতা অব্যাহত রাখেন। সার্বিকভাবে ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনীর আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ডের ফলে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের রেকর্ড এবং ছবি অনুযায়ী, পাকিস্তানিদের পে আত্মসমর্পণ করেন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজী এবং আত্মসমর্পণ গ্রহণ করেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। সেই অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি, তৎকালীন কর্নেল ওসমানী উপস্থিত ছিলেন না (বা তাকে উপস্থিত রাখা হয়নি!!)। প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীর কোনো প্রতিনিধিকেও আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট করা হয়নি। অর্থাৎ জিনিসটা এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যে, ১৩ দিনের দীর্ঘ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছে এবং ওই যুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানিরা ওই যুদ্ধের বিজয়ী ভারতীয়দের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। ইংরেজিতে দু’টি শব্দ আছে, মার্জিন বা মার্জিনালাইজড। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে অপরাহ্নে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে, ভারতীয় কর্তৃপ সফলভাবেই মুক্তিবাহিনীর অবদান ও সাফল্যকে মার্জিনালাইজড করে দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় ও বিজয়ের আনন্দ ওই বিকেল বেলায় ছিনতাই হয়ে গিয়েছিল। দুই বছর পর সিমলায় অনুষ্ঠিত আলোচনার পর যে চুক্তি স্বারিত হয়েছিল, সেই চুক্তির ফলেও বাংলাদেশের মানুষের এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে মার্জিনালাইজড করে ফেলা হয়। এতদ সত্ত্বেও বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সচেতন জনগণ নিজেদের প্রেরণায়, নিজেদের আত্মসম্মানের তাগিদে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবসকে একান্তই নিজেদের বিজয় হিসেবে সমুন্নত রেখেছে সফলভাবে। ওই বিজয়টি বাস্তবে ছিল মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশের ওই আমলের জনগণের। মুক্তিযুদ্ধ- পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ১৯৭১-এর বিজয়টি প্রেরণার একটি অমøান চিরন্তন উৎস। এই উৎসকে অত রাখা অতীব প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৯৭১-এর রণাঙ্গনে রক্ত বিনিময়ের মাধ্যমে ভারত ও বাংলাদেশ নামক দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে এবং দু’টি রাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল সে সম্পর্কটির উষ্ণতা বিগত ৪২ বছর সময়কালে একই রকম থাকেনি। বিগত ৪২ বছরে উভয় দেশের মধ্যে তিক্ততা যেমন ছিল, তেমনি মধুর সম্পর্কের সময়ও ছিল। ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং ভারতীয় স্বার্থের মূল্যায়নে সবচেয়ে উজ্জ্বল সময় হচ্ছে, ২০০৯ থেকে আজ অবধি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য ও সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে হবে, প্রকাশ করতে হবে এবং উপকার প্রদান করতে হবে; এটাই বাস্তব। কিন্তু কৃতজ্ঞতার সীমারেখা কতটুকু, কতটুকু পরিমাণ উপকার প্রদান, কতটুকু স্বার্থ ত্যাগ করলে বলা হবে যে, বাংলাদেশ যথেষ্ট কৃতজ্ঞ; এই সীমারেখা কোনো দিনই চিহ্নিত হয়নি। এই প্রসঙ্গটি আলোচনা করতে গেলেই আলোচনাকারীকে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত করে ফেলা হয়। বাংলাদেশ ভারতকে অনেক কিছুই দিলো। আরো অনেক কিছু দেয়ার জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক সরকার মনে হয় প্রস্তুত এবং আগ্রহী। কিন্তু সময়ের অভাবে পেরে ওঠেনি। তাই আরো সময় চায়। মনে হচ্ছে যেন, বাংলাদেশ দিতেই থাকবে এবং ভারত নিতেই থাকবে, এ রকম একটি পরিস্থিতি।

২০১৪ সালের ফেব্র“য়ারির শেষাংশে, গুন্ডে ছবির প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে একটি শব্দযুগল এখানে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছি। ওই শব্দযুগল হচ্ছে: ‘ইলাস্টিসিটি অব গ্র্যাটিচিউড’, তথা কতটুকু কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে যথেষ্ট বলা হবে? ইলাস্টিক বস্তুকে যেমন বেশি টানলে ছিঁড়ে যায়, তেমনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রক্রিয়াকে যদি টানতেই থাকে কেউ, তাহলে সেটা ছিঁড়ে যেতে বাধ্য। আমার প্রশ্ন, আমরা কতটুকু টেনেছি? আমাদের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতা আদায়ের নিমিত্তে বা কৃতজ্ঞতার উসিলায় প্রতিবেশী রাষ্ট্র কী চায়? আমার অনুভূতি হচ্ছে, ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক পরাশক্তি। ভারতের সাথে আমাদের গঠনমূলক বাস্তবতাভিত্তিক সুসম্পর্ক রাখতেই হবে। পারস্পরিক আদান-প্রদানের মানদণ্ড স্থির করতেই হবে এবং এই কাজটি করতে গেলে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ একটি বড় উপাত্ত হিসেবে কাজ করবে।
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
(নয়া দিগন্ত, ০৫/০৩/২০১৪)

You Might Also Like