গণজাগরণ মঞ্চকে নিয়ে নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন কারা?

ইতিহাস বলে, ইতিহাস থেকে আমরা কোনো শিক্ষা নেই না। বাংলাদেশের বেলায় কথাটা সর্বাংশে সত্য বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির একটা বড় দুর্ভাগ্য এই যে, যখনই তা সামগ্রিক ঐক্যের ভিত্তিতে গণবিরোধী প্রতিক্রিয়ার দুর্গকে পরাভূত করে অথবা পরাভূত করার শক্তি অর্জন করে, তখনই তার শত্রুরা সেই ঐক্যের দেয়ালে চিড় ধরাতে সক্ষম হয় অথবা প্রগতিশীল শিবির নিজেরাই অন্তর্দ্বন্দ্বে অথবা শত্রুর ফাঁদে পা দিয়ে সেই ঐক্যকে ধ্বংস করে দেশকে আবার পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে দেয়।

দূর অতীতে যাব না। ১৯৫৪ সাল থেকে আমরা এই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখে আসছি। সম্প্রতি সেই একই ইতিহাসের ন্যক্কারজন পুনরাবৃত্তি দেখলাম শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশি হামলায় এবং তার আগে গণজাগরণ মঞ্চ ও অপর এক দলের মধ্যে (ছাত্রলীগের বলে কথিত) প্রচণ্ড মারামারিতে। যদিও পরে দেখা গেছে, এটা মঞ্চের দুই অংশের মধ্যে মারামারি।

ছাত্রলীগ অবশ্য বলেছে, তারা এই হামলা চালায়নি। এটা জাগরণ মঞ্চের অন্তর্দ্বন্দ্বের ফল। জাগরণ মঞ্চ এখন আর আগের মতো ঐক্যবদ্ধ নয়, বিতর্কিত ও বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই মঞ্চের নেতা ইমরান সরকারের বিরুদ্ধেও নানা অপবাদ ও অভিযোগ উঠেছে। কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগ ও জাগরণ মঞ্চের একাংশের মধ্যে। এই মঞ্চের এক অংশ দাবি করছেন, তারা আর জাগরণ মঞ্চ নামে পরিচিত হতে চান না।

এই অনৈক্য ও বিভক্তির জন্য দায়ী কারা, সে প্রশ্নে এখন যাচ্ছি না। আমি শুধু ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এই যে আওয়ামী লীগ, ইমরান সরকার ও গণজাগরণ মঞ্চের মধ্যে ত্রিভুজ দ্বন্দ্ব, জাগরণ মঞ্চের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, তাতে দেশের প্রগতিশীল ও সেক্যুলার শিবিরের কোনো লাভ হয়নি। লাভ হয়েছে ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক গণবিরোধী শিবিরের।

দেশে মুক্তিযুদ্ধের সেক্যুলার চেতনায় যে ঐক্যবদ্ধ তরুণ প্রজন্ম গড়ে উঠেছিল, যাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক-সেতু গড়ে ওঠায় ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এত বড় গণআন্দোলন তৈরি হয়েছিল, যে আন্দোলনের ফলে কাদের মোল্লার মতো যুদ্ধাপরাধীকে ফাঁসি দেওয়া সম্ভব হয়েছে, সে আন্দোলন আজ খণ্ডিত এবং সর্বনাশা অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত।

এই পরিস্থিতি পরাজিত গণবিরোধী শিবিরকে আবার শক্তি ও সাহস জোগাচ্ছে। আবার মাথা তুলবার সুযোগ করে দিচ্ছে। এটা যদি আওয়ামী লীগ উপলব্ধি করতে না পারে এবং গণজাগরণ মঞ্চেরও একশ্রেণীর নেতাকর্মী তাদের হঠকারী নীতির সর্বনাশা পরিণতি বুঝতে না পারেন, তাহলে যে বিজয়ের ফসল তারা ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম দ্বারা ঘরে তুলবেন ভেবেছেন তা আবার পরাজিত গণশত্রু শিবিরের গোলায় চলে যাবে।

১৯৫৪ সালে হক-ভাসানী ও সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে এবং বামপন্থিদের সমর্থনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যে বিশাল গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সেই ঐক্যের আঘাতে প্রদেশে সাম্প্রদায়িক ও অত্যাচারী মুসলিম লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং গণতন্ত্রের শুভ বিকাশের সূচনা হয়। যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় বসে। কিন্তু এই ঐক্য যুক্তফ্রন্ট এক বছরও ধরে রাখতে পারেনি। প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগের ষড়যন্ত্র তো ছিলই। কিন্তু যুক্তফ্রন্টের ভেতরেও অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে পরাজিত সাম্প্রদায়িক শক্তি আঘাত হানে যুক্তফ্রন্টের ওপর। জনতার ঐক্য দ্বারা যে বিজয় অর্জিত হয়েছিল, নেতাদের অনৈক্য ও অন্তর্দ্বদ্বের জন্য বছর না ঘুরতেই সেই অর্জন ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আমরা দেখেছি ১৯৫৮ সালে। তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অংশের জনগণের মিলিত আন্দোলনে যখন কেন্দ্রে সাম্প্রদায়িক ও গণবিরোধী মুসলিম লীগ দল ক্ষমতাহারা, একটি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় বসবে_ এই আশায় সবাই উন্মুখ, ঠিক সেই মুহূর্তে ‘নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির’ দাবিতে শত্রুপক্ষের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে একদল বামপন্থি আওয়ামী লীগ ভেঙে বেরিয়ে যায় এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নামে নতুন দল গঠন করে। আওয়ামী লীগ ভেঙে যেতেই এবং গণঐক্য বিভক্ত হতেই সুযোগের অপেক্ষায় রত সামরিক বাহিনীর ক্ষমতালোভী জেনারেলরা দেশে রাজনীতি নিষিদ্ধ করে রাজনৈতিক নেতাদের অধিকাংশকে জেলে পাঠিয়ে কঠোর সামরিক শাসন প্রবর্তন করেন। নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির দাবি আদায় করা দূরের কথা, দেশটি সামরিক শাসনের নামে আমেরিকার সেটেলাইট স্টেটে পরিণত হয়।

১৯৭১ সালেও একটি সশস্ত্র সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন ও একটি গণতান্ত্রিক সেক্যুলার স্টেটের ভিত্তি স্থাপন সম্ভব হয়েছিল অটুট গণঐক্যের শক্তিতে। সেই ঐক্য বছরখানেকও টিকিয়ে রাখা গেল না। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ভেতর থেকেই তৈরি হলো একটি ইনফেনটাইল অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় তরুণ নেতৃত্ব। দেশে গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত শক্ত না হতেই তারা ধ্বনি তুললেন সম্পূর্ণ অবাস্তব বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের। তাদের হঠকারিতায় দেশে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র, প্রচলিত সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তিই ধসে পড়ে। সামরিক বাহিনীর ক্ষমতালোভী জেনারেলরা ক্ষমতা দখল করেন এবং তাদের হাত ধরে রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠা লাভ করে ‘৭১-এর পরাজিত শত্রুপক্ষ, বিশেষ করে হানাদারদের গণহত্যার সহযোগী জামায়াতে ইসলামী।

ইতিহাস বলে, ইতিহাস থেকে আমরা কোনো শিক্ষা নেই না। বাংলাদেশের বেলায় কথাটা সর্বাংশে সত্য। ‘৭১-এর পরাজিত শত্রু, বিশেষ করে ঘাতক ও দালালদের বিচার ও শাস্তিদানের দাবিতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয়। বেগম সুফিয়া কামালের অপারগতার দরুন জাহানারা ইমাম এই কমিটির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। প্রথমে এই কমিটির পেছনে আওয়ামী লীগের পূর্ণ সমর্থন ছিল। শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রয়াত আওয়ামী নেতা আবদুর রাজ্জাক এই ঘাতক দালাল নির্মূল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং অচিরেই তা ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপান্তর হয়। যার ফলে সরকারি বাধা উপেক্ষা করে বিশাল গণআদালতে গোলাম আযমের মতো যুদ্ধাপরাধীর অপরাধ ফাঁসির দণ্ডযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল, যা ভবিষ্যতে কার্যকর হতে পারে ভেবে ‘৭১-এর ঘাতকরা পর্যন্ত শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল।

ঘাতক দালাল নির্মূল আন্দোলনের এই সাফল্যের পরই শুরু হয় এই আন্দোলনের ঐক্যকে ভাঙার ষড়যন্ত্র। তৎকালীন বিএনপি সরকার ও জামায়াত এই ষড়যন্ত্র তো করেছেই; বড় ষড়যন্ত্রটি হয়েছে নির্মূল কমিটির ভেতর থেকেই। একশ্রেণীর হতাশাগ্রস্ত বামপন্থি নেতা এই ভেবে আশায় উদ্দীপ্ত হন যে, তারা জীবনভর চেষ্টা করে যা পারেননি, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মাইনাস করে দিয়ে নিজেরা বড় নেতা হয়ে উঠতে, সেই সুযোগটি এখন এসেছে। নির্মূল কমিটি ও জাহানারা ইমামের জনপ্রিয়তাকে কেন্দ্র করে জাহানারা ইমামকে দেশের বিকল্প নেতা এবং নির্মূল কমিটিকে আওয়ামী লীগের বিকল্প রাজনৈতিক দল হিসেবে খাড়া করা যাবে।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম নিজে এই ষড়যন্ত্র টের পেয়ে তা ব্যর্থ করার চেষ্টা করেন। দুরারোগ্য ক্যান্সারের কারণে তা পারেননি। তার সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের সময় তিনি আমাকে বলেছেন, ‘আমাদের সংগঠনে কিছু উদ্দেশ্যপরায়ণ লোক ঢুকে গেছেন। তারা চান আমাকে নেতা হিসেবে দেখিয়ে রাজনৈতিক সংগঠন গড়তে। তারপর তারা নিজেরা নেতা হবেন। এদের ষড়যন্ত্র আওয়ামী লীগ টের পেয়েছে। তাই তারা আন্দোলন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আন্দোলন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।’

দুরারোগ্য ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে নির্মূল কমিটির ভেতরের ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে শহীদ জননী আর সংগ্রাম করে পেরে ওঠেননি। সময়ও তিনি পাননি। সংগঠনের ভেতরে এই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রই নির্মূল কমিটিকে দুর্বল করেছে এবং ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকেও বিলম্বিত করেছে। শাহরিয়ার কবির ও তার সহযোগী বন্ধুদের ধন্যবাদ, তাদের সাহসী ভূমিকায় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি বর্তমানে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রমুক্ত হয়েছে এবং আন্দোলনটি শুধু টিকে থাকা নয়, আন্তর্জাতিক ব্যাপ্তিও লাভ করেছে।

ঘাতক দালাল নির্মূল আন্দোলনের বেলায় যা ঘটেছে, তা আরেকটু প্রকাশ্য ও ব্যাপকভাবে ঘটতে চলেছে গণজাগরণ মঞ্চের বেলায়। ঘাতক দালাল নির্মূল আন্দোলন ও গত বছরের গণজাগরণ মঞ্চের মধ্যে একটি চরিত্রগত ও উদ্দেশ্যগত অভিন্নতা রয়েছে। দুটি আন্দোলনই চরিত্রে অরাজনৈতিক এবং তাদের উদ্দেশ্যও একটিই, তা হলো_ মানবতার শত্রু একাত্তরের ঘাতক ও দালালদের প্রকাশ্য বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান। এর বাইরে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও অভিলাষ এই দুই সংগঠনেরই নেই। থাকার কথাও নয়। গত বছরের গোড়ায় তরুণ প্রজন্মের এই জাগরণ মঞ্চের আন্দোলন এতই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার বিচার ও তার ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করার ব্যাপারে তা হাসিনা সরকারের হাতে শক্তি জোগায়। এই আন্দোলনের শক্তি ও ঐক্য অটুট থাকলে এত দিনে আরও দু’একজন যুদ্ধাপরাধীর দণ্ডাদেশ কার্যকর হয়ে যেত।

ঝতে পেরেই বিএনপি ও জামায়াত পাল্টা হেফাজতি অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র করে। মঞ্চের নেতাকর্মীদের নাস্তিক ও কাফের আখ্যাদান, তাদের ব্লগার হত্যা ইত্যাদিসহ জাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে প্রচার অভিযান প্রকট হয়ে ওঠে। তাতে মঞ্চের ঐক্য ও শক্তিকে খর্ব করতে না পেরে সম্ভবত অনেকে নেপথ্যে খেলতে নামেন বলেও আমার সন্দেহ। তারা নেপথ্যে বসে কলকাঠি নাড়তে শুরু করেন বলে দেশে-বিদেশে গুজবও প্রচারিত হয়েছে। পেছনে আরও মদদ জুগিয়েছে শক্তিশালী বিদেশি মহল। যারা ভারতে কংগ্রেস সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য আন্না হাজারে, কেজরিওয়ালকে নতুন রাজনৈতিক দল (আম আদমি পার্টি) গঠন করতে উৎসাহিত করে নরেন্দ্র মোদির দিলি্ল দখলের পথ প্রশস্ত করতে চেয়েছে।

বাংলাদেশেও হাসিনা সরকারের প্রতি অপ্রসন্ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সুযোগ পেলে আওয়ামী লীগের পাল্টা শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনে উস্কানি দেবে না_ তা ভাবা যায় না। জাগরণ মঞ্চের নেতা হিসেবে ইমরান সরকার কি তাদের আন্দোলনের ঐতিহাসিক সাফল্যে গর্বিত হয়ে এই সম্মিলিত চক্রান্তের ফাঁদেই পা দিয়েছিলেন? তার মধ্যে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছিল? বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। আবার অবিশ্বাস করাও কঠিন।

গণজাগরণ মঞ্চকে কোনো রাজনৈতিক ভূমিকায় নিতে না চাইলে কাদের মোল্লার দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তান পার্লামেন্টে যখন নিন্দা প্রস্তাব ওঠে, তখন তার কঠোর প্রতিবাদ জানানোর মধ্যে মঞ্চের ভূমিকা সীমাবদ্ধ না রেখে ইমরান কেন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে_ এই রাজনৈতিক দাবি জানিয়ে মাঠে নামেন? বিদেশি দূতাবাস অবরোধ করেন এবং পুলিশের সঙ্গে দাঙ্গায় জড়িত হন? জাগরণ মঞ্চ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ডাদেশ কার্যকর করার জন্য আন্দোলন করতে পারে। কিন্তু অপর দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি জানিয়ে তা কার্যকর করার জন্য দেশের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামা তো তার এখতিয়ারভুক্ত নয়। সেটা রাজনৈতিক আন্দোলন। রাজনৈতিক দল প্রয়োজনে সে আন্দোলন করবে। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি বা গণজাগরণ মঞ্চ এই দাবি জানাতে পারে। কিন্তু এটা তো তাদের আন্দোলনের ইস্যু নয়। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি এই ভুলটি করেনি।

শুধু পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবির ব্যাপারে নয়, আরও কয়েকটি ইস্যুতে ইমরান সরকার এমন বক্তব্য রেখেছেন এবং কর্মপন্থা নিয়েছেন, যাতে অনেকের মনেই সন্দেহ দেখা দিতে পারে যে, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাকে পেয়ে বসেছে এবং তিনি দেশে আওয়ামী লীগের বিকল্প দল ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান। এই উদ্দেশ্যটি ইমরান সরকারের মনে না থাকলেও নেপথ্যের একটি চক্রান্তকারী মহল এই সন্দেহটি অনেকের মনে ঢুকিয়েছে। যার ফলে সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত হয়েছে আওয়ামী লীগ এবং সম্ভবত আওয়ামী লীগের পরামর্শেই ছাত্রলীগ ও যুবলীগ জাগরণ মঞ্চ থেকে সরে গেছে। শুধু সরে যাওয়া নয়, জাগরণ মঞ্চের দ্বিধাবিভক্তিরও কারণ ঘটিয়েছে।

সর্বশেষ পরিস্থিতি এই যে, জাগরণ মঞ্চের আওয়ামী লীগ সমর্থক অংশটি ইমরান সরকারকে মঞ্চের মুখপাত্রের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে ইমরান সরকার এই বিভক্তির জন্য আওয়ামী লীগের ওপর দোষারোপ করে বলেছেন, গণজাগরণ মঞ্চের আর কোনো প্রয়োজন আওয়ামী লীগের কাছে নেই। তিনি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তার প্রতিপক্ষও তার বিরুদ্ধে মঞ্চের জন্য চাঁদাবাজি, সংগৃহীত বিপুল অর্থের হিসাব না দেওয়া, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ ও মঞ্চকে রাজনৈতিক দলে রূপান্তরের চেষ্টা ইত্যাদি অভিযোগ ফলাও করে প্রচার করছে। ১৮ এপ্রিল শুক্রবার মঞ্চের দুই অংশ ঢাকা শহরের একই স্থানে পাল্টাপাল্টি যে সমাবেশ ডেকেছিল, পুলিশ তা অনুষ্ঠানের অনুমতি দেয়নি।

মাত্র এক বছর আগে গড়ে ওঠা দেশের তরুণ প্রজন্মের ঐক্য ও শক্তির প্রতীক এই ঐতিহাসিক সংগঠনটির এমন করুণ পরিণতি দুঃখজনক। এতে মুচকি হাসছেন নেপথ্যে বসে যারা সংগঠনটি ভাঙার জন্য কলকাঠি নেড়েছেন এবং লাভবান হয়েছে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার শত্রুশিবির। হেফাজতিদের ঐক্যে ভাঙন ধরেনি। ভাঙন ধরেছে গণজাগরণ মঞ্চে।

এই ভাঙনের জন্য আওয়ামী লীগ এবং জাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বের একটি অংশ উভয় পক্ষই দায়ী। আওয়ামী লীগ রজ্জুকে সর্পভ্রম করেছে। ইমরান সরকার আওয়ামী লীগের জন্য কোনো হুমকিই নয়। যেমন হুমকি ছিলেন না শহীদ জননী জাহানারা ইমামও। ড. কামাল হোসেন থেকে কাদের সিদ্দিকীর মতো ব্যক্তিরা যেখানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে ইমরান সরকারের মতো এক আকস্মিক নেতার আকস্মিক অভ্যুত্থান আওয়ামী লীগের জন্য কোনো শিরঃপীড়ার কারণ হতে পারে না। ইমরানকে আঘাত করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ আসলে গণজাগরণ মঞ্চের এবং দেশের তরুণ প্রজন্মের শক্তি ও ঐক্যের শিকড়ে আঘাত করেছে। এই ঐক্য দেশে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আওয়ামী সরকারের জন্য অতীব প্রয়োজন। শত্রুপক্ষ ওত পেতে আছে এই অনৈক্য ও বিবাদের জন্যই। অতীতের মতো তারা আবার ছোবল মারার অপেক্ষায়।

অন্যদিকে উচ্চাভিলাষ ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাগরণ মঞ্চের নেতৃত্বের একাংশকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে হয়। সে সঙ্গে তারা হয়তো বাইরে থেকে উস্কানি ও উৎসাহও পেয়েছেন। আন্দোলনের সাফল্যেও তারা মাথা ঠিক রাখতে পারেননি। তারুণ্যের এই হঠকারিতা ও অ্যাডভেঞ্চারিজম থেকে তাদের মুক্ত হওয়া উচিত। তাদের অনৈক্য ও বিবাদের জন্য ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ডাদেশ কার্যকর হওয়া ঝুলে গেছে। এই দণ্ডাদেশ কার্যকর না করার জন্য সরকারের ওপর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়ছে। এই চাপ সরকার প্রতিহত করতে পারবে, যদি দেশের তরুণ প্রজন্ম তথা গণজাগরণ মঞ্চের ঐক্য ও শক্তি অটুট থাকে।

গণজাগরণ মঞ্চের অনৈক্য ও বিবাদের যেমন এখনই পরিসমাপ্তি ঘটা দরকার, তেমনি আওয়ামী লীগের উচিত এই বিভক্তি ঘটানোর উদ্যোগ থেকে দূরে সরে আসা। নইলে গণজাগরণ মঞ্চ হয়তো ভেঙে যাবে, কিন্তু আওয়ামী লীগের জন্য এবং দেশের গণতান্ত্রিক শক্তির জন্যও বিপদ আরও বড় হয়ে দেখা দেবে।

You Might Also Like