খালেদা ছাড়া নির্বাচনে কি পারবে বিএনপি?

khaleda111কাজী সিরাজ

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ৬ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। কিছু দিন আগে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, এখন থেকে তিনি গণদাবিভিত্তিক কর্মসূচি দেবেন, যাতে জনগণ তাতে সংশ্লিষ্ট হয়। কর্মসূচিটি নিঃসন্দেহে গণদাবিভিত্তিক ছিল; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, ২০ দল মিলেও কর্মসূচিতে জনগণকে সংশ্লিষ্ট করতে পারেনি। রাজধানী ঢাকাতেই বিক্ষোভ দিবসের কোনো প্রকাশ্য দৃষ্টিগ্রাহ্য কর্মকান্ড ছিল না। জোটের বাকি দলগুলোর মধ্যে জামায়াত ছাড়া অন্য দলগুলো প্যাডসর্বস্বই বলা চলে। জামায়াত এখন কোনো ঝুঁকিতে যাবে না বোঝা যায়। আন্দোলন জমে উঠলে তারা হয়তো মাঠে নামবে। আর সরকারের সঙ্গে কোনো গোপন রাজনৈতিক সমঝোতা হয়ে থাকলে তাদের আন্দোলনে পাওয়া না যাওয়ারই কথা। চরম বিপদের মুখে তারা এমন কৌশল নিতেই পারে। সরকারও সবল একটি লড়াকু শক্তিকে বিএনপি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইতে পারে দুইটি কারণে- এক. বিএনপির আন্দোলনের নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর শক্তিকে বিযুক্ত করে বিএনপি জোটের আন্দোলনের ধার কমিয়ে দেয়া, দুই. আগামী নির্বাচনে কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ শতাংশ ভোট বিএনপি থেকে সরিয়ে নেয়া। বিএনপির তো এখন বয়স হয়েছে। তাদের তো রাজনীতির এই হিসাব বোঝা উচিত। তাহলে যে কোনো আন্দোলন কর্মসূচিতে বিএনপিকে নিজের পায়েই দাঁড়াতে হবে। নির্ভর করতে হবে আপন শক্তির ওপর। কিন্তু কই? ৬ সেপ্টেম্বর তা তো দেখা গেল না। ঢাকার বাইরেও কর্মসূচি পালনের তেমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি। বিএনপির লোকজনকে তাদের পৌনঃপুনিক ব্যর্থতার কথা এবং অধিকাংশ বড় নেতার নিষ্ক্রিয়তা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলেই জবাব আসে, ‘কী করব ভাই, কথা বললে, মাঠে নামলেই লাঠি, গুলি, টিয়ার গ্যাস, মামলা-মোকদ্দমা, জেল, রিমান্ড।’ তাদের এ ধরনের কথাবার্তা শুনলে তো মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরক্ত হয়ে ক্ষমতা ছেড়ে না দিলে তারা আর কিছু করতে পারবেন না। এ জায়গাতেই আওয়ামী লীগ থেকে শিক্ষা নেয়ার কথা আসে। স্বৈরাচার এরশাদ আমলে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলন-সংগ্রামের কথাও স্মরণ করতে পারে বিএনপির তরুণ তুর্কিরা। অবশ্য এরশাদের স্বৈরাচারী শাসন বর্তমান ‘গণতান্ত্রিক’ শাসনের কাছে লজ্জা পাচ্ছে।

বিএনপির কাছ থেকে দেশ ও জনগণের প্রত্যাশা অনেক। দলটি গঠনের পেছনে যে ঐতিহাসিক কার্যকারণ ছিল তা ছিল তখন দেশ ও জনগণের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষাপ্রসূত। সময়টা আমাদের একটু খেয়াল করতে হবে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নিষ্ঠুর হত্যাকা- এবং একদলীয় বাকশাল শাসনের অবসানের পর থেকে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি গঠনের পূর্ব পর্যন্ত ওই ক’বছর দেশে প্রকাশ্য কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে একটিমাত্র জাতীয় দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ-বাকশাল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। জিয়াউর রহমানের আমলে পঞ্চম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় বাকশালপ্রথা বাতিল করে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। এই সাংবিধানিক সিদ্ধান্তেই বাকশালের গর্ভ থেকে আবার আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম হয় এবং কমিউনিস্ট পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, ন্যাপসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল আবার বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে কর্মকান্ড পরিচালনার অধিকারপ্রাপ্ত হয়। বিএনপিরও জন্ম হয় সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী-পরবর্তী গণতন্ত্রে উত্তরণকালে। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশাল প্রতিষ্ঠার আগেও দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সুখকর ছিল না। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপ ছিল প্রচন্ড চাপের মুখে। বাম প্রগতিশীলরা চরম নিগ্রহ ভোগ করে। বাহাত্তর সালে আওয়ামী লীগের ভ্রূণ থেকেই সাহসী তরুণদের নিয়ে গঠিত হয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ। দুনিয়া তখন ইন্দো-মার্কিন এবং রুশ-ভারত অক্ষশক্তিতে বিভক্ত। বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা ছিল রুশ-ভারত বলয়ভুক্ত। বাংলাদেশে রুশপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি (সে দলের অনেক প্রভাবশালী নেতা এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও প্রভাবশালী নেতা ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী), মুজাফফর ন্যাপ বাকশাল গঠনের আগে থেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে একাট্টা ছিল। তারা তিন দল মিলে প্রথম গড়েছিল ত্রিদলীয় ঐক্যজোট এবং পরে গণঐক্যজোট। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী এবং বিএনপি গঠনের পর সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী শক্তি ও জনগণের সামনে রাজনীতি করার নতুন দুয়ার অবারিত হয় এবং আবার বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা ও অনুশীলনের সুযোগ ঘটে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য দুইটি বিষয়ই ছিল জরুরি। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঐন্দ্রজালিক নেতৃত্বে বিএনপি দেশ ও জাতির (সামগ্রিক অর্থে) সে চাহিদা পূরণ করেছে। সে চাহিদা ও গণআকাঙ্ক্ষা এখনও বিদ্যমান। কিন্তু বিএনপি কি দেশ ও জাতির সে চাহিদা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারছে? এক অক্ষরে জবাব- না।

কেন পারছে না বিএনপি? স্পষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হবে আদর্শচ্যুতির কথা।

প্রেসিডেন্ট জিয়ার চিন্তা, বিশ্বাস ও দর্শনের সুস্পষ্ট প্রকাশ আছে বিএনপির ঘোষণাপত্রের শুরুতেই। ঘোষণাপত্রের শুরুটা এখনও ঠিক এভাবেই আছে- ‘ঐতিহাসিক মুক্তি সংগ্রামের সোনালি ফসল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আমাদের পবিত্র আমানত এবং অলঙ্ঘনীয় অধিকার। প্রাণের চেয়ে প্রিয় মাতৃভূমির এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুদৃঢ় ও সুরক্ষিত করে রাখাই হচ্ছে আমাদের কালের প্রথম ও প্রধান দাবি। বিবর্তনশীল ইতিহাস এবং সাম্প্রতিক জীবনলব্ধ অভিজ্ঞতা আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত গণপ্রচেষ্টা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কালজয়ী রক্ষাকবচ। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অতন্দ্র প্রহরী হচ্ছে যথাক্রমে- এক. বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অনুপ্রাণিত ও সংহত ইস্পাতকঠিন গণঐক্য, দুই. জনগণভিত্তিক গণতন্ত্র ও রাজনীতি এবং তিন. ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত জনগণের অক্লান্ত প্রয়াসের ফলে লব্ধ জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তি, আত্মনির্ভরশীলতা ও প্রগতি।’ জিয়া তার জীবদ্দশায় দলের কর্মধারা পরিচালনা করেছিলেন এই ঘোষণা অনুযায়ী। তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন দল গঠনের আগে। লক্ষ্যে অবিচল জিয়া পরে ১৯ দফাকে তার দলের কর্মসূচি হিসেবেও গ্রহণ করেন। বিএনপির ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত এখন ক’জন নেতা আছেন যারা জিজ্ঞেস করলে এসব সম্পর্কে বলতে পারবেন? দল কি স্থির আছে জিয়ার নির্দেশিত লক্ষ্যে ও পথে? নেই। নেই বলেই পদে পদে বিপদে পড়ছে বিএনপি। জিয়াউর রহমান দল এবং সরকারকে আলাদা করে রেখেছিলেন। দলে খুব প্রয়োজন না হলে যারা সরকারে ছিলেন তাদের দলের নেতৃত্বে রাখেননি। সব এমপি থানা কমিটি দখল করে রাখেননি। ঢাকায় বসে বরিশালের কমিটি করার সুযোগ ছিল না। কমিটি বেচাকেনার চিন্তাও করা যায়নি। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন হয় তারই আমলে। ক’জন প্রার্থীর কাছে মনোনয়ন বিক্রি করা হয়েছিল? খালেদা জিয়া তো দূরের কথা, তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ, এমনকি দূরাত্মীয় কাউকে কি তিনি দলে বা সরকারে ঠাঁই দিয়েছিলেন? কিন্তু এখন? কোনো একটি ব্যাপারেও জিয়ার বিএনপির সঙ্গে বর্তমান বিএনপিকে মেলানো যায় না। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায়ই বলেন, বিএনপি এখন আদর্শচ্যুত, লক্ষ্যচ্যুত একটি রাজনৈতিক দল। দলটি গঠনে এবং গড়ে ওঠার পেছনে যে শর্তগুলো কাজ করেছে, সে শর্তগুলো এখনও বিদ্যমান থাকায় জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি অংশ এখনও এ দলকে সমর্থন করে। জিয়া জনগণের সমর্থনকে কাজে লাগিয়েছেন দলের কাজে, চূড়ান্তভাবে দেশের কাজে। তার রাজনৈতিক বিরোধিতা করেন প্রতিপক্ষ; কিন্তু তার ব্যক্তিগত সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং দেশপ্রেম নিয়ে শত্রুরাও প্রশ্ন তোলে না। অথচ বর্তমান বিএনপি নেতৃত্ব নিয়ে এমন কোনো নেতিবাচক বিষয় নেই, যা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না, সমালোচনা হয় না। এটা বহুল আলোচিত যে, বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটি এখন রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণে নেই। দলে স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যানবৃন্দ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামন্ডলী (ভাইস চেয়ারম্যান পদমর্যাদাসম্পন্ন), সম্পাদকম-লী, নির্বাহী কমিটিসহ বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন আছে অনেক। কিন্তু সবই ঠুঁটো জগন্নাথ। দল নিয়ন্ত্রণ করেন খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের নিযুক্ত ‘রাজকর্মচারীরা’। এরা দলের সিনিয়র নেতাদের চেয়েও শক্তিশালী। সপ্তাহ খানেক আগে দৈনিক প্রথম আলো খবর ছেপেছে যে, বিএনপির অনেক সিদ্ধান্ত নেয় গুলশান অফিসের কর্মচারীরা। বিএনপির এই বাস্তবতার কথা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলে আসছেন অনেক দিন ধরেই। কিন্তু কোনো পরিবর্তন নেই। সরকারি নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগ সর্বাংশে সত্য বলে ধরে নিলেও বিএনপির মতো একটি বিপুল গণসমর্থিত দল বেঁচে আছে না মরে গেছে তা বোঝা যাবে না কেন? আসলে বিএনপি এখন কী করবে, কী করা উচিত, কীভাবে করা উচিত তা-ই বোধহয় ঠিক করতে পারছে না। এসব ঠিক করার জন্য উপযুক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব লাগে, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা-পরামর্শ করা লাগে। কিন্তু এসবের কোনো বালাই নেই এই দলে। কারও কোনো মূল্যই তো নেই পছন্দের ফুট-ফরমাশ খাটা কর্মচারীরা ছাড়া। শোনা যায়, গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত গুলশান অফিসের পিয়নরাও জানে স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বড় বড় পদধারী ব্যক্তিদের আগে। এভাবে চলতে এবং চালাতে গিয়েই দলের ‘বারোটা’ বাজার দশা।

বিএনপি এখন আগাম একটা সংসদ নির্বাচন চায়। এ চাওয়ার পেছনে ন্যায্যতা মানেন দেশ-বিদেশের অনেকে। কিন্তু চাইলেই তা পাওয়া যাবে, নাকি জাতিসংঘ বা বিদেশি বন্ধুরা সে ব্যবস্থা করে দেবে? পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এজন্য বিএনপির সক্ষমতার প্রমাণটাও জরুরি। কিছু দিন আগে বিএনপি চেয়ারপারসন গণদাবির ভিত্তিতে গণসংশ্লিষ্ট কর্মসূচি দেয়ার কথা বলেছিলেন। আরেকটি কথা বলেছিলেন যে, কোথাও দলের পকেট কমিটি করা যাবে না। দুইটি বক্তব্যের বিশ্লেষণ করলে তো এই দাঁড়ায় যে, এক. এর আগে গৃহীত কর্মসূচিগুলো গণদাবিভিত্তিক গণসংশ্লিষ্ট কর্মসূচি ছিল না। এ বছরের জানুয়ারি-মার্চ তিন মাসের হিংসাশ্রয়ী আন্দোলনের প্রতি-ই তিনি হয়তো ইঙ্গিত করে থাকবেন। তার এ উপলব্ধি যথার্থ, দুই. বিএনপিতে এতদিন যে পকেট কমিটি হয়েছে, পদ-পদবি বেচাকেনা হয়েছে তা-ও স্পষ্ট হয়েছে পকেট কমিটি করার বিরুদ্ধে হুশিয়ারি থেকে। তার আন্দোলনের ডাক বারবার ব্যর্থ হওয়ার কারণ যে অফিসের দারোয়ান-পিয়ন, আয়া-বুয়া দিয়ে কমিটি করা এবং সৎ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করা, তা-ও স্পষ্ট হয়েছে। আগাম বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের লক্ষ্যে বিএনপির সামনে দুইটি কাজ। এক. দ্রুত নির্বাচনের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, দুই. নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করা। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য সারা দেশে গণযোগাযোগ এবং জনগণকে সংশ্লিষ্ট করার মতো কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। এ জন্য সর্বাগ্রে গুলশান অফিস নিষ্ক্রিয় করে দিতে হবে। এরপর অসৎ, দুর্নীতিবাজ, অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নেতৃত্ব কাঠামো থেকে বাদ দিয়ে মাঠকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে তরুণ, সাহসী, লড়াকু নেতাকর্মী, সংগঠকদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। মামলা, হামলার কথা বলে যারা পালিয়ে থাকে, কখনও কখনও তলে তলে আপস করে, তাদের হিসাবের খাতা থেকে বাদ দিতে হবে। অহিংস গণমুখী কর্মসূচি নিয়ে খালেদা জিয়াকেই আবার সভা-সমাবেশ, লংমার্চ-রোডমার্চ ইত্যাদি জনপ্রিয় কর্মসূচির কথা ভাবতে হবে। শোনা যাচ্ছে, সরকারও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা বাস্তবতায় আগাম নির্বাচনের কথা ভাবছে। সে ক্ষেত্রে বিএনপি কি তার ‘পুরনো চালান’ নিয়ে বাজিমাৎ করার স্বপ্ন দেখছে? সে স্বপ্ন কিন্তু দুঃস্বপ্ন হবে। মনোনয়ন কেনাবেচার সর্বনাশা পথ পরিহার করতে হবে। শোনা যায়, গুলশান অফিসের ‘বড় বাবুরা’ এরই মধ্যে অনেককে ক্লিয়ারেন্স দিয়ে রেখেছেন। হয়তো অ্যাডভান্সও নিয়ে ফেলেছেন। ওইসব ক্লিয়ারেন্স বাতিল না করলে এবার দলের প্রার্থী দলের লোকদের দ্বারাই বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় একটি বাস্তবানুগ কথা বলেছেন যে, খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে ছাড়াও বিএনপি নির্বাচনে যেতে চায়। এর অর্থ এই নয় যে, তিনি খালেদা-তারেককে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার কথা বলেছেন। আশঙ্কা করা হয় যে, সরকার খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের জন্য অযোগ্য ঘোষণার কৌশল নিতে পারে। চলমান কোনো একটি ফৌজদারি মামলায় তার দুই বছরের বেশি জেলসাজা হয়ে গেলে সরকারের আশা পূর্ণ হবে। এটি একটি আইনি প্রক্রিয়া। আইনি লড়াইয়ে গিয়ে অনুকূলে রায় আনতে আনতে সরকার আগাম নির্বাচনের ব্যবস্থা করে নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন করলে তো খালেদা জিয়াকে ছাড়াই করতে হবে। ফের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত হবে হঠকারী সিদ্ধান্ত। তারেক রহমানের ব্যাপারটা তো চূড়ান্তই। বিএনপি সরকার গঠন করতে না পারলে তারেক রহমান দেশে ফিরবেন, এমন আশা করা যায় না। বিএনপি সংসদে একশপ্লাস সদস্য নিয়ে শক্তিশালী একটি বিরোধী দল হতে পারলেও তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার একটা বার্গেইনিং পাওয়ার অর্জন করতে পারে। তার আগে তারেক রহমানকে নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কোনো কারণ নেই। কাজেই নির্বাচনের সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজনে খালেদা জিয়া-তারেক রহমানকে ছাড়াও নির্বাচনে লড়ার সাহস দেখাতে হবে বিএনপিকে। এবার কোনো অজুহাতে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত হবে বিএনপির জন্য আত্মঘাতী। অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ে যাবে দলটি। গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বক্তব্য তাই যথার্থ। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ভোটের রাজনীতিতে তারেক রহমান এখন কোনো ফ্যাক্টর নন। সেই ভাবমূর্তি তিনি গড়ে তুলতে পারেননি। তবে খালেদা জিয়া বিএনপির ভোট-কারেন্সি। তাকে কারাগারে রেখে যদি বিএনপিকে নির্বাচন করতে হয়, তা দলটির জন্য সোনায় সোহাগা হয়ে যেতে পারে। মুক্ত খালেদা জিয়ার চেয়ে বন্দি খালেদা জিয়া হয়ে যেতে পারেন অধিক শক্তিশালী।

কাজী সিরাজ : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলাম লেখক

You Might Also Like