খালেদার কারামুক্তি কতদূর?

মিথুন রায় : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ৫ বছরের সাজা হয়েছে। রায় ঘোষণার দিন (৮ ফেব্রুয়ারি) থেকে এখনও পর্যন্ত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী কারাবন্দি আছেন। শুরুতে বিএনপির আইনজীবীরা বলছিলেন- রায়ের অনুলিপি হাতে পেলেই উচ্চ আদালতে যাবেন তারা। এবং সর্বোচ্চ দু-চার দিনের মধ্যেই হাইকোর্ট থেকে জামিন পাবেন খালেদা জিয়া। কিন্তু আইনজীবীদের সেই দু-চার দিনের আশাবাদ এরই মধ্যে পেরিয়ে যাচ্ছে। তথাপি এখনও সুনির্দিষ্ট ভাবে বলা যাচ্ছে না- কবে, কখন কারামুক্ত হচ্ছেন খালেদা জিয়া।
উল্টো বোঝার উপর শাকের আঁটি হয়ে মাথায় উঠছে আরও একাধিক গ্রেফতারি পরোয়ানা। এরইমধ্যে কুমিল্লায় নাশকতার মামলাসহ বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচ মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। কুমিল্লার দুটি মামলায় হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিলেও অপর তিনটি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনকে গ্রেফতার দেখানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ।
একটি মামলায় এরই মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাছে পৌঁছেছে গ্রেফতারি পরোয়ানা। গত সোমবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ওই পরোয়ানায় খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার দেখানোর প্রায় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে যে কোনও সময় বিএনপি চেয়ারপারসনকে নাশকতার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হতে পারে।
খালেদা জিয়ার সাজার রায় পরবর্তী বিএনপি বড় কোনও নাশকতা কিংবা বিশৃঙ্খলার পথ বেছে নেয়নি। ব্যালটের মাঠে এই এপ্রোচকে ইতিবাচকভাবে দেখছে সচেতন জনগণ। তবে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও দলীয় নেত্রীর মুক্তির দাবিতে রাজপথে আছে দলটির নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যে রায় পরবর্তীও দলের একাধিক শীর্ষ নেতাকে নাশকতার মামলায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ ধরনের গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত থাকবে জানিয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- বিএনপির ‘শান্তিপূর্ণ’ কোনও কর্মসূচিতে বাধা দেবে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এমতাবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কূটনৈতিকগণ মনে করছেন, শুধু জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার জামিন নয়, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সামনে দীর্ঘ আইনি লড়াই মোকাবিলা করতে হতে পারে। ফলে তাঁর কারামুক্তি খুব দ্রুত হবে না। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ কারাবাসের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকেই।
এদিকে ২০০৮ সালের শাহবাগ ও তেজগাঁও থানায় দায়ের করা দুই মামলায় খালেদা জিয়াকে পৃথক দিনে আদালতে হাজির করতে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে গত সোমবার হাজিরা পরোয়ানা পাঠানো হয়েছে। তবে কুমিল্লার যে দুটি মামলায় হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিয়েছে এর বিরুদ্ধে সরকার কোনও আইনি পদক্ষেপে যাবে কিনা জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘এর ‘মেরিট’ আমরা খতিয়ে দেখছি। এরপর পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
অন্যদিকে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে- কবে মুক্তি পাবেন খালেদা জিয়া? বিএনপি চেয়ারপারসনের কি দীর্ঘ কারাবাস হবে? সরকার কি বেগম জিয়ার মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চালিত করতে চাইছে? এমন বহু প্রশ্ন যখন জনমানসে উঁকি দিচ্ছে তখন খালেদা জিয়ার কারামুক্তি কিংবা তাঁর দীর্ঘ কারাবাস প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, দুর্নীতি দমন কমিশন কিংবা বিভিন্ন পক্ষের আইনজীবীদের কাছ থেকেও পাওয়া যাচ্ছে পৃথক বক্তব্য।
দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘কোনও মামলায় কারও একাধিক গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলে সবগুলো নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই।’
খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও বারের সেক্রেটারি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে খালেদা জিয়ার অন্য মামলাগুলো সামনে নিয়ে আসছে সরকার। তবে আইনি প্রক্রিয়া মোকাবিলা করে তাকে কারাগার থেকে বের করে আনা হবে।’
কারাগারের ডিআইজি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি ও ৪ মার্চ খালেদা জিয়াকে পৃথক মামলায় আদালতে উপস্থিত করতে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে হাজিরা পরোয়ানা পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কুমিল্লায় নাশকতার ঘটনায় কোনও গ্রেফতারি পরোয়ানা হাতে পাইনি।’
এদিকে খালেদা জিয়ার কারাবাসকালীন অতীতের প্রায় সব মামলার ফাইল ঘাঁটতে শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কোন কোন মামলা কি অবস্থায় আছে তা নতুন করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।
সূত্র মতে, বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে দুর্নীতি, ভুয়া জন্মদিন, মানুষ হত্যা, নাশকতা, মানহানিসহ নানা অভিযোগে মোট ৩৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি মামলা দুর্নীতির। তা হলো- গ্যাটকো দুর্নীতি, নাইকো, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতির মামলা। ৩৬টি মামলার মধ্যে চারটি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে, বাকি মামলা বর্তমান সরকারের আমলে করা হয়। মামলাগুলোর মধ্যে ১৯টি মামলা বিচারাধীন। আরও ১২টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে।
তবে যেহেতু খালেদা জিয়ার সাজা হয়েছে এবং তিনি কারাবন্দি আছেন, ফলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত তা নিয়েও প্রশ্ন জেগেছে দেশবাসীর মনে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে তৈরি হচ্ছে শঙ্কা। সংবিধান ও নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, নৈতিক স্খলনজনিত কারণে অভিযুক্ত হয়ে কারও দুই বছরের অধিক সাজা হলে সাজার পরবর্তী পাঁচ বছর তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হবেন। জিয়া অরফানেজ স্ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিচারিক আদালত বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। সেই দিক থেকে তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটে লড়ার অযোগ্য। তবে সুযোগ থাকছে তাঁর সামনে। সেক্ষেত্রে আপিল করে ভোটে অংশ নিতে পারবেন খালেদা জিয়া।
আইন অনুযায়ী বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে বিচারিক আদালতের রায়কে পূর্ণাঙ্গ রায় বলা যাবে না। বেগম জিয়ার আইনজীবীরা এখন বিচারিক আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আপিল আবেদন করতে পারবেন। হাইকোর্ট কিংবা আপিল বিভাগে বিচারিক আদালতের রায় স্থগিত ঘোষণা হলে কিংবা খালেদা জিয়াকে জামিন দেয়া হলে নির্বাচনে অংশ নিতে তাঁর আর কোনও বাধা থাকবে না। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতে বিচারিক আদালতের রায় বহাল থাকার পর যদি খালেদা জিয়া সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, তখন তাঁর সংসদ সদস্য পদ চাইলে বাতিল ঘোষণা করতে পারবেন আদালত।
তবে পুরনো একটি মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার দেখানোর পর বিএনপি নেতাকর্মীরাও মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে বিএনপি চেয়ারপারসনকে কারাবন্দি রাখার জন্যই সরকার এমন পরিকল্পনা করছে। সরকারের হস্তক্ষেপ ও দিকনির্দেশনায়ই পুরনো মামলাগুলো আবার জেগে উঠছে। সরকার সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই এসব করছে। তবে দলটির শীর্ষ নেতারা এ-ও মনে করেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিপূর্ণ ও অহিংস আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশনেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কারামুক্ত করা হবে।
এদিকে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুসারে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানেরই হাল ধরার কথা। কিন্তু তিনিও ১০ বছর ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন। তা ছাড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদার পাশাপাশি তারেকেরও ১০ বছর এবং এর আগে অর্থপাচার মামলায় ৭ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। আইনের চোখে এখন তিনি পলাতক। ফলে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দল পরিচালনা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে বিএনপিকে।
এ বিষয়ে এরই মধ্যে দলীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সাজা হতে পারে এমন ধারণা থেকেই আগামী কয়েক সপ্তাহ দলের করণীয় নির্ধারণ করে দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তাই আপাতত নতুন কোনও নীতি গ্রহণের প্রয়োজন নেই বলে মনে করছে দলটির শীর্ষ নেতারা। তবে তারা আশা করছেন খালেদা জিয়া শিগগিরই জামিনে মুক্তি পাবেন। এরপর সবকিছু তাঁর নির্দেশেই পরিচালিত হবে। এই সময়ে তারেক রহমান দূর থেকে মূল দায়িত্ব পালন করবেন। যদিও তার বক্তব্য প্রচারে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আর তাই তারেক রহমান চাইলেও তিনি সরাসরি কিছু করতে পারবেন না। সেজন্য সামনে থেকে এখন মূল দায়িত্বটা মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইমলাম আলমগীরকেই পালন করতে হবে। আর তিনি সেটিই করছেন।
লেখক: কবি ও সংবাদকর্মী

You Might Also Like