‘খাঁচাবন্দী পাখি’ রাষ্ট্রপতি!

রাষ্ট্রপতি নিজের ভালো না থাকার কথা অকপটে বলতে পেরেছেন। বাক্স্বাধীনতা অনুশীলন নির্মল আনন্দের বিষয়। নাগরিকদের সঙ্গে তিনি তাঁর নিরানন্দ প্রকাশের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন এমন সময়ে, যখন বাংলাদেশে অগ্নিস্নান চলছে।
প্রতিবেশী দেশের স্পিকারের সঙ্গে আমাদের মিল কেবলই নারীবিষয়ক। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভারতীয় নেতা প্রণব মুখার্জির সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের তুলনা করার অবকাশ আছে। দুজনেরই রাজনীতির শিকড় গভীরে। প্রণব মুখার্জি রাষ্ট্রপতি হিসেবে এক বছর পূর্ণ করেন গত বছরের ২৫ জুলাই। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদ সংস্থা দুই ক্ষেত্রেই খবর পরিবেশন করেছে। পিটিআই তথ্যনির্ভর, বাসস মন্তব্যনির্ভর।
বঙ্গভবনের সূত্র জানায়, বঙ্গভবনের সঙ্গে যুক্ত থাকা তিনটি সংবাদ সংস্থা বাসস, ইউএনবি ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর প্রতিনিধির সঙ্গে রাষ্ট্রপতি কথা বলেন। রাষ্ট্রপতির অনুভূতির যে বিবরণ তারা প্রকাশ করেছে, তা রাষ্ট্রপতির দপ্তর দেখে দিয়েছে। এ তথ্য নিশ্চিত করে যে এটা ঠিক সংবাদ সম্মেলন নয়, আবার রাষ্ট্রপতি তাঁর অনুভূতি সুচিন্তিতভাবে প্রকাশ করেছেন।
আমাদের কাছে একটি বার্তা স্পষ্ট যে রাষ্ট্রপতি যিনি সাংবিধানিক প্রধান, ‘রাষ্ট্রের অন্য সকলের ঊর্ধ্বে’, তাঁর মন ভালো নেই। তিনি তাঁর দায়িত্ব উপভোগ করছেন না। প্রণবের মন ভালো না থাকার খবর নেই। প্রথম বছরে বিক্ষোভরত জনতা সরাসরি তাঁর হস্তক্ষেপ চেয়েছে। তাঁর দুয়ারে ধরনা দিয়েছে। সেটা ছিল ২৩ বছরের প্যারা মেডিকেল ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায়। হামিদের প্রথম বছরে মানবিক ট্র্যাজেডি অনেক ঘটেছে। কিন্তু জনগণ তাঁর কাছে ছুটে যায়নি। প্রণব ২৩টি রাজ্যে ও ৩৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গেছেন। বাসস এ রকম নির্দিষ্ট তথ্য দেয়নি। এমনকি রোববার একজন মুখপাত্রের কাছে যখন জানতে চাই, তখন তিনিও কিছু বলতে পারেননি।
ঔপনিবেশিক আমল থেকে প্রধান নির্বাহীকে ‘হিজ এক্সিলেন্সি’ কথাটি বলা হয়। সমাজ থেকে দাবি ওঠেনি। তবু ২০১২ সালের অক্টোবরে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে বিবৃতি এল। বলা হলো, ‘হিজ এক্সিলেন্সি’ আর চলবে না। দেশের অনুষ্ঠানে এবং দেশীয় লোকজন যখন রাষ্ট্রপতিকে সম্বোধন করবেন, তখন তাঁরা এটা আর বলবেন না। রাষ্ট্রপতি বা গভর্নরকে সম্বোধন করতে ‘অনারেবল’ বললেই চলবে। তবে ভারতীয় প্রটোকল অনুযায়ী নামের আগে যথারীতি শ্রী বা শ্রীমতি বসবে। এক্সিলেন্সি কেবল বিদেশি নেতা বা প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় থাকবে। সেটাই আন্তর্জাতিক রীতি।
প্রণব মুখার্জি আরও জানিয়ে দেন, রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের নথিতে রাষ্ট্রপতি নামের আগে ‘মহামহিম’ চলবে না। রাষ্ট্রপতিজি লিখলেই চলবে। বাংলাদেশ প্রশাসন একবার ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউতে শিরোনাম হলো। সম্ভবত লেডি ইজ স্যার। এর মানে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পরিপত্র দিয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীকে ম্যাডাম নয়, স্যার বলতে হবে। প্রণব বিলাতের কাগজে শিরোনাম হয়েছেন যে তিনি জনগণের রাষ্ট্রপতি। আমাদের সরকারি ওয়েবসাইটে রাষ্ট্রপতির আগে হিজ এক্সিলেন্সি কথাটি লেখা আছে।

আবদুল হামিদ যানজটের কারণে কোথাও আসা-যাওয়ার ব্যাপারে শঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। এ ক্ষেত্রে উত্তম ওষুধ আবিষ্কার করেছেন প্রণব। তাঁর যুক্তি, নগরের মধ্যে তাঁকে বহনকারী যানবাহন যখন চলাচল করে, তখন জনগণের অসুবিধা হয়। পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার লোকদের ওপর চাপ পড়ে। সে জন্য তাঁর স্থায়ী নির্দেশ হচ্ছে, যত দূর সম্ভব, যেসব অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির ডাক পড়বে, সেসব অনুষ্ঠান রাষ্ট্রপতি ভবন চত্বরেই আয়োজন করতে হবে। এটা দিল্লিতে যুক্তিসংগত হলে ঢাকায় হাজারবার হওয়া উচিত।
ভারতের বাঙালি প্রধান বিচারপতি আলতামাশ কবির স্টার ভবনের ভাষণে এমন যানজট জীবনে দেখিনি বলার পর প্রশ্ন করলেন, প্রশাসনেরও একই হাল কি না। পরক্ষণেই হাসলেন। বললেন, এটা রসিকতামাত্র!
দুই দেশেই সংসদীয় গণতন্ত্র। তবে অন্যায়ভাবে আমরা প্রধানমন্ত্রীর হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত করেছি। ভারত সেটা করেনি। বঙ্গভবন সূত্র নিশ্চিত করল যে সাংবাদিকেরা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। রাষ্ট্রপতির মনোভাব হলো, এটা সংসদের বিষয়। যাক, তিনি বলেননি এটা অদরকারি। তবে আনুগত্য ও সংবেদনশীলতা এ দেশে যমজ বোন। তাই বুঝি আলোচনার এই অংশটির তথ্য প্রকাশ পর্যন্ত পায়নি।
বঙ্গভবনের অনুরোধে কোনো বিষয় এখনো মন্ত্রিসভার এজেন্ডাভুক্ত হয়নি। বিল ফেরতের ঘটনা ঘটেনি। অবশ্য ৮ জুন ২০১৩ ঢাকা ট্রিবিউনের শিরোনাম ছিল, আমি ক্ষমা করার ক্ষমতা প্রয়োগ করব না। তবে বঙ্গভবন বিবৃতি দেয়নি। অজ্ঞাতনামা সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি লিখেছে, ক্ষমতাধর মহল থেকে দুটি ক্ষমার আবেদন এসেছে, কিন্তু রাষ্ট্রপতি তার কর্মকর্তাদের তা ডিপ ফ্রিজে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। ২০১২ সালের ১৪ নভেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে তথ্য দিয়েছিলেন, ১৯৭২ থেকে ২৫ ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়েছেন। এর মধ্যে কেবল রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানই মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ২১ জনকে ক্ষমা করেন। ট্রিবিউন রাষ্ট্রপতির মন্তব্য ছেপেছে, ‘আমি আমার মেয়াদকালে ক্ষমার ক্ষমতা প্রয়োগ করব না।’ ক্ষমার ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তাই এটা আমরা আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ্য করব।
গণপরিষদ বিতর্কে জওহরলাল নেহরুর যুক্তি ছিল, ওয়েস্টমিনস্টর মডেলই যখন নিয়েছি, তখন প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছেই রাখতে হবে। যদিও মন্ত্রিসভাকে এড়িয়ে রাষ্ট্রপতির কিছুই করার থাকবে না। তদুপরি ফাঁক সৃষ্টি হয়েছিল। ভারতের মূল সংবিধানে লেখা হয়েছিল, মন্ত্রিসভা রাষ্ট্রপতিকে ‘এইড অ্যান্ড অ্যাডভাইস’ করবে। দেখা গেল, ভারতীয় রাষ্ট্রপতিগণ কিছু ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভাকে অগ্রাহ্য করছেন। সুপ্রিম কোর্টও বললেন, এই ‘অ্যাডভাইস’ শক্তপোক্ত কিছু নয়, ঠুনকো। ১৯৭৬ সালে ক্ষুব্ধ ইন্দিরা কাঁচি চালালেন। সংবিধানে সংশোধনী আনলেন। কিন্তু আমরা যেটা শিখব, তা হলো মাথাব্যথার জন্য মাথা কাটা হয়নি। ওই অ্যাডভাইস শব্দটি থাকল ঠিকই। এরপর আরেকটি বাক্য জুড়লেন ইন্দিরা। লিখেছিলেন, ওই পরামর্শ অবশ্যই মানতে হবে। এর সমালোচনা হলো। বলা হলো, রাবার স্ট্যাম্প রাষ্ট্রপতি চাইনে। ১৯৭৮ সালে জনতা দল আবারও সংশোধন করল। আবারও দেখুন, কেউ কিন্তু রাষ্ট্রপতির হাত থেকে নির্বাহী ক্ষমতা কেড়ে নিল না। মন্ত্রিসভা থেকে প্রধানমন্ত্রীকে আলাদা করল না। জমিজমা একজনকে লিখে দিয়ে খাওয়ানো এক জিনিস, আরেকজনকে অলিখিতভাবে খাওয়ানো আরেক জিনিস। এই সরল সত্য বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের মগজে ঢোকে না। তাঁরা বলেন, প্রধানমন্ত্রীই তো সব, তাই বাহাত্তরে তাঁকে লিখে দিয়ে ক্ষতি আর এমন কী হয়েছে?
বাসস জানাচ্ছে, রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘আমি এখানে ভালো নেই। বন্দী পাখিকে যত সুখাদ্য দেওয়া হোক, বনের পাখির সঙ্গে তার কোনো তুলনা চলে না।’ সাতবারের নির্বাচিত সাংসদ ডানা ঝাপটাচ্ছেন। বলেছেন, তাঁর ডেপুটি স্পিকারের জীবনই ছিল শ্রেয়। অবশ্য গত সংসদে বিএনপি থেকে ডেপুটি স্পিকার নিতে শেখ হাসিনার প্রস্তাবে তিনি সায় দেননি বলেই জানা যায়।
আবদুল হামিদের একটি মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ, যখন তিনি বলেন, ‘সংসদে মনের খোরাক পেতাম, বঙ্গভবনে পাই না। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমি অনেক কিছু করতে পারি না এবং আপনারা জানেন, কোনো ইচ্ছা করতে হলে সমস্যা রয়েছে।’ তাঁর আরও মন্তব্য, আমার আগে বঙ্গভবনের উত্তরসুরীরা বেশির ভাগই সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও শিক্ষাবিদ ছিলেন। এই পদ তাঁদের জন্য যথার্থ। কারণ, সাধারণ জনগণের সঙ্গে অবাধ আলোচনায় তাঁদের পরিচিতি থাকে না। কিন্তু আসল সত্য হলো, এখানে প্রবেশের মৌলিক শর্ত তো সব অবস্থায় অপরিবর্তিত থাকে। তাই নজর দিতে হবে সংবিধান ও সংস্কৃতি শোধরাতে। ওটা বদলে গেলে স্বাদ বদলাবে। কোন পেশা থেকে কে এলেন, সেটি তখন বিচার্য হবে না।
বঙ্গভবনের নির্মাণাধীন ওয়েবসাইট দেখে একটা স্বস্তি পেলাম। মনে হলো, জেনারেল জিয়াকে নিয়ে যে বিতর্ক রাজনীতিতে চলছে, তার একটা বিহিত এখানে পেলাম। জিয়া সম্পর্কে লেখা হয়েছে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে তিনি ঐতিহাসিক স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটা যদি ভুলক্রমে না হয়ে থাকে, তাহলে তো এই বিতর্কের আমরা ইতি টানতে পারি। বঙ্গভবনের ওয়েবসাইটের এই সত্য তো বর্তমান সরকার অস্বীকার করতে পারে না।
বঙ্গভবনের জীবন আবদুল হামিদের কাছে সোনার খাঁচা। আর বাইরে দেশের নাগরিকেরা কি যথেষ্ট খাঁচামুক্ত? তাঁরাও হয়তো খাচ্ছেন, দাচ্ছেন, সবকিছুই ঠিকঠাক চলছে। কেবল নেই মানবিক মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। এমনকি ভোটের অধিকারটুকুও কি আছে তাদের?
সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি, গভর্নর জেনারেল বা রাজা-রানির ভূমিকা সীমিতই থাকে। কিন্তু একজন আপাদমস্তক রাজনীতিক বঙ্গভবনে যদি হাঁপিয়ে ওঠেন এবং তা অকপটে প্রকাশ করেন, তখন এটা ভাবার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অবশ্য খাঁচা মনে করলে খাঁচা। সোনার হলেও খাঁচা।
আমি জানি, খাঁচার পাখি কেন গান গায়, বিখ্যাত আফ্রো-মার্কিন কবি ও অভিনেত্রী মায়া অ্যাঞ্জেলুর একটি কবিতা। তার নির্যাস : ‘শ্রেষ্ঠের জন্য আশা, নিকৃষ্টের জন্য প্রস্তুতি এবং এ দুইয়ের মধ্যবর্তী যেকোনো কিছুর জন্য অবাক না হওয়া।’

You Might Also Like