ক্রসফায়ার এনকাউন্টার বন্দুকযুদ্ধ : বাংলাদেশ ও আমেরিকায়

আবিদুর রহিম

বাংলাদেশের পুলিশ এবং ব্যাব কর্মকর্তারা বিশেষ করে যারা ক্রস ফায়ার বা বিচার বিহর্ভুত হত্যাকান্ডের সাখে জড়িত তারা শুনে খুশি হবেন যে বিশ্বব্যাপী ব্যাক্তিস্বাধীনতা এবং মানবাধিকার রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী যুক্তরাষ্ট্রেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড ঘটে। শুধু যে কদাচিত ঘটে তা নয়। মাঝেমধ্যেই এখানে আইন শৃঙখলারক্ষাকারী বাহিনী ঘটাচ্ছে এরকম হত্যাকান্ড। নিচে সেরকম কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করছি। যা জেনে রাখলে হয়তো পুলিশ-ব্যাবের কর্মকর্তা বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রসফায়ারের সাফাই গাওয়ার সময় নিজেদের পক্ষে রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করতে পারবেন! বলতে পারবেন- শুধু আমাদের দেশেই না মানবাধিকারের দেশ যুক্তরাষ্ট্রেও ঘটে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড। সুবিধা হবে প্রধানমন্ত্রীরো, তিনিও সাংবাদিকদের ডেকে নিয়ে জায়গামতো খুচা দিয়ে বলতে পারবেন- “আমাদেরটাই দেখেন, আমরা কিছু করলেই টেলিভিশন-পত্রিকায় ফাটিয়ে ফেলেন! আমেরিকারটা দেখেন না, তাদের হত্যাকান্ড নিয়েতো কোনো রিপোর্ট দেখলাম না।“ যেভাবে কিছুদিন আগে সংবাদ সম্মেলনের নামে সাংবাদিকদের ডেকে নিয়ে জায়গামতো আঙ্গুল দিয়ে বললেন- “কই সৌদী আরবে খালেদার শপিংমল-টাকাপাচার নিয়েতো কাউকে রিপোর্ট করতে দেখলাম না। আমাদের হলেতো ফাটিয়ে ফেলতেন! তারেকের ভয়ে কি সবাই চুপসে গেছেন? নাকি টাকার ভাগ পেয়েছেন?” ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে মাশাআল্লাহ! পৃথিবীর সবচেয়ে ধৈর্যশীল ও লাজুক বাংলাদেশের সাংবাদিকরাও ঐদিন অতীব গুরুত্বপুর্ণ একটি সংবাদ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং সে বিষয়ে সংবাদ করতে না পারার ব্যর্থতার লজ্জায় একেবারে চুপসে গিয়েছিলেন। পরে অবশ্য সাংবাদিকতার সেই লজ্জা ঢাকতে কেউ কেউ সরকার প্রধানের নির্দেশিত সংবাদ তৈরী করতে সরকারের মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চেয়ে সাংবাদিকতার ইজ্জত বাচিয়েছেন। যদিও পরে বেরিয়েছে যে আসলে ঐ সংবাদটির কোনো ভিত্তিই নাকি নেই! যাক খালেদার ঐ সংবাদ সত্য না মিথ্যা সেটি আমার এই লেখার প্রসঙ্গ নয়। বলছিলাম আমার এই লেখাটি পড়লে পুলিশ-ব্যাবের কর্মকর্তা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রীও হয়তো স্বভাবসুলভ ক্রসফায়ার-এনকাউন্টারের পক্ষে রেফারেন্স দিতে পারবেন। তবে তাদের কাছে একটি অনুরোধ, রেফারেন্স দেয়ার আগে আমার এই লেখাটি পুরোটা পড়বেন। “লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়াদিন” এর মতো অর্ধেক সুরা পড়ে যত্রতত্র ভুল রেফারেন্স না দেয়ার অনুরোধ করছি লেখক হিসাবে।
*ঘটনা এক-
১৯৯৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী নিউ ইয়র্ক সিটির ব্রংক্স এর সাউন্ডভিউ এলাকায় পুলিশ গুলিকরে হত্যা করে আমাদো দিয়ালো নামের ২৩ বছর বয়সী এক যুবককে। ধর্ষণ মামলার আসামী দিয়ালোকে পুলিশ আটক করতে গেলে সে পালানোর চেষ্টা করছিল বলে অভিযোগ।
*ঘটনা দুই-
২০১১ সালের ১১ আগষ্ট নিউইয়র্ক সিটির কেন্দ্রস্থল ম্যানহাটনের টাইমস্কয়ারে পুলিশ গুলিকরে হত্যা করে ড্যারিয়াস ক্যানেডি নামে ৫১ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে। সে জনবহুল টাইমস্কয়ারে প্রকাশ্যে একটি ছুরি হাতে পথচারীদের তাড়া করছিল। পুলিশ তাকে আটকের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।
*ঘটনা তিন-
২০১২ সালের ২৪ আগষ্ট নিউ ইয়র্ক সিটির ম্যানহাটনের আরেক ব্যস্ততম এলাকা আম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন জ্যাফরী জ্যাকসন নামের ৫৮ বছর বয়সী এক সশস্ত্র ব্যক্তি। ঘটনার মাত্র কিছুক্ষন আগে জ্যাকসন নিকটস্থ একটি ভবনের সামনে একজনকে গুলিকরে হত্যা করেছিল। পুলিশ তাকে আটক করতে গেলে সে পুলিশের দিকে তেড়ে আসে বলে অভিযোগ।
*ঘটনা চার-
২০১৪ সালের ১৭ জুলাই নিউইয়র্ক সিটির স্ট্যাটেন আইলান্ডে পুলিশের হাতে নিহত হন এরিক গারনার নামের ৪৭ বছর বয়সী এক ব্যাক্তি। অভিযোগ- ফেরী ঘাটের খুব কাছেই বেআইনী কর্মকান্ডের দায়ে এরিককে আটক করতে যায় পুলিশ, এসময় পুলিশের সাথে ধ্বস্তাধ্বস্তির এক পর্যায়ে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান এরিক। সে সময় ঐ ঘটনায় গোটা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। পরে অবশ্য বিচারকের রায়ে মোটা অংকের ক্ষতিপুরণ দেয়া হয় এরিক গারনারের পরিবারকে।
*ঘটনা পাচঁ-
২০১৪ সালের ৯ আগষ্ট যুক্তরাষ্ট্রের মিশৌরী রাজ্যের ফারগুসনে মাইকেল ব্রাউন নামের ১৮ বয়সী এক তরুণকে গুলিকরে হত্যা করে পুলিশ। অভিযোগ, নিকটবর্তী একটি দোকানে ডাকাতী করে পালিয়ে যাচ্ছিল সে। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় পুলিশ এবং তাকে আটকের চেষ্টা করলে সে পুলিশকে গুলী করতে উদ্ধত হয়েছিল। এই ঘটনার প্রতিবাদেও সেসময় উত্তাল হয়ে উঠে আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল।
*ঘটনা ছয়-
২০১৬ সালের ১৯ জুন নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্কস এর সাউন্ডভিউ এলাকায় পুলিশ গুলিকরে হত্যা করে ২৫ বছর বয়সী আরেক যুবক বাসাউন লিউডকে। নাইন ওয়ান ওয়ানের একটি কল পেয়ে পুলিশ দ্রুত সেখানে যায় এবং আগ্নেয়াস্ত্রসহ লিউডকে আটক করতে গেলে সে পুলিশের দিকে অস্ত্র তাক করেছিল বলে অভিযোগ।
*ঘটনা সাত-
২০১৬ সালের ১৮ মে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের ব্যস্ততম প্যান স্টেশন এলাকায় গ্যারি কনরেড নামের ৪৬ বছর বয়সী একজনকে গুলিকরে হত্যা করে পুলিশ। অভিযোগ ঐ এলাকার একটি দোকানে ঢুকে ছুরি দেখিয়ে জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়েছিল কনরেড। পুলিশ যখন ঘটনাস্থলে পৌছে তখনো তার হাতে ছিল ছুরিটি। পুলিশ তাকে ছুরিটি ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পনের আহবান জানালেও সে কর্ণপাত করেনি।
*ঘটনা আট-
২০১৬ সালের ১৫ সে্প্টেম্বর ম্যানহাটনের প্যান স্টেশনের পার্শ্ববর্তী আরেকটি স্ট্রীটে পুলিশ গুলিকরে হত্যাকরে আকরাম জুদেহ নামের ৩২ বছর বয়সী আরেক যুবককে। অভিযোগ সে একটি ধারালো ছুরি নিয়ে এক আন্ডার কভার পুলিশ অফিসারকে আক্রমণ করেছিল।
আমেরিকায় এরকম আরো অনেক এনকাউন্টারের ঘটনাই আছে। আশা করি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য এসব রেফারেন্সই যথেষ্ট হবে। তবে তাদের অবগতির জন্য একটি বিষয় জানিয়ে রাখতে চাই, তাহলো- উল্লেখিত এসব এনকাউন্টারের ঘটনার অধিকাংশই ঘটেছে প্রকাশ্যে, দিবালোকে, জনবহুল এলাকায়, হাজারো জনতার সামনেই। বাংলাদেশের মতো রাতের অন্ধকারে, অস্ত্র উদ্ধারে যাওয়ার সময় নয়।
বিশ্বাস না হলে খোঁজ নিয়ে দেখুন- উপরে উল্লেখিত ঘটনাগুলোর মধ্যে স্ট্যাটান আইল্যান্ডে শ্বাসরোধে এরিক গারনারের হত্যাকান্ডের ঘটনাটি ঘটে বিকেল ৩টার দিকে, ফারগুসনে ব্রাউন পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেলা ১২টায়, আম্পায়ার স্টেটের কাছে স্বশস্ত্র জ্যাফরী জনসন নিহত হয় সকাল ৯টায়, টাইম স্কয়ারে ড্যারিয়াস ক্যানেডি হত্যাকান্ডটি হয় বেলা ৩টায়, ব্রংসের সাউন্ডভিউ এলাকায় লিউডের ঘটনাটি রাত দেড়টার দিকে ঘটলেও পুলিশ সেখানে গিয়েছিল একটি ৯১১ কল পেয়ে।
আবার অন্যরকম ঘটনাও আছে, ২০১৭ সালের ১৮ মে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে টাইম স্কয়ারের জনবহুল ফুটপাতে ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়ী তুলে দিয়ে ১জনকে নিহত এবং ২২ জনকে আহত করে রিচার্ড রজার্স নামের ২৬ বছর বয়সী এক যুবক। সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তৎক্ষনাত তাকে ধাওয়া করে আটক করতে সমর্থ হয়। ফলে আর এনকাউন্টারে তাকে নিহত হতে হয়নি। এছাড়া ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবরে বিকেল ৩টায় ওয়ার্ল্ডট্রেড সেন্টারের খুব কাছেই হাডসন নদীর তীরবর্তী রাস্তায় পথচারী ও সাইকেল আরোহীদের উপর ট্রাক চালিয়ে দিয়ে ৮জনকে হত্যা এবং ১১জনকে আহত করে ২৯ বছরের সাইফুল সেইপভ। সেখানে পুলিশ প্রকাশ্যে তার উপর গুলী চালালেও তাকে আহত অবস্থায় আটক করতে সমর্থ হয়।যার প্রত্যক্ষদর্শী ছিল হাজার হাজার মানুষ। ফলে হয়েছে কি, আমেরিকায় পুলিশের এনকাউন্টারে হত্যার ঘটনার বর্ণণা মিডিয়ার কাছে দিয়েছে প্রত্যক্ষদর্শী জনগণ। অনেক ক্ষেত্রে আশপাশের মানুষ তাদের মোবাইল ফোনে এসব ঘটনার ভিডিউ ফুটেজ ধারণ করে মিডিয়ায় সরবরাহ করেছে। আর বাংলাদেশের প্রতিটি ক্রসফায়ারের পর নাটকের বর্ণণা দিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হচ্ছে ডিসি ডিবিকে। সবক্ষেত্রেই নাটকের স্ক্রিপ্ট বাংলা সিনেমার মতো হয়ে যাচ্ছে একইরকম।
তাই আমার পরামর্শ যদি বক্তৃতায় আমেরিকার এসব এনকাউন্টারের রেফারেন্স দেন তবে দু’দেশের ঘটনায়- দিন রাতের পার্থক্য এবং প্রত্যক্ষদর্শী থাকা না থাকার বিষয়গুলো কিভাবে উপস্থাপন করবেন তা আগেই ট্রায়াল দিয়ে নিবেন। কেননা শত সমালোচনা আর আহবান উপেক্ষা করে ক্রসফায়ার চলছে এবং চলবে বলেই মনে হয়। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের হিসাব অনুযায়ী ২০১৭ সালের শুধু জানুয়ারী থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে ৬৩ জনকে। ৪ মার্চ ২০১৭ সালে ইউএস স্টেট ডিপার্টেমন্ট এর প্রকাশিত রিপোর্টে বাংলাদেশে বিচারবহির্ভুত হত্যাকান্ড এবং গুমের ঘটনা আশংকাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রায় একই সময়ে অর্থাৎ ২৮ মার্চ ২০১৭ সালে বাংলাদেশ বিষয়ে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি রিপোর্টে বিচার বহির্ভুত হত্যা এবং গুমের ঘটনাকে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে তাদের ভাষায় “হাইরেটের” উল্লেখ করে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। যদিও এই সময়ের মধ্যেই দেশটির সরকারপ্রধান আগের “গণতন্ত্রের মানসকন্যা” এর সাথে নতুন করে “মাদার অব হিউমিনিটি” উপাধী লাভ করেছেন।
তাই বলি এসব উপাধী টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ক্রসফায়ারের গল্পলেখার সব চাপ অমানবিকভাবে একা ডিসি ডিবির উপর না দিয়ে সবাই ভাগাভাগি করে তা নিখুত করার চেষ্টা করবেন। অথবা পারলে আমেরিকার মতো এরকম প্রকাশ্যে দিবালোকে অপরাধস্থলেই তা সরাসরি ঘটাবার ব্যবস্থা করবেন। রাতের আধাঁরে অস্ত্র উদ্ধারে গিয়ে নয়! আর তাহলে নতুন নতুন এসব উপাধীর সাথে নোবেল পাওয়ারো সম্ভাবনা তৈরী হবে। তখন একজন বাংলাদেশী হিসাবে আমিও গর্বিত হতে পারবো।

You Might Also Like