ক্যাসিনোবাজদের তথ্য চেয়ে সিঙ্গাপুরে চিঠি : চার শতাধিক ব্যাংক হিসাবের খোঁজে দুদক

সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের যে ব্যক্তিরা জুয়া খেলেছেন, তাঁদের তথ্য জানতে সিঙ্গাপুরে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দেশটির রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি দমন সংস্থা করাপ্ট প্র্যাকটিসেস ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর পরিচালক বরাবর এ চিঠি পাঠিয়েছেন দুদকের মহাপরিচালক (মানি লন্ডারিং) আ ন ম আল ফিরোজ।

 

বৃহস্পতিবার এ চিঠি পাঠানো হয় বলে দুদক সূত্র নিশ্চিত করেছে। চিঠিতে জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশনের ৪৮ ধারা উল্লেখ করে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুই দেশই এতে সই করেছে। কনভেনশনের ওই ধারা অনুযায়ী দুই দেশের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার মধ্যে আইনি কার্যক্রমে সহযোগিতার কথা উল্লেখ আছে।

 

চিঠিতে আরও বলা হয়, সরকারের দুর্নীতিবিরোধী শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি অনুসারে দুদক দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করেছে। দুর্নীতিবাজেরা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে দেশের বাইরে বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাচার করেছেন বলে তথ্য রয়েছে। এ অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচারের কথা বেরিয়ে এসেছে। তাঁরা স্বীকার করেছেন, সিঙ্গাপুরে বিপুল তথ্য অবৈধভাবে পাচার করে সেখানকার ক্যাসিনোগুলোয় জুয়া খেলেছে।

 

দুদক চিঠিতে বলেছে, দুর্নীতির সঠিক তথ্য উদ্‌ঘাটনে সিঙ্গাপুরের ম্যারিনা বেসহ অন্যান্য ক্যাসিনোতে যেসব বাংলাদেশি জুয়া খেলেছেন, তাঁদের তথ্য দরকার। সেখানকার ক্যাসিনোতে বিদেশিদের প্রবেশ করতে হলে পাসপোর্টের তথ্য দিয়ে ঢুকতে হয়। দুদকের পক্ষ থেকে পাঠানো ওই চিঠিতে গত পাঁচ বছরে যেসব বাংলাদেশি সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে জুয়া খেলেছেন, তাঁদের তথ্য দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।

 

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে দেশের ক্যাসিনো জুয়াড়িতে নানা তথ্য উঠে আসছে অনুসন্ধানে। গণমাধ্যমেও নানা ধরনের খবর আসে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বরাতে জানা যায়, দেশের অনেক ‘রাঘববোয়াল’ সিঙ্গাপুরের ম্যারিনা বেসহ অন্যান্য ক্যাসিনোতে জুয়া খেলতে যেতেন। সেখানে ভিআইপি মর্যাদা পাওয়া অনেক বাংলাদেশি জুয়াড়ি লাখ লাখ ডলারের জুয়া খেলতেন।

 

ওই সব তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে দুদকের এই চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। সেখান থেকে তথ্য পেলে দুর্নীতির অনুসন্ধান নতুন মাত্রা পাবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।

 

চলমান ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরুর পর থেকে একে একে বেরিয়ে আসছে অনেক ‘রাঘববোয়ালের’ নাম। র‍্যাবের অভিযানে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে এসব নাম। সাংসদ, সরকারি কর্মচারীসহ অন্তত ১০০ জনের অবৈধ সম্পদের খোঁজে মাঠে নেমেছে দুদক। সরকারের অন্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে নেমেছে দুদক।

 

অবৈধ সম্পদের খোঁজে মাঠে নেমে দুদক এরই মধ্যে নয়টি মামলা করেছে। তিন সাংসদসহ ৩৪ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। চার শতাধিক ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে বিএফআইইউতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অন্তত ১০০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের তথ্য চাওয়া হয়েছে।

 

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে প্রথম দিনই রাজধানীর ফকিরাপুলের ইয়াংমেনস ক্লাবে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে গ্রেপ্তার হন ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক (পরে বহিষ্কার করা হয়) খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন অভিযানে একে একে গ্রেপ্তার হন কথিত যুবলীগ নেতা ও ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম, মোহামেডান ক্লাবের ডাইরেক্টর ইনচার্জ মো. লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, সম্রাটের সহযোগী এনামুল হক আরমান, কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি মোহাম্মদ শফিকুল আলম (ফিরোজ), অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান এবং তিন ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান (মিজান), তারেকুজ্জামান রাজীব ও ময়নুল হক মঞ্জু।

 

গ্রেপ্তার হওয়া এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বিপুল অর্থের মালিক হওয়া, অর্থ পাচারসহ নানা অভিযোগ ওঠে। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁদের অপকর্মে সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সাংসদ, রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্নজনের নাম উঠে আসে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের পাশাপাশি এঁদের অবৈধ সম্পদের খোঁজে মাঠে নামে দুদক।

 

অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ভোলার সাংসদ নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, হুইপ ও চট্টগ্রামের সাংসদ শামসুল হক চৌধুরী, সুনামগঞ্জের সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন রতনসহ ৩৪ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এঁদের মধ্যে গ্রেপ্তারকৃতদের নামও আছে। আছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, হাফিজুর রহমান মুন্সীসহ ১৪ জনের নাম।

You Might Also Like