ক্যানসারের কাছে পরাজিত বন্ড

৪৫ বছরে আমরা অনেকেই বুড়িয়ে যাই। রজার ম্যুর ৪৫ বছরে গিয়ে জেমস বন্ড হলেন। বন্ড, জেমস বন্ড-০০৭; আয়ান ফ্লেমিং সৃষ্ট এমন এক চরিত্র যা বিশ্বে এক নামে পরিচিত। ব্রিটিশ সিক্রেট এজেন্ট জেমস বন্ড দুর্ধর্ষ এক গুপ্তচর! শত্রুকে পরাস্ত করতে নানা দেশে ঘুরে বেড়ান, অত্যাধুনিক অস্ত্র আর দুর্দান্ত সব সুন্দরীর বাহুলগ্ন হয়ে থাকেন কিন্তু বন্ধনে জড়ান না।

রজার ম্যুর ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৫ সাল নাগাদ সাতটি জেমস বন্ড চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তার আগে এই চরিত্রে অভিনয় করতেন শন কনারি। ‘লিভ এ- লেট ডাই (১৯৭৩), দ্য ম্যান উইথ আ গোল্ডেন গান (১৯৭৪), দ্য স্পাই হু লাভড মি (১৯৭৭), মুনরেকার(১৯৭৯) ফর ইউর আইস অনলি (১৯৮১), অক্টুপাসি (১৯৮৩) এবং আ ভিউ টু কিল (১৯৮৩) এই সাতটি বন্ড সিরিজে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি সর্বাধিক বন্ড ছবির নায়কের সম্মান পেয়েছেন। উল্লেখ্য বন্ড সিরিজে অভিনয় করার আগে তিনি ব্রিটিশ টেলিভিশনের অপরাধমূলক বিখ্যাত ধারাবাহিক ‘দ্য সেইন্ট’ এর সাইমন টেম্পলারে অভিনয় করে সবার নজর কেড়েছিলেন। কিন্তু রূপালী পর্দার জেমস বন্ডের চেয়ে বাস্তবের রজার ম্যুর অনেক বড় নায়ক ছিলেন। ছোটবেলা থেকে তিনি লড়াই করেছেন রোগ-শোক-বেদনা, জীবনযন্ত্রণার বিরুদ্ধে। ব্যক্তি রজার ম্যুর ভীষণভাবে মানব-দরদী। মারামারি কাটাকাটি নয়, বরং সদাই তিনি মানুষের পাশে ছিলেন।

১৯৯১ সাল থেকে তিনি ইউনিসেফের গুডউইল এম্বাসেডর হিসেবে কাজ করেছেন। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ‘মানবতার সেবা’র জন্য তাকে সম্মানজনক নাইটহুড উপাধি দেন ২০০৩ সালে। এর আগে তিনি ইউনিসেফের কাছ থেকেও মানব সেবার জন্য সর্ব্বোচ্চ স্বীকৃতি পান। ২০০৮ সালে ফরাসী সরকার তাকে ‘অড্রে দ্যু আর্টস এতুদে লেটার’-এর কমান্ডার উপাধি দেন। তারও আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশের হয়ে যুদ্ধ করেছেন।

পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে রজার ম্যুর ছোটবেলা থেকেই শিল্পী হতে চেয়েছেন। কার্টুন এনিমেটর শিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে ব্যর্থতাটা তার জীবনে শাপে বর হয়ে দেখা দেয়। পরিচালকের অনুরোধেই সিনেমায় কাজ শুরু করেন তিনি। টিভি, সিনেমা, মঞ্চের রজার ম্যুরকে আজ সবাই এক নামে চেনেন কিন্তু আমরা বলতে চাই, মানব-দরদী ম্যুরের কথা। তিনি দেশে দেশে ছুটে গেছেন মানুষের দুর্দশা আর হতাশা লাঘব করবেন বলে। সত্যিকারের নায়কের মতোই লড়াই করেছেন মানবিক বিপর্যয়ে পাশে থেকে। এমনকি জীবনের শেষ দিনগুলোতে অসুস্থ হয়েও নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন মানবসেবায়।

আদতেই রজার ম্যুর এক লড়াকু ব্যক্তির নাম। পাঁচ বছর বয়সে তার ডাবল নিমোনিয়া হয়েছিল। বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছিল স্বজনেরা। কিন্তু ছোট্ট ম্যুর বেঁচে গেলেন। আট বছর বয়সেই তার এপেনডিক্স এবং টনসিল অপারেশন হয়। কিন্তু রূপালী পর্দার ভবিষ্যতের জেমস বন্ডকে কুপোকাত করতে পারেনি এসব শারীরিক ঝুট ঝামেলা। ২০০৩ সালে ব্রডওয়ে একটা শো’র সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখনও অনেকে আশঙ্কায় ছিলেন তাকে নিয়ে। কিন্তু সবার আশঙ্কা দূর করে বাস্তবের নায়ক রজার ম্যুর বুকে পেসমেকার নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠলেন এবং টিকে গেলেন। ২০১২ সালে তার স্কিন ক্যানসার ধরা পড়ে। ২০১৩ সালে ধরা পড়ে ডায়াবেটিস। মদ্যপান এবং অন্যান্য নেশা ও বিলাসিতা বর্জন করে এবারও তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তব ও পর্দার এই দুর্ধর্ষ নায়ককে পরাজিত হতে হলো ক্যানসার নামক ঘাতকের হাতে। অনেকটা সংগ্রামী পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে গত ২৩ মে প্রোস্টেট ক্যানসারের কারণে সুইজারল্যান্ডে মৃত্যুবরণ করলেন রজার ম্যুর। কিন্তু জেমস বন্ডের মৃত্যু নেই।

তার মৃত্যুতে বর্তমানের বন্ড ডেনিয়েল ক্রেইগ বলেছেন, ‘আর কেউ তারচেয়ে ভালো করতে পারে না।’ তিনি ট্যুইটে তাদের দুজনের ছবি শেয়ার করে জানিয়েছেন: স্যার রজার ম্যুরই হলেন সেরা জেমস বন্ড।

রজার ম্যুরের এক সময়ের নায়িকা (লিভ এ- লেট ডাই), বন্ড গার্লখ্যাত জেন সাইম্যুর বলেছেন, ‘তিনি চারপাশের সবার কাছেই ফূর্তিবাজ, দয়ালু এবং চিন্তাশীল মানুষ।’ তিনি রজার ম্যুরকে ‘আমার বন্ড’ উল্লেখ করে বলেছেন, ‘রজার আমাকে শিখিয়েছে একজন চলচ্চিত্র তারকা সত্যি কেমন হয় এবং হওয়া উচিত।’

পিয়ার্স ব্রুসনান বন্ডখ্যাত আরেক নায়ক। সম্প্রতি রজার ম্যুরকে তিনি ‘ম্যাগনিফিসেন্ট’ বলে উল্লেখ করেছেন। ইন্সটাগ্রামে তিনি লিখেছেন: ‘প্রিয় স্যার রজার ম্যুর, যথার্থ এক ভারী হৃদয়ে আমি আজ সকালে আপনার চলে যাওয়ার সংবাদ শুনলাম। আপনি ছিলেন আমার জীবনের একটা বড় অংশ, সেইন্ট থেকে জেমস বন্ড পর্যন্ত… আপনি ছিলেন মহৎ জেমস বন্ড এবং এমন একজন যিনি আমাকে পথের দিশা দিয়েছেন, বিশ্ব আপনার অভাব অনুভব করবে এবং আপনার অসাধারণ রসবোধ বহু বছর স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

যথার্থই বলেছেন তিনি। স্মরণীয় এই নায়কের অভাব পৃথিবী অনুভব করবে আর ঘাতক ক্যানসার দায়ী থাকবে ইতিহাসের কাছেই।

এক নজরে রজার ম্যুর:

জন্মদিন: ১৪ অক্টোবর, ১৯২৭

মৃত্যুদিন: ২৩ মে, ২০১৭

জন্মস্থান: লন্ডন, ইংল্যান্ড

পুরো নাম: রজার জর্জ ম্যুর

বাবা: জর্জ ম্যুর

মা: লিলি ম্যুর

স্ত্রী: ক্রিস্টিনা থলস্ট্রাপ (সর্বশেষ)

শিক্ষা: রয়েল একাডেমি অব ড্রামাটিক্স আর্টস

কর্ম: ব্রিটিশ আর্মি, সেকেন্ড ল্যাফটেনেন্ট

আত্মজীবনী: লাস্ট ম্যান্ট স্ট্যান্ডি: টেলস ফ্রম টিনসেলটাউন, মাই ওয়ার্ড ইজ মাই বন্ড, ওয়ান লাকি বাস্টার্ড: টেলস ফ্রম টিনসেলটাউন

You Might Also Like