কোন পথে হাঁটবেন মোদি!

সাঈদ তারেক : ৫ই জানুয়ারি বাংলাদেশে কোন তামাশা মঞ্চস্থ না হয়ে যদি সত্যিকার একটা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো তাহলে ক্ষমতাসীনদের জন্য যে ধরনের ফলাফল হতো ভারতের সাম্প্রতিক নির্বাচনে অহংকারি কংগ্রেসের ক্ষেত্রে হয়েছে সেই ফল। দিল্লীর কংগ্রেস সরকার জানতো বাংলাদেশে যদি একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয় বা সকল দল বিশেস করে বিরোধী বিএনপি নির্বাচনে যায় তাহলে তাদের পালিত আওয়ামী লীগ সরকার ভেসে যাবে খড়কুটোর মত। এটা জেনেই দিল্লী বাংলাদেশের জনমত উপেক্ষা করে বিশ্ব সম্প্রদায়ের মতামতকে পায়ে দলে নির্বাচনের নামে একটা প্রহসন করায়, যাতে না ছিল ভোট না ছিল ভোটার! গায়েবী নির্বাচনের মাধ্যমে বসিয়ে দেয় একটা ভৌতিক সংসদ! অবাক হয়ে যাই পাঁচটা বছর ধরে কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশে এই যে দক্ষযজ্ঞ চালালো, পা-চাটা আওয়ামী লীগকে দিয়ে একের পর এক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করিয়ে নিল একবারও টেরটি পেল না নিজের দেশেই পায়ের তলায় মাটি নাই! পড়বি তো পড় একেবারে পপাত ধরণীতল! ধরণীতলেরও একটা তল থাকে এ যেন একেবারে ভুতলেরও অতল! মানে যার কোন তলই নাই। মোদী নিজেও এই ভুমিধ্বস বিজয়ে হতভম্ব। কংগ্রেস যে ভারতবাসীর কাছে এতটা ঘৃণিত নিন্দিত মোদিরও তা ছিল কল্পনার বাইরে। বিরোধী দলও হতে পারছে না! মোদী এনডিএ জোটের বাইরের দলগুলোকে আহ্বান জানিয়েছে সবাই মিলে একটা শক্তিশালী বিরোধী মোর্চা গঠনের জন্য। এর চেয়ে লজ্জা আর কি হতে পারে!

বাংলাদেশের ক্ষমতায় গণপ্রত্যাখ্যাত আওয়ামী লীগকে বসিয়ে দিতে সক্ষম হলেও কংগ্রেস নিজ দেশেই জনগণ কর্তৃক এভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে এটা আমারও ছিল কল্পনার বাইরে। ভারতে যে এবার ক্ষমতার পালাবদল হবে তা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। বিজেপি জিতবে মোদী প্রধানমন্ত্রী হবেন দিনে দিনে এ লক্ষণও ষ্পষ্ট হয়ে উঠছিল। কিন্তু কংগ্রেস কোন কিছুই আমলে নিচ্ছিল না। এমনকি ফল প্রকাশের তিনদিন আগে বুথফেরত জরীপে যে পুর্বাভাস দেয়া হচ্ছিল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে তাও উড়িয়ে দেয়া হচ্ছিল। আমাদের দেশের আওয়ামী লীগের হাইব্রিড নেতাদের মত কোন কোন বাচাল নেতা এমনও বলছিলেন ওসব জরিপের কোন মূল্য নাই কারণ গত নির্বাচনের আগেও অমন বলা হয়েছিল কিন্তু দেখা গেছে কংগ্রেসই ক্ষমতায় থেকে গেছে। অর্থাৎ কংগ্রেসের ধারনা ছিল ক্ষমতায় থেকে যত অন্যায় অপকর্মই করুক তাদেরকে ভোট দেয়া ছাড়া ভারতবাসীর আর কোন গত্যন্তর নাই। জনগণকে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা এবং অসাম্প্রদায়িকতার বটিকা গিলিয়ে মনে করেছিল মোদী যতই হিন্দুত্ববাদের জিগিড় তুলুন মানুষ তা প্রত্যাখ্যান করবে এবং আবার কংগ্রেসকেই ভোট দেবে।

বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের মত ভারতের জাতীয় কংগ্রেসও এক ধরনের অহমিকায় ভুগে থাকে। উভয়ই মনে করে দেশের স্বাধীনতা তাদেরই অবদান। অতএব জনগণের উচিত কেয়ামত পর্যন্ত তাদের বাধ্য হয়ে থাকা তাদেরকে ক্ষমতায় রাখা। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ যেমন কখনও জনমতের তোয়াক্কা করেনা এবার ভারতে কংগ্রেসও ভারতবাসীর মনের ভাব বুঝতে চায় নাই নাই বা বুঝেও সেন্টিমেন্টকে আমলে নেয় নাই। কংগ্রেসের এই শোচনীয় পরাজয়ে সেদিন এক রসিক বন্ধু বলছিলেন- কংগ্রেস এই বেকুবিটা করতে গেল কেন! ইলেকশন কমিশন তো তারাই গঠন করে দিয়েছিল। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের মত একটা গণধিকৃত দলকে যে মেকানিজম করে ক্ষমতায় বসালো একই ফর্মূলা নিজের দেশেও এস্তেমাল করতে পারলো না! বাংলাদেশে যে অজুহাতে জামাতে ইসলামীকে নির্বাচনে অযোগ্য করিয়েছে একই ধরনের অজুহাত তুলে অর্থাৎ বিজেপি ধর্মকে ব্যবহার করছে এই দোহাই দিয়ে কি তাদেরকে ডিসকোয়ালিফাই করাতে পারতো না! অথবা পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে বা গোয়েন্দা সংস্থা লেলিয়ে দিয়ে সকল বিরোধী দলকে নির্বাচনের বাইরে ঠেলে দিতে পারতো না! তাহলেই তো ল্যাঠা চুকে যেতো!

ভারত এখনও পুরোপুরিভাবে গণতান্ত্রিক দেশ হয়ে উঠতে না পারলেও গণতন্ত্রের চর্চা তারা চালিয়ে আসছে সেই সাতচল্লিশের পর থেকেই। মাঝে একবার কয়েক বছরের জন্য ইন্দিরা গান্ধীর স্বৈরশাসন ছাড়া সাতষট্টি বছরে সে দেশে কোন একক স্বৈরাচারের আবির্ভাব হয় নাই। সে দেশের রাষ্ট্র কাঠামোয় এরূপ স্বৈরাচার সৃস্টি হওয়ার অবকাশও কম। তাছাড়া ভারতের রাজনীতিকরা কিছুটা হলেও নীতিনৈতিকতা মেনে চলেন। ক্ষমতার চাইতে দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখেন। আমাদের দেশের রাজনীতিকদের মত এরা পুরো অশিক্ষিত অ-সভ্য বা অ-সংষ্কৃত নন। কাজেই যে অপরাধ কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশে করেছে তার সিকিও করার অবকাশ নিজ দেশে নাই। সেখানকার নির্বাচন কমিশন কারও হুকুমের গোলাম হয়না। যে-ই গঠন করে দিক গঠনের মুহূর্ত থেকে তারা স্বাধীন এবং আইন মেনে কাজ করতে বাধ্য। যে কারণে ভারতে নির্বাচন করানোর জন্য কোন তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দরকার পড়ে না।

ভারতের নির্বাচনে কংগ্রেসের এই শোচনীয় পরাজয়ে বাংলাদেশের মানুষ খুশী। এই কংগ্রেস সরকারই গত পাঁচ বছর বাংলাদেশে হরেক রকমের অনর্থ বাধিয়েছে। নিজের দেশে ধর্মভিত্তিক বা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বহাল রেখে বাংলাদেশকে তথাকথিত ধর্মনিরুপেক্ষ করতে গেছে। জঙ্গী দমন তথাকথিত যুদ্ধাপরাধি বিচার ইত্যকার নানা নাম দিয়ে ইসলামপন্থীদেরকে নির্মূল করতে চেয়েছে। পাঁচ বছরে বশংবদ আওয়ামী লীগ সরকারকে দিয়ে জামাত বিএনপির শত শত লোককে নির্বিচারে হত্যা করেছে। এই কংগ্রেস সরকারের কারণেই বাংলাদেশে গনতন্ত্র অধুরা রয়ে গেছে। কংগ্রেস সরকারই বাংলাদেশে নতুন করে একটি স্বৈরাচার কায়েম করেছে। কংগ্রেস সরকারের মদদেই একটি অবৈধ অগণতান্ত্রিক সরকার বাংলাদেশ পরিচালনা করতে পারছে। কংগ্রেস সরকারই বাংলাদেশের মানুষের ভোটাধিকার হরন করে গত পাঁচই জানুয়ারি একটি প্রহসন মঞ্চস্থ করিয়েছে। সেই কংগ্রেস সরকার যখন শোচনীয় পরাজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয় তখন স্বভাবতই মানুষ খুশী হয়।

তাই বলে এই খুশীর সাথে আশাবাদের কোন ব্যপার নাই। নাই এই কারণে যে কংগ্রেসের বদলে ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসছেন উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংঘ পরিবার থেকে আসা নরেন্দ্র মোদী। গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ে মুসলিম গণহত্যার দায়ে যাকে এক সময় বুচার মোদী বা কসাই মোদী বলা হতো। গনহত্যার সাথে সম্পৃক্ততার সন্দেহে যুক্তরাষ্ট্র যাকে এক সময় ভিসা দিতে অস্বীকার করেছিল। বিষ্ময়কর বিজয় নিয়ে ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় সেই নরেন্দ্র মোদীর অধিষ্ঠান তাই বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মুসলমানদের জন্য তাই কোন খুশীর বিষয় হতে পারেনা। তবে একটা স্বস্তির বিষয় হতে পারে এই যে, ভারতের সংখ্যাগুরু হিন্দু জনগোষ্ঠী এই নির্বাচনের মাধ্যমে তথাকথিত ধর্মনিরুপেক্ষতা বা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির অসারতা প্রমান করেছেন। এতে করে কংগ্রেস সরকারের টাকা খেয়ে বাংলাদেশে সুশীল এবং বুদ্ধিজীবি সমাজের যে অংশটি এতদিন অসাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মনিরুপেক্ষতার নামে ইসলাম এবং মুসলিম ভাবধারা ধুয়েমুছে ফেলার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন কিছুটা হলেও হোচট খাবেন। বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক বা ইসলামপন্থী রাজনীতিকরা বলতে পারবেন ভারতে যদি হিন্দুত্ববাদীরা ক্ষমতায় যেতে পারে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীরা কেন পারবে না!

একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা ভারতের সাম্প্রতিক এই নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদেরই জয় হয়েছে। নরেন্দ্র মোদী এবং বিজেপির পুরো নির্বাচনী ক্যাম্পেইন ছিল ধর্মভিত্তিক বা হিন্দু জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক। ১৬ই মে কবি দাউদ হায়দার এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘আরএসএস-বিজেপির সেবক, কর্মীরা ভারতের অধিকাংশ রাজ্যে, শুধু লিফলেট প্রচারণা নয়, মিটিংই নয়, ঘরে-ঘরে গিয়ে বলেছে, ভারত হিন্দুর দেশ। হিন্দু ঐতিহ্য, সংস্কৃতি প্রত্যেক হিন্দুকেই ফিরিয়ে আনতে হবে। কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টির তথাকথিত সেকুলারিজমে হিন্দুত্ব গোল্লায় গেছে, ফিরিয়ে আনো। কংগ্রেসের সেকুলারিজমের নামে ভারত আজ অতলে। কংগ্রেস হঠাও। আমরা হিন্দু, রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্যে চাই হিন্দুত্ব। রামরাজ্যের রাম হবেন নরেন্দ্র দামোদাস মোদি। এখানেই শেষ নয়। সোনিয়া, রাহুল, প্রিয়াঙ্কাকে দেশ থেকে তাড়াও, উচ্ছেদ করো। ওরা বিদেশি, ভারতের কলকাতার শত্রু। এইসব খবর গত এক মাসে ভারতের বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত, ইংরেজি দ্য হিন্দু, দ্য হিন্দুস্তান টাইমস, নর্দান ইন্ডিয়া পত্রিকাসহ সময়, গণশক্তি, আজকাল এ।’ দাউদ হায়দারের মতে আরএসএস-বিজেপি-শিবসেনার প্রচারণায়, হিন্দুত্বকেই ফিরিয়ে আনতে মোদিকে ভোট দিয়েছে জনগণ।

ভারতের সাম্প্রতিক এই নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদের জাগরণকে তুলনা করা চলে ১৯০৫ সাল থেকে পরবর্তী কয়েক বছর বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের সাথে। বঙ্গমাতার ব্যবচ্ছেদের প্রতিবাদে কলকাতাকে কেন্দ্র করে সে সময় হিন্দুত্ববাদের এক অভুতপূর্ব জাগরণ ঘটেছিল। স্বয়ং কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ তাবৎ হিন্দু জমিদার রাজা মহারাজা কবি সাহিত্যিক সুশীল সমাজ সে সময় পুর্ববাংলার অবহেলিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছিলেন। কবিগুরু হিন্দু জাগরণকে মহিমাম্বিত করতে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ (আমাদের জাতীয় সঙ্গীত) রচনা করেন। সেই আন্দোলন থেকেই বাংলায় হিন্দু মুসলমান দ্বন্ধের সৃস্টি। ফলশ্রুতিতে মুসলমানদের পৃথক সংগঠন মুসলিম লীগের জন্ম হয়। বঙ্গভঙ্গ রদের প্রতিশোধ হিসেবে ১৯৪৬ সালে বাংলার মুসলমানরা নিজেদের পৃথক আবাসভুমির পক্ষে ভোট দেয়। অসাম্প্রদায়িকতার নামাবলীধারী কংগ্রেস নেতৃত্ব এবং গান্ধীজী জিন্নাহ সাহেবের দ্বিজাতিতত্বের বিরোধীতা করেছিলেন এই কারণে যে তারা জানতেন ভারত এক থাকলে সংখ্যগুরু হিন্দু ধর্মবিশ্বাসীরাই সব সময় দেশ শাসন করবে। কিন্তু দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে বাংলাকে ভাগ করেছিলেন এই কারণে যে গোটা বাংলায় তখন মুসলমানরা ছিল সংখ্যাগড়িষ্ঠ এবং অবিভক্ত বাংলার তিনজন মুখ্যমন্ত্রীই ছিলেন মুসলিম, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, খাজা নাজিমউদ্দিন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। বাংলা এক থাকলে সংখ্যাগুরু মুসলিমরাই সব সময় তা শাসন করবে। এই আশংকা থেকে গান্ধীজী পন্ডিত নেহেরু বল্লভভাই প্যাটেল প্রমুখেরা সোহরাওয়ার্দী-শরৎ বসুদের অখন্ড বাংলার স্বাধীনতার দাবীকে থোড়াই কেয়ার করে কংগ্রেস হিন্দু মহাসভা এবং জ্যোতি বসুদের কম্যুনিষ্ট পার্টিকে দিয়ে বাংলা ভাগ করিয়ে হিন্দুপ্রধান অংশকে ভারতের সাথে মিলিয়ে নিয়েছিলেন।

’৪৭ থেকে সাতষট্টি বছরেও ভারতের সংখ্যাগুরু ধর্মবিশ্বাষীর মন মানসিকতা চিন্তা চেতনায় যে কোন পরিবর্তন আসে নাই সাম্প্রতিক এই নির্বাচনে তারই প্রমান পাওয়া গেল। পরিবর্তিত কংগ্রেস নেতৃত্ব ধর্মনিরুপেক্ষতাকে নীতি হিসেবে নিয়েছে অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলেছে কিন্তু সাধারণ্যে এর প্রভাব যে কিছুই ছিলনা এই নির্বাচন তারও প্রমান। ধর্মনিরুপেক্ষতা একটা ভুয়া ডক্টরিন। ভূয়া বলছি এ কারণে- যে ধর্ম মানে সে নিরুপেক্ষ থাকতে পারেনা। যে ধর্ম মানেনা সে নাস্তিক। ধর্ম যেমন বিশ্বাস নাস্তিকতাও তেমনি একটা বিশ্বাস। কেবলমাত্র নাস্তিকরাই ধর্মের ব্যপারে নিরুপেক্ষ থাকতে পারে। ধর্ম যে মানে সে কি করে নিরুপেক্ষ থাকবে! ধর্মনিরুপেক্ষতা নাস্তিকতার সমার্থক হওয়ায় ভারতে শুধু নয় বাংলাদেশেও এই ডক্টরিন কাজ দেয় নাই। ভারতে যে তা একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে তার প্রমান নির্বাচনে কংগ্রেসের ঝাড়–পেটা বিদায় এবং হিন্দুত্ববাদের পুনর্জাগরন।

নরেন্দ্র মোদী পাঁচ বছর সে দেশের সরকার চালাবেন। এইরকম ভুমিধ্বস বিজয় নিয়ে আমাদের এখানে আওয়ামী লীগও ২০০৮- এ সরকার গঠন করেছিল। সংসদে বিরোধী দলও খুঁজে পায় নাই। তারপর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে কি পরিমান নিন্দিত এবং প্রত্যাখ্যাত হয়েছে তার প্রমান ৫ জানুয়ারির গায়ের জোরের ভোট। যে আশা নিয়ে ভারতবাসী এবার নরেন্দ্র মোদীকে ক্ষমতায় পাঠালো কতটুকু তিনি তা পুরন করতে পারেন, ভারতকে রামরাজ্য বানাতে কতটুকু সফল হন তা সময়েই প্রমান হবে তবে বরাবরই দেখা গেছে এমন ভুমধ্বিস বিজয় নিয়ে যারাই ক্ষমতায় আসেন অল্প দিনেই জনপ্রিয়তা হারান। দ্রুত মানুষের মোহমুক্তি ঘটতে থাকে এবং জনমত উল্টো হাঁটতে শুরু করে। এই অভুপুর্ব জনসমর্থন মি: মোদীর জন্য তাই শুধু আনন্দ উল্লাসই নয় উদ্বেগের কারণও বটে। দেখা যাক সরকার পরিচালনায়ও তার ম্যাজিক কতটা কার্যকর হয়।

আমাদের দেশে মোদীর বিজয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। আওয়ামী শিবিরে কংগ্রেসের ভরাডুবিতে চাপা কান্না কিন্তু মোদীর বিজয়ে কোন উদ্বেগ নাই। বিএনপি মহলে কংগ্রেসের বিদায়ে উল্লাস কিন্তু মোদীর ক্ষমতারোহনে উৎকন্ঠা। এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে দুই পক্ষের ‘টম এ্যন্ড জেরী শো।’ কৃপাদৃস্টি আকর্ষন এবং পরষ্পরকে টপকে যাওয়ার চেষ্টা। কার ভাগ্যে শিকা ছিড়বে তা বলার সময় এখনও আসে নাই।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন ভারতে সরকার পরিবর্তন হলে পররাষ্ট্রনীতি বদলায় না। বাংলাদেশে দিল্লীর ‘ভাইসরয়’ খ্যাত মি: পংকজ শরনও কিছুদিন আগে বলেছিলেন ভারতে সরকার পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশ নীতিতে কোন পরিবর্তন হবে না। অবশ্য বাংলাদেশ সম্পর্কে কংগ্রেস সরকারের কোন ‘পররাষ্ট্র নীতি’ ছিল কিনা সন্দেহ। দুস্ট লোকে বলে কংগ্রেস সরকার বাংলাদেশকে কোন পর রাষ্ট্রই মনে করতো না। এ দেশটা চালিয়েছে তারা ‘স্বরাষ্ট্র নীতি’ দিয়ে! নরেন্দ্র মোদী এই নীতি পরিত্যাগ করবেন কেন! কেকটা কংগ্রেস তৈরী করে দিয়ে গেছে বলে!

নরেন্দ্র মোদী যে কথা বলে ভোটে জিতেছেন, যদি হিন্দুত্ববাদ বা রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠাই তার লক্ষ্য হয়ে থাকে তাহলে হিসাবে বলে বাংলাদেশকেও তিনি সে রাজ্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইবেন। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগই হবে বিশ্বস্ত মিত্র। একটাই ব্লাকষ্পট, এরা কংগ্রেসের কেনা গোলাম। তারপরও বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদেরকে নির্মূল করতে সাফল্য তাদের একটা বড় ক্রেডেন্সিয়াল। বিএনপির মিত্রই এই ইসলামপন্থীরা। মি: মোদী এই দলটিকে আস্থায় নেবেন বা দায়িত্ব দেবেন কোন যুক্তিতে!

আর যদি মি: মোদী সাব্যস্ত করেন ভোট যা হবার হয়ে গেছে দেশ চালাতে হবে দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনায়কের মত করে, নিজের একটা স্বচ্ছ ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে হবে, প্রতিবেশীদের সাথে কংগ্রেসের মত প্রভূ নয় বন্ধুর মত আচরণ করতে হবে তাহলে বাংলাদেশ প্রশ্নে কংগ্রেসের নেয়া নীতি ঝেড়ে ফেলে নতুন নীতি গ্রহণ করবেন। সৌহার্দ্যমূলক আচড়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংখ্যাগড়িষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ উৎকন্ঠা দুর করবেন। ভুললে চলবে না বাংলাদেশে কংগ্রেস সরকারের ইসলাম এবং মুসলিমবিরোধী নীতির কারনে দলটি ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের এক বিরাট অংশের সমর্থন হারিয়েছে। গত নির্বাচনে তারা মুসলমানদের ভোটও আগের মত পায় নাই।

এখন অপেক্ষা- দেখতে, কোন পথে হাঁটেন মোদী!

১৯ মে, ২০১৪

e-mail: mail@saeedtarek.com

You Might Also Like