কেউ রাতারাতি জঙ্গি হয়ে ওঠে না

আলী রীয়াজ :
কেন একজন ব্যক্তি জঙ্গি হয়ে ওঠে?
কোনো ব্যক্তির জঙ্গি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি কী? যখনই জঙ্গি তৎপরতার খবর পাওয়া যায়, যখনই কোনো জঙ্গি বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়, তখনই সাধারণ মানুষের মনে এসব প্রশ্ন জাগে। তাঁরা বুঝতে চান ঠিক কীভাবে একজন ব্যক্তি জঙ্গি হয়ে উঠেছে। তার পেছনে কী ধরনের ঘটনা বা প্রবণতা কাজ করেছে। নীতিনির্ধারক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, সন্ত্রাসবাদ দমনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা তো অবশ্যই, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরাও এ বিষয়ে কমবেশি সব সময়ই চিন্তাভাবনা করেন। তাঁরা সবাই এর একটা সন্তোষজনক উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করেন। বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠনের উপস্থিতি দীর্ঘদিন হলেও পদ্ধতিগতভাবে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা হয়েছে, এমন উদাহরণ সহজে দেখা যায় না।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদবিষয়ক আলোচনা ও গবেষণা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বর্ণনামূলক বা এ বিষয়ে জনসাধারণের মনোভাববিষয়ক জরিপভিত্তিক। কিন্তু গত এক মাসে সবাই কোনো না কোনোভাবে এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হয়েছেন, সেটা একান্ত চিন্তায় কিংবা অন্যদের সঙ্গে আলোচনায়। জঙ্গি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ার প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার কারণ আমরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারি। বাংলাদেশের সমাজে জঙ্গিদের বিষয়ে যেমন একটি পূর্বধারণা ছিল, তেমনি এই জঙ্গি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া নিয়েও একটা পূর্বধারণা আসন গেঁড়ে বসেছিল। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে আমরা যা যা জানতে পেরেছি তার সঙ্গে এই ধারণার অসংগতিই এখন এ বিষয়ে উৎসাহ তৈরির একটি অন্যতম কারণ। দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে এসব বিষয়ে উৎসাহ তৈরি হয়েছে এবং আমরা এ রকম একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি—এটা মেনে নেওয়া সত্ত্বেও এটাকে একার্থে ইতিবাচক বলেই বিবেচনা করা যায়। দেশে জঙ্গিবাদ মোকাবিলা, এর বিস্তার রোধ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতি নির্ধারণের জন্য এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা জরুরি।
জঙ্গি হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে আলোচনার শুরুতে আমাদের কয়েকটা বিষয় মনে রাখতে হবে। প্রথমত, এটি একটি প্রক্রিয়া; অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি অকস্মাৎ জঙ্গি হয়ে ওঠে না। দ্বিতীয়ত, এটি একটি প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়; অর্থাৎ এই পর্যায়ে যাওয়ার অনেক আগেই এর সূচনা হয় এবং বিভিন্ন ধাপের মধ্য দিয়ে ওই ব্যক্তিকে যেতে হয়। তৃতীয়ত, এই প্রক্রিয়া একরৈখিক নয়; অর্থাৎ একবার এই প্রক্রিয়ার অংশীদার হলে সেখান থেকে ফেরার পথ নেই বা যে প্রক্রিয়া জঙ্গি তৈরি করে, সেই পথের সব অংশগ্রহণকারীই যে শেষ পর্যন্ত জঙ্গি হবেন তা পূর্বনির্ধারিত নয়। এই প্রক্রিয়াকে আমরা বলতে পারি র্যাডিকালাইজেশন।
র্যাডিকালাইজেশন হচ্ছে এমন এক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি এমন ধরনের আদর্শ ও বিশ্বাসের সঙ্গে পরিচিত হন যা তাঁকে মধ্যপন্থী, মূলধারার চিন্তাধারা থেকে চরমপন্থী চিন্তার দিকে সরে যেতে সাহায্য করে। আমাদের স্মরণ রাখা দরকার যে র্যাডিকালাইজেশনের ধারণার দুটো দিক আছে। একটি হচ্ছে সহিংস র্যাডিকালাইজেশনের পথ; যে ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য সহিংসতাকে কেবল যৌক্তিক বলে বিবেচনা করা হয় না, সহিংসতাকেই প্রধান এবং একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিয়ে সেভাবেই কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এই পথ অবশ্যই গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য প্রত্যক্ষ হুমকি।
অন্যটি বৃহত্তর অর্থে র্যা ডিকালাইজেশন; সমাজ ও রাজনীতিতে ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন এবং তাতে অংশগ্রহণ করা। এ ধরনের র্যাডিকালাইজেশন সমাজে দীর্ঘ মেয়াদে প্রচলিত গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হলেও তা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি নয় এবং এই প্রবণতাকে সহিংস র্যাডিকালাইজেশনের সঙ্গে এক কাতারে বিবেচনা করা সঠিক নয়। ফলে এটা মনে রাখতে হবে যে র্যা ডিকাল মানুষ মাত্রই জঙ্গি নন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা র্যা ডিকালাইজেশন বলতে
সহিংস র্যা ডিকালিজমকেই বোঝাব। সহিংস র্যাডিকাল পথের সবাই যে ব্যক্তি হিসেবে সহিংসতার পথ বেছে নিয়ে জঙ্গি হবেনই, এমনও বলা যায় না।
সহিংস র্যা ডিকালাইজেশন বিষয়ে গত কয়েক দশকে সারা পৃথিবীতে, বিশেষত পশ্চিমা দেশগুলোতে, ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। যদিও র্যা ডিকালাইজেশনের প্রশ্নটি নতুন নয়, তথাপি এ বিষয়ে ২০০১ সালের পরে গবেষণার সংখ্যা বেড়েছে এবং দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। সহিংস উগ্রপন্থা বা ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম নিঃসন্দেহে এককভাবে কোনো অঞ্চলের বা বিশেষ কোনো ধর্মের ক্ষেত্রে সীমিত নয়। এ বিষয়ে আলোচনা ও গবেষণার সূত্রপাত হয়েছিল গত শতাব্দীর ষাটের দশকে এবং তা ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রশ্নকে ঘিরে তৈরি হয়নি (দেখুন আমার লেখা, ‘কোন পরিস্থিতি জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটায়’, প্রথম আলো ৭ অক্টোবর, ২০১৫)। কিন্তু ২০০১ সালের পরে এসব আলোচনা ও গবেষণায় যেটা প্রাধান্য পেয়েছে তা হচ্ছে ইসলামপন্থী উগ্র সহিংস সংগঠনগুলোর উত্থান এবং বিস্তার, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর প্রতি আকর্ষণের বিষয়। এদিকটি আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ২০১৪ সালে আইএসের নাটকীয় উত্থান এবং বিভিন্ন দেশ থেকে তরুণ-তরুণীদের আইএসে যোগ দেওয়ার পরে। শুধু তা-ই নয়, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে অন্যান্য দেশেও সমাজের ভেতরে র্যাডিকালাইজেশনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এযাবৎ র্যাডিকালাইজেশন-বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যনির্ভর আলোচনাগুলোতে মোটা দাগে দুটি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। একটি হচ্ছে র্যাডিকালাইজেশনের কারণ এবং অন্যটি র্যা ডিকালাইজেশনের প্রক্রিয়া। এই দুইয়ের মধ্যে যে একটি গভীর সম্পর্ক আছে সেটা অনস্বীকার্য। দুই ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পাই যে গবেষকেরা চেষ্টা করছেন কতকগুলো সাধারণ প্রবণতা বা স্তর চিহ্নিত করতে। কারণ হিসেবে প্রবণতাগুলোকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্বগুলোর সাহায্য নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে উগ্র সহিংস পন্থা, জঙ্গিবাদ, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী তৎপরতা ইত্যাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দেশ বা সংগঠনভিত্তিক যেসব কেস স্টাডি হয়েছে
তার সারসংকলন করেই এসব সাধারণ প্রবণতার তালিকা তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। র্যা ডিকালাইজেশনের প্রক্রিয়া-বিষয়ক বেশির ভাগ কেস স্টাডি পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর, বিশেষত তরুণদের, র্যাডিকালাইজেশনের পথ বোঝার আগ্রহ থেকেই তৈরি হয়েছে। কিন্তু এগুলোর সঙ্গে ক্রমান্বয়ে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাকে যুক্ত করা হয়েছে।
এই পটভূমিকায় সহিংস র্যা ডিকালাইজেশনের কারণ এবং সহিংস র্যাডিকালাইজেশনের প্রক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করতে চাইলে কেবল বর্ণনামূলক প্রতিবেদনের দিকে মনোনিবেশ করলে হবে না। আমাদের আলোচনা শুরু করতে হবে এই প্রপঞ্চের সাধারণ প্রবণতাগুলো নিয়ে; তার সঙ্গে বিরাজমান ঘটনাপ্রবাহের মিল-অমিলগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে।
আলী রীয়াজ : যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক
প্রথম আলো’র সৌজন্যে

You Might Also Like