কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

কুড়িগ্রামে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিকেল পর্যন্ত ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে বিপৎসীমার ১০৩ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপৎসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার, নুনখাওয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৮৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম এ তথ‌্য নিশ্চিত করেন।

এ অবস্থায় জেলার নয় উপজেলার ৬০ ইউনিয়নের আড়াই শতাধিক চরাঞ্চলসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ।

এদের মধ‌্যে যাদের ঘর-বাড়িতে বিছানাপত্রসহ সবকিছুই তলিয়ে গেছে, তারা ঘর-বাড়ি ছেড়ে পাকা সড়ক, উঁচু বাঁধ ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়েছেন। যাদের কোনো রকমে থাকার ব‌্যবস্থা আছে, তারা কষ্ট করে পরিবার পরিজন নিয়ে বন্যার পানির মধ্যে ঘর-বাড়িতেই অবস্থান করছেন। পাকা সড়ক, উঁচু বাঁধ এবং খোলা আকাশের নিচে পলিথিনের তাবু টানিয়ে বসবাসকারী পরিবারগুলো অব্যাহত বৃষ্টিতে চরম কষ্টে জীবন-যাপন করছেন।

বন্যা কবলিত এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথম দফায় প্রায় দুই সপ্তাহের বন্যার সময়ও তারা পানিবন্দি জীবন-যাপন করেছেন। দ্বিতীয় দফার বন্যার কবলে পড়া কর্মহীন এসব মানুষের মাঝে খাদ্য সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। সেইসাথে যোগাযোগ ব‌্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়েছে।

উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের আইড়মাড়ীর চরের আব্দুর রহিম বলেন, ‘গত বন্যায় ঘরে যা শুকনো খাবার ছিলো, তা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আগের বন্যা যেতে না যেতেই আবারও বড় বন্যা এলো। কোনো রকমে বিছানা তৈরি করে পরিবার নিয়ে অবস্থান করছি। চুলা জ্বালানো যাচ্ছে না। সবকিছুই পানিতে ভিজে গেছে। খেয়ে না খেয়ে খুব কষ্ট করে আছি। পানি আরও বাড়লে উঁচু জায়গায় যেতে হবে। কিন্তু কোথায় যাবো সেটাও জানা নেই।’

সদরের পাঁচগাছী ইউনিয়নের শুলকুর বাজার বাঁধে আশ্রয় নেওয়া সাহেব আলী বলেন, ‘বাড়িতে আর থাকার উপায় নেই। সোমবার গরু, ছাগল, বউ, বাচ্চা নিয়ে নৌকায় করে এখানে উঠেছি। এখানেও খুব কষ্ট। গতরাতে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। পলিথিনের তাবু বানিয়েছিলাম। ভিতরে পানি ঢুকে শুকনো কাপড়চোপড় সব ভিজে গেছে। সারারাত বসে কাটিয়েছি। খাবার নেই, খুব কষ্টে আছি। এখন পর্যন্ত মেম্বার চেয়ারম্যানও কোনো সহযোগীতা করেনি।’

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম আবুল হোসেন জানান, পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে এই বন্যা দুর্গত মানুষদের হাতে দীর্ঘদিন তেমন কাজ ছিল না। তার ওপর প্রথম দফা বন্যা চলে যাওয়ার সাথে সাথে আবারও বন্যা এলো। চরে বসবাসকারী বেশিরভাগই অভাবী মানুষ। মূলত এই দিন মজুর শ্রেণির মানুষেরা খাদ্য সংকটে পড়েছে। এদের এই মুহূর্তে শুকনো খাবারের প্রয়োজন।

উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের চার হাজার পরিবারের ২৮ হাজার মানুষই পানিবন্দি জীবন-যাপন করছে। দ্বিতীয় দফা বন্যায় জেলা প্রশাসন থেকে আমার ইউনিয়নের জন্য পাঁচ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যা আগামীকাল বুধবার (১৫ জুলাই) উত্তোলন করে বিতরণ করা হবে। এই পাঁচ টন চাল ১০ কেজি করে মাত্র ৫০০ পরিবারকে দেওয়া সম্ভব হবে। বাকিদের কী হবে জানা নেই।’

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল করিম জানান, জেলায় বন্যা কবলিত মানুষের জন্য নয় উপজেলায় ১৬০ মেট্রিক টন চাল, শুকনো খাবারের জন্য চার লাখ জিআর ক্যাশ, শিশু খাদ্যের জন্য দুই লাখ, গো-খাদ্যের জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যা বিতরণ কার্যক্রম চলছে।

You Might Also Like