কুচবিহারের ইসলামী ধর্মসভায় পুলিশের গুলি ও লাঠিপেটা: আহত ২৫

পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার তুফানগঞ্জে এক ইসলামী ধর্মসভায় মাইক বন্ধ করাকে কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে ৫ জন গ্রামবাসী আহত হয়েছে। লাঠি এবং গুলি চালানোর ঘটনায় অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছে। এদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকায় তীব্র ক্ষোভ এবং উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

আজ (সোমবার) ‘সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন’-এর সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান রেডিও তেহরানকে জানান, ‘তুফানগঞ্জে একটি মাদ্রাসার ধর্মীয় সভায় মাত্র দেড় থেকে দুই হাজার মানুষের এক শান্তিপূর্ণ সমাবেশ থামাতে গিয়ে পুলিশ যেভাবে সরাসরি গুলি চালিয়ে ৫ জন নিরীহ মানুষকে আক্রান্ত করেছে, তা চরম নিন্দনীয়। একে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। এই সামান্য একটি ধর্মসভাকে বন্ধ করতে পুলিশের দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য ছিল। এ নিয়ে উদ্যোক্তা বা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনাই যথেষ্ট ছিল। পুলিশ চরমভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ করেছে।’

মুহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘পুলিশের এ ধরণের মনোভাবে গোটা রাজ্যে শান্তি নিয়ে আসার পরিবর্তে অশান্ত করে তুলতে সহায়ক হবে। অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপার এবং তুফানগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সরিয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দাবি করছি। যারা এ ঘটনায় আহত হয়েছে তাদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিপূরণ দিতে সরকার অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ করুক।’

আজ (সোমবার) কোলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সংবাদপত্র সূত্রে প্রকাশ, শনিবার রাতে তুফানগঞ্জের দেওচড়াই সংলগ্ন সন্তোষপুর ফোরকানিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসার ময়দানে একটি ধর্মীয় সভা চলছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পুলিশ রাত ১২ টা নাগাদ ঘটনাস্থলে এসে মাইক বন্ধ করতে বলে। সে সময় পুলিশের সঙ্গে থাকা এক সিভিক ভলান্টিয়ার (সিভিক পুলিশ নামে পরিচিত) মদ্যপ অবস্থায় মুসলিম সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করলে উপস্থিত মানুষজনের সঙ্গে এ নিয়ে বচসা বাধে।

এ ঘটনার কিছুক্ষণ বাদেই তুফানগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিম অধিকারীর নেতৃত্বে ‘র‍্যাফ’ বাহিনী পৌঁছে সভায় উপস্থিত থাকা মানুষজনের উপর নির্বিচারে লাঠি চালায় এবং ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ। এ সময় মানুষজন প্রাণের ভয়ে পালাতে থাকলে পুলিশ ৭ রাউন্ড গুলি চালায় বলে অভিযোগ।

তুফানগঞ্জ দেউচড়াই তৃণমূল ব্লক প্রেসিডেন্ট আবুল কাশেম পুলিশের হামলাকে বর্বরোচিত বলে আখ্যা দিয়েছেন। কোনোরকম প্ররোচনা ছাড়াই এ ধরণের হামলাকে নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

ধর্মীয় সভার উদ্যোক্তারা জানান, ‘গত প্রায় তিন দশক ধরে এই অনুষ্ঠান চলে আসলেও কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। পুলিশের পক্ষ থেকে আপত্তি আসায় মাইক বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। যদিও কিছুক্ষণের মধ্যেই আচমকা বিশাল পুলিশ বাহিনী এসে লাঠি চালাতে শুরু করে। তাদের লাঠির আঘাত থেকে পুরুষ, মহিলা এমনকি বয়স্করাও রেহাই পায়নি। এ সময় পালাতে গিয়ে পড়ে গিয়ে অনেকে আহত হন। যদিও তার মধ্যেই মাটি লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালায় পুলিশ।’

সভার অন্যতম কর্মকর্তা আজিজার রহমান জানান, ‘পুলিশ ওই রাতে বেসামাল অবস্থায় এসে উত্তেজিতভাবে মাইক বন্ধ করতে বলে। তারপরেই পুলিশ লাঠি চালায় এবং নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে পাঁচজন গ্রামবাসী আহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধ আমিনুর রহমান বলেন, ‘পুলিশ লাঠিচার্জ করলে আতঙ্কে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। তখনই পুলিশ গুলি চালায়। আধঘণ্টা রাস্তায় পড়ে থাকার পর গ্রামবাসীরা হাসপাতালে ভর্তি করে।’

স্থানীয় বাসিন্দা হামিদ আলী বলেন, ‘পুলিশ এসেই মাইক বন্ধ না করে দিলে এতবড় ঘটনা ঘটত না। বচসা শুরু হতেই পুলিশ আচমকা অন্যায়ভাবে লাঠি এবং গুলি চালায়।’

প্রশ্ন উঠেছে, লাঠি চালানোর পরে পালাতে থাকা মানুষদের উপর গুলি চালানো হল কেন? কেনই বা রাবার বুলেট বা কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়নি? শূন্যে গুলি না ছুঁড়ে দুই হাজার মানুষের ভিড়ে এভাবে গুলি চালানো হল কেন?

পুলিশের পক্ষ থেকে অবশ্য সাফাই দিয়ে দাবি করা হয়েছে, ওইদিন রাত ১২ টার পরেও জোরে মাইক বাজানোর অভিযোগ পেয়ে পুলিশ মাইক বন্ধ করতে গেলে কোনো কাজ হয়নি। তাদের কার্যত ধাক্কা দিয়ে সেখান থেকে বের করে দেয়া হয়। তাদের গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। পরে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিম অধিকারী কমব্যাট ফোর্স নিয়ে সেখানে গেলে পুলিশের উদ্দেশ্যে ইট ছোঁড়ে এবং এক জওয়ানকে মারধর করা হয়। আত্মরক্ষা করতে পুলিশ গুলি চালিয়েছে বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

কুচবিহারের জেলা প্রশাসক পি উলগানাথন গ্রামবাসী মনিরুল ইসলাম, আব্দুল মান্নান এবং আমিনূর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে স্বীকার করলেও পুলিশের পক্ষ থেকে এ নিয়ে মুখ খোলা হয়নি। আহতদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য নথি সংগ্রহ করা হচ্ছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।

এদিকে, পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনায় বিড়ম্বনায় পড়েছে রাজ্য প্রশাসন। রাজ্য সচিবালয় ‘নবান্ন’ সূত্রের বরাতে প্রকাশ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গুলিচালানোর ঘটনার কারণ খুঁজতে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। ঘটনার জেরে এরইমধ্যে তুফান গঞ্জের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহিম অধিকারীকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করার পাশাপাশি তাকে ‘ক্লোজ করা হয়েছে।

কুচবিহার জেলার তৃণমূল প্রেসিডেন্ট এবং বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ঘোষ পুলিশের ভূমিকায় খুশি নন। তিনি বলেছেন, ‘পুলিশ বিষয়টি এড়াতে পারত। গুলি চালিয়ে পুলিশ ঠিক করেনি। পুরো ঘটনা মুখ্যমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে।’

You Might Also Like