হোম » কী এমন লিখেছিলাম?

কী এমন লিখেছিলাম?

ঢাকা অফিস- Wednesday, January 13th, 2016

কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

৫ জানুয়ারি আমরা যে কলঙ্কের মালা গলায় পরেছি তা থেকে কবে যে মুক্তি পাব সে শুধু দয়াময় আল্লাহই জানেন। সেদিন গাজীপুরের পথে টঙ্গীতে ব্যানারে দেখলাম, ‘বিশ্ব ইজতেমা সফল হোক— গাজীপুর পুলিশ’। ভালোই লাগল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একটি ইসলামী জলসার সফলতা কামনা করছে— খুশি না হয়ে উপায় কী?
গত সংখ্যায় কী এমন লিখেছিলাম বুঝতে পারছি না। তাড়াহুড়া থাকায় লেখায় তেমন গতি ছিল না। বই ছাপার জন্য যখন আবার চোখ বুলাব, হৃদয় ছোঁয়াব তখন লেখাটি আরও একটু উন্নত হবে। সাত-আট বছর ধরে নিয়মিত লিখি। এমনকি গত বছর চরম উত্তেজনা জ্বালাও-পোড়াওয়ের মাঝেও ২৮ জানুয়ারি থেকে ৩০৮ দিন ঘরের বাইরে অবস্থানের মাঝে ফুটপাথে, তাঁবুতে বসেও লিখেছি। সে যে কী নিদারুণ কষ্ট, লিখে বোঝানো যাবে না। সে সময়ও পাঠকদের বঞ্চিত করিনি। যত কষ্ট হোক রাস্তার পাশে ছোট্ট কাঠের টুল নিয়ে পাঠকদের জন্য লেখা তৈরি করেছি। কিন্তু গত মঙ্গলবার ‘মা-বাবা-মামার দেশে টিউলিপকে প্রাণঢালা অভিনন্দন’ তাতে কী এমন লিখেছি? টিউলিপ আমার ভাগিনী, আমি তার মামা। এ তো শাশ্বত সত্য— কারও কোনো সন্দেহ আছে? সে ব্রিটেনে পার্লামেন্ট সদস্য হয়েছে, এ জন্য আমি আনন্দিত, গর্বিত। আমার মনে হয়েছে রাস্তাঘাটের মানুষও বেশ খুশি, তাই লিখেছি। আমি তো এখানে একদিকে আনন্দের বান, অন্যদিকে আসমান ভেঙে পড়ার কিছু দেখি না। এত ফোন, এত চিঠি, এত জনের শুভ কামনা আর কোনো লেখায় পাইনি। রেহানা একবার বলেছিল, ‘কাদের ভাই, দুইটা মা একত্র হলে তবেই মামা হয়। মামা যেনতেন ছোটখাটো কিছু নয়, মামা বড় অমূল্য ধন।’ ব্যাপারটা আমি আমার সমস্ত অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করি। আমি যখন সম্পূর্ণ নিঃস্ব-রিক্ত ম্রিয়মাণ, আশপাশে ভরসার তেমন কেউ ছিল না, তখন চাঁদের মতো বোন শাহানার মেয়ে ইয়া আমাদের অন্ধকার ঘর আলো করেছিল। জয়-পুতুল-ববি-টিউলিপ-রূপন্তীও আমার কাছে তেমনি। আমার মন, আমার হৃদয় যদি ওদের কল্যাণে ব্যাকুল হয় কার কী করার আছে? কুশিমণি যে এখন আমার সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে বিরাজ করে সেটা ফেরানোর ক্ষমতা কারও আছে, কোনো পথ বা শক্তি আছে? কয়েক বছর আগে এক বিমানযাত্রায় রেহানা ববিকে বলেছিল, ‘যা, দেখ, মামা ভাগ্নে চিনে কিনা?’ আমি আমার বুকের ধন চোখের আলো ভাগিনা ববিকে ঠিকই চিনেছিলাম। আর কদিন পর আমার কলিজার টুকরা, হৃদয়ের স্পন্দন কুঁড়িও পড়তে বিলেত যাবে। আমি নিশ্চয়ই বলব, রেহানাকে গিয়ে বলতে ভাইঝিকে চেনে কিনা। ববি-টিউলিপ-রূপন্তী তার বোনকে চিনতে পারে কিনা। আমি জানি আমার বোন তার ভাইঝি, ভাগিনা-ভাগিনী তাদের বোনকে অবশ্য অবশ্যই চিনতে পারবে।
সেদিন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া টিউলিপের সংবর্ধনায় আমাকে না দেখে একজন ক্ষমতাবান উচ্চ পর্যায়ের ভদ্রলোক বলছিলেন, ‘গণভবনে আপনাকে দেখলাম না! আপনি যাননি?’ উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই আবার প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘আপনার উপনির্বাচনের কী হলো? মনে হয় সরকার আপনাকে নির্বাচন করতে দিতে চায় না।’ ভদ্রলোককে তেমন কিছু বলতে পারিনি। এ ধরনের ক্ষমতাবানরা খুব একটা শোনার জন্য বলে না, বলার জন্য বলে, নিজেকে জাহির করার জন্য বলে। আমার জন্য যাদের এখন সুবিধা তারা তাদের চেষ্টা চালাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সামনে রেখে তারা যদি এটাওটা করতে পারে তারা তা করবে। কিন্তু আমি সেটা নিয়ে ভাবতে যাব কেন? আমরা যখন বড় হয়েছি তখন নেতাদের সালাম দিলে তারা সালাম নিতেন। আমাদেরও যারা সালাম দিত, তাদের সালাম আমরা নিতাম। সারা জীবন শত্রু-মিত্র সবার সঙ্গে মানবিক আচরণ করার চেষ্টা করেছি। দয়া-মায়া-ভালোবাসায় আমরা মানবতার শিক্ষা পেয়েছি। আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধু তার চরম বিরোধী জনাব শাহ আজিজ, সবুর খান এমনকি ফজলুল কাদের চৌধুরীকেও সম্মান দেখিয়েছেন, তাদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করেছেন। স্বাধীনতার পর জনাব শাহ আজিজুর রহমান যখন জেলে বঙ্গবন্ধুর হুকুমে আমি তার বাড়ি গিয়ে প্রতি মাসে বাড়ি ভাড়াসহ খরচের টাকা দিয়ে এসেছি। অথচ সেই জনাব শাহ আজিজ বীরউত্তম জিয়াউর রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার বিয়ের পাত্রী নাসরিনের পাসপোর্ট সিজ করে বাধার সৃষ্টি করেছিলেন। একেই বলে কৃতজ্ঞতা! খান আবদুস সবুর খানের ছোট্ট এক চিঠিতে বঙ্গবন্ধু তাকে মুক্তি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়েছিলেন। ফজলুল কাদের চৌধুরীকে জেলে বাড়ির খাবার দিতে বাধা দেওয়ায় তার ছোট মেয়ে বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলে জেলে বাড়ি থেকে খাবার-দাবারের সব বাধা উঠিয়ে নিতে বলেছিলেন। একবার গ্রেফতার করতে জনাব অলি আহাদের ঘরে পুলিশ গেলে বিরক্ত হয়ে পুলিশ কর্তাকে বলেছিলেন, ‘তোমাদের সাধারণ ভদ্রতাও নেই অমন একজন প্রবীণ নেতার শোবার ঘরে যেতে হয়?’ বেল নেই তাই বলে লাভ নেই। ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন এক দিনের জন্যও বঙ্গবন্ধুকে সম্মান করেননি। সব সময় নাহক গালাগাল করেছেন। স্বাধীনতার পরপরই রাজশাহীর কোথাও অস্ত্রসহ ধরা পড়েছিলেন। কারণ তারা এই স্বাধীনতা মানতে চাননি। আমাদের রক্তের স্বাধীনতা তাদের পছন্দ নয়। বঙ্গবন্ধুর হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তারা আবার নতুন করে দেশকে স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন। তাই রক্ষীবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে পিঠমোড়া করে বেঁধে এক পুলিশ ট্রেনিং ক্যাম্পের মাঠে ফেলে রেখেছিল। তখন এত ফোন ছিল না। জনাব সরদার আমজাদ হোসেন তখন হুইপ। রাজশাহী থেকে ফোন করেছিলেন, ‘রক্ষীবাহিনী আবদুল মতিনকে ধরে পিঠমোড়া করে মাঠে ফেলে রেখেছে। এখন আমরা কী করব?’ শোনা মাত্র বলেছিলেন, ‘তোরা করেছিস কী? এখনই তাকে রাজশাহী সার্কিট হাউসে নিয়ে যা। গোসল আসল করিয়ে নাস্তা খাইয়ে আমাকে ফোন দে।’ নেতা আমাকে সন্তানের মতো দেখতেন। তাই বসেছিলাম। ৪০-৫০ মিনিটের মধ্যেই ফোন এসেছিল। ফোন ধরে বলেছিলেন, ‘মতিন ভাই চিন্তা করবেন না। কয়েক দিন এ-জেল ও-জেল করুন। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।’ হয়েছিলও তাই। কিন্তু তারা কেউ বঙ্গবন্ধুকে সম্মান করেনি। স্বাভাবিক মানবিক মর্যাদাটুকুও দেয়নি। এই যে মাননীয় মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে কী গালাগালই না করেছেন। এখানে সেখানে তার বক্তৃতা শুনে নিজেকে ধরে রাখতে পারতাম না। কদিন আগে শেরপুর আওয়ামী লীগ নেতা হুইপ আতিউর রহমান তাকে ষড়যন্ত্রকারী বলে খেতাব দিয়েছেন। ধন্যবাদ আতিউর রহমান দেরিতে হলেও তাকে চিনেছেন। আমাদের নেতা ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। মানবতা ভালোবাসা তাদের কাছে শিখেছি। একবার সিরাজ সিকদার গিয়েছিলেন সন্তোষে। ঠিক সেই সময় হুজুরের কাছে আমিও গিয়েছিলাম। তিনি সিরাজ সিকদারকে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। যেই মাত্র তিনি আমার পরিচয় পান একেবারে আঁতকে ওঠেন। হুজুর মওলানা ভাসানী তাকে ধমকে উঠে বলেছিলেন, ‘মেহমানকে কীভাবে আশ্রয় দিতে হয় তা কী জান না? তুমি না বিপ্লবী। তুমি আবার ছটফট কর, থাম?’ আমাকেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন সিরাজ সিকদারকে নিরাপদে এগিয়ে দিতে। আমি সে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। ঘটনার দুই-তিন মাস পর একদিন বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলাম। তিনি মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন, ‘তুই ঠিক করেছিস।’ অমন জাতীয় নেতার কাছে শত্রু-মিত্র আবার কী? সব সমান, সন্তানের মতো। তিনি সবাইকে আশ্রয় দেবেন। এতে আবার দোষের কী? বেশি কী বলব? আ স ম আবদুর রব এখনো বেঁচে আছেন। তার যেদিন গুলি লাগে বঙ্গবন্ধু খবর শুনে ভীষণ মর্মাহত হয়েছিলেন। পিজিতে চিকিৎসা চলছিল। আ স ম রবের চিকিৎসায় যাতে কোনো ত্রুটি না হয় এটা বললে তুখোড় আওয়ামী নেতারা বিস্মিত হয়ে এটাওটা বলছিলেন। বঙ্গবন্ধু গর্জে উঠে বলেছিলেন, ‘তোরা রবকে মেরে ফেলতে চাস? ও তো তোদের সঙ্গেই মুক্তিযুদ্ধে ছিল। আমি বেঁচে থাকতেই ওকে মেরে ফেলবি?’ তার পরও বঙ্গবন্ধুকে কত গালাগাল শুনতে হয়েছে, এখনো শুনতে হয়। কত কঠিন সময় আমরা পার করছি। এখন কারও অত বিদ্বেষ দেখি না। তবে হ্যাঁ, ইদানীং কিছু বিশ্রী ফোন, চিঠিপত্র পাচ্ছি। যেমনটা ’৭৫-এর আগে পেতাম। তখন কিছু করার ছিল, বলার ছিল। জনাব তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল হক মণি, আবদুর রাজ্জাক, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ফণি দা— এদের দরজা ছিল আমার জন্য সব সময় খোলা। অনেক কথাই তাদের বলেছি। স্বয়ং বঙ্গবন্ধুকেও কত কথা বলেছি। তখন বঙ্গবন্ধুকে কিছু বলতে কাউকে জিজ্ঞাসা করতে হতো না। তিনি মাথায় হাত দিয়ে পুত্র স্নেহে কতবার বলেছেন, ‘যুদ্ধ করেছিস তাই সব দিকে শত্রু দেখিস। চিন্তা করিস না, আর যাই হোক কেউ আমাকে মারবে না, মারতে পারবে না। পাকিস্তানিরাই পারে নাই, কোনো বাঙালি আমাকে মারবে? তোর চিন্তা আমাকে ভাবিয়ে তোলে।’ কিছু করার মতো তখন বয়স ছিল, শক্তি সামর্থ্যও ছিল। আজ শক্তিও নেই, বয়সও নেই। মঙ্গল অমঙ্গল জানানোর জায়গাও নেই। কিন্তু এমন বিদ্বেষ মানুষের মধ্যে থাকে এটা স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। যারা চিঠিপত্র লেখে তারা অধিকাংশই বিরোধী। লেখা এবং ভাষায় মনে হয় বেশিসংখ্যক ধর্মীয় দলের। ইসলামপন্থি ধর্মীয় দলের লোকজনের লেখা অন্যের প্রতি এমন নির্মম হতে পারে ভাবতে পারি না। তারা কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুকে যে নামে ডাকেন, আমি এখানে তাদের বয়ান লিখতেও লজ্জাবোধ করি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে যে ধরনের জঘন্য ভাষা প্রয়োগ করে ভাবতেও অবাক লাগে। ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত কেউ অমন জঘন্য ভাষা ব্যবহার করতে পারে তা ছিল ধারণার অতীত। অন্যের প্রতি দয়া-মায়া-সম্মান না দেখাতে পারলে সে আবার কীসের মুসলমান? আরব বেদুইনরা না জেনে নিজের সন্তানের খুনিকেও আশ্রয় দিয়ে জানার পর তার কোনো ক্ষতি না করে বরং নিরাপদে পথ দেখিয়ে দেয়। অথচ আমরা নাম গোপন করা চিঠিতে কত কী যে দেখি যা বলার মতো নয়।
এবার অসন্তুষ্টির কথা বলি। বেগম খালেদা জিয়া শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বঙ্গবন্ধুর অবদান ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাই বলেছিলাম, ওসব বলার অর্থ স্বাধীনতাকেই অস্বীকার করা। কতজন ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন। দু-চার জন তো লিখেছেনই, ‘এ সময় বেগম জিয়ার ও কথা না ধরলে পারতেন না? তিনি তো ওভাবে বলেননি।’ যা সত্য তা না বলে আমি থাকতে পারি না। তাই যারা বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করে না, আমার দৃষ্টিতে তারা বাংলাদেশকেও স্বীকার করে না। আর বাংলাদেশকে স্বীকার না করে বাংলাদেশে রাজনীতি চলে না— এ সাদা কথাটিই বলেছিলাম। তাতে আসমান ভেঙে পড়ার কী ছিল? গত কয়েক বছর বিএনপি মানুষকে পাত্তা দেয়নি। যেমন আজকাল আওয়ামী লীগ দেয় না। ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিয়ে সবচেয়ে বড় অন্যায় করেছে, আওয়ামী লীগ এটা জনগণের কাছে অনেকটা প্রতিষ্ঠাও করেছে। নির্বাচন বর্জন ’৮৬ সালে বিএনপিই সূচনা করেছিল। ’৮৬-র এরশাদবিরোধী আন্দোলনে যখন নির্বাচনের কথা হয় তখন এমনও হয়েছিল, প্রয়োজনে দুই নেত্রী ১৫০+১৫০ = ৩০০ আসনে দাঁড়াবেন। সে জন্য হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আদেশ জারি করেছিলেন ৫ আসনের বেশিতে কেউ দাঁড়াতে পারবেন না। রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে তিন জোটের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে ’৮৬-তে ভোটে যাওয়ার কথা ছিল। আওয়ামী জোট ভোটে যাচ্ছে বলে বিবৃতি দিয়ে দেয়, আড়াইটা পর্যন্ত বিএনপি জোট ভোটে অংশ নেওয়ার বিবৃতি দেয়নি। পর দিন বিএনপি সরে দাঁড়ায়, আওয়ামী লীগ ভোটে যায়। সে যাত্রায় বিএনপি আওয়ামী লীগকে এরশাদের দালাল বলে জনগণের কাছে তুলে ধরতে সফল হয়। আবার ’৯৬ সালে বিএনপির ডাকা ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আওয়ামী লীগ বর্জন করে। বিএনপিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেনে নিতে বাধ্য করে। ১২ জুনের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২৩ জুন পলাশী দিবসে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণ করে। আন্দোলনের মধ্যে পতিত বিএনপি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা হয়নি। ১১৬টি আসন নিয়ে বিএনপি বরং সরকার গঠনের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগ ১৪২, বিএনপি ১১৬, জাতীয় পার্টি ৩৫। বিএনপি ১১৬+জাতীয় পার্টি ৩৫ = ১৫১। তারা কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে পারত। জাতীয় পার্টিকে সব কটি মন্ত্রিত্ব দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করতে চেয়েছিল।
ব্যাপারটা তখন এমন দাঁড়িয়েছিল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একটু ঝুঁকলেই আবার সেই বিএনপি সমর্থিত সরকার। শোনা যায়, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে ভারতই আওয়ামী লীগের দিকে টেনেছিল। যে কারণে ঐকমত্যের সরকার হয়েছিল। যার ফলে জাতীয় পার্টির আনোয়ার হোসেন মঞ্জু হয়েছিলেন যোগাযোগমন্ত্রী। ’৮৬ সালের নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি জনগণকে পাশে পেয়েছিল। ’৯৬-র ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে আওয়ামী লীগ মানুষকে জাগাতে পেরেছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি মানুষের কাছে যেতে পারেনি বা যায়নি। তা না হলে ৩০০ আসনের ১৫৩টি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, বাকি আসনেও ভোট পড়েছিল ৪-৫ শতাংশ। নির্বাচন কমিশন নিজেই বলেছে ভোট পড়েছে ৪০ শতাংশ। অর্ধেক আসনে ৪০ শতাংশ ভোট পড়লে পুরো সংসদ ২০ শতাংশ ভোটের ওপর দাঁড়িয়ে— এ সাদা কথাটিও বিএনপি দেশবাসীকে এবং বিশ্ববাসীকে বোঝাতে পারেনি। জাতীয় নির্বাচন বর্জন করার পরপরই কাউকে কিছু না বলে তাড়াহুড়া করে উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়। নিবন্ধিত দল যারা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি তাদের তো জিজ্ঞাসা করা হয়ইনি, নিজের জোটের কাউকে কোনো কিছু না বলেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। এরপর ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন। সেখানেও বিরোধী দল বিএনপি লাল কার্ড দেখেছে। সদ্য সমাপ্ত পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি যা পাওয়ার তা-ই পেয়েছে। কেন যেন মনে হয় যা পেয়েছে অনেক বেশিই পেয়েছে। সাদা চোখে যা দেখেছি তাতে বিএনপি মনে করেছিল দেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে না, তাহলে বিএনপি ছাড়া কাকে দেবে? সব ভোট ধানের শীষে দেবে তাই তারা প্রচারে নামেনি। মাগনা পেলে কে আবার পরিশ্রম করে? এমপি, মন্ত্রীদের প্রচারে বাধা ছিল। বিএনপি নেত্রী এখন এমপিও নন, মন্ত্রীও নন। আর তা ছাড়া কোনো দলীয় প্রধানের নির্বাচনী প্রচারে কোনো বাধা ছিল না। এক দিনের জন্যও ম্যাডাম বাইরে বেরোননি, প্রচারে যাননি। বরং ভোটের দু-এক দিন আগে শহীদের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ, স্বাধীনতায় বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ও অবদান অস্বীকার করেন। এতে আর কিছু না হোক শতকরা ১০টি ভোটও যদি কমে তাহলে তার জন্য কম করে ২৫ জন প্রার্থী হেরেছেন। কারণ ১৪ ভোটে চুনারুঘাটে বিএনপি জিতেছে, ১৩ ভোটে বিএনপি জিতেছে তানোরে। ঠিক তেমনি ১৭৬ ভোটে বিএনপি হেরেছে ভূঞাপুরে, ১১৭ ভোটে বাগেরহাটে, ১৭২ ভোটে ধামরাইয়ে, রায়গঞ্জে ২৫৭ ভোটে, ৮৩ ভোটে শায়েস্তাগঞ্জে, ২৬৭ ভোটে শেরপুরে, ১৫৪ ভোটে জকিগঞ্জে। শতকরা ১০টি ভোট বেশি পেলে এরা সবাই হয়তো জিততেও পারত। নিজের খেয়ে আর কত বনের মোষ তাড়াব? ম্যাডাম তো নির্বাচনী প্রচারে বের হননিই, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব একবার ঢাকা থেকে সড়কপথে সুদূর ঠাকুরগাঁও গিয়ে চ্যানেলের সামনে ভোট প্রার্থনা করেছেন। তিনি গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর পথে পথে ভোট চাইতে চাইতে যেতে পারতেন। নির্বাচনে গুরুত্ব দিলে এমনটা হতো না।
লেখক : রাজনীতিক