কিউইদের কষ্টের জয়

উপমহাদেশে যেমন ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ, তাসমান সাগর পাড়ে তেমনি অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড।

নিউজিল্যান্ডের দুর্দান্ত ফর্মের বিপরীতে অস্ট্রেলিয়ানদের পেশাদারিত্বের মোড়কে এই ম্যাচকে দেখা হচ্ছিলো। যেখানে রিচার্ড হ্যাডলি, মার্টিন ক্রো থেকে স্টিভ ওয়াহ-এর মতো সাবেক কিংবদন্তি ক্রিকেটাররা বাজি ধরেছিল নিউজিল্যান্ডের ওপর। কিন্তু তারাও সম্ভবত এতোটা আশা করেননি? বিশ্বকাপের দাপুটে শক্তি অস্ট্রেলিয়াকে এদিন খুবলে রক্তাক্ত ও জখম করলো কিউই পাখির দেশ। এতোটাই যে- এদিন বিশ্বকাপে নিজেদের তৃতীয় সর্বনিন্ম ১৫১ রানেই অলআউট ডন ব্রাডম্যান-রিকি পন্টিংয়ের মাতৃভূমি। আর ছোট এই র্টাগেট সামনে পেয়ে যতো তাড়াতাড়ি খেলা শেষ করা যায় এই মনোভাবে ব্যাটিং করে ১ উইকেট ম্যাচ জিতলো ব্লাক ক্যাপসরা। ১৫২ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ৯ উইকেট হারিয়ে ২৩.১ ওভারে জয়ের বন্দরে পৌঁছে তারা।

অথচ ম্যাচের শুরুতে ক্ষুণাক্ষরেও কেউ এমন দৃশ্যপট কল্পনা করতে পারেননি। ইনজুরি থেকে দলে ফিরে চওড়া একটা হাসি দিয়েই ম্যাচ শুরু করেছিল মাইকেল ক্লার্ক। টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় তারা। সম্ভবত অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য ছিল ইডেন পার্কের ছোট মাঠে বড় রানের লক্ষ্য গড়ে স্বাগতিকদের উপর চাপ সৃষ্টি করা। কিন্তু ব্যাটিংয়ে নেমে উল্টো চাপে পড়ে অসিরাই। ডেভিড ওয়ার্নার ও অ্যারন ফিঞ্চের উদ্বোধনী জুটিতে আসে ৩০ রান। ২.২ ওভারেই। শেষে টিম সাউদি ফিঞ্চকে বোল্ড করলে সেই জুটির পতন হয়। অবশ্য তখনো খুব খারাপ কিছুর ভয় স্পর্শ করছিল না মাইকেল ক্লার্কদের। আত্মবিশ্বাস দেখাতে না পারলেও দলকে ঠিকই এগিয়ে নিচ্ছিলেন শেন ওয়াটসন ও ডেভিড ওয়ার্নার জুটি। দ্বিতীয় উইকেটে ৫০ রান যোগ করে ‘বুড়ো’ ড্যানিয়েল ভেট্টোরির হাতে বিদায় নেন ওয়াটসন (২৩)। সেটা ১৩ ওভারের শেষ বলের ঘটনা।

এরপরই মড়ক লাগে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে। সেই ৮০ রানেই আউট হন ওয়ার্নার (৩৪)। সাউদির দ্বিতীয় শিকারে পরিণত হন অসি ওপেনার। দ্রুত ফিরে যান ত্রিদেশীয় সিরিজে দুরন্ত ফর্মে থাকা স্টিভ স্মিথও (৪)। তারপরই ঘোমটা খুলে বের হন মাইকেল ক্লার্কদের মূল হন্তারক কিউই পেসার ট্রেন্ট বোল্ট। মাত্র ১০ রানের ব্যবধানে একে একে গ্লেন ম্যাক্সওয়েল (১), মিশেল মার্শ (০), মাইকেল ক্লার্ক (১২), মিশেল জনসন(১) ও মিশেল স্টার্ককে (০) ফেরান তিনি।  অবশ্য খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে দশম উইকেটে গিয়ে প্রতিরোধ গড়ে প্যাট কামিন্স ও ব্রাড হাডিন। দলের পক্ষে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৫ রানের জুটি গড়ে বিচ্ছিন্ন হন তারা। ফলে ১০৬ রানে ৮ উইকেট পড়ার পরও স্কোরবোর্ডে ১৫১ রান যোগ করতে সমর্থ হয় অস্ট্রেলিয়ানরা। ক্যাঙ্গারুদের পক্ষে সর্বোচ্চ ৪৩ রান করেন হাডিন। বোল্ট ১০ ওভার বল করে ২৭ রানের বিনিময়ে পাঁচ পাঁচটি উইকেট শিকার করেন। দুটি করে উইকেট পেয়েছেন টিম সাউদি ও ড্যানিয়েল ভেট্টোরি।

লক্ষ্য তাড়ায় ব্যাটিংয়ে নেমে আগ্রাসী হয়ে ব্যাট চালাতে থাকে নিউজিল্যান্ড। ৩.৫ ওভারের উদ্বোধনী জুটিতে আসে ৪০ রান। মার্টিন গাপটিল ১৪ বলে ১১ রান করে মিশেল স্টার্কের বলে প্যাট কামিন্সের হাতে ক্যাচ দেন। ৩ ছয় ও ৭ চারে ২৪ বলে ঝড়ো ৫০ রান করে কামিন্সের শিকার হন ব্রেন্ডন ম্যাককুলাম। অস্টম ওভারের চতুর্থ বলে কিউই দলপতির বিদায়ের তিন বল বাদে সাজঘরে ফেরেন রস টেলরও। উইকেটে না দাঁড়াতেই বোল্ড আউট হন টেলর (১)। স্টার্কের দ্বিতীয় শিকার হন তিনি। তৃতীয় উইকেট জুটিতে গ্রান্ট এলিয়টও(১) ব্যর্থ। ফলে মরা ম্যাচে সাময়িক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেটা মাত্র কিছুক্ষণের জন্য। এরপর কোরি অ্যান্ডারসন ও কেন উইলিয়ামসন পঞ্চম উইকেটে ৫২ রান যোগ করে সব শঙ্কা মুছে ফেলেন। ১৯.৪ ওভারে ম্যাক্সওয়েল ফেরান ২৬ রান করা অ্যান্ডারসনকে। তারপর আবারো রুদ্ধশ্বাষ একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় ছয় রানের ব্যবধানে লুক রঞ্চি (৬) ও ড্যানিয়েল ভেট্টোরি (২) আউট হলে।

পরে অ্যাডাম মিলনে ও টিম সাউদিকে বিদায় করে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনাও জাগান স্টার্ক। কিন্তু একটা ভালো উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠার মতো তা অতৃপ্তিতেই মোড়ানো থাকে ২৩তম ওভারের শেষ বলে অফ স্টাম্পের বাহির দিয়ে গেলে। এরপর স্ট্রাইক পেয়ে সমর্থকদের আর অপেক্ষা বাড়াননি উইলিয়ামসন। ২৪তম ওভারে প্যাট কামিন্সের করা প্রথম বলে ছক্কা হাঁকিয়ে ম্যাচের যবনিকাপাত করেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ান পেসার মিশেল স্টার্ক ৯ ওভার বল করে ২৬ রান দিয়ে ছয়টি উইকেট দখল করেন। ম্যান অব দ্য ম্যাচ নিউজিল্যান্ডের পেসার ট্রেন্ট বোল্ট।

You Might Also Like