কান ধরে উঠবোস করানো সংবিধানের লঙ্ঘন

ইকতেদার আহমেদ :
যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের আবালবৃদ্ধাবনিতাসহ সব শ্রেণীপেশার মানুষের জন্য আইন মেনে চলা আবশ্যিক কর্তব্য। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও সংবিধান হলো সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানের অবস্থান অপরাপর সব আইনের ঊর্ধ্বে। আমাদের বাংলাদেশের সংবিধানে মানবসত্তার মর্যাদা ও মানুষের মূল্যের প্রতি সমধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আমাদের সাংবিধানিক পদধারী ও সরকারি কর্মচারীরাও দেশের নাগরিক; তবে পদে বহাল থাকাকালে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অপরাপর নাগরিকের চেয়ে অধিক। সরকারি কর্মচারীরা শপথের অধীন না হলেও সাংবিধানিক পদধারীদের মধ্যে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যতীত অন্য সবাই শপথের অধীন। সাংবিধানিক পদধারীদের মধ্যে সংসদ সদস্যদের আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হয় এবং এর অতিরিক্ত, শপথ গ্রহণ করাকালে তাদের বলতে হয়Ñ তারা বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করবেন এবং সদস্যরূপে তাদের কর্তব্য পালনকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হতে দেবেন না। অপরাপর সাংবিধানিক পদধারীদেরও শপথগ্রহণ করাকালে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি বলতে হয়, তারা সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করবেন। সাংবিধানিক পদধারীসহ সরকারি কর্মচারী ও নাগরিকদের সংবিধান ও আইন মেনে চলার পাশাপাশি শৃঙ্খলা রক্ষা, জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা এবং নাগরিক দায়িত্ব পালন করা কর্তব্য।
ফৌজদারি কার্যবিধির ভাষ্য মতে, অপরাধ হলো কোনো কাজ বা বিচ্যুতি যা আপাত বলবৎ আইনের অধীনে শাস্তিযোগ্য। একজন ব্যক্তি অপরাধ সংঘটন করলে মামলা সংশ্লেষে বিচারকার্যে নিয়োজিত বিচারক ব্যতীত অপর কারো অপরাধীকে সাজা দেয়ার সুযোগ নেই এবং সে সাজা অবশ্যই আইন দিয়ে স্বীকৃত হতে হবে। একজন ব্যক্তি কোন ধরনের অপরাধ করলে তাকে কী ধরনের সাজা দেয়া যাবে, সে বিষয়টিও আইন দিয়ে নির্ধারিত। আইনের বিধান অনুযায়ী, অপরাধভেদে সাজা পাঁচ ধরনের, যথা মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, সম্পত্তির বাজেয়াপ্তি এবং অর্থদণ্ড। এ পাঁচ ধরনের সাজার বাইরে আরো দুই ধরনের সাজা ছিল; যথা দ্বীপান্তর ও বেত্রাঘাত। একপর্যায়ে এ দুই ধরনের সাজা বিলোপ করা হয়েছে।
দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান পর্যবেক্ষণে প্রতীয়মান হয়Ñ তাতে সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাবে না কিংবা কারো সাথে অনুরূপ আচরণ করা যাবে না; তবে তা প্রচলিত আইনের নির্দিষ্ট কোনো দণ্ড বা বিচারপদ্ধতি সম্পর্কিত কোনো বিধানের প্রয়োগকে প্রভাবিত করবে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কোনো ব্যক্তিকে আদালত বিচারকার্য সমাপনান্তে সশ্রম কারাদণ্ড দিলে কারা অভ্যন্তরে থাকাকালে তাকে দিয়ে কায়িক শ্রম করানো হয়। এরূপ শ্রমকে নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা অনুরূপ আচরণ বলা যায় না।
এবার পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, জনৈক সংসদ সদস্য তার সংসদীয় এলাকাধীন একটি মাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষককে ‘ধর্ম নিয়ে কটূক্তি’ করার অভিযোগে জনরোষের মুখে কান ধরে উঠবোস করান। এতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, একজন সংসদ সদস্য আইনকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে কান ধরে উঠবোস করার সাজা দিতে পারেন কি না। আমাদের সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী, আইনে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বা নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনাল ব্যতীত অপর কারো ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিয্ক্তু কোনো ব্যক্তিকে সাজা দেয়ার অধিকার বা ক্ষমতা নেই। এখানে সাজা দেয়ার অধিকার বা ক্ষমতা বলতে স্বাধীন বা নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্যে আসীন বিচারকের ক্ষমতাকে বোঝায়।
আমাদের দণ্ডবিধি ও অপরাপর দণ্ড আইনে যে পাঁচ ধরনের সাজার উল্লেখ রয়েছে, তার মধ্যে কান ধরে উঠবোস করানো সাজা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত নয়। স্পষ্টত, আমাদের সংবিধান অনুযায়ী, এরূপ সাজা লাঞ্ছনাকর ও অবমাননাকর। অতীতে আমাদের দেশসহ বিভিন্ন দেশ যখন সামন্ত রাজার শাসনে ছিল, তখন তারা জনসমক্ষে অন্যান্য সাজার পাশাপাশি অপরাধীদের এ সাজাটিও দিতেন। বর্তমানে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এ সাজা অনুমোদন করে না এবং সাজাটি ব্যক্তির মানবিক মর্যাদা, আত্মসম্মান ও মানবাধিকারের পরিপন্থী।
পূর্বোক্ত সংসদ সদস্য যে কাজটি করেছেন এটি সংবিধান ও আইন দিয়ে অনুমোদিত নয়। এমনকি এরূপ সাজা দেয়ার জন্য আদালতও ক্ষমতাপ্রাপ্ত নন। সংসদ সদস্যের এ ঘটনাটি সংঘটনের আগে অপর দু’জন সাংবিধানিক পদধারী কর্তৃক সংঘটিত অনুরূপ ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল; কিন্তু আলোচ্য ঘটনাটি যেভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, অতীতের দু’টি ঘটনা সেভাবে আলোচনায় আসেনি।
অতীতের দু’টি ঘটনার প্রথমোক্তটিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ থেকে সদ্য অবসরে যাওয়া বিচারক হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক হিসেবে কর্মকালে তার কার্যালয়ে যাওয়ার সময় তার কথিত মতে, তার গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যালে অনেকক্ষণ অপেক্ষমাণ থাকাবস্থায় ট্রাফিক পুলিশ কর্তৃক অন্য দিকের গাড়ি ছাড়ায় তার কালক্ষেপণ হওয়ার দায়ে তিনি ট্রাফিক পুলিশকে সবার সামনে কান ধরতে বাধ্য করেন। সে সময় সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদে বিচারকের নাম উল্লেখ না করা হলেও গাড়ির নম্বর এবং এ বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশ শাহবাগ থানায় জিডি করার বিষয় উল্লেখ করা হয়।
দ্বিতীয় ঘটনাটিতে সড়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মহাসড়ক পরিদর্শনকালে সে সড়কে অনুমোদনহীনভাবে জনৈক বেবিট্যাক্সি চালক তার ট্যাক্সিটি চালাতে থাকলে মন্ত্রীর নির্দেশে ট্যাক্সিটি থামানো হয় এবং তার উপস্থিতিতে তার সাথে থাকা দায়িত্বরত পুলিশ জনসমক্ষে বেবিট্যাক্সি চালককে কান ধরে উঠবোস করান। মন্ত্রীর উপস্থিতিতে সংঘটিত এ ঘটনাটির সংবাদ ও চিত্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এবং ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে প্রচারিত ও দেখানো হয়েছে।
উপরিউক্ত তিনটি ঘটনাই সাংবিধানিক পদধারী কর্তৃক সংঘটিত। এই তিনজনের মধ্যে একজন হলেন সংসদ সদস্য এবং অপর দু’জনের একজন উচ্চ আদালতের বিচারক ও অপরজন সরকারের মন্ত্রী।
এবার সংঘটিত ঘটনা বিষয়ে সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, আলোচিত প্রধান শিক্ষক ইসলামধর্ম সম্পর্কে কটাক্ষ করায় যে জন-অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল তা পুলিশ সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তাকে সংবাদ দেয়া হলে তিনি সেখানে উপস্থিত হন এবং সে মুহূর্তে এরূপ সাজা দেয়া ব্যতিরেকে উত্তেজিত জনতার রোষানল থেকে প্রধান শিক্ষককে রক্ষা করা যেত না। সংসদ সদস্যের বক্তব্য সঠিক নাকি বেঠিক, এটি তদন্তসাপেক্ষ।
আমাদের মূল দণ্ড আইন, দণ্ডবিধিতে কোনো সম্প্রদায়ের ধর্ম বা ধর্ম বিশ্বাসের বিদ্বেষমূলক অবমাননা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে। দণ্ডবিধিতে ধর্ম অবমাননার বিষয়ে অপরাধের সাজা সীমিত হওয়ায় এবং তা ধর্ম অবমাননাসংক্রান্ত অপরাধ হ্রাসে কার্যকরভাবে ভূমিকা রাখতে না পারায় ২০০৬ সালে যখন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন প্রণয়ন করা হয়, তখন এ আইনে ৫৭ ও ৬৬ ধারায় তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে যেকোনো ধর্মের অবমাননায় বর্ধিত শাস্তি দেয়ার বিধান করা হয়।
আমাদের দেশে নাস্তিক দাবিদার অনেকে ইলেকট্রনিক ও কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ধর্মবিষয়ে মিথ্যা, অশ্লীল ও মানহানিকর বক্তব্য প্রচার করে এক দিকে ধর্মকে অবমাননা করাসহ বিশ্বাসীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে চলেছেন, অপর দিকে সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বিপন্ন করে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকির সৃষ্টি করছেন। এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্র সময়োচিত পদক্ষেপ না নেয়ায় অনেকে আইনকে উপরিউক্ত সাংবিধানিক পদধারীর মতো নিজের হাতে তুলে অপ্রীতিকর এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটিয়েছেন, যা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
উচ্চ আদালতের একজন কর্মরত বিচারক কর্তৃক ট্রাফিক পুলিশ এবং সরকারের একজন মন্ত্রী কর্তৃক বেবিট্যাক্সি চালককে কান ধরে উঠবোস করানোর পর যদি এবারের ঘটনার মতো সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সোচ্চার হতো, তা হলে এরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটত না।
আইনের দৃষ্টিতে সমতা আমাদের সংবিধানের অনন্য বৈশিষ্ট্য; কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আলোচ্য ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ও অবস্থান অতীতে সংঘটিত দু’টি ঘটনার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি যথাক্রমে ট্রাফিক পুলিশ ও বেবিট্যাক্সি চালক থেকে উচ্চতর হওয়ার কারণে তার ক্ষেত্রে যেভাবে সভা, সমাবেশ ও মানববন্ধন করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন মহল থেকে বক্তব্য বিবৃতি আসছে, আগেকার দু’জনের ক্ষেত্রে তা পরিলক্ষিত হয়নি।
যেকোনো ফৌজদারি অপরাধ সময় দিয়ে বারিত নয়। আলোচ্য ঘটনার আগে সংঘটিত দু’টি ঘটনা থেকে আলোচ্য ঘটনাটি ভিন্ন। আগে সংঘটিত দু’টি ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত দু’জনই সাংবিধানিক পদধারী হিসেবে সংবিধানকে রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথগ্রহণ করলেও তাদের কাজের দ্বারা সে শপথের অবদমন ও লঙ্ঘন করেছেন। সংবিধান ও আইন দিয়ে অনুমোদিত নয়, এহেন কাজের জন্য সংবিধান ও আইন অনুমোদিত যথাযথ বিচারের ব্যবস্থা করে সাজা নিশ্চিত করা গেলে আমাদের দেশে কখনো অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।
সংবিধান ও আইন অমান্য করা, উভয়ই অপরাধ; তবে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ নম্বর ৭ক সন্নিবেশিত হওয়ায় সংবিধান বা এর কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস ও প্রত্যয় পরাহত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। স্পষ্টত, একজন সাংবিধানিক পদধারী যখন সংবিধান ও আইনের অবমাননায় কোনো ব্যক্তিকে কান ধরে উঠবোস করান, তাতে সংবিধান বা এর বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত হয়। আর যখনই এরূপ প্রত্যয় পরাহত হয়, তখনই তা সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৭ক (১)(খ) কে আকৃষ্ট করে।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com

You Might Also Like