হোম » কণ্টকাস্তীর্ণ পথে আওয়ামী লীগের নবযাত্রা

কণ্টকাস্তীর্ণ পথে আওয়ামী লীগের নবযাত্রা

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী- বুধবার, অক্টোবর ২৬, ২০১৬

আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলন শেষ হয়েছে। এই সম্মেলন নিয়ে অনেক আশা ও আশঙ্কার মধ্যে দুলছিলাম। আশঙ্কার কথাটাই আগে বলি। আশঙ্কা ছিল, যত ধুমধাম হোক, সম্মেলনটি গতানুগতিকতার মধ্য দিয়ে শেষ হবে। দলটিকে জঞ্জালমুক্ত করা ও নতুনভাবে সংগঠিত করে তোলার জন্য তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটানো হবে না। অন্যদিকে আশা ছিল, দলে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব অব্যাহত থাকবে। কিন্তু সেই নেতৃত্বের ছায়াতলে নতুন মুখেরও আবির্ভাব দেখা যাবে। নতুন ও পুরনো নেতৃত্বের সমন্বয়ে আওয়ামী লীগের নবযাত্রা শুরু হবে।
এ ক্ষেত্রে আমার আশঙ্কাটি যেমন সত্য হয়নি, তেমনি আশাও যে অনেকটা পূর্ণ হয়েছে সে কথা স্বীকারে কোনো দ্বিধা নেই। আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ সাধারণ সম্পাদকের পদটি। এই পদে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নির্বাচিত হওয়ায় এবং দলের প্রেসিডিয়ামেও কিছু কর্মদক্ষ, প্রবীণ ও নতুন মুখ যুক্ত হওয়ায় আমি আশান্বিত হয়েছি। আওয়ামী লীগ যদিও ক্ষমতায় আছে, কিন্তু তার সামনে দুস্তর কণ্টকাস্তীর্ণ পথ। এই পথ পাড়ি দেওয়া ও আগামী সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মতো অভ্যন্তরীণ শক্তি ও ঐক্য বেশ কিছুকাল যাবৎই দলটির মধ্যে দেখা যাচ্ছিল না। দলের এই ঐক্য ও শক্তি ফিরিয়ে আনার জন্য এবারের সম্মেলনে একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, এটাই সবচেয়ে বড় কথা।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও তার সামনে কণ্টকাস্তীর্ণ পথ কেন, তার একটু ব্যাখ্যা দরকার। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বিরোধী দল হিসেবে থাকাকালে আওয়ামী লীগের কাজ তুলনামূলক সহজ ছিল। এই কাজটি ছিল জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করা এবং তাদের দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য আন্দোলন করা। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর জনগণের সেই আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ ও তাদের দাবিদাওয়া বাস্তবায়নের দায়িত্বটি বর্তায় দলের ও তার সরকারের ওপর। দাবিদাওয়া চাওয়া যত সহজ, তার বাস্তবায়ন তত সহজ নয়। ক্ষমতায় বসার পরই দলের জন্য দেখা দেয় কঠিন পরীক্ষা। দেখা দেয় তাদের সামনে পর্বতপ্রমাণ অন্তরায় ও সমস্যা। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এই সমস্যাসংকুল পথ পাড়ি দেওয়ার ওপরই একটি রাজনৈতিক দলের সাফল্য অর্জন নির্ভর করে।’

বঙ্গবন্ধুর এই উক্তির অনুসরণ করেই বলা চলে, অতীতে আওয়ামী লীগ দেশের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাটির প্রতিনিধিত্ব করেছে এবং আন্দোলন ও সংগ্রামের কণ্টকাস্তীর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে দেশের মানুষকে সেই স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। এই রাজনৈতিক মুক্তির পরই বঙ্গবন্ধুর দল ও সরকার চেয়েছে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগেই তাঁকে ও দলের প্রবীণ নেতাদের হত্যা করা হয়। দীর্ঘ ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার সেই দুরূহ কাজে আবার হাত দেয়।

কিন্তু এই কাজে অর্থাৎ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের যতটা সাফল্য, তার দলের সাফল্য ততটা নয়। দলে নব্যধনী ও সুবিধাবাদীদের অনুপ্রবেশ, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের এক শ্রেণির গডফাদারদের প্রভাব বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও কোন্দলে দলটির সাংগঠনিক শক্তিতে যেমন ফাটল ধরেছিল, তেমনি গণবিচ্ছিন্নতাও দেখা দিয়েছে। হাসিনা সরকারের যত অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অর্জন, তা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা এই সংগঠনটি ইদানীংকালে দেখায়নি।

শেখ হাসিনা এ অবস্থা সম্পর্কে যে সম্পূর্ণ সজাগ, তার প্রমাণ এবারের কাউন্সিল অধিবেশনে তাঁর দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ। তিনি বলেছেন, ‘গত সাত বছরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশের উন্নয়নের ছবি মানুষের কাছে তুলে ধরতে হবে। জনগণকে বোঝাতে হবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।’ তিনি দলের নেতা ও কর্মীদের তাগিদ দিয়ে বলেছেন, ‘তৃতীয় দফায়ও নির্বাচনে জয়ী হতে হলে তাদের জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে।’

জননেত্রীর এই উক্তির প্রসঙ্গে অত্যন্ত বিনীতভাবে একটি সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে চাই। সরকারের কোনো বড় উন্নয়নই জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে না, যদি তার সঙ্গে সুশাসন (Good Governance) যুক্ত না হয়। রাজনৈতিক সরকার এই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে প্রধানত তার রাজনৈতিক সংগঠনের সহায়তায়। সাম্প্রতিককালে আওয়ামী লীগ সংগঠন হিসেবে এই সহায়তা সরকারকে দিতে পারেনি। দলের এক শ্রেণির নেতা ও এমপির দুর্নীতি ও গণবিরোধী কার্যকলাপের ফলে দেশের উন্নয়নের অর্জনগুলো জনগণের কাছে তেমনভাবে পৌঁছেনি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বিঘ্ন ঘটছে। আগামী নির্বাচনে জয়ী হতে হলে আওয়ামী লীগের আবর্জনামুক্ত হওয়া দরকার। সেই সঙ্গে উন্নয়নের ফসল জনগণের দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে সহায়তাদানে দলটির আন্তরিকতা ও ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা দরকার। দলের কাঠামোয় নতুন রক্তের সঞ্চালন দরকার।

ওবায়দুল কাদেরের মতো এক পরীক্ষিত কর্মদক্ষ তরুণকে দলের সাধারণ সম্পাদক করা ও প্রেসিডিয়ামেও কিছু নতুন মুখ যুক্ত হওয়ায় আশা জাগছে, দলটিকে সংস্কার ও সংগঠিত করার লক্ষ্যেই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দলের সব কমিটি ও উপকমিটির সদস্যদের নাম এখনো ঘোষিত হয়নি। কিন্তু হাওয়া থেকে পাওয়া খবরে বোঝা যায়, দলের সর্বস্তরেই পুরনো ও নতুন নেতৃত্বের একটি সংমিশ্রণ ঘটানো হবে এবং দলটি যাতে সামনের কণ্টকাস্তীর্ণ পথ সাহসের সঙ্গে পাড়ি দিতে পারে সে জন্য তাকে প্রস্তুত করা হবে। এ খবর যদি সত্য হয় তাহলে আমি বলব, এটা কণ্টকাস্তীর্ণ সামনের পথে আওয়ামী লীগের নবযাত্রা। ওবায়দুল কাদেরকে আমি ঘনিষ্ঠভাবে জানি। এই কর্মযোগী মানুষটি হাসিনা-নেতৃত্বের ছায়াতলে একদল নিষ্ঠ ও সৎ সহযোগী সংগ্রহ করে আওয়ামী লীগকে নববলে বলীয়ান করে তুলতে পারবেন—এ আশা আমি রাখি।

ভারতে দীর্ঘকাল গান্ধী-নেতৃত্ব কংগ্রেসে নতুন নতুন নেতার আবির্ভাব ও বিকাশকে (যেমন নেহরু, প্যাটেল, আজাদ প্রমুখ) লালন করেছিল বলেই কংগ্রেস এখনো জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী দল হিসেবে টিকে আছে। বঙ্গবন্ধুও বাংলাদেশে তাই করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বের বলয় ঘিরেই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল আলম খান প্রমুখ তরুণ নেতার বিকাশ ঘটেছিল, তাঁরা সবাই সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছতে পারেননি, সেটাও অন্য কথা।

আওয়ামী লীগকে আগামী প্রজন্মের জন্য নেতৃত্বদানে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে দলে নতুন নেতৃত্বের বিকাশে শেখ হাসিনা উদ্যোগ নেবেন কিংবা নিয়েছেন বলেই আমার ধারণা। সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘আমি চাই আমি বেঁচে থাকতে নতুন নেতা নির্বাচন করে দলকে শক্তিশালী দল হিসেবে রেখে যাব।’ এটা একজন বাস্তববাদী নেতার কথা। শেখ হাসিনা আজ আছেন, চিরকাল থাকবেন না। তখন যাতে দলে নেতৃত্বের সংকট দেখা না দেয় সে জন্য এখন থেকেই দলনেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা হয়তো সচেতন হয়েছেন। তাঁর দলে তরুণ ও সাহসী নেতাকর্মীর অভাব নেই। তাদের ভেতর থেকে তিনি বাছাই করতে পারেন, অথবা তাঁর পরিবারের ভেতরেও এই সন্ধান চালাতে পারেন। তাতে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিযোগ উঠতে পারে; কিন্তু দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই সেই অভিযোগ উপেক্ষা করা উচিত।

আমি বিস্মিত হয়ে ভাবছি, সজীব ওয়াজেদ জয়কে আরো প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে টেনে আনার কথা শেখ হাসিনা কেন ভাবছেন না। জয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় নেই। কিন্তু তাঁকে যতটুকু দেখেছি, তাতে বুঝেছি, রাজনৈতিক নেতা হওয়ার জন্য তাঁর আরো যোগ্যতা অর্জন প্রয়োজন। কিন্তু এই নেতা হওয়ার ‘ভিশন’ তাঁর মধ্যে আছে। বাংলাদেশের তরুণদের চোখে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তিনিই তুলে দিয়েছেন। ভারতে কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণে রাহুল গান্ধী যে যোগ্যতার পরীক্ষায় এখনো উত্তীর্ণ হতে পারছেন না, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগে সেই নেতৃত্ব গ্রহণের যোগ্যতার পরীক্ষায় সজীব ওয়াজেদ জয় উত্তীর্ণ হবেন বলে আমার বিশ্বাস। তবে তাঁকে দেশে ফিরে এসে মাটি ও মানুষের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।

প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ‘এবার প্রথম আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর হিসেবে সম্মেলনে যোগ দেওয়া সজীব ওয়াজেদ জয়কে দলের নেতৃত্বে চেয়ে দাবি তুলেছিলেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। কিন্তু জয় তা নাকচ করে বলেছেন, বিদেশে থেকে দলীয় পদে বসতে চান না তিনি।’ আমি তাঁর এই যুক্তির সঙ্গে সহমত পোষণ করি না। ভারতের নেহরু, সুভাষ বসু থেকে শুরু করে রাজীব গান্ধী পর্যন্ত অনেকে বিদেশে লেখাপড়া করেছেন। দীর্ঘকাল বিদেশে বসবাস করেছেন। রাজীব গান্ধী তো বিদেশি স্ত্রী-ই গ্রহণ করেছেন। তাতে দেশে ফিরে রাজনৈতিক নেতৃত্ব গ্রহণে তাঁদের অসুবিধা হয়নি। বরং বিদেশের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা দেশের রাজনীতিকে আধুনিকায়নে তাঁদের সাহায্য জুগিয়েছে। বিদেশ থেকে দেশে ফিরেই নেহরু গান্ধীবাদী বর্ণাশ্রমভিত্তিক রাজনীতিতে পরিবর্তন ঘটিয়ে আধুনিক সমাজবাদী গণতন্ত্রের (Social Democracy) ভাবধারা যুক্ত করেছিলেন, যাকে ভিত্তি করে আধুনিক গণতান্ত্রিক ভারত গড়ে উঠেছে।

জয় যদি দেশে ফিরে দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে যুক্ত হন, তাহলে তাঁর পক্ষেও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন সফল করা সম্ভব হতে পারে। দেশের তরুণ প্রজন্ম তাঁর নেতৃত্ব মেনে নিতে বেশি আগ্রহী হবে। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার রাজনীতির সাহসী উত্তরাধিকারের সঙ্গে জয় যদি তাঁর আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে মিশিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন ধারার সৃষ্টি করতে চান, তা-ও তিনি পারবেন বলে আমার ধারণা। প্রয়োজন তাঁর স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসা এবং মাতামহ ও মায়ের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার সাহস ও দূরদর্শিতা দেখানো। তাতে আওয়ামী লীগ লাভবান হবে, দেশ লাভবান হবে। আমি আওয়ামী লীগের নবযাত্রার সাফল্য কামনা করি। সেই সঙ্গে কামনা করি সজীব ওয়াজেদ জয় দেশে ফিরে আসুক।