‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ…’

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় সম্পর্কে লন্ডনে আমার বন্ধু এক বাঙালি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সঙ্গে বাজি ধরেছিলাম। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দুর্বৃত্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ আপিল আদালতে আমৃত্যু কারাদণ্ডে পরিণত হওয়ায় এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের পালের গোদা গোলাম আযমের মৃত্যুর পর তাঁকে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে সরকারি পাহারায় জানাজার ব্যবস্থা করে দেওয়ায় আমি খুব হতাশ হয়েছিলাম। এই হতাশা আমার লেখাতেও প্রকাশ করেছি এবং লন্ডনের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বলেছি, যুদ্ধাপরাধীদের আর কারো ফাঁসি হবে না। ট্রাইব্যুনালের রায়ে ফাঁসির আদেশ হলেও আপিল আদালতে গিয়ে হয়তো তা রদ হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিণত হবে।

বন্ধু আমার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেননি। তিনি বলেছেন, ‘আমি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখি। আপনিও রাখেন। সুতরাং বিশ্বাস করতে পারেন, সাঈদী কোনো কারণে চরম দণ্ড এড়ালেও বাকি যুদ্ধাপরাধীরা সেই দণ্ড এড়াতে পারবে না। হাসিনা সরকারের ওপরেও আপনি আস্থা রাখতে পারেন। যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ডদানের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তাঁর অনড় অবস্থান থেকে নড়বেন, তা মনে হয় না।’

এরপর দুর্বৃত্ত মীর কাসেম আলীকে দুই দিন আগে যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন তখনো আমি আশাবাদী হতে পারিনি। মনে হয়েছে, সর্বোচ্চ আপিল আদালতে গিয়ে এই দুর্বৃত্তও হয়তো মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পেয়ে যাবেন। আজ সোমবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই আরেক যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানের ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ডাদেশ আপিল আদালত বহাল রাখার খবর পেয়ে আমার মনের সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর হয়েছে। আমাদের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা দৃঢ় হয়েছে। সরকার জামায়াতের সঙ্গে আপস করেছে বলে যে বাজারি গুজবটি ছড়ানো হয়েছে, তা যে সত্য নয়, এই প্রতীতিও মনে জন্মেছে।

‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ…’

চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বন্ধুকে টেলিফোন করে জানিয়েছি, আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে আপনার সঙ্গে বাজিতে হেরে গেলাম। মানুষ যেকোনো ব্যাপারে পরাজিত হয়েও স্বস্তি ও আনন্দ লাভ করতে পারে, তা আজ আমি বুঝতে পারছি। আর বুঝতে পেরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও অভিনন্দন জানাতে দ্বিধা করছি না। ভাবীকালের ইতিহাস শেখ হাসিনা সম্পর্কে কী রায় দেবে জানি না। কিন্তু এ কথাটি তাঁকে বলতেই হবে যে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে একজন নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি যা করলেন, তা কোনো পুরুষ প্রধানমন্ত্রীর পক্ষেও করা সম্ভব হয়নি এবং হতো না।

জিয়াউর রহমান ও এরশাদ তো জাঁদরেল সেনাপতি ছিলেন। তাঁরাও দীর্ঘকালের জন্য ক্ষমতায় বসে মানবতার এই জঘন্য শত্রুদের বিচার করতে ও দণ্ড দিতে সাহসী হননি; বরং তাঁদের সমীহ করে চলেছেন, প্রশ্রয় দিয়েছেন। এমনকি ক্ষমতার ভাগীদার করেছেন। যুদ্ধাপরাধ করার পর দীর্ঘ চার দশকের মতো কেটে গেছে। কেউ এই মানবতার শত্রুদের গায়ে ফুলের আঁচড়টি দিতেও সাহসী হননি। ড. কামাল হোসেন থেকে শুরু করে বড় বড় রাঘব বোয়াল আইনজীবী ও রাজনৈতিক নেতা দেশে আছেন। এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের ব্যাপারে কোনো দিন তাঁদের জোর আওয়াজ তুলতে দেখা যায়নি। বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছা-সহায়তা দেওয়া দূরের কথা। কেউ কেউ অজুহাত দেখিয়েছেন সরকার আমাদের ডাকছে না। তাঁরা গণতন্ত্র ও মানবতার মিত্র হলে কি সরকারের ডাকের জন্য অপেক্ষা করার নামে বসে থাকতেন?

আমার সহৃদয় পাঠকরা যেন আমাকে ভুল না বোঝেন। আমি একটি মৃত্যুদণ্ডাদেশ (মীর কাসেম আলী) এবং আরেকটি মৃত্যুদণ্ডাদেশ উচ্চ আদালতে বহাল থাকায় আনন্দে আপ্লুত হচ্ছি, তা নয়। মৃত্যুমাত্রই শোকাবহ। কিন্তু কোনো কোনো মৃত্যু মানবতার বৃহত্তর স্বার্থে মনে হয় পরম কাম্য। বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড বা সর্বোচ্চ সাজা তাই পরম কাম্য দেশবাসীর কাছে। এ ক্ষেত্রে দুর্বলতা দেখানো মানবতার বিরুদ্ধে ঘৃণ্য অপরাধের প্রতি নৈতিক সমর্থন দেওয়া। রবীন্দ্রনাথ তাই লিখেছেন,

‘ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা

হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা।’

কেন এই মানবতার শত্রুদের প্রতি বিন্দুমাত্র করুণা দেখাব? যখনই এই ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে নিহত দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, শিল্পী, ডাক্তার, সাংবাদিক তথা মুনীর চৌধুরী থেকে সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লা কায়সারদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা মনে পড়ে, চোখে ভেসে ওঠে কবি মেহেরুন্নেসা, ললনা পত্রিকার সম্পাদক সেলিনা বানুর মৃত্যুমলিন মুখ তখন সুকান্তের সেই কবিতার লাইন মনে গর্জায়-

‘আদিম হিংস্র মানবিকতার আমি যদি কেউ হই,

স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের চিতা আমি তুলবোই।’

এই মৃত্যুদণ্ড হত্যা নয়, সত্যাগ্রহ। মিথ্যার ওপর সত্যের প্রতিষ্ঠা। এই যুদ্ধাপরাধকে চাপা দিয়ে ৪০ বছরের বেশি সময় যে মিথ্যা ইতিহাসের কলঙ্কের বোঝা জাতি বয়ে বেড়িয়েছে, একাত্তরের ঘাতকদের বিচার ও দণ্ডদান সমাপ্ত হলে জাতি সেই কলঙ্কমুক্ত হবে। একাত্তরের গণহত্যায় যারা অংশ নিয়েছে, দেশের বুদ্ধিজীবী হত্যায় (নারীসহ) যারা হাত বাড়িয়েছে, তারা তাদের ঘৃণ্য অপরাধের জন্য কখনো অনুতপ্ত হয়নি। জাতির কাছে ক্ষমা চায়নি; বরং বিচার থেকে বাঁচার জন্য ধর্মের আবরণে মিথ্যা প্রচার ও প্রোপাগান্ডায় দেশে-বিদেশে ঝড় তুলেছে। শেখ হাসিনার দৃঢ়তার কাছে সেই ঝড়কে পরাস্ত হতে হয়েছে।

এই মৃত্যুদণ্ড দেশের মানুষের মনে কোনো শোক সৃষ্টি করেনি, বিদেশের মানুষের মনেও নয়। জামায়াতের পরম মিত্র (তারেক রহমানের ভাষায় পরম আত্মীয়) বিএনপিও গোলাম আযমের মৃত্যুতে শোকবাণী দেয়নি। একমাত্র শোক প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। কাদের মোল্লার ফাঁসি হওয়ায় তারা পার্লামেন্টে বাংলাদেশকে নিন্দা করেছে এবং শোক প্রস্তাব এনেছে। গোলাম আযমের মৃত্যুতে তারা গায়েবানা জানাজা পড়েছে। বাংলাদেশে একাত্তরের নারীঘাতী, শিশুঘাতী বর্বরতায় পাকিস্তানের হানাদারদের সহচর ছিল যে এই দণ্ডিত ও বিচারাধীন অপরাধীরা, তার নিঃসংশয় প্রমাণ পাকিস্তানের কার্যকলাপ। পাকিস্তানের সামরিক চক্র (জনগণ নয়) ছাড়া মানবতার শত্রুদের জন্য কাঁদবার আজ কেউ নেই।

শেখ হাসিনা ইতিহাসে তাঁর নামটি চিরকালের জন্য অক্ষয় করলেন। তাঁর সরকার দেশের কতটা ভালো করেছে, মন্দ করেছে, সেই বিচার ইতিহাস করবে আরো অনেক পরে। কিন্তু তাঁর জীবদ্দশাতেই ইতিহাস রায় দেবে, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের ব্যবস্থার দ্বারা তিনি দেশ, জাতি ও মানবতার জন্য এমন একটি কাজ করে গেছেন, ইতিহাসেই যার তুলনা বিরল।

কয়েক বছর আগেও যে মতিউর রহমান নিজামীর গাড়িতে মন্ত্রিত্বের পতাকা উড়েছে, দম্ভ ভরে যাঁকে বলতে শোনা গেছে, ‘বাংলা ভাই বলে দেশে কেউ নেই’, সেই নিজামী এত শিগগির ফাঁসির আসামি হয়ে জেলের কনডেম সেলে বাস করবেন, সে কথা কি কেউ ভাবতে পেরেছিল? কোনো সরকার সামরিক অথবা অসামরিক হোক, গোলাম আযমের গায়ে হাত দিতে পারবে, তাঁকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে জেলে নিতে পারবে- এটা ছিল অবিশ্বাস্য ব্যাপার। সেই গোলাম আযমকেও ফ্রান্সের দেশদ্রোহী মার্শাল পেঁতার মতো কারা প্রকোষ্ঠে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়েছে। মীর কাসেম আলী তো নিজেকে বাঁচানোর জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয়ে বিদেশে লবিস্ট পর্যন্ত নিয়োগ করেছিলেন। তিনি আজ মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত জেলের কয়েদি।

দেশ-বিদেশের কেউ ভাবতে পারেনি, বাংলাদেশের কোনো সরকার একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে পারবে, দণ্ডদান দূরের কথা। এই অসাধ্য সাধন করেছে একটি গণতান্ত্রিক সরকার। আর সেই সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা। আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্রদের চাপের মুখে চিলির গণতান্ত্রিক সরকার, ফ্যাসিস্ট ডিক্টেটর নরপশু পিনোচেটকে চরম দণ্ড দিতে পারেনি। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকার এই ধরনের চাপের মুখেও একাত্তরের পিনোচেটদের এই দণ্ডদানে সাহস দেখিয়েছে এবং এগিয়ে যাচ্ছে।

একদিন কলঙ্কমুক্ত জাতি শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের কাছে অবশ্যই কুণ্ঠাহীন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।

You Might Also Like