ইউক্রেন নিয়ে পশ্চিমা ও রাশিয়ার টানা হেচড়া

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল গত বছরের শেষ দিকে। তবে তার জের চলেছে পরের বছর অর্থাৎ চলতি বছরের পুরোটা সময় জুড়ে। ইউক্রেন সংকট নিয়ে রীতিমতো মুখোমুখি অবস্থানে ছিল এবং আছে রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্ব। ইউক্রেনকে নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব ও রাশিয়ার কেন এই টানাহেচড়া? বছর শেষে সেই বিশ্লেষণ-
ইউক্রেনের রাজনীতিতে দুটি ধারা রয়েছে- একদিকে রুশপন্থী আর অন্যদিকে পশ্চিমা তথা ইউরোপপন্থী।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ইউক্রেন, জর্জিয়া, বেলারুশের মতো ১৫টি দেশ বেরিয়ে স্বাধীন হয়ে গেলেও জনগণ ও শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে রাশিয়া-প্রভাব রয়েই গেছে। ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির অনেকাংশই রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে শুরু করে বিভিন্ন খনিজ পদার্থ ও খাদ্যশস্য দেশটিতে স্বস্তায় সরবরাহ করে রাশিয়া। ২০০৪ সালে ক্ষমতায় আসা পশ্চিমাপন্থী সরকার আগপিছ না ভেবেই রাশিয়ার সঙ্গে করা বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও সামরিক চুক্তি বাতিল করে দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় দেশটিতে তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয় রশিয়া। এর ফলে সংকটে পড়ে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ। তাই ২০১০ সালে জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে রাশিয়াপন্থী ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ। ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতায় এসেই খোলাখুলিই রাশিয়ার পক্ষ অবলম্বন করেন। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে পশ্চিমারা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি ঋণ প্রত্যাখ্যান করে রাশিয়ার কাছ থেকে টাকা নেয়ার পর পশ্চিমারা দেশটির অভ্যন্তরে বিপ্লবের বীজ বুনে দেয়। শুরু হয় লাগাতার আন্দোলন, সংঘর্ষ ও হত্যা। পরবর্তীতে ইয়ানুকোভিচ পালিয়ে রাশিয়ায় গিয়ে আশ্রয় নেন। রাশিয়া এর প্রতিশোধ নেয় ক্রিমিয়া দখল করে। কিন্তু পুতিন সেখানেই থেমে যাননি। তিনি ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রাশিয়ার বংশোদ্ভুত জনগণকে ইউক্রেনকে বিচ্ছিন্ন হতে সাহায্য ও সমর্থন দেন। সে কারণে সেই অঞ্চলে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের লড়াই চলছে। পূর্বাঞ্চলের স্বঘোষিত দনেৎস্ক ও লুহানস্ক প্রজাতন্ত্রে রুশপন্থী বিদ্রোহীদের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ নির্বাচনে জোরালো সমর্থনও দিয়েছে রাশিয়া। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, জোটনিরপেক্ষ দেশের তালিকা থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করেছে ইউক্রেন। এর মাধ্যমে ন্যাটোর জোটভুক্ত হওয়ার পথ প্রশস্ত হলো দেশটির পক্ষে।

এবার আসি ইউক্রেনকে নিয় রাশিয়া ও পশ্চিমাদের টানা হেচড়ার কারণ বিশ্লেষনে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনকে রাশিয়ার প্রভাব মুক্ত করতে পারলে রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যিক ও নৌ-সীমায় বিপুল লাভ হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত সাবেক দেশগুলোকে নিয়ে একটি জোট আছে, যা সিআইএস নামে পরিচিত। এর নিয়ন্ত্রক রাশিয়া। এই জোটের আওতায় নিজেদের মধ্যে নানা ধরণের চুক্তি আছে। সাবেক সোভিয়েতভুক্ত দেশগুলোতে যদি বাইরের কোনো রাষ্ট্র সামরিক স্থাপনা গড়ে তুলতে চায় তাহলে অবশ্যই তাকে এই সিআইএসের অনুমতি নিতে হবে। যেমন-কিরগিজস্তানের মানস বিমানঘাটি ব্যবহার করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এটি ব্যবহার করে  আফগানিস্তানে যুদ্ধ-রসদ পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র। এটি ব্যবহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়ার সম্মতি নিতে হয়েছিল।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, ২০০৩ সালে জর্জিয়াতে যে ‘গোলাপ বিপ্লব’ হয়েছিল, তাতে ইইউ ও পশ্চিমা শক্তির ভূমিকা ছিল। এটা জর্জিয়াকে রাশিয়ার বলয় থেকে বের করে নিয়ে ইইউর সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির একটা পশ্চিমা-পদক্ষেপ। এর সঙ্গে ন্যাটোর শক্তি বৃদ্ধিতেও উদ্বেগ ছিল রাশিয়ার। পরের বছর ইউক্রেনে যে অরেঞ্জ রেভ্যুলিউশন হয়েছিল, সেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ- দুভাবেই প্রভাব বিস্তার করেছিল পশ্চিমা বিশ্ব। আর সেই বিপ্লবের ফলে ক্ষমতায় চলে আসে পশ্চিমাপন্থী সরকার। এতে রাশিয়া রীতিমতো অস্বস্ততিতেই ভুগছিল। কারণ এখানেও ইউক্রেনকে রাশিয়ার বলয় থেকে বের করে নেয়ার ষড়যন্ত্র কাজ করছিল ইইউর।

আবার ইউরোপের মোট চাহিদার ৩০-৪০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করে রাশিয়া। এ ছাড়াও ইউরোপের তেলের ৩৫ শতাংশও আসে রাশিয়া থেকে। গ্যাসের ৬০ শতাংশ আসে ইউক্রেনের উপর দিয়ে পাইপলাইন হয়ে। গত কয়েক বছর আগে পশ্চিম ইউক্রেনে বেশ কিছু তেল গ্যাসের খনির সন্ধান পাওয়া গেছে। শেভরনসহ পশ্চিমা তেল, গ্যাস উত্তোলনকারী দেশগুলো এই খনিগুলো থেকে প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন করতে চাইছে। সেক্ষেত্রে নতুন পাইপলাইন বসানো ছাড়াই ইউক্রেনের উপর দিয়ে যাওয়া রাশিয়ার তেল গ্যাসের পাইপলাইনগুলো তারা ব্যবহার করতে পারবে। তবে তার আগে অবশ্যই রাশিয়ার তেল গ্যাস বয়কট করতে হবে এবং ইউক্রেনকে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকিতে যেতে চাননি পুতিন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় বুলগেরিয়া, রোমানিয়া সোভিয়েত বলয়ে ছিলো। তখন মস্কোকে মধ্যপ্রাচ্যে ঢোকার জন্য এতোকিছু চিন্তা করতে হত না। কিন্তু এখন হয়। সিরিয়াতে থাকা রুশ নৌ-ঘাটিও এজন্য এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাশিয়ার কাছে। মধ্যপ্রাচ্য নিজেদের অবস্থান জানান দিতে যেকোনো মূল্য তারা সেটা ধরে রাখবে এবং রেখেছে। এছাড়া ঠাণ্ডার সময় উত্তরমেরুর বাল্টিক সাগর, ব্যারেন্টস বা কারা সাগর ব্যবহার করা রুশ নৌ বাহিনীর জন্য সমস্যা। ভূমধ্যসাগরে যেতে হলে তাদের কৃষ্ণ সাগরের ওপর দিয়েই যেতে হবে। সেক্ষেত্রে এই অঞ্চলে তার দখলে থাকাটা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, বাল্টিক, কৃষ্ণসাগরসহ কাজাখিস্তান, কিরগিজস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে ন্যাটো রাশিয়া ও চীনের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পূর্ব পশ্চিম উত্তর প্রায় সব দিক থেকেই পশ্চিমারা চীন ও রাশিয়াকে ঘিরে ফেলছে। এখন ইউক্রেনকে ন্যাটো জোটভুক্ত করতে পারলেই ষোলকলা পূর্ণ হয়। আর সে কারণেই নিজের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করেছে এবং ইউক্রেনের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাচ্ছে।
ইনস্টিটিউট ফর পলিটিক্যাল স্টাডিস ইন মস্কোর পরিচালক ও ক্রেমলিনের উপদেষ্টা সারগেই মারকভ বলেছেন, পশ্চিমারা আসলে মস্কোর বাড়ির পাশে রাশিয়াবিরোধী একটি শক্তি গড়ে তুলছিল। ‘দেখি না কী হয়’ নীতি নিয়ে অপেক্ষায় থাকতে চাননি পুতিন। তিনি ভবিষ্যতে বড় শত্রুর সঙ্গে বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার চেয়ে এই মূহুর্তের ছোটো যুদ্ধটাই বেছে নিয়েছেন। এই লড়াইটা তাকে একটা সময় করতেই হত।

You Might Also Like