হোম » এরা এত দূর আসে কিভাবে?

এরা এত দূর আসে কিভাবে?

admin- Saturday, July 22nd, 2017

ড. সা’দত হুসাইন :

একের পর এক কাহিনি বেরিয়ে আসছে। আরো কাহিনি হয়তো বেরোবে। একের পর এক অপরাধ করে দুর্বৃত্তরা এগিয়ে গেছে। অপরাধের মাত্রা বেড়েছে। কেউ তাদের টিকিটি স্পর্শ করতে পারেনি। অসহায় নারী-পুরুষ নীরবে কেঁদেছে, বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভিশাপ দিয়েছে। মাঝেমধ্যে দুর্বৃত্তরা সমাজপতি সেজে উল্টা অত্যাচারিতদের বিচার করেছে। কিম্ভূতকিমাকার বিচারে তাদের সাজা দিয়েছে। পার্থিব কাঠামোতে বিচার না পেয়ে মুসলমানরা আল্লাহর কাছে ও অন্য ধর্মাবলম্বীরা তাদের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী দেব-দেবী বা মহাপ্রভুর কাছে বিচার চেয়ে নীরব হয়েছে। নিয়তির নির্দেশে কখনো কখনো দু-একজন দুর্বৃত্ত ধরা পড়েছে। জেল খেটেছে; শাস্তি ভোগ করেছে। একাধিক দুর্বৃত্তের ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয়েছে। দুর্বৃত্তপনা কিন্তু থেমে নেই। অপরাধীর সংখ্যা কমছে না। আমাদের চেনা পরিসীমার মধ্যে অপরাধীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সমাজের প্রভাবশালী অংশ হিসেবে তারা টিকে থাকতে চাইছে।

দুর্বৃত্তদের পারিবারিক পটভূমি, শিক্ষা-দীক্ষা, চলাফেরা, মেলামেশার সাথি ইত্যাদি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, তাদের বেশির ভাগই মা-বাবা-অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণে স্বাভাবিক মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠেনি। তাদের কেউ বাল্যকাল পেরিয়ে কৈশোরে পদার্পণ করেছে নিম্নবিত্ত পরিবারের বখাটে ছেলে হিসেবে। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই গ্রাম ছেড়েছে জীবিকার সন্ধানে। একই সঙ্গে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছে অভিভাবকের সাধারণ মানের নিয়ন্ত্রণ থেকে। শহরে গিয়ে চুরি ও অনৈতিক কাজকর্মের মাধ্যমে প্রথমে বেঁচে থাকার মতো রুজিরোজগারের ব্যবস্থা করেছে। এরপর সুযোগ বুঝে দাঁও মেরে হয়েছে সম্পদের মালিক। হাতেখড়ি নিয়েছে দুর্বৃত্তপনার। আরেক দল জন্ম নিয়েছে ধনী পরিবারে। ছোট বয়সেই মা-বাবা-অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে মা-বাবার আশকারা পেয়ে। ধনী মা-বাবার চোখের সামনে তাদেরই আশকারা পেয়ে গা ভাসিয়ে দিয়েছে উদ্দাম জীবনে। অল্প বয়সে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে নামকাওয়াস্তে জড়িত হয়েছে বাবার ব্যবসায়ে, মূল উদ্দেশ্য মাসোয়ারার নামে ব্যবসা থেকে উচ্চ অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং যথেচ্ছ অসামাজিক কর্মকাণ্ডে সে অর্থ ব্যয় করা। সাধারণ আনন্দ আয়োজন দিয়ে শুরু হলেও শিগগির তা গড়িয়ে পড়েছে অপরাধমূলক কাজে। অপরাধের মাত্রা বাড়তে থাকে। অবশেষে তা পৌঁছে যায় খুন, জখম, ধর্ষণের জগতে। আতঙ্কের ব্যাপার হচ্ছে, প্রশাসন ও সমাজের কিছু গণমান্য ব্যক্তিও একসময় তাদের সমর্থক ও সহায়তাকারী রূপে আবির্ভূত হন। পরিবারের অভিভাবক, পাড়ার মুরব্বি ও স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক অল্প বয়সে যদি বেয়াড়া কিশোর অনৈতিক কাজ তথা বখাটেপনায় বাধাগ্রস্ত হয়, তবে সে এসব কাজ করতে ইতস্তত করবে, ভয় পাবে।

প্রথমে ধরা যাক পারিবারিক পর্যায়ে মা-বাবা-অভিভাবকদের সোহাগ মাখানো সতর্ক শাসন। আড়াই-তিন বছরের মধ্যে সন্তানের জেদ ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। চার-পাঁচ বছরের মধ্যে তার প্রবণতা-প্রকৃতি ফুটে ওঠে। কোনো কোনো শিশুর মধ্যে উচ্ছৃঙ্খল আগ্রাসী স্বভাবের প্রকাশ ঘটে। হাত-পা ছোড়াছুড়ির পাশাপাশি হাতে রাখা জিনিসপত্র ছুড়ে মারার কিংবা হাতের লাঠি দিয়ে মারার প্রবণতাও দেখা যায়। মা-বাবা-অভিভাবকদের এদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা আবশ্যকীয়। শিশুর এ ধরনের খারাপ কাজ বন্ধ রাখার ব্যাপারে তাঁদের দৃঢ় মনোভাব ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শিশুকে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে যে এসব হচ্ছে খারাপ কাজ। এ কাজে কেউ তাকে সমর্থন করবে না। শাস্তি থেকে বাঁচতে হলে তাকে এসব খারাপ কাজ বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজন হলে এর জন্য শিশুকে শাসন করতে হবে। পারিবারিক পর্যায়ে এ ব্যাপারে মা-বাবা, অভিভাবক, মুরব্বি সবাইকে একই মনোভাব দেখাতে হবে।

সমস্যা হয় যখন পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য দেখা দেয়। সোহাগ মাখানো শাসনের পরিবর্তে কেউ কেউ শিশুর এ ধরনের আক্রমণাত্মক ও বেয়াড়া আচরণকে প্রশ্রয় দেয় এবং অন্যান্য সদস্যকে যেকোনো ধরনের শাসনধর্মী পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেয়। শিশুকে বুঝতে দেওয়া হয় না যে তার সব চাহিদা-আবদার পূরণ হবে না। সব সময় সে যা চাইবে, তা পাওয়া যাবে না। তার চাহিদা পূরণ না হলে, সব চাওয়া না পাওয়া গেলে, তাতে তার রেগে যাওয়া চলবে না। তার চাহিদা অনুযায়ী জিনিস না পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে তার রাগ করা ঠিক হবে না, আক্রমণাত্মক ভাবভঙ্গি দেখানো তো নয়ই। তার চাহিদা ভালো হলে, তা পরবর্তীকালে যথাসময়ে পূরণ করা হবে। এ জন্য তাকে ধৈর্য ধরতে হবে। অপেক্ষা করতে হবে। চাহিদা মেটানোর জন্য তাকে শান্তশিষ্টভাবে আবদার করতে হবে। অনেক পরিবারে মা-বাবা বা অভিভাবকরা শিশু যা চায় তা-ই এনে দেওয়াকে তাঁদের সামর্থ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেন। শাসনবিহীন পরিবেশে শিশুর বড় হওয়াকে তাঁরা আধুনিকতার ছাপ হিসেবে দেখতে চান। পারিবারিক মতানৈক্যের বদৌলতে অতি অল্প বয়সে শিশুর যথেচ্ছভাবে চলার অভ্যাসে হাতেখড়ি হয়।

পাঁচ বছর বয়সে বিদ্যালয়ের পরিবেশে শিশুর শিক্ষা ও সমাজিকীকরণের অনুশীলন শুরু হয়। বিদ্যালয়ে নিয়মিত গমন ও পূর্ণকালীন অবস্থান তার জীবন গড়ন ও সুশীল হয়ে ওঠার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। প্রত্যেক অভিভাবক শিশুকে স্কুলে ভর্তি করানোর ব্যাপারে উৎসাহী, নিতান্ত হতদরিদ্র অভিভাবক ছাড়া। কিন্তু বিদ্যালয়ের নিয়ম-কানুনের আওতায় শিশুর শিক্ষাজীবন গড়ে তোলার ব্যাপারে তাঁরা তেমন উৎসাহী নন। স্কুলে যেতে হলে শিশুকে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতে হবে, রোদ-বৃষ্টি যা-ই হোক না কেন, তাকে প্রতিদিন স্কুলে যেতে হবে, বিদ্যাভ্যাস ও জীবন গঠনে সচেষ্ট থাকতে হবে। সুন্দরভাবে শিশুর বড় হয়ে ওঠার জন্য শিক্ষকরা অভিভাবকদের যে পরামর্শ দেবেন, অভিভাবকদের তা গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করতে হবে। যদি কোনো জায়গায় তাঁদের ভিন্নমত থাকে বা স্পষ্টীকরণের প্রয়োজন হয়, তবে শিক্ষকদের সঙ্গে তাঁরা আলাপ-আলোচনা করতে পারেন। এখানেও কিছু অভিভাবক শিশুর ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও জেদকে প্রাধান্য দিয়ে বিদ্যালয়ের নিয়ম-কানুনকে গুরুত্বহীন করে দেন। শিশুর ঘুম থেকে দেরিতে ওঠাকে তাঁরা প্রশ্রয় দেন, রোদ-বৃষ্টির অজুহাতে শিশুকে স্কুলে পাঠানো থেকে বিরত থাকেন, নানা পারিবারিক অনুষ্ঠানের দিন শিশুকে স্কুলে পাঠান না। বিদ্যালয়-পরিবেশের বিরুদ্ধে শিশুর বক্তব্য, অভিযোগ ও উসকানিতে তাঁরা শিশুটিকে বিদ্যালয় থেকে ছাড়িয়ে নেন। নতুন স্কুলে ভর্তি করাতে সময় লেগে যায়। এ সময় স্কুলের শৃঙ্খলার বাইরে শিশুটি তার খুশিমতো চলাফেরা করে কু-অভ্যাস রপ্ত করে। বেয়াড়াজীবনে আনন্দ আছে, অভিভাবক সে আনন্দ দেখে মজা পান। শিশুটি উচ্ছন্নে যেতে শুরু করে।

মাধ্যমিক স্কুলে অধ্যয়নকালে বালক-বালিকা উভয়ের ক্ষেত্রে দৈহিক ও মানসিক দিক থেকে নানা রকম পরিবর্তন ঘটতে থাকে। তারা গায়ে-গতরে যেমন বেড়ে ওঠে, তেমনি তাদের আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ডের সক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। বালিকাদের জন্য এ বয়সটা একটু নাজুক ক্রান্তিকালও বটে। এ নিবন্ধে অবশ্য সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে না। মূলত বালক-কিশোরের বিগড়ে যাওয়ার বিষয়টি হচ্ছে আলোচনার উপজীব্য। এ সময় বাড়ন্ত শিশু ও উঠতি কিশোরদের মধ্যে দৈহিক শক্তি প্রদর্শনের প্রবণতা এবং নানা মাত্রার হিংসাত্মক কাজের প্রতি আকর্ষণ লক্ষ করা যায়। দৈহিক পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু মনোবৈকল্যও পরিলক্ষিত হতে পারে। তাদের কেউ কেউ প্রেমকাতুরে হয়ে উঠতে পারে, আবার কেউ বা যৌন চাহিদায় আক্রান্ত হতে পারে। এককথায় তারা অনেকেই আমোদপ্রিয় (Fun-Loving) হয়ে উঠতে পারে। মা-বাবা, শিক্ষক-অভিভাবকদের শাসন, এমনকি নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের একাংশ মরিয়া হয়ে ওঠে। এর জন্য যে অর্থ-বিত্তের প্রয়োজন হয় তা জোগাড়ের জন্য তারা দুরভিসন্ধিমূলক ফন্দি-ফিকির কষে। হাজির হয় অভিভাবকদের জন্য এক নতুন ও জটিল সমস্যা, যার মোকাবেলা করা অনেক সময় দূরতিক্রমণীয় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

এ সময়ে মা-বাবা-অভিভাবকদের প্রতিনিয়ত তাঁদের সন্তান বা পোষিতের (Ward) গতিবিধি, কর্মকাণ্ড, আচার-আচরণ, খাওয়াদাওয়া ও সঙ্গী-সাথিদের প্রতি তীক্ষ দৃষ্টি রাখতে হয়। বিচ্যুতি বা সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়লে সে সম্পর্কে উদাসীন না থেকে তা খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা করতে হবে। সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হলে তা করতে হবে। সন্তান বা পোষিতকে বোঝাতে হবে যে তার কার্যকলাপ মা-বাবা-অভিভাবকদের নজরে এসেছে এবং তা পর্যবেক্ষণে রয়েছে। অতএব, সে যেন সাবধান হয়ে যায়। এ বয়সে বালক-বালিকারা নিজস্ব কৌতূহল, দৈহিক তাড়না ও বন্ধুবান্ধবের কুপ্রভাবে পড়ে মাদক সেবন, বখাটেপনা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও যৌন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। বিত্তহীন ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের কেউ কেউ পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়; পাড়া, মহল্লা, গ্রাম ছেড়ে নতুন জীবন-জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র চলে যায়। মা-বাবা-অভিভাবকদের দৃষ্টির আড়ালে গিয়ে শহর-উপশহরে নোংরা পরিবেশে নানা অকাজ-কুকাজে জড়িয়ে পড়ে। কেউ বা এর মধ্যে সম্পদশালী হওয়ার রাস্তা খুঁজে পায়; তাদের কথা পরে বলছি। সচ্ছল পরিবারের বেয়াড়া ছেলে-মেয়েরা এ সময় পড়াশোনার প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়ে। তাদের পরীক্ষার ফল খারাপ হতে থাকে। আমোদ, আহ্লাদ, ভোগ-আসক্তি ও বাড়তি খরচের দিকে তাদের আগ্রহ অনেক বেড়ে যায়। দামি ব্র্যান্ডের পোশাক-পরিচ্ছদ, যন্ত্রপাতি, ব্যবহার্যসামগ্রী, এমনকি গাড়ির জন্য মা-বাবা-অভিভাবকদের ওপর চাপ দিতে থাকে। কেউ কেউ এ চাপে নুইয়ে পড়েন, কেউ বা জৌলুস দেখানোর উদ্দেশ্যে সন্তানকে ভোগাসক্তিতে উসকে দেন। সন্তানের উচ্ছন্নে যাওয়ার পথ পরিষ্কার হয়। যাঁরা চাপের মুখেও সাহস ও প্রত্যয় নিয়ে দৃঢ়ভাবে রাশ টেনে ধরতে চেষ্টা করেন, তাঁদের একাংশ সফল হয়। তাদের সন্তান বা পোষিতরা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। ভাগ্য দোষে যাঁরা বিফল হন, তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অপরাধ, অপকর্মে জড়িয়ে তাদের কেউ কেউ কারাবাসে চলে যায়। দু-একজনকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়।

নিম্নবিত্ত পরিবারের কিছু বখাটে প্রকৃতির ‘বাপে তাড়ানো, মায়ে খেদানো’ বালক নোংরা পরিবেশে থেকে তেল চুরি, যন্ত্রাংশ চুরি, ছাগল চুরি দিয়ে শুরু করে নানা অপকর্মের মাধ্যমে সম্পদ সংগ্রহ করেছে, বিত্তশালী হয়েছে। এরপর খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ প্রায় সব অপকর্ম চালিয়ে গেছে। পাড়ার মুরব্বি রাজনৈতিক নেতা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন তাদের বাধা দেয়নি, বরং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উৎসাহ জুগিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের নূর হোসেন, খুলনার এরশাদ শিকদার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সমর্থন-সহযোগিতা পেয়েছে। এসব ব্যক্তি জাতিকে হতাশ করেছেন। তাঁদের আশকারা ও সমর্থন পেয়েই দুর্বৃত্ত শিরোমণিরা অপ্রতিরোধ্য গতিতে তাদের অপরাধযজ্ঞ চালিয়েছে। নিষ্ঠুরভাবে মানুষ খুন করেছে। মহিলাদের ধর্ষণ করেছে। বৈষয়িক সুবিধার বিনিময়ে তারা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের তাদের সহযোগী হিসেবে পেয়েছে। এ ধরনের সহযোগীরা ঘৃণার পাত্র, স্থায়ীভাবে নিন্দনীয়।

মা-বাবা, অভিভাবক, পাড়ার মুরব্বি, রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় প্রশাসন, বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি উঠতি কিশোরের বখাটেপনার প্রতি সজাগ থাকে ও সাহস-দৃঢ়তা নিয়ে শুরুতেই সম্মিলিতভাবে বখাটেপনা প্রতিরোধ করে, তবে বেয়াড়া কিশোর-কিশোরী এত দূর এগোতে পারবে না। আমরা যখন স্কুলে পড়তাম তখন পাড়ার মুরব্বিরা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে পারিবারিক অবস্থান-নির্বিশেষে এলাকার বালকদের চলাফেরা ও আচার-আচরণের ওপর নজর রাখতেন (বালিকাদের মধ্যে সমস্যা একেবারেই ছিল না)। কারো অস্বাভাবিক গতিবিধি, আচরণ-বিচ্যুতি দেখলে সঙ্গে সঙ্গেই তাকে সতর্ক হতে বলতেন। প্রয়োজনে হালকা মেজাজের শাসন করতেন। ফল হচ্ছে একটি মাঝারি আকারের দিঘির পাড়ের সত্তর-আশিটি পরিবারের প্রায় প্রত্যেক ছেলে-মেয়ে সুশিক্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রশাসনে, বিচার বিভাগে, পেশাজীবী মহলে, ব্যাংকিং সেক্টরে, বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে এ পাড়ার সন্তানরা সর্বোচ্চ স্তরে অধিষ্ঠিত হয়েছে। মুরব্বিদের সম্মিলিত সতর্কতা ও সোহাগ মাখানো দৃঢ় শাসন শিথিল হওয়ার পর পাড়ার ছেলে-মেয়েরা এলাকার প্রশংসিত অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি।

আমরা বয়স্ক মুরব্বি, রাজনীতি, প্রশাসন ও সামাজিক অঙ্গনে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছি তারা নিবেদিত উদ্যোগ নিয়ে কিশোরদের বখাটেপনা ও ছোট ছোট অপরাধ শুরুতেই যদি প্রতিরোধের উদ্যোগ নিই, তবে দুর্বৃত্তায়িত কিশোররা বেশি দূর এগোতে পারবে না। আমাদের উদাসীনতা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে তারা এত দূর এগোতে সাহস পায়।

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান