হোম » এখন সময়টা অপেক্ষারবিবিধ প্রসঙ্গ

এখন সময়টা অপেক্ষারবিবিধ প্রসঙ্গ

মাসুদ মজুমদার- Thursday, March 23rd, 2017

পর পর কয়েকটি ঘটনা আবার সর্বত্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আত্মঘাতী হামলার এই নতুন সংস্করণ আসল রোগ না উপসর্গ, কেউ নিশ্চিত করতে পারছেন না। জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়, এরা কারা ও কেন এত বেপরোয়া হয়ে উঠল। এটা ঠিকÑ জুলুম, নিপীড়ন-নির্যাতনে অধিকারহারা মানুষ বঞ্চনার শিকার হলে বাড়াবাড়ির পথ ধরে। প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আত্মঘাতী পর্যন্ত হতে পারে। পুলিশের বক্তব্যে জনগণের আস্থা ও ভরসা দুটোই কম। কারণ, বিচারবহির্ভূত হত্যার গল্প এবং গ্রেফতারের কাহিনী শুনতে শুনতে যেকোনো নাশকতা ও হঠকারী ঘটনা জনগণ নিজস্ব মূল্যায়ন করে বুঝতে বাধ্য হয়েছে। এটা সরকার ও পুলিশের প্রতি অবিশ্বাস ও অনাস্থারই নামান্তর। ক্ষমতার মানুষের প্রতি জনগণের অবিশ্বাস যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি। জনগণ জানে ক্ষমতায় থাকলে যেটা গুণ, ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়লে সেটাই হয়ে যায় দোষ। দোষে-গুণে মানুষ কতটা সভ্য ও সৎ হতে পারে, অসৎ হলেও কতটা নিচে নামতে পারে, তার কোনো সীমা নেই। তবে সততা যেমন গোপন থাকে না, অসততাও লুকিয়ে রাখা যায় না। কথায় আছে ক্ষমতার উত্তাপ, টাকার গরম, মানুষের স্বভাব ও শরীরের মেদ বেশিক্ষণ লুকানো যায় না। এ ক্ষমতার গরমের তাপে পোড়ার ভয়ে কিংবা দাপটের কাছে সত্য উচ্চারণের মতো হিম্মত অনেকেই দেখাতে পারেন না। যারা পারেন, তারা বিবেকতাড়িত হয়ে চলেন বলেই কিছুটা সাহসী হতে পারেন। উপমা হিসেবে প্রধান বিচারপতির সর্বশেষ বক্তব্য উপস্থাপন করা যায়। তিনি সংবিধান মতো কাজ করতে না দেয়ার অভিযোগ তুললেন। জনগণ ব্যক্তি হিসেবে তাকে কতটা পছন্দ করেন সেটা আলাদা প্রসঙ্গ, কিন্তু তার এ কথাটি জনগণ বিশ্বাস করে। সত্যি কথা হচ্ছে, চলমান রাজনীতি সম্পর্কে অনেকের ধারণাÑ আমরা আনপ্রেডিক্টেবল বা অজানা গন্তব্যের একটা ঘোর অন্ধকার সময় অতিক্রম করছি।
আমাদের কাছে পুরো বিষয় তেমনটি মনে হয় না। এর কারণ, রাষ্ট্রশক্তির জোর খাটিয়ে এমন পরিস্থিতি যেকোনো শাসক সৃষ্টি করতে পারেন। যে তল্লাটে মোরগ থাকে না, সেখানে ডিমপাড়া মুরগিও ডাক দেয়। জনগণ দেখলÑ গণবিচ্ছিন্ন এমন মানুষেরা দণ্ডমুণ্ডের মালিক সেজে গেছেন, যাদের রাজনৈতিক চাঁদাবাজির যোগ্যতা ছাড়া আর কিছু নেই। তা ছাড়া মনে হয়, পরিণতি না ভেবেই শাসকেরা অন্যায্য শাসনদণ্ড জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। এরও কারণ, পরিণতি না ভেবে অনেক কাজ করা সম্ভব। সরকার তাই করছে। কিন্তু সময় হলে সেটার খেসারত এতটাই বড় হয়ে যায়, যার জন্য অনেক মূল্য দিতে হয়। এখন সরকার যা যা করছে, তা অনেকের কাছে প্রত্যাশিত নয়। এমনকি সরকার পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্টরাও আজকের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। এর অর্থ এই নয় যে, সরকার সংশ্লিষ্টরা কিছুই বোঝেন না; এটাও নয় যে, এরা ধরে নিয়েছেন সরকার সব অপকর্মের পরও অবলীলায় পার পেয়ে যাবে।
সরকারে যারা আছেন তারা অনেকেই রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ভাবছেন, এটা তাদের কায়েমি শক্তি এবং সব সময় এই শক্তি তাদের হাতের মুঠোয় থাকবে। সব সময় এ শক্তি হাতের মুঠোয় রাখা যাবে বলেই নীতিনির্ধারকদের ধারণা। এরা মূলত একচোখা দৈত্যের ঘাড়ে সওয়ার হয়েছেন। ঘাড় থেকে নামলে ঘাড় মটকাবে। না নামলে এভাবে বাড়াবাড়ি করতেই হবে। আসলে এই ভাবনাটাই তাদের বাস্তবতা ভুলিয়ে রেখেছে। এই ভুলে থাকাই আসল সত্য নয়, এর পরিণতি একসময় সবাইকে ডোবাবে। আমরা অদৃষ্টবাদী হতে চাই না, যৌক্তিক হতে চাই। যুক্তিশাস্ত্র বিজ্ঞান মানে। বিজ্ঞান প্রতিটি ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়াকে অনিবার্য বলেছে। এই অনিবার্যতায় বেপরোয়া ভাব, আবেগ ও অদৃষ্টবাদিতার ঠাঁই নেই। সত্যটা একসময় মুখোমুখি এসে দাঁড়াবেই।
সব রক্ত মাথায় উঠে যাওয়া কোনো সুস্থতা নয়, একধরনের ভয়াবহ ব্যাধি। এ রোগের নাম মৃত্যুরোগ। ডাক্তার-বদ্যি এই রোগ সারাতে পারেন না। ওষুধ-পথ্যি কাজ দেয় না। এই রোগ সারাতে জনগণকে ভূমিকা রাখতে হয়। জনগণ কখনো সঙ্ঘবদ্ধ শক্তি নয়। সরকারের প্রতিপক্ষে যারা থাকেন, তাদেরই জনগণকে ভূমিকা রাখতে পথ বাতলে দিতে হয়। পথচলার অবারিত রাস্তা দেখিয়ে দিতে হয়। সব যুগে, সব সময় জনগণ সাহসী। তবে চলার পথ জনগণ রচনা করে না; সেই পথ রচনা করতে সাহায্য করে। অথচ জনগণের চলার সব পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। তাই মনে হচ্ছে, জনগণকে আহ্বান জানানোর লোক নেই। এটা ঠিক, পৃথিবীতে মানুষই দাস হয়। আবার মানুষই সেই দাসত্বে পদাঘাত করে মুক্তির পথ রচনা করে। মানুষের এই বিপরীত অবস্থান বেদনাদায়ক, কিন্তু অস্বাভাবিক নয়। স্বভাবগতভাবে মানুষ প্রভুত্বকামী। এ জন্য মানুষই দানব সাজে। আবার মানুষই ত্রাণকর্তা সেজে মানুষকে উদ্ধার করে। দেশের ১৬ কোটি মানুষকে দাস ভাবার কোনো কারণ নেই। হ্যাঁ, এই ১৬ কোটির মধ্যে দাসও আছে। আবার দাসত্বের নিগড় থেকে উদ্ধার করার মতো মানবিক ও মানসিক শক্তিসম্পন্ন লড়াকু মানুষও আছে। এই লড়াকু মানুষদের সকাল-বিকাল সন্ধান মেলে না। তাদের জন্য কিছু সময় অপেক্ষা করতে হয়। এখন সময়টা সেই অপেক্ষার।
বাংলাদেশকে নিয়ে বিদেশীরা প্রচুর ঠোঁট সেবা বা লিপ সার্ভিস দিয়ে থাকেন। এটা বাংলাদেশের ললাটের লিখন। ছোট দেশ, জনসংখ্যা বেশি। ভাত-কাপড়, রুটিরুজি, উন্নয়ন-অগ্রগতিসহ সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দাতাদের শরণাপন্ন হতে হয়। সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা হাত পাততে হয়। নির্ভরশীলতার কারণে আমাদের হাতটা সব সময় নিচেই রাখতে হয়। দানের হাত মর্যাদার, তাই ওপরেরও। গ্রহীতার হাত করুণা, ভিক্ষা ও অমর্যাদার। তাই বাংলাদেশকে নিয়ে বিদেশীরা নাক গলায়, পরামর্শ দেয়, সুযোগ বুঝে প্রেসক্রিপশনটাও হাতে ধরিয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে এত জল্পনা কল্পনার কারণটাও এখানে। সবাই ভাবছেন ভারত বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতে একটা প্রেসক্রিপশন ধরিয়ে দেবে। একই কারণে আমাদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা সহজ হয় না। নীতিগত কথা বলার সময় বলা হয় ‘বিদেশে বন্ধু আছে প্রভু নেই। সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়।’ বাস্তবতা মোটেও তা নয়। তার ওপর, কোনো সরকার বিশেষ কোনো দেশের পক্ষপুটে চলে গেলে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। আমরা তেমন একটা ভারসাম্যহীন অবস্থার মধ্য দিয়ে সময় পার করছি। দুর্ভাগ্য, বর্তমান সরকার সময়কে একাত্তরে-বাহাত্তরে নিয়ে গেছে। অবশিষ্ট সব কিছু বাকশাল আদলে ভাবতে চাইছে। এটা তাদের কৃতিত্ব নাকি অদূরদর্শিতা, সেটা দেখার জন্য কিছু সময় অবশ্যই অপেক্ষা করতে হবে। সবার স্মরণে থাকার কথা, এ সরকার ঘড়ির কাঁটা একবার উল্টো ঘুরিয়ে দিয়েছিল। শেষে ছি ছি পড়ে গেলে ঘড়ির কাঁটা স্বস্থানে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিল। আঁড়িয়াল বিলে বঙ্গবন্ধুর নামে একটা বড়সড় বিমানবন্দর করার হুজ্জত তুলে লোক হাসিয়ে শেষে নিবৃত্ত হয়েছে। এবার তারা সময়ের গতি ও কাঁটা ঘুরিয়ে বসে বসে তামাশা দেখছে। জনগণ কিন্তু প্রহর গুনছে। তাই অনেকটা আত্মপ্রত্যয় নিয়ে জোরের সাথে বলতে পারি, রাশিয়ান মডেলে সাজানো সরকার, পুতিনের কায়দায় চালানো শাসন দীর্ঘ দিন চলুক, দেশবাসী তা চায় না। কেন চায় না সেটা আওয়ামী লীগ এবং দলের নেত্রী ভালো করে জানেন।
ক্ষমতার রাজনীতির বিচারে শেখ হাসিনা নিজে টেকসই মানুষ। তার নিজস্ব একটা ধরন বা স্টাইল আছে। সেটা সবার পছন্দ হতে হবে, তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। গতানুগতিক রাজনীতিকে দুমড়ে-মুচড়ে তিনি নিজের মতো করে সাজিয়েছেন। এই সাজানো বাগানের ব্যাপারে তার নিয়োগ দেয়া মালীদের কোনো নিজস্বতা থাকার দরকার নেই, সুযোগও নেই। মালী বাগান সুন্দর করার স্বার্থে তার কাঁচির মাধ্যমে বাড়ন্ত ডগা, ডালপালা, এমনকি পাতাও কুট্টুস করে কেটে দেয়। এতে বাগানের কোনো গাছ স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় না। বাগানমালিকের ইচ্ছায় বাগান সাজাতে গিয়ে মালী অসংখ্য গাছ লোপাট করে। কিছু গাছ উপড়ে ফেলে। কিছু রাখে বনসাই করে। আওয়ামী লীগ নেত্রী তার দলকে এভাবে সাজাতে চাইলে কারো কোনো আপত্তি নেই। আপত্তি থাকার কথাও নয়। পুরো জাতিকে তিনি তার ইচ্ছা ও মর্জিমতো সাজানো বাগান বানাতে চাইতে পারেন, কিন্তু তার বাগানের গাছ তা না হতে চাইলে, এমনকি বাগানমালী ভিন্নরূপ চাইলে তিনি জোর করতে পারেন না। সমস্যাটা এখানেই। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী অতি গোপনীয়তার সাথে যেসব কাজ করেন তা তার একান্ত সহযোগী কিংবা বিশ্বস্তজনও জানতে পারেন না। কেবল সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিরাই জানেন যাকে বা যাদের তিনি নিয়োজিত করেন কর্মটি সম্পাদনের জন্য। এভাবে কাজ করতে করতে তিনি তার দলের নেতাকর্মীদের খুব ভালোভাবে বোঝার সুযোগ পেয়েছেন।
আমরা শুধু বলব, কারো দোষটা দেখলে গুণটাও দেখতে হয়। গুণটা লুকানো যেমন ন্যায়সঙ্গত নয়, তেমনি দোষ না বলাটাও সততা হতে পারে না। অপরাপর নেতানেত্রী নিজেদের সাথে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য মিলিয়ে দেখতে পারেন। গ্রহণ-বর্জনের বিষয়টি যার যার তার তার। এ কারণেই শেখ হাসিনার ভারত সফর এবং মইনের ঘোড়া কূটনীতির ভারত সফর এক হবে না। এত দিন শেখ হাসিনার ভারতনীতিতে রাখঢাক ছিল না। ভারতও প্রকাশ্যে যা করার করেছে। এবার যা হবে, কূটনীতির চাদরে ঢেকেই হবে। যারা ভাবছেন প্রতিরক্ষা চুক্তিটা হবে, তবে কৌশলে এবং সমঝোতা স্মারকের পথ ধরে। তাদের এ ভাবনা উপেক্ষার নয়।
আওয়ামী লীগের ভারতনীতি পূর্বাপর নতুনত্ব আনবে না। সাউথ ব্লক পরীক্ষিত বন্ধুর সন্ধান করে। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা সব অবস্থায় ভারতের চোখে, মন্দের ভালো। তাই ভারত সফর নতুন আশাবাদ যেমন জাগাবে না, নতুন করে শঙ্কার ডঙ্কাও বাজাতে পারবে না। আশার কথা, জনগণ ভারতভীতি ও প্রীতি কোনোটাই পরোয়া করে না। প্রয়োজনের সময় তারা স্বাতন্ত্র্য নিয়ে অস্তিত্বের সংগ্রামে নেমে পড়ে। এই বার্তাটি পিন্ডির কাছে যেমন আছে, তেমনি দিল্লিরও অজানা নয়। জঙ্গিদের নতুন কৌশল আর বিচ্ছিন্ন হামলা জনগণ এখনো আমলে নিচ্ছে নাÑ কারণ জনগণ সরকারের কথায় বিশ্বাস স্থাপনের চেয়েও শেষ দেখার জন্য অপেক্ষা করতে চায়।
মাসুদ মজুমদার
masud2151@gmail.com