হোম » এক কাপ চা

এক কাপ চা

admin- Thursday, August 25th, 2016

আবু এন এম ওয়াহিদ : এখন গ্রীষ্মের ছুটি চলছে। এ সময়ে আমার কোনো পড়ানো নেই। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ক্লাসে যাওয়ার তাগিদ নেই। ছাত্রছাত্রীদের সামনে দাঁড়িয়ে বকবক করার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয় না। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হয় না। খাতা দেখার দরকার পড়ে না। শিক্ষার্থীদের ইমেলের জবাব দিতে হয় না। কলেজে কমিটি মিটিং-এরও বালাই নেই। তার মানে এই নয় যে, আমি গরমের ছুটি এলে অফুরন্ত অবসর সময় পাই। এ না পাওয়ার কারণ আপনারা অনেকেই জানেন। আমি একটা জার্নাল চালাই, সেই সুবাদে নিত্যদিনই দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে থাকা জার্নালের সাবস্ক্রাইবার, কন্ট্রিবিউটার ও রেফারিদের সঙ্গে আমাকে যোগাযোগ করতে হয়। তাঁদের নানান কিসিম সওয়ালের জওয়াব দিতে হয়। যাঁর যাঁর সমস্যা অনুযায়ী সঙ্গে সঙ্গে সমাধান দিতে হয়। আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখতে হয়। শুধু তাই নয়, এসব কাজকামের সব দলিলপত্র সযত্নে সেভ করতে হয়। তার আবার ব্যাকআপ কপিও আলাদা ড্রাইভে রাখতে হয়। পাণ্ডলিপি নিয়ে প্রেসে যেতে হয়, প্রুফ দেখতে হয়, আরো কত কিছু। তারপর এদিক-ওদিক যাওয়া তো আছেই। তিন দিনের জন্য বিদেশ গেলে যাওয়া-আসার পথে চলে যায় সাড়ে তিন দিন। যাওয়ার আগে ভিসা, কাগজপত্র, কাপড়চোপড় সব গোছগাছ করতে লাগে এক সপ্তাহ, ফিরে এলে ক্লান্ত হতে হতে যায় আরো দু-তিন দিন। এ দিনগুলোতে যত কাজ জমা হয় তা গুছিয়ে আনতে ক’দিন লাগতে পারে তা আপনারা সহজেই আন্দাজ করে নিতে পারেন। এ ছাড়াও একটু-আধটু দিনদুনিয়ার খবর রাখারও চেষ্টা করি, লেখালেখি করি। তার ওপর সাংসারিক কাজকর্ম তো লেগেই আছে। এত কিছু সামাল দিয়ে বিছানায় যেতে যেতে প্রায় প্রতিদিন রাত ১২টা-১টা, কোনো দিন আরো দেরি হয়ে যায়। এ নিয়ে গিন্নির সাথে মাঝে-মধ্যে খিটিমিটিও হয়।
তারপরও গ্রীষ্মের ছুটিকে আমি ছুটিই মনে করি। তার একটা ছোট্ট কারণ আছে। কারণ আর কিছু নয়, সকাল বেলার এক কাপ ‘সোনালি চা’ (শব্দযুগল আমার নিজের নয়, এ নিয়ে আরো কথা হবে একটু পরে)। চা-এর সাথে ছুটির সম্পর্কটি কী? সে কথা শুনুন এবার। আমি জানি খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে আমার মাঝে একটা বৈপরীত্য আছে। একদিকে আমি ষোল আনা ভোজনরসিক মানুষ, অর্থাৎ মজাদার খাবার আমার খুব প্রিয়, (কী কী খাবারের খুশবু আমাকে পাগল করে তা ইতিমধ্যে আপনাদের অনেকের জানা হয়ে গেছে) অন্যদিকে যখন যা থাকে তা দিয়েই আমার পেটের খিদে মেটাতেও কোনো অসুবিধা হয় না, কারণ আমার জিহ্বার ঃধংঃব নঁফ খুব ধারালো। আমিষ হোক, নিরামিষ হোক, শাক-শুটকি, করলা ভাজি, আর ডাল-আলু-ভর্তা যা-ই হোক, আমার প্লেটে এলে আমি সেগুলোকে আল্লাহ্র নিয়ামত হিসেবেই দেখি এবং মুখে দিলে অমৃতের স্বাদ পাই। এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহে আমি সৌভাগ্যবান!
ছুটির দিন সকাল বেলার নাস্তায় ডিম-রুটি-মাখন, জ্যাম-জেলি, ওয়াফল, মাফিন, ব্যাগল, বিস্কিট, দুধ-সিরিয়েল, কলা-মূলা যখন যা পাই তা-ই খাই। অনাড়ম্বর পরিবেশে কিচেন টেবিলে বসেই নাস্তা পর্ব সেরে ফেলি। তারপর নিজ হাতে যতœ করে বড় কাপে এক কাপ চা বানাই, কিন্তু সেটা রান্না ঘরে বা লিভিং রুমে বসে খাই না। ওপরে নিয়ে আসি আমার অফিসঘরে। এখানে একা একা হেলান দিয়ে আরাম করে সোফায় বসে খুব আয়েসের সাথে ধীরে ধীরে আমি চা-টা খাই। এক কাপ চা খেতে আমার কমসে কম ১৫ মিনিট সময় লাগে। খেতে খেতে চা যাতে ঠা-া না হয়ে যায়, সে জন্য ভালো করে গরম করে আনি। এই সময়টা এবং চা খাওয়াটা আমি ভীষণভাবে উপভোগ করি। এই সময় আমি কোনো কাজ করি না। এটা আমার একাšইÍ ব্যক্তিগত সময়, নিজস্ব সময়, আনন্দের সময়, উপভোগের সময়। বলতে পারেন এটা আমার একমাত্র নিখাদ বিনোদন-উৎস।
চায়ের পেয়ালায় একেকটা চুমুক দেওয়ার সাথে সাথে মনে হয় যেন আমার আয়ু এক মাস করে বেড়ে যাচ্ছে! আরো মনে হয় আমি যেন সংসারযন্ত্রণা থেকে মুক্ত একেবারেই দুশ্চিন্তাহীন মানুষ, জগতে আমার চেয়ে সুখী আর কেউ নেই! আমি যখন নীরবে একাকী চা খাই, তখন নানা ধরণের কাল্পনিক ভাবনা এসে মাথায় ভীড় করে, পেছনে ফেলে আসা দিনগুলো অজ¯্র রঙ ধরে একে একে আমার স্মৃতির মিনারে এসে ধাক্কা খায়। রবি ঠাকুরের ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে,
‘দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি….।’
এ টুকু লেখার পর, আমি আর লেখাটিকে কোনোমতেই এগিয়ে নিতে পারছিলাম না। ফাইলটা সেভ করে বিরতি নিলাম। কয়েক সপ্তাহ পর আবার কম্পিউটার খুলে লিখতে বসলাম। বাকিটা কিভাবে লিখব, ভেবে ভেবে কোনো কূলকিনারা পেলাম না। যা লিখা হয়েছে তা-ই ইংল্যান্ড পাঠালাম বন্ধু মাহবুবের কাছে। মাহবুব কিছু সূত্র ধরিয়ে দিল, তার সূত্র এবং আমার স্মৃতিচারণ, এ দু’য়ের সংমিশ্রণে লেখাটা শেষ করলাম, এভাবে।
ভারতবর্ষে চা-চাষের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এটা শুরু হয়েছে ব্রিটিশ আমলে ১৮২০ দশকের শেষ দিকে আসাম অঞ্চলে। ১৮২৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অহম রাজাদের কাছ থেকে ‘ইয়ান্দাবু’ চুক্তির মাধ্যমে বিশাল পরিমাণ পাহাড়ী জমির দখল নেয়। তারপর চীনা বীজ ও চাষাবাদ পদ্ধতিতে মানুষকে চা-চাষে উৎসাহীত করার জন্য ওই অঞ্চলে বড় বড় উদ্যোক্তাদের দীঘর্মেয়াদে জমি বন্দোবস্ত দিতে শুরু করে। শুরুতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাণিজ্যিকভাবে কেউ চা-চাষ করেছিলেন কিনা সে তথ্য আমার জানা নেই। তবে পারিবারিকভাবে নিজের ব্যবহারের জন্য সবার আগে যিনি চা আবাদ করেন তাঁর নাম ছিল মণিরাম দেওয়ান। তিনি ১৮০৬ সালে জন্ম গ্রহণ করেন এবং সিপাহী বিদ্রোহে জড়িত থাকার কারণে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ১৮৫৮ সালে ফাঁসি দেয়। আসাম টি কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে ১৮৩৭ সালে আসাম তথা ভারতবর্ষের পথ্র ম চা-বাগান আবাদ করে আপার-আসামের চাবুয়াতে। চাবুয়া আসামের ডিব্রুগড় শহর থেকে ২০ মাইল পূবে অবস্থিত একটি ছোট্ট শহর। অহমীয়া ভাষায় ‘চাবুয়া’ শব্দটি এসেছে ‘চা’ (মানে চা) এবং ‘বুয়া’ মানে ‘লাগানো’ ইংরেজিতে যাকে বলে ঢ়ষধহঃধঃরড়হ। চাবুয়া চা-বাগানে প্রথম উৎপাদন শুরু হয় ১৮৪০ সালে।
বাংলাদেশে সবচেয়ে পথ্রম চায়ের চাষ শুরু হয় আরেকটু পরে, ১৮৪০ সালে, চট্টগ্রামে। বতর্মানে যেখানে চট্টগ্রাম ক্লাব ঠিক সেই জায়গাতেই পথ্রম চা-এর চারা লাগানো হয়েছিল। ১৮৫৪ সালে ডানকান ব্রাদারস সিলেটের সুরমা ভ্যালির মালনী ছড়ায় বাণিজ্যিকভাবে পথ্রম চা-বাগান আবাদ করে। ১৮৫৭-তে শুরু হয় তার উৎপাদন। তারপর ১৮৬০ সালে তারা আরো দু’টো বাগান চালু করে, হবিগঞ্জের লালচান্দে এবং মৌলভী বাজারের মের্টিঙ্গাতে।
দেশীয় বাজারে চা বেচাকেনা শুরু হওয়ার আগে গ্রামগঞ্জের মানুষদের চা খাওয়া শেখানো এবং তাঁদের মধ্যে চা জনপিয়্র করে তোলার কাজটি চলে। এ লক্ষ্য পূরণে তখন চা-কোম্পানিগুলো কী করত জানেন? তাঁরা হাটের দিন বাজারে বাজারে যেত এবং মানুষদের চা বানিয়ে খাওয়াত। পথ্র ম পথ্র ম লোকজন একেবারেই চা খেতে চাইত না। চা-কোম্পানির প্রতিনিধিরা অত্যন্ত ধৈযের্র সাথে বুঝিয়ে শুনিয়ে চা খাওয়াতে কাউকে কাউকে রাজি করাত। যাঁরা চা খেতে সায় দিত তাঁদের বিনামূল্যে এক কাপ চা খাওয়াত এবং এক পুঁটলি চা-পাতা, একটা দিয়াশলাই ও একটা ‘তামার পয়সা’ বোনাস হিসেবে তাঁদের হাতে ধরিয়ে দিত। আজকাল পয়সা তো দূরে থাক, সিকি-আধুলি এমন কী টাকারই কোনো দাম নেই। তাই বলে সে সময়কার ‘তামার পয়সা’কে আপনারা এনকার করবেন না। ওই সময়ে বাজারে তারও একটা অর্থপূর্ণ ক্রয়ক্ষমতা ছিল। আমার এখনো মনে আছে, ছোটবেলা একটা কানা-পয়সা দিয়ে আমি লেবেনচুষ কিনেছি। এ ছাড়াও মোয়া, মুড়ি, বিস্কুট, মার্বেল ইত্যাদি এক পয়সায় কেনা যেত।
এত কিছুর পরও ঊনিশ শ’ পঞ্চাশ-ষাটের দশকে গ্রামগঞ্জে সবার বাড়িতে চা খাওয়ার চল ছিল না। তার কারণ যতটা না আর্থিক, তার চেয়ে বেশি সাংস্কৃতিক। অর্থাৎ তখনো গ্রামে চা খাওয়ার রেওয়াজটা গড়ে ওঠেনি। যাঁরা স্বচ্ছল এবং সামাজিকভাবে একটু অগস্র র ছিলেন শুধু তাঁদের বাড়িতে চা খাওয়ার চল ছিল। আমাদের একান্নবর্তী পরিবারে প্রতিদিন ভোরবেলা চায়ের জন্য সর্বপ্রথম চুলা জ্বালানো হত। চা বানিয়ে খালি পেটে খাওয়া হত। কদাচিৎ মুড়ি, টোস্ট, কিংবা কুকিবিস্কুট থাকত। খালিপেটে চা খাওয়া যে ভালো নয়, সেটা ওই সময়ে নিশ্চয়ই আমাদের বাপ-চাচারা কেউ জানতেন না। জানলে এমন ধরণের চা-সংস্কৃতি বাড়িতে গড়ে উঠতে পারত না।
সে যা-ই হোক, এ চা-তে বাড়ির সবার সমান অধিকার নিশ্চিত ছিল না। চা পেতেন দাদি, মা-চাচি, বাবা-চাচা, স্কুলের মাস্টার, মসজিদের ইমাম, অতিথিমুসাফির কেউ থাকলে তাঁরা। বাড়ির কাজের লোক এবং ছোট ছেলেমেয়েরা কেউ চা-য়ে ভাগ বসাতে পারত না। কাজের লোকদের মাঝে অবশ্য একজন ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি বংশানুক্রমে আমাদের বাড়িতে থাকতে থাকতে পুরোদস্তুর পরিবারের একজন সদস্যই বনে গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ‘মটর’এর ছেলে ‘চটর’। আব্বা এবং বড়চাচা ছাড়া তাঁকে কেউ নাম ধরে ডাকতেন না। আমরা ডাকতাম ‘চটর’ চাচা। চা বানানোর পর রান্নাঘর থেকে ‘চটর’ চাচাই যাঁর যাঁর ঘরে চা পৌঁছে দিতেন, এবং সবার শেষে মা-চাচীদের সাথে রানাœঘরে বসে তিনিও এক কাপ চা খেতে পেতেন।
আজকাল সচরাচর যেভাবে চা বানানো হয় – অর্থাৎ কেটলি ভরা গরম পানিতে টি-ব্যাগ চুবিবে রেখে, অথবা এক কাপ গরম পানিতে ব্যাগ চুবিয়ে নিয়ে যাঁর যাঁর পছন্দ মতন চা বানিয়ে ফেলা- সেযুগে এমনটি ছিল না। শহরে থাকলেও অন্তত গ্রামদেশে টি-ব্যাগের কোনো ব্যবহারই ছিল না। গুঁড়া চা-পাতা থেকেই তখন চা বনানোর নিয়ম ছিল। চুলায় পানি টগবগ করে ফুটে উঠলে পাত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ চা-পাতা ঢেলে দেওয়া হত এবং বেশ কিছুক্ষণ ফুটানোর পরে চায়ের কষ ঘন কালো হয়ে গেলে কাপের মুখে ছাঁকনি ধরে লিকার ঢেলে তারপর আন্দাজমত দুধ-চিনি মিশিয়ে দিলে মজাদার একেক কাপ ‘সোনালি চা’ তৈরি হয়ে যেত। এখানে ছোট করে একটা কথা বলে রাখি, দুধ-চিনি ছাড়া শুধু হালকা লিকারের রঙ-চা শরীরের জন্য অনেক বেশি উপকারী। আরেকটি কথা,‘black tea’ থেকে ‘green tea’ এবং ‘white tea’ থেকে ‘green tea’ আরো বেশি স্বাস্থ্যসম্মত।
গ্রামের অন্যসব ছেলেমেয়ের সাথে আমিও সকালবেলা ইমাম সাহেবের কাছে আরবি পড়তে আমাদের বাড়ির সাথে লাগোয়া মসজিদে যেতাম। মসজিদঘরের বারান্দায় বসে আমরা সূরা মুখস্থ করতাম, কায়দা-কোরআন পড়তাম। মাঝখানে ইমাম সাহেব আমাকে ছুটি দিতেন তাঁর জন্য বাড়ি থেকে এক কাপ চা নিয়ে আসার জন্য। আমি যখন চা নিয়ে আসতাম তখন বিশেষ করে শীতের দিনে চায়ের কাপ থেকে বাষ্পধোঁয়া যখন কু-লি পাকিয়ে ওপরের দিকে উঠত তখন নাকে এসে চায়ের একটা খুশবু লাগত। এতে চা খাওয়ার জন্য আমার খুব লোভ হত, কিন্তু খেতে পারতাম না। যখন হাই স্কুলে গেলাম তখনও চা আমাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। হলে কী হবে, হাতে দু-এক আনা জমলে লুকিয়ে লুকিয়ে বড়লেখা
স্টেশনবাজারে হবি-র চা-এর স্টলে বসে মাঝে মধ্যে চা এস্তেমাল করতাম। কোনো কোনো সময় চা-এর কাপে টোস্ট চুবিয়ে চুবিয়েও খেয়েছি। চা খেতাম ঠিকই, কিন্তু যদি আব্বা দেখে ফেলেন সেই ভয়ে এত মজার চা খেয়েও আনন্দ পেতাম না। এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার। আমার আব্বা শুধু বাড়ির জবরদস্ত মুরব্বীই ছিলেন না, তিনি আমাদের হাই স্কুলের কড়া মাস্টারও ছিলেন।
তার আগে বেশ কয়েক বছর আমি নানার বাড়ি ছিলাম। সেখানে দেখেছি চাএর সংস্কৃতি একটু অন্য রকম। নানার বাড়ি সকাল বেলা চা খাওয়া হত না। চা বানানো হত, আসরের নামাজের পর এবং প্িরতদিনই খাওয়া হত। জোহরের নামাজ পড়ে ভাত খেয়ে নানা ঘুমাতেন। ঘুম থেকে উঠে আসরের নামাজ পড়লেই চা ও পান-তামাকের জন্য হাঁকডাক শুরু করে দিতেন। তবে বাড়িতে মেহমান এলে দিন-দুপুরেও চা করা হত। একদিনের কথা আজও আমার মনে পড়ে। নানার মামার বাড়ি একই গ্রামে দীঘির এপার-ওপার। নানার এক মামাত ভাই ছিলেন সার্কেল অফিসার। একবার তিনি ছুটিতে বাড়ি এসেছেন। কাজে ফিরে যাওয়ার আগে নানার বাড়ি বেড়াতে এসেছেন তাঁর সাথে দেখা করতে। তাঁরা দু’জন মামাত-ফুফাত ভাই। ওই নানাকে আমরা ডাকতাম ‘ছানু নানা’। তাঁর আসল নাম কী ছিল তা আমি কাউকে কোনো দিন জিজ্ঞেস করিনি এবং আজও জানি না। গল্পেরত দুই তুতো ভাইয়ের জন্য আমার ছোটখালা যখন চা বানিয়ে নিয়ে এলেন, তখন ‘ছানু নানা’ তাঁর কাপ ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, আরেকটা নিয়ে এসো রিঃযড়ঁঃ ংঁমধৎ’। তখন আমি ইংরেজি শব্দ দু’টোর অর্থ বুঝি, আর বুঝি বলেই এক চিন্তায়ও পড়ে গেলাম। আমার ধারণা, দুধ-চিনি ছাড়া চা হয়-ই না, এবং ওই দিন আমি অনেক ভেবেও বুঝতে পারিনি যে, ‘ছানু নানা’ চিনি ছাড়া চা চাইলেনই বা কেন, চিনি ছাড়া তিনি চা খাবেনই বা কেমন করে। অনেক পরে জেনেছি ওই নানা ডায়বেটিক পেশেন্ট ছিলেন।
চা-কফি (তখনো কফির সাথে আমার পরিচয় হয়নি) খাওয়ারও একটা আদবকায়দা আছে। সেটা শিখেছি আইএ পাশ করার পর। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এসেছি ঢাকায়। উঠেছি মেজমামার বাসায়। তিনি বহু বছর লন্ডন ছিলেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সপরিবারে ঢাকায় এসেছিলেন কয়েকদিনের জন্য। ওই সময় মেজমামার বাসায় ছিলেন আমার ছোটমামা এবং বড়ভাইও। ছোটমামা লন্ডন যাবেন এবং বড়ভাই আমেরিকা যাবেন। এ সময় দু’জনের দু’ধরণের প্রস্তুতি চলছে। মামার বাসায় কোনো এক ছুটির দিন সকালবেলা নাস্তা শেষে আমরা মামা-ভাগ্না চারজন বসে আরাম করে চা খাচ্ছি। ছোটমামা গরম চা-এর কাপে চুমুক দিচ্ছেন আর সড়ুৎ সুড়ৎ আওয়াজ তুলছেন। মেজমামা এক সময় রেগে গিয়ে বললেন, ‘দু’দিন পর লন্ডন যাবি, অথচ এখনো চা খাওয়া শিখলি না। চা খেতে আওয়াজ করা নধফ সধহহবৎ।’ ছোটমামা বেশ লজ্জা পেলেন, আর আমি চা খাওয়ার ম্যানারটা শিখতে পারলাম।
এবার শুনুন ‘সোনালি চা’-এর কথা। তখন আমি কানাডার উইনিপেগে। একবার কোনো এক সেমিনার উপলক্ষে শিকাগোর উইলিস টাওয়ারের (আগে এটা সিয়ারস্ টাওয়ার নামে পরিচিত ছিল) স্থপতি ড. ফজলুর রহমান খানের ছোটভাই ড. জিল্লুর রহমান খান এসেছিলেন উইনিপেগে। সেমিনার শেষে রাতে তাঁর ডিনারের দাওয়াত ছিল বায়োকেমিস্ট ড. একরামুদ্দৌলার বাড়িতে। সৌভাগ্যক্রমে, আমিও সেই পার্টিতে উপস্থিত ছিলাম। ডিনার শেষে গৃহকর্ত্রী যখন ড. খানকে বললেন, ‘ভাই, আপনার চা কিভাবে বানাব?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘ভাবী, বাংলাদেশের ওই এক কাপ ‘সোনালি চা।’
সবশেষে বলছি একটি মজার গল্প। গল্প নয়, আসলে এটাও সত্যি ঘটনা, শুনেছি ঢাকার অনুজপ্রতিম বন্ধু হাসান শরীফের কাছে। বর্ণনাটি তিনি যেভাবে দিয়েছেন আপনাদের জন্য আমি হুবহু সেভাবেই তুলে দিচ্ছি।
‘পল্লীকবি জসীম উদ্দীন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে চা পান করানোর একটি মজার কাহিনী উল্লেখ করেছেন তার ‘ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়’ বইতে। কবি নজরুল ছিলেন চা-খোর। কিছুক্ষণ পর পর চা পান না করলে তার চলতো না। ফরিদপুরে বঙ্গীয় রাষ্ট্রীয় সমিতির অধিবেশন উপলক্ষে কবি নজরুল সেখানে গিয়েছিলেন, তবে রাতে কবির সম্মানে জসীম উদ্দীনের উদ্যোগে গানের জলসা বসানো হলো। সেখানেই সেই চা-কাহিনীর সৃষ্টি। তার ভাষাতেই কাহিনীটি শোনা যাক :
‘রাত্রিবেলা এক মুস্কিলে পড়া গেল। চা না পাইয়া কবি অস্থির হইয়া উঠিলেন। এই পাড়াগাঁয়ে চা কোথায় পাইব? নদীর ওপারে গিয়া যে চা লইয়া আসিব, তাহারও উপায় নাই। রাত্রিবেলা কে সাহস করিয়া এত বড় পদ্মা-নদী পাড়ি দিবে? তখন তিন-চার গ্রামে লোক পাঠান হইল চায়ের অনুসন্ধানে। অনেক খোঁজাখুজির পর আলিম মাতব্বরের বাড়ি হইতে কয়েকটা চায়ের পাতা বাহির হইল। তিনি একবার কলিকাতা গিয়া চা খাওয়া শিখিয়া আসিয়াছিলেন। গ্রামের লোকদের চা খাওয়াইয়া তাজ্জব বানাইয়া দিবার জন্য কলিকাতা হইতে তিনি কিছু চা-পাতা লইয়া আসিয়াছিলেন। গ্রামের লোকদের খাওয়াইয়া চা-পাতা যখন কম হইয়া আসিত, তখন তাহার সহিত কিছু শুকনা ঘাসপাতা মিশাইয়া চায়ের ভা-ার তিনি অফুরন্ত রাখিতেন। তিনি অতি গবের্র সহিত তাঁহার কলিকাতা-ভ্রমণের আশ্চর্য কাহিনী বলিতে বলিতে সেই চা-পাতা আনিয়া কবিকে উপঢৌকন দিলেন। চা-পাতা দেখিয়া কবির তখন কী আনন্দ!
এই মহামূল্য চা এখন কে জ্বাল দিবে? এ-বাড়ির বড়বৌ, ও বাড়ির ছোটবৌ-সকলে মিলিয়া পরামর্শ করিয়া যাহার যত রন্ধনবিদ্যা জানা ছিল সমস্ত উজাড় করিয়া সেই অপূর্ব চা-রন্ধন-পর্ব সমাধা করিল। অবশেষে চা বদনায় ভর্তি হইয়া বৈঠকখানায় আগমন করিল। কবির সঙ্গে আমরাও তাহার কিঞ্চিত প্রসাদ পাইলাম। কবি তো মহাপুরুষ। চা পান করিতে করিতে চা-রাঁধুনীদের অজস্র প্রশংসা করিতেছিলেন। আমরাও কবির সঙ্গে ধূয়া ধরিলাম। গ্রাম্য-চাষীর বাড়িতে যত রকমের তরকারী রান্না হইয়া থাকে, সেই চায়ের মধ্যে তাহার সবগুলিরই প্রসাদ মিশ্রিত ছিল। কমিউনিস্ট কর্মী আবদুল হালিম বড় সমালোচনা-প্রবণ। তাঁহার সমালোচনা মতে সেই চা-রামায়ণের রচয়িত্রীরা নাকি লঙ্কাকা-ের উপর বেশী জোর দিয়াছিলেন। আমাদের মতে চা-পর্বে সকল ভোজনরসের সবগুলিকেই সম মর্যাদা দেওয়া হইয়াছিল। পরবর্তীকাল বহু গুণীজনের কাছে এই চা খাওয়ার বর্ণনা করিয়া কবি আনন্দ পরিবেশন করিতেন’।’
লেখক : অর্থনীতির অধ্যাপক- টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি; এডিটর- জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ;
Email: wahid2569@gmail.com