হোম » একজন খালেদা জিয়ার প্রতি কতো ভয় হলে এতো প্রপাগান্ডা

একজন খালেদা জিয়ার প্রতি কতো ভয় হলে এতো প্রপাগান্ডা

admin- Friday, August 4th, 2017

সায়েক এম রহমান

১৭ জুলাই সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত তাদের মন্ত্রী সভার গুরুত্বপুর্ণ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বললেন – লন্ডনে সফররত বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া কি দেশে ফিরবেন? তখনই তা নিয়ে শুরু হলো ‘মসকারা ও আলোচনা মন্ত্রী সভা’ বৈঠকে।

এক মন্ত্রী মসকরা করে বললেন, উনি লন্ডনে গেছেন আর কি দেশে আসবেন? আরেকজন বললেন, সাজার ভয়ে আর দেশে আসবেন কি না সন্দেহ। কেউ কেউ বললেন দেখেন ফিরে আসেন কি না? এভাবেই একেক মন্ত্রী একেক ভাবে মসকরা করলেন মন্ত্রী সভার বৈঠকে বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে। এই দিনকার এই মন্ত্রী সভার দৃশ্য দেখে ছোট বেলায় পড়া একটি নাটকের দৃশ্য বার বারই আমার চোখে ফোঁটে উঠছিল। নাটকটি সম্ভবত পঞ্চম শ্রেণীতে পড়েছিলাম। নাকটির নাম “ঈমান”। অনেকেই হয়ত অবগত। লেখকের নাম সঠিক মনে নেই। নাটকটির উল্লেখ্যযোগ্য রোল ছিল বাদশাহ, উজির, সাঈদ, ইসহাক, কাজল ও জল্লাদ।

নাটকটির বিষয় বস্তু ছিল: বাদশাহ ছিলেন বেদুইন। সাঈদ যুদ্ধে পরাজিত হন। তখন সাঈদকে বাদশাহর সামনে হাজির করা হয়। বাদশাহ হুকুম দিলেন, সাঈদের গর্দান কর্তন করার জন্য জল্লাদকে ডাক দেয়া হলো। জল্লাদ হাজির। সাঈদকে জিজ্ঞেস করা হল তোমার কোন শেষ ইচ্ছা আছে কি না?

তখন সাঈদ বলল, “জাঁহাপনা, লড়াইয়ের ময়দানে এসে শুনতে পেলাম আমার একটি সন্তান হয়েছে। এটা আমার প্রথম সন্তান। যদি আপনার মর্জি হয় আমার নবজাত শিশুকে একটি নজর দেখার সুযোগ দান করুন।” বাদশাহ বললেন, তাহলে তোমার জিম্মাদার হবে কে? ইসহাক দাঁড়িয়ে বলল, আমি হবো ওর জিম্মাদার। জাঁহাপনা তাহার হাতের বন্ধন খুলে দেয়ার আদেশ হউক। যাতে ঘোড়া দ্রুত দৌড়ে গিয়ে তাহার নবজাত শিশুকে দেখে এসে সুর্যাস্তের পূর্বেই তাহার প্রাণ জল্লাদের হাতে তুলে দিতে পারে। তখন ইসহাকের হাতে বন্ধন দেয়া হল।

সাঈদকে ছেড়ে দেয়া হল তার নবজাত শিশুকে দেখার জন্য। তখনই বাদশাহর মন্ত্রী সভায় শুরু হলো আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রী সভার দৃশ্য। অতঃপর শুরু হল ইসহাককে ভয় দেখানো এবং মসকরা। কেউ বলছেন জল্লাদের তলোয়ারের নীচ থেকে চলে গেলে আর কি কেউ ফিরে আসে? কেউ বলছেন সাঈদ তো আর ফিরে আসবে না। কেউ আবার বলছেন সাঈদ বেঁচে গেলো।

ইসহাক তার ঈমানি শক্তিতে বলেই যাচ্ছিল- আমি জানি সে ফিরে আসবে। কারন সে সত্য নিষ্ঠ একজন ভাই। নীতিবান একজন মানুষ। তার কথা দুই হতে পারে না। এই বুঝি সূর্য লাল হয়ে আসল ডুবু ডুবু অবস্থা ইসহাকের গর্দান এখন জল্লাদের তলোয়ারের নীচে। এমন সময় দুর থেকে আওয়াজ আসছিল, আমি হাজির, আমি হাজির, থামুন, থামুন, বলে ঠিকই সাঈদ যথা সময়ে হাজির হল বাদশাহর সামনে। বাদশাহ তখন অবাক দৃষ্টিতে সাঈদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তার ঈমানী শক্তিকে ধন্যবাদ জানালেন এবং তাদেরকে মাফ করে দিলেন। তাদের সততা নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে বাদশাহ নিজেই সাঈদের ধর্ম কর্ম গ্রহন করলেন।

এখানে বাদশাহর মন্ত্রী সভার সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রী সভার কথোপকথন গুলো অনেকাংশে মিল। তাই পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরলাম।

আজ সাধারন মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে সর্বত্রই বলছে- ‘আপনি যে ভাবেই প্রধানমন্ত্রী হন না কেন? আপনি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসে এমনভাবে মসকারী করা মোটেই সমীচিন হয় নাই। আপনার মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীরা যাই বলুক আপনার কিন্তু ডিগনিটি থাকার দরকার ছিল। এ জাতীয় কথা বার্তা প্রপাগান্ডা যতই করবেন ততই হাস্যরসে পরিনত হবেন। কারন কাঁচের ঘরে বসে কখনও ডিল মারতে নাই।

আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ও সেতু ও সড়ক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেররা ২০১৫ সালে যে ভাবে বলছিলেন ঠিক সেই ভাবেই কাঁচা ভাষায় এবারও সরাসরি মিডিয়ায় বলছেন বেগম খালেদা জিয়া পালিয়ে গেছেন।

শুধু এখানেই শেষ নয় ‘লজ্জা শরম সব কিছু ফেলে দিয়ে বিভিন্ন হলুদ মিডিয়ার মাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করছেন লন্ডনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের উপর হামলা হয়েছে। এখানেও ক্লান্ত নয় ‘পূর্বপশ্চিম বিডি নিউজ’ এর মাধ্যমে বলা হয়েছে – লন্ডনে আইএসআই এর সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠক হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য তাৎক্ষণিক ভাবে অভিযোগ করে বলেছেন, পূর্বপশ্চিম যাচাই বাচাই না করেই একটা অসত্য নিউজ প্রকাশ করেছে।

মির্জা আলমগীর পূর্বপশ্চিমকে তাহার প্রতিবাদ পত্রে বলেছেন, অসত্য সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিকল্পিত ভাবে পোষ্ট করা হয়েছে। যা সম্পুর্ণ ই উদ্দেশ্য প্রণোদিত নোংরা ও অপপ্রচার।

এখন প্রশ্ন হলো- একজন খালেদা জিয়াকে নিয়ে আর কত প্রপাগান্ডা? এখানে সহজে অনুমেয় একজন খালেদা জিয়াকে নিয়ে কত ভয় হলে এত প্রপাগান্ডা হতে পারে?

আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক ও সেতু ও সড়ক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাহেবকে বলতে চাই ‘আপনাদের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, নেতা, উপনেতা পর্যন্ত সবাই পালানো পালানো যখন এতই জপ করছেন। তা হইলে বাংলাদেশের ইতিহাসে পালাবার সংস্কৃতি কাদের একটু দেখে আসি।

১. একাত্তর সালের ২৪ মার্চ মধ্যরাতে আপোসে গ্রেফতার হয়ে কে পালিয়ে ছিলেন?

২. ৭৫ এর ২৪ জানুয়ারী কারা বহুদলীয় গনতন্ত্র থেকে পালিয়ে গিয়ে বাকশাল গঠন করে ছিলেন?

৩. ৭১ সালে সমগ্র জাতিকে অরক্ষিত রেখে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পালিয়ে গিয়ে সোনাগাছীতে আলাদা সেক্টর তৈয়ার করে কারা আমোদ প্রমোদে মত্ত ছিলেন ?

৪. এরশাদের ৮৬ নির্বাচনে কে পালিয়ে গিয়ে স্বৈরাচার এরশাদের সাথে নির্বাচন করেছিল?

৫. মঈন-ফখরুলের জরুরী সরকারের সময়ে মাইনাস ফর্মূলা মেনে নিয়ে জনগনকে অরক্ষিত রেখে কে লন্ডন পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং সৌখিন বিদেশ ভ্রমন করেছিলেন?

এখন বলুন তো পালাবার সংস্কৃতি টি কাদের ?

অপর দিকে জনগনের পাশে থাকার এবং গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করার সংস্কৃতি কাদের একটু দেখুনঃ-

১. একাত্তর সালের ভয়াল মার্চে বেগম খালেদা জিয়ার স্বামী পালিয়ে যাননি। সেই ২৫শে মার্চের কাল রাতের পরবর্তী উত্তাল দিন গুলিতে স্বাধীনতার জন্য বেগম খালেদা জিয়ার স্বামী তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহামানের উদাত্ত আহ্বানই জাতিকে উদ্বেলিত করেছিল। “আমি মেজর জিয়া বলছি” সেই ইস্পাত কঠিন উচ্চারণ জাতিকে দিয়েছিল সাহস, নিশ্চয়তা ও গন্তব্য স্থান।

২. স্বৈরাচার এরশাদের ৮৬র নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার আপোসহীনতার দরুন ৯০এ স্বৈরাচার এরশাদের পতন সহজতর হয়েছিল।

৩. বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে দীর্ঘ নয় বছর সংগ্রাম তিতিক্ষা ও আপোসহীন ভূমিকার জন্য জনগনের কাছে জননন্দিত আপোষহীন নেত্রীতে পরিণত হন।

৪. ১/১১ জরুরী সরকারের ‘মাইনাস টু’ ফর্মূলায় দুই নেত্রীই ছিলেন। সেই দিন আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশ পাঠানোর হাইয়েস্ট প্রলোভন দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রলোভনে পড়ে আপনার নেত্রী শেখ হাসিনা জনগনকে অরক্ষিত রেখে পালিয়ে গিয়ে সৌখিন বিদেশ ভ্রমন করেছিলেন। সেই দিন কিন্তু বেগম খালেদা জিয়াই মঈন ফখরুলের চাল বুঝে দেশ না ছাড়ার পক্ষে মরন কামড় দিয়েছিলেন। এই কঠিন সময়ে আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইস্পাত কঠিন কন্ঠে বলেছিলেন,” বাংলাদেশের বাহিরে আমার কোন ঠিকানা নাই। ইতিহাস সাক্ষী অতঃপর তাহার সন্তানদ্বয়ের উপর শুরু হল দুনিয়ার নিকৃষ্টতম নির্যাতন। মঈন-ফখরুল সরকার এক পর্যায়ে বেগম জিয়াকে বাইফোর্স করে বিমানে তুলার চেষ্টা করেও ব্যার্থ হয়েছিল। তিনিই হলেন জনগনের পাশে থাকার নেত্রী। তিনিই হলেন আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি পালাবার নেত্রী নন।

তিনি সেই দিন বাংলার চির সবুজের মাটিকে আঁকড়ে ধরেছিলেন আর বলেছিলেন- ‘আমি আমার মায়ের কাছেই থাকবো। আমি আমার স্বামীর কাছেই থাকবো। আমার দেশ ছেড়ে আমি যাব না। আমি ষোল কোটি মানুষের মাঝেই বেঁচে থাকতে চাই। আমি আমার দুই সন্তানকে মহান আল্লাহর কাছে সঁপে দিলাম। এই হলো আপোষহীন নেত্রী, দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়া।

একটি দলের চেয়ারপার্সন ও তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসার উদ্দেশ্যে লন্ডনে গেছেন এবং ছেলে, পূত্রবধু, নাতনীদের সাথে কয়েকটা দিন বসবাস করবেন এবং দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এর সাথে দেশের মহাসংকট নিয়ে রাজনৈতিক কলাকৌশল ও শলাপরামর্শ করবেন এটাই স্বাভাবিক। এটাকে যারা ষড়যন্ত্র বলেন তাদেরকে কি বলবেন?

তাহলে একটি ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী যখন প্রতি মাসেই বড় বড় বহর নিয়ে জনগনের কোটি কোটি টাকা খরচ করে দাওয়াতে অনাদাওয়াতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রধান এবং তাহার ভীনদেশী পূত্রবধূ, ভীনদেশী বেয়াই বেয়াইনদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখন ঐ সাক্ষাৎ বা সফরকে কোন ষড়যন্ত্র বলবেন?

পাঠক সব মূলে, তারা জানেন তারা অবৈধ, তারা বিনা ভোটের সরকার। তাই ৩০/৪০ জন মানুষ রাস্তায় দেখলেই তাদের হার্টবিট ফাস্ট হয়ে যায়। মানুষের চক্ষু তুলে নেয়। লোকজন বাসায় চায়ের টেবিলে বসলে বেহুশ হয়ে যায়। আর বেগম খালেদা জিয়া লন্ডন সফর করলেই উন্মাদ হয়ে যায়।

এখানে প্রমাণিত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের আতংকের এক নাম বেগম খালেদা জিয়া। তাইতো এত প্রপাগান্ডা! কি পরিমাণ ভয় ও আতংক হলে এত প্রপাগান্ডা হতে পারে জাতি আজ সহজেই বোধগম্য।

তাই বলছি, আর কত প্রপাগান্ডা? আর কত বর্বরতা নগ্নতা? এই প্রপাগান্ডা, বর্বরতা নগ্নতাই প্রমান করে একজন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি অবৈধ সরকারের কি পরিমান ভয়, কি পরিমান আতংক?

সত্যি একজন বেগম খালেদা জিয়াই অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে এক জলন্ত অগ্নিপিন্ড।

সায়েক এম রহমান, লেখক ও কলামিস্ট

sayakurrahman@hotmail.com

সর্বশেষ সংবাদ