একজন আলোকিত মানুষের আকস্মিক বিদায়

তিনি এমন আকস্মিকভাবে চলে যাবেন, তা কখনো কল্পনাও করিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল নব্বইয়ের ওপরে। তাতেও বয়সের ছোঁয়া তাঁর তারুণ্যের ওপর ছাপ ফেলতে পারেনি। কয়েক দিন আগেও টেলিফোনে কথা বলেছি। আগের মতো সাবলীল কণ্ঠ। নিজের নানা অসুখবিসুখের কথা বলতেই বললেন, ‘আপনি তো আমার চেয়ে ১০ বছরের ছোট। আমি যদি এত কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারি, তাহলে আপনি পারবেন না কেন? এই তো ঢাকায় আপনার ৮০তম জন্মবার্ষিকী পালিত হবে। মোনায়েম সরকারের অনুরোধে আমি সেই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক হয়েছি। দৌড়াদৌড়িও করছি। ডিসেম্বরে ঢাকায় অবশ্যই আপনার সঙ্গে দেখা হবে। বয়স, অসুখবিসুখের কথা ভুলে যান।’

এই আলাপচারিতার সময় একবারও কি ভেবেছিলাম, তাঁর সঙ্গে ডিসেম্বরে কেন, সারা জীবনেও আর দেখা হবে না! মোনায়েম সরকার তাঁর মৃত্যুর কথা আমাকে বলতে গিয়ে কেঁদেছেন। আমি কাঁদতে পারিনি, শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছি। আমাদের প্রকৃত ও প্রবীণ বিদ্বৎসমাজের আরেক মহীরুহ পড়ে গেলেন। একে একে কিছু সময়ের ব্যবধানে চলে গেলেন ড. মোশাররফ হোসেন, সরদার ফজলুল করিম, বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমান শেলী, প্রবাসী সাহিত্যিক আবদুল মতিন ও আরো কয়েকজন। ভাষা মতিনের মৃত্যু আরো সাম্প্রতিক। তার পরই গেলেন বরেণ্য ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ আমাদের জাতীয় অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দীন আহমেদ। যাঁর প্রতি শোকার্ত শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই আজ আমার কলম ধরা।

একজন আলোকিত মানুষের আকস্মিক বিদায়

আমার সমবয়সী অথবা বয়সে প্রবীণ অনেক বুদ্ধিজীবীকেই শ্রদ্ধা করতাম এবং এখনো করি। কিন্তু সবার প্রতি শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধা অক্ষুণœ রাখতে পারিনি। যুবা বয়সে যিনি ছিলেন আপসহীন, অকুতোভয় সংগ্রামী; পরিণত বয়সে তাঁকে আপস ও সুবিধাবাদিতার চোরাবালিতে ডুবে যেতে দেখেছি। একটু খ্যাতি, প্রচার-প্রোপাগান্ডা, একটু সরকারি সুযোগ-সুবিধা অথবা বিদেশে একটি উচ্চপদের চাকরি- শুধু এ জন্য অনেক সিংহপুরুষকে নতজানু হতে দেখেছি। ভোল পাল্টাতে দেখেছি। ড. সালাহউদ্দীনকে তাঁর শেষ বয়স পর্যন্ত তাঁদের দলে দেখতে পাইনি বলে তাঁর প্রতি শুধু আমার নয়, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের শ্রদ্ধা অটুট রয়েছে। তিনি ছিলেন জাতির জাগ্রত বিবেকের প্রহরী। তাঁর এই ভূমিকায় কখনো মালিন্য দেখা দেয়নি। তাই বলা চলে ১৯ অক্টোবর আমাদের মাঝ থেকে একজন অমলিন চরিত্রের মহান পুরুষ চলে গেলেন, যাঁর শূন্যস্থান শিগগিরই পূর্ণ হওয়ার নয়।

ড. সালাহউদ্দীন শুধু ইতিহাসবিদ ছিলেন না, ছিলেন ইতিহাস-পুরুষ। ইতিহাসের নতুন রূপকার ও আধুনিক বিশ্লেষক। তাঁর ইতিহাস-বিশ্লেষণ সমাজবিজ্ঞানের অগ্রসর চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত। তিনি ইতিহাসকে পেছনের দিকে ঠেলতে চাননি। বিকৃত ইতিহাসচর্চার পুরোহিত হননি। তাই বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম ও জাতীয় মনমানসের বিবর্তনকে এমন নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করতে পেরেছেন, যা জাতির বিবেককে জাগায়, সামনের দিকে তাকাতে শেখায়। ধর্মান্ধতা ও বৈজ্ঞানিক সত্যান্বেষণাকে তিনি অনায়াসে সাহসের সঙ্গে পৃথক করে রাখতে পেরেছেন। তাঁর লেখা গ্রন্থগুলো তাই জাতীয় জীবনে অনিবার্য প্রদীপ শিখার মতো হয়ে থাকবে। আমাদের পথ দেখাবে। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় তিনি সর্বাত্মক সহযোগিতা জুগিয়েছেন। প্রথম কমিটির সভাপতিও ছিলেন তিনি।

শুনেছি, একসময় অর্থাৎ তরুণ বয়সে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। রাজনীতির সঙ্গে তেমনভাবে যুক্ত হননি; কিন্তু ছিলেন সবচেয়ে অগ্রসর রাজনৈতিক চিন্তা ও চেতনার ধারক। আমি তাঁকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনি কি মাক্সর্বাদী? তিনি হেসে উত্তর দিয়েছেন, ‘মাক্সর্বাদ একটি বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের সত্য ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। আমি এই পরিবর্তনকে সব সময় মেনে চলি।’ ১৯৪৬ সালে নোয়াখালীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় যখন মহাত্মা গান্ধী শান্তি মিশন নিয়ে সেখানে যান, তিনি রেডক্রসের সেচ্ছাসেবক হয়ে সেখানে গিয়েছিলেন।

আমার লেখায় মাঝেমধ্যেই একটা গল্প ব্যবহার করি। একবার লন্ডনে তাঁর কাছেই গল্পটি আমার শোনা। সেই প্রাচীনকালে বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক তথাগত বুদ্ধ একদিন ভক্ত পরিবৃত হয়ে বসে আছেন। এ সময় তাঁর এক ভক্ত জিজ্ঞাসা করল, প্রভু, শেষ সত্যটা আমাকে বলে দিন। বুদ্ধ একটু হেসে বললেন, ওই যে দূরে গাছটা দেখছ, তা থেকে অনবরত পাতা ঝরছে। সব ঝরা পাতা তোমার কোচর ভর্তি করে নিয়ে এসো। তারপর শেষ সত্য কী, তা বলব।

ভক্ত ছুটে গেল গাছতলায়। কোচরভর্তি করে ঝরা পাতা নিয়ে এলো। বুদ্ধ বললেন, সব ঝরাপাতা নিয়ে এসেছো? ভক্ত বলল, না প্রভু। বুদ্ধ বললেন, তাহলে আবার যাও। সব পাতা নিয়ে এসো। ভক্ত আবার ছুটল। পাতা নিয়ে এলো। বুদ্ধ জিজ্ঞাসা করলেন, সব ঝরা পাতা নিয়ে এসেছো? ভক্ত বললেন, না প্রভু, গাছ থেকে পাতা তো অবিরাম ঝরছে। কেমন করে সব পাতা আনব? বুদ্ধ বললেন, সত্যও এই রকম। অবিরাম পরিবর্তিত হচ্ছে। ঝরছে। শেষ সত্য বলে কিছু নেই।

আমার ধারণা, ড. সালাহউদ্দীনও তাঁর ইতিহাসের সত্যান্বেষণায় এই অবিরাম পরিবর্তনশীল ও অগ্রবর্তী চিন্তাচেতনাকেই অনুসরণ করেছেন। কখনো কোনো বদ্ধ ধারণার কুঠুরিতে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। তাই তাঁর সমালোচকদেরও তাঁর সম্পর্কে শ্রদ্ধার সঙ্গে কথা বলতে দেখেছি। তিনি সুবিধাবাদী রাজনৈতিক বিতর্কের উর্ধ্বে সব সময় নিজেকে রেখেছিলেন। কিন্তু সত্য প্রকাশে তাঁর মধ্যে অকপট দৃঢ়চিত্ততা দেখেছি। সম্প্রতি এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকারের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত বিতর্কিত স্মৃতিকথা সম্পর্কেও তাঁর এই বস্তুনিষ্ঠ মনোভাবের পরিচয় পেয়েছি।

তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। আমেরিকার পেনসেলভেনিয়া ইউনিভার্সিটিতেও তিনি অধ্যয়ন করেছেন এবং পিএইচডি করেছেন লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে। আমি তাঁর ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করিনি। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমার দীর্ঘকালের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। তাঁর ছাত্রদের মুখে শুনেছি, তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন। ১৯৪৮ সালে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শুরু ঢাকার জগন্নাথ কলেজে (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়)। তারপর রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ইতিহাসের শিক্ষক ছিলেন। আর এই শিক্ষকতার ফাঁকে ফাঁকে তাঁর মৌলিক চিন্তায় পরিচয়বাহী কয়েকটি গ্রন্থও রচনা করেছেন। অবসর জীবনেও এই লেখালেখি থেকে বিরত হননি। সংবাদপত্রে তিনি কলামিস্টও হয়েছিলেন।

আমি লন্ডনে বসবাস করায় বহু দিন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু তিনি লন্ডন এলেই আমার খোঁজখবর নিতেন। আমি তাঁকে বহুবার অনুরোধ করেছি, আপনি আমার চেয়ে বয়সে বড়। আমি আপনার ছাত্র হতে পারতাম (বিশ্ববিদ্যালয়ে আমারও পঠিত বিষয়ের একটি ছিল ইতিহাস)। আপনি আমাকে তুমি বলবেন। তিনি বলতেন, ‘আপনাআপনি তুমি সম্বোধনটা যদি আসে ভালো, নইলে আপাতত আপনিই থাক।’ আমার প্রতিবাদ তিনি গায়ে মাখেননি।

আশির দশকের শেষের দিকের কথা। আমি তখন লন্ডনের একটি বাংলা সাপ্তাহিক ‘নতুন দিনের’ সম্পাদক। আমাদের অফিস পূর্ব লন্ডনের উইকহাম হাউস (বর্তমানে ওয়াটার লিলি) নামের এক বিল্ডিংয়ে। একদিন দুপুরে আকস্মিকভাবে তিনি আমার অফিসে এসে হাজির। বললেন, ‘আমি আপনার একটা সাক্ষাৎকার নেব।’ আমি ভয়ানক বিব্রতবোধ করলাম। বললাম, স্যার, কোথায় আমি আপনার সাক্ষাৎকার নেব, তা নয়, আপনি এসেছেন আমার সাক্ষাৎকার নিতে? আমি খুবই বিব্রতবোধ করছি।

তিনি বললেন, ইতিহাসের গবেষক নয়, নিজেকে একজন ছাত্র মনে করি। এই ইতিহাসচর্চার প্রয়োজনেই আপনার একটা সাক্ষাৎকার নেওয়া আবশ্যক। সে জন্যই আমি ছুটে এসেছি। আপনি মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি জড়িত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শে আপনি বিশ্বাসী বলে জানি। আপনার মতো বেশ কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নেওয়া আমার প্রয়োজন।

সেদিন তিনি আমার সঙ্গে তিন ঘণ্টা ছিলেন। একটানা প্রশ্ন করেছেন এবং জবাবগুলো লিখেছেন। সঙ্গে টেপ রেকর্ডার আনেননি। সুতরাং তাঁকে লং হ্যান্ডেই লিখতে হয়েছে। এই লেখায় ফাঁকে একবার তিনি শুধু একটি মন্তব্য করেছেন, বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িকতা ও সমাজতন্ত্রের আদর্শ স্বাধীন বাংলার মাটিতে টিকতে পারল না, তার বড় কারণ আমাদের সমাজমানস এ দুটি আদর্শ গ্রহণের জন্য এখনো তৈরি হয়নি।

নিজের এই কথার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, এই সমাজমানস পরিবর্তনের জন্য আমাদের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণি কোনো চেষ্টা, কোনো ত্যাগ স্বীকার করেনি। হিন্দু সমাজে সমাজ সংস্কার ও সমাজমানসে পরিবর্তন ঘটানোর জন্য অনেক বড় বড় বুদ্ধিজীবী মৃত্যুবরণের ঝুঁকি পর্যন্ত গ্রহণ করেছেন। রাজা রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও আরো অনেকের কথা আপনি ভেবে দেখুন। আমাদের মধ্যে একজন বিদ্যাসাগর, একজন রামমোহনের আবির্ভাব হলো কোথায়?

আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে বিদ্যাসাগর, রামমোহনের মতো সংস্কারক জন্মালেন না কেন? এখনো জন্মানোর সম্ভাবনা আছে কি? তিনি বলেছেন, জন্মাননি সামাজিক অনগ্রসরতার জন্য। তখন নতুন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হিন্দুসমাজ সংস্কারক জন্ম দেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তা ছাড়া এই সংস্কারে বিদেশি ইংরেজ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। লর্ড বেন্টিকের সহায়তা ছাড়া বিদ্যাসাগর ও রামমোহন বাল্যবিবাহ, বিধবাবিবাহ, সতীদাহ প্রথা রদ ইত্যাদি করতে পারতেন না।

তিনি বললেন, বিশ শতকের গোড়ায় বাংলার মুসলিম সমাজেও কিছু সমাজ সংস্কারক বুদ্ধিজীবীর আবির্ভাব হয়েছিল। যেমন কাজী আব্দুল ওদুদ, আবুল হোসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, কবি আবদুল কাদির প্রমুখ। তাঁরা ঢাকায় বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন শুরু করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাহস রাখতে পারেননি। আঘাত আসতেই তাঁরা কলকাতায় চলে গিয়ে উন্নত হিন্দুসমাজে আশ্রয় নেন।

আমার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ভবিষ্যতে আমাদের মধ্যে সাহসী সমাজ সংস্কারক যে জন্মাবেন না, তা নয়। বর্তমানে যে জন্মাচ্ছেন না তার কারণ দীর্ঘকাল পর স্বাধীনতা আমাদের শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির জন্য বড় বেশি সুযোগ-সুবিধা এনে দিয়েছে। ফলে আমরা সবাই বড় বেশি সুযোগসন্ধানী ও সুবিধাবাদী। দেশি শাসক শ্রেণিও ভোটের জন্য বা ক্ষমতার জন্য বড় বেশি রক্ষণশীল। এই দুইয়ের মিলনে সামাজিক চিন্তা ও চেতনার ক্ষেত্রে একটা বন্ধ্যাত্ব দেখা দিয়েছে। এটা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে।

লন্ডনে বসবাস করতেন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবদুল মতিন। তাঁর সঙ্গে ড. সালাহউদ্দীনের বন্ধুত্ব ছিল নিবিড়। আবদুল মতিনও প্রয়াত হয়েছেন বছর দুয়েক হতে চলেছে। দুজনের মধ্যে নিয়মিত পত্রালাপ হতো। আবদুল মতিনকে লেখা ড. সালাহউদ্দীনের কয়েকটি চিঠি আমি দেখেছি। এগুলো সংগ্রহ করে প্রকাশ করা হলে আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে তাঁর সুচিন্তিত মতামত জানা যাবে।

কয়েক বছর আগে এই মতিন ভাই আমাকে জানালেন, ড. সালাহউদ্দীন তাঁর স্ত্রীসহ লন্ডনে এসেছেন। আমাদের সঙ্গে তিনি দেখাসাক্ষাৎ করতে চান। আমি সাগ্রহে বললাম, চলুন, তাঁর কাছেই যাই। তিনি একটা ফ্ল্যাটে উঠেছিলেন। আমরা দুপুরের দিকে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। তাঁর স্ত্রী আমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত আড্ডা চলল। তার ফাঁকে সালাহউদ্দীন-পতœী আমার হাতে একটা বই গুঁজে দিলেন। তাঁর নিজের স্মৃতিকথা। ভাষার লালিত্য ও বর্ণনার গুণে বইটি এত সমৃদ্ধ যে বাসায় এসে সেটি এক নিঃশ্বাসে পড়েছি। বইটি আমার কাছে এখন নেই। তাই নামটা সঠিকভাবে স্মরণ করতে পারছি না। তবে ‘ঝরা বকুলের গন্ধ’ বা এই জাতীয় কোনো নাম। আলাপচারিতায়ও তিনি ছিলেন অসাধারণ। স্বামীর আগেই তিনি মারা গেছেন। আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর টেলিফোনে আমাকে সমবেদনা জানাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার যাতনা এখন আপনি বুঝবেন।’

আগামী ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় আমার জন্মদিনের সভায় যাঁর সভাপতিত্ব করার কথা ছিল, তিনি চলে গেলেন। আমার সৌভাগ্য হলো না আরেকবার তাঁর সাক্ষাৎ লাভের। তবু যে কয়দিন বেঁচে আছি তাঁকে স্মরণ করব। তিনি আর নয়নের সামনে নেই, কিন্তু নয়নের মাঝখানে স্থান নিলেন। সেখানে তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অমিতায়ু।

You Might Also Like