এই দুর্যোগে দুই মায়ের কণ্ঠে আশ্বাসবাণী

বলতে গেলে, ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় একই সময়ে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস সম্পর্কে তাঁদের বক্তব্য দিয়েছেন। ব্রিটেনের রানি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, ‘ভবিষ্যতের মানুষ বলবে, ব্রিটেনের বর্তমান প্রজন্ম আগের মতো সাহসের সঙ্গে একইভাবে দুর্যোগ মোকাবেলা করেছে।’ অন্যদিকে ঢাকার গণভবনে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এই যুদ্ধে জাতিকে জয়ী হতে হবে এবং মন্দা মোকাবেলায় তৈরি থাকতে হবে।’ করোনাভাইরাস দমনে প্রধানমন্ত্রী ৩১টি নির্দেশনা দিয়েছেন। গৃহহীনদের জন্য তিনি আশ্রয়ের ব্যবস্থা এবং খাবারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন।

লক্ষণীয়, সারা পৃথিবীর এই দুর্যোগের সময় দুই নেতা বিশ্ববাসীর কাছে সাহস ও প্রতিরোধের বাণী দিয়েছেন। তাঁরা দুজনই নারী। মানুষ ভয় পেলে মায়ের বুকে আশ্রয় নেয়। আজ এই দুর্দিনেও ভীত মানবতা এই দুই নারীর অভয়বার্তায় নতুন করে সাহস পাবে। ব্রিটেনের রানি অতীতেও বড় বড় দুর্যোগ দেখেছেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় লন্ডনে যখন ২৪ ঘণ্টা মুষলধারে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে এবং রাজপরিবারকেও ভূগর্ভে আশ্রয় নিতে হয়েছে, সে সময়ও এই তরুণী রাজকন্যাকে সাহস হারাতে দেখা যায়নি। তিনি তাঁর ভাষণে বলেছেন, কিভাবে তাঁরা দুই বোন, তিনি ও প্রিন্সেস মার্গারেট সেই দুর্যোগ মোকাবেলা করেছেন। সেই তরুণী বয়সে রাজকুমারী থাকাকালে বর্তমান রানি স্বেচ্ছাসেবিকা হিসেবে সেনাদের মধ্যে কাজ করেছেন। তিনি সিংহাসনে বসার পর ব্রিটেন বহু সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। তিনি দারুণ সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে তাঁর মন্ত্রিসভাকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। চার্চিল যখন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী তখন রানি এলিজাবেথ সদ্য সিংহাসনে বসা তরুণী। সেই সময়ও চার্চিল রাষ্ট্র পরিচালনায় রানির সাহস ও দূরদর্শিতার প্রশংসা করেছেন। রানি তাঁর ভাষণে লন্ডনে হিটলারের ব্লিৎস হামলার উল্লেখ করেছেন।

ব্লিৎস হামলায় লন্ডনে প্রতি ঘণ্টায় হিটলারের ভি-রকেট বোমা পড়েছিল এবং মনে হয়েছিল শহরটি ধ্বংস হয়ে যাবে। ওই সময়ও রাজকুমারী এলিজাবেথ যুদ্ধে হতাহতদের মধ্যে কাজ করেছেন, পালিয়ে থাকেননি। বর্তমানে ব্রিটেন শুধু করোনাভাইরাস নয়, ব্রেক্সিট সংকটে ভুগছে। বরিস জনসনের ‘ইউরোপ ছাড়ো’ নীতি ব্রিটেনকে নিঃসঙ্গ করে ফেলেছে। এখন তাঁর পাশে ইউরোপ নেই এবং আমেরিকাও কাছে এসেছে, তা বলা যায় না। রানি এই সময়ে তাঁর দেশের মানুষকে আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের পাশে কমনওয়েলথের ৫৬টি দেশ আছে। রানি এর আগেও কমনওয়েলথের প্রতি গুরুত্ব দেখিয়ে কথা বলেছেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে ততটা গুরুত্ব দেননি; কিন্তু তাঁর মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। এখন ব্রিটেনের এই একাকিত্বের দিনে তিনি কমনওয়েলথের গুরুত্ব তাঁর মন্ত্রিসভাকে আবার স্মরণ করিয়ে দিলেন এবং দেশবাসীকে জানালেন, তারা একা নয়, তাদের পাশে কমনওয়েলথ আছে।

ব্রিটেনের রানি তাঁর দেশবাসীকে ব্লিৎস স্পিরিট নিয়ে করোনা দুর্যোগ মোকাবেলার আহ্বান জানিয়েছেন। লন্ডনের সানডে টেলিগ্রাফ পত্রিকা রানির এ আহ্বানকে বলেছে, ‘Queen invokes blitz spirit in message of hope to nation.’ রানির এই ভাষণের মতো জাতির প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানও জাতিকে নতুন আশার বাণী শুনিয়েছে। রানির মতোই শেখ হাসিনা আগেও বহু দুর্যোগ ও সংকট সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করেছেন এবং তাকে জয় করেছেন। ১৯৭১ সালে তাঁর চোখের সামনে পাকিস্তানি হানাদারদের গণহত্যা দেখেছেন গৃহবন্দি অবস্থায়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ দেখেছেন। নিজের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় মহাপ্লাবনের ধাক্কা প্রতিরোধ করেছেন। জীবনের ওপর ভয়াবহ হামলা থেকে বেঁচেছেন, সাহস হারাননি। এবারও তাঁর কণ্ঠে সাহস ও আশ্বাসের বাণী। তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আলাদা কন্ট্রোল রুম চালু করে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তা ছাড়া সরকার ‘ন্যাশনাল প্রিপার্ডনেস অ্যান্ড রেসপন্স প্ল্যান ফর কভিড-১৯’ প্রণয়ন করেছে। এই পরিকল্পনার আওতায় তিন স্তরবিশিষ্ট কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় শিল্প ও বাণিজ্য খাতের জন্য মোট পাঁচটি প্যাকেজের আওতায় ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে সিআরআর এবং রেপোর হার কমিয়ে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছে। আরেকটি কর্মসূচি গৃহহীনদের জন্য গৃহনির্মাণ। তিনি আরো বলেছেন, তাত্ক্ষণিক, স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—এই চার ভাগে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চারটি কার্যক্রম নিয়ে সরকারের কর্মপরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। বর্তমান সরকারি পরিকল্পনায় সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাটিও নজরে রাখা হয়েছে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য যাতে ব্যাহত না হয় সে জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ব্রিফিং যাঁরা সংবাদপত্র পাঠ করেছেন, তাঁদের কাছে এর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার দরকার নেই। তিনি আরো বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে যে জাতি মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে, সে জাতিকে কোনো কিছুই দাবিয়ে রাখতে পারবে না, এবারের করোনাভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধেও জাতি বিজয়ী হবেই।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ব্রিফিং শুধু সান্ত্বনা ও আশ্বাসে ভরা নয়, তাতে রয়েছে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ এবং তার পরবর্তী বিপর্যস্ত দেশকে পুনর্গঠনের দূরপ্রসারী পরিকল্পনাও। এখন প্রশ্ন, এই পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়ন করা যাবে? এটা নির্ভর করে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দক্ষতা ও সততার ওপর। সরকার বিনা মূল্যে খাদ্য বিতরণ, ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রয়, লক্ষভিত্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে নগদ অর্থ বিতরণের ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণা সাধারণ মানুষের মনে অবশ্যই আশা ও উৎসাহ বাড়াবে। কিন্তু সরকারি অব্যবস্থা, এক শ্রেণির মন্ত্রী, এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের দুর্নীতির জন্য এগুলো সফল হবে কি?

অতীতেও দেখা গেছে, সরকার যখন ১৬ টাকা কেজি দরে সাধারণ মানুষের মধ্যে চাল বিক্রির ব্যবস্থা করেছিল, তা এই দুর্নীতিবাজ মহলগুলোর চক্রান্তে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেনি। এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি এখন সর্বজনবিদিত। এ জন্য অনেকেই ফেসবুকে লিখেছেন, সরকারকে এবার শতভাগ কঠোর হতে হবে। শেখ হাসিনার উচিত নিজের দল ও সরকারের মধ্যে যে অব্যবস্থা ও দুর্নীতি রয়েছে, তা শক্ত হাতে দমন করা এবং উচ্ছৃঙ্খল জনসমাজ যাতে সরকারি নির্দেশনাগুলো মেনে চলে সে জন্য আরো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীকে সর্বাধিক দায়িত্ব নিতে হবে। এই তিনটি মন্ত্রণালয় যদি সঠিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে পারে, তাহলে এই ভাইরাসের ধাক্কা অনেকটাই সামাল দেওয়া যাবে। স্বাস্থ্য সেক্টরের দুর্নীতি দূর করার ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবহিত হোন। চাটার দল যাতে ত্রাণসামগ্রী খেয়ে না ফেলে, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী তার নিশ্চিত ব্যবস্থা করবেন। এবার অর্থমন্ত্রীকে অগ্নিপরীক্ষায় পাস করতে হবে। সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব কয়েকটি অগ্নিপরীক্ষা সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন। শেয়ার মার্কেটের বিপর্যয়ের রেশ, পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের অসাধুতা এবং বাজারে তরল মুদ্রার অভাব ও ব্যাংক বিপর্যয়ের সংকট অতিক্রম করেছেন। এবার বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে প্রমাণ করতে হবে তাঁর বিশ্বব্যাংক-ঘেঁষা অর্থনীতি দেশকে বর্তমান বিপর্যয় থেকে কতটা রক্ষা করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলেছেন। এ ক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি যাতে না ঘটে সেদিকেও সরকারকে লক্ষ রাখতে হবে। দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা জনগণ এবং দিনমজুররা যাতে দুই বেলা খেতে পায় প্রধানমন্ত্রী সে ব্যাপারে লক্ষ রেখেছেন। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীকে লক্ষ রাখতে হবে প্রধানমন্ত্রীর এ কার্যক্রম যাতে সফল হয় এবং গরিবের খাদ্য চাটার দলের পেটে না যায়।

বিদেশে যে লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি আছেন, তাঁরাও দেশের মানুষের মতো সমানভাবে বিপন্ন। আগে দেশে কোনো দুর্যোগ দেখা দিলে প্রবাসীরা সাহায্য পাঠাতেন। এখন তাঁরাও দুর্যোগগ্রস্ত। সরকারকে তাঁদের দিকেও নজর দিতে হবে। আমার ধারণা, আগের দুর্যোগগুলো শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যেভাবে মোকাবেলা করা গেছে, এবারও তা করা যাবে, যদি তাঁর নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায়। ব্রিটেনের রানি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা শুধু তাঁদের দেশবাসীর জন্যই নয়, বিশ্ববাসীর জন্যও সাহস ও আশ্বাসের বাণী। বিশ্বব্যাপী এই বিপর্যয়ের দিনে দুই নারীর কণ্ঠে উচ্চারিত আশ্বাস মানুষের মনে মায়ের আশ্বাসবাণীর মতো সাহস জোগাবে।

লন্ডন, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০২০

You Might Also Like