উত্তর কোরিয়া কি আরেকটি হিরোশিমা হয়ে উঠবে?

উত্তর কোরিয়ার আন্তমহাদেশীয় ব্যালাস্টিক মিসাইল নিক্ষেপের সক্ষমতা এখন আর সন্দেহের বিষয় নয়। কয়েক মাস আগে সেই সক্ষমতার বিষয়টি ছিল অনুমাননির্ভর। আজকে এটি এখন বিশ্বরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা। উত্তর কোরিয়া এখন পারমানবিক ওয়ারহেড বহনকারী আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র বানাতে সক্ষম। সেটি স্বল্প, মাঝারি কিংবা দূরপাল্লার যাহোক না কেন, উত্তর কোরিয়ার এখন সেই প্রযুক্তি রয়েছে।

অতিসম্প্রতি উত্তর কোরিয়া যে সকল আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা পরিচালনা করেছিল, সেই সকল ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়ার ভ্লাদিভস্টক ও জাপানের অর্থনৈতিক জলসীমার গিয়ে পতিত হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার নির্মিত মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র এখন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত এলাকা গুয়ামে, এমনকি দেশটির মূল ভূখণ্ডেও আঘাত হানতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত ও কৌশলগত বন্ধুপ্রতীম দেশ দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপান উত্তর কোরিয়ার আন্তমহাদেশীয় মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় ভালোভাবেই আছে। সেটি গত মঙ্গলবার ভোরে আবারও একবার প্রমাণ হয়ে গেল।

গোয়েন্দা সংস্থা ও একাডেমিক স্কলারদের মূল্যায়নেও উত্তর কোরিয়ার মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্রের রেঞ্জ নিয়ে তেমন তারতম্য নেই। তারা বিশ্বাস করে, উত্তর কোরিয়ার আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রগুলি ৪৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারবে।

মঙ্গলবার ভোরে উত্তর কোরিয়া দেশটির রাজধানী পিয়ংইয়ংএর সুনান এলাকা থেকে নিক্ষেপ হোয়াসং-১২ নামের আন্তমহাদেশীয় ব্যালাস্টিক মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়। আগস্টের প্রথম দিকে উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনী হোয়াসং-১২ নামের মধ্যপাল্লার চারটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের জন্য দেশটির নেতা কিম জং ঊনের অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, গুয়ামসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য কৌশলগত এলাকায় হামলা করা। ধারণা করা হয়েছিল, আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে দেশটির নেতা তাতে অনুমোদন দিবেন। যাহোক, সে সময় তিনি অনুমোদন করেছেন বলে শোনা যায়নি। বিশ্বনেতারাও কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন; এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিম জং ঊনের এমন সিদ্ধান্তের জন্য ধন্যবাদ দিয়েছিলেন।

হঠাৎ উত্তর কোরিয়া আবার ব্যালাস্টিক মিসাইল পরীক্ষা চালিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কেসিএনএ জানিয়েছে, কোরীয় উপদ্বীপের দক্ষিণাংশের অর্ধেকের ভিতরে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যে সামরিক মহড়া চলছে সেটির জবাবে তারা বুধবার সকালে মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র হোয়াসং-১২ নিক্ষেপ করেছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, উত্তর কোরিয়ার সরকার তাদের মিসাইল পরীক্ষার কর্মসূচির তথ্য এখন আর কাউকে জানতে দিচ্ছে না। উত্তর কোরিয়ার মতো একটি সমাজতান্ত্রিক দেশে সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ছাড়া অন্য দেশের উপর মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়টি চিন্তা করা যায় না। কোন প্রেক্ষাপটে কোন ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা আগেই গৃহীত হয়ে থাকে। ফলে এটি বিশ্বাসযোগ্য যে, দেশটির নেতা হোয়াসং-১২ নিক্ষেপের অনুমোদন আগস্টের মাঝামাঝি না দিলেও সিদ্ধান্ত নিয়েই রেখেছিলেন।

ফলে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। প্রশ্নটি এখন বিশ্বের সামনে। সেটি হল, উত্তর কোরিয়া কি যুক্তরাষ্ট্রে মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাবে? যদি হামলা করেই বসে, যুক্তরাষ্ট্রে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাবে? উত্তর কোরিয়ার কী পরিণতি হতে পারে? আমাদের মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে হামলা করা হয়েছিল টুইন টাওয়ারে। সেটির প্রতিক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের উপর কীভাবে দেখিয়েছিল সেটি আমাদেরকে বিবেচনায় নিতে হবে। অধিকন্তু, উত্তর কোরিয়ার এমন উত্তেজনা প্ররোচক আচরণ দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানকেও কি পারমানবিক অস্ত্র নির্মাণের দিকে ঠেলে দিবে? সেসব প্রশ্নের উত্তর আমরা লেখাটির শেষাংশে খুঁজব।

যাহোক, মঙ্গলবারে নিক্ষেপিত হোয়াসং-১২ ব্যালাস্টিক মিসাইলটি ছিল মধ্যপাল্লার। নিক্ষেপিত ব্যালাস্টিক মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্রটি জাপানের উত্তর-পূর্বাংশের হোক্কাইডো প্রদেশের দ্বীপ এলাকা অতিক্রম করে প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পড়েছে। মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্রটি পতিত হওয়ার সময় তিনটি অংশে ভেঙে পড়ে। ভেঙে পড়ার আগে এটি জাপানের আকাশে ছিল ১৪ মিনিটের মতো। উত্তর কোরিয়ার ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র এর আগেও দুইবার জাপানের উপর দিয়ে পতিত হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে দিওপোদং-১ এবং ২০০৯ সালে আনহা-২ নামের দুটি মিসাইল।

এখানে দুটি বিষয় লক্ষ্য করার মতো। প্রথমটি হল, উত্তর কোরিয়ার গত মঙ্গলবার যে মিসাইলটি নিক্ষেপ করেছে, সেটি খোদ রাজধানীর একটি এলাকা সুনান থেকে। সুনান এলাকার পাশে রয়েছে পিয়ংইয়ের প্রধান বিমানবন্দর। এর আগে উত্তর কোরিয়া রাজধানীর বাইরে প্রায় জনশূন্য কিংবা কম বসতির এলাকা থেকে ব্যালাস্টিক মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার এমন সিদ্ধান্তের কারণ একটাই। দেশটি বাইরের দুনিয়ার গোয়েন্দাদের ফাঁকি দেওয়ার জন্যই মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার জন্য স্থান নির্বাচনে গোপনীয়তা ও কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। ফলে আগামীতেও মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করার জন্য এমনসব এলাকা উত্তর কোরিয়া নির্বাচন করবে যেসব এলাকা স্যাটেলাইট কিংবা গোয়েন্দাদের নজরের বাইরে রয়েছে।

দ্বিতীয় বিষয় হল, উত্তর কোরিয়ার লাগাতার আন্তমহাদেশীয় ব্যালাস্টিক মিসাইল হামলার হুমকি দিচ্ছিল বেশ কমাস ধরেই। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া বলে আসছিল যে, দেশগুলির অ্যান্টিব্যালাস্টিক মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি দিয়ে উত্তর কোরিয়ার ব্যালাস্টিক মিসাইলকে আকাশেই ধ্বংস করে দেওয়া হবে। উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত এলাকা গুয়ামে হামলা করার হুমকি দিচ্ছে। মঙ্গলবারের হামলার পর উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম থেকে স্পষ্ট করেই বলা হচ্ছে যে, তাদের পরবর্তী টার্গেট যুক্তরাষ্ট্রের গুয়াম। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বড় দুটি সামরিক স্থাপনা রয়েছে। গুয়ামে মিসাইল হামলা করতে গেলে নিক্ষেপিত মিসাইল জাপানের হিরোশিমা, সিমন ও কোচির উপর দিয়ে যেতে হবে। গুয়ামের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপিত যে কোনো বস্তুকে আকাশপথেই আটকে দেওয়ার প্রযুক্তি জাপানের কাছে রয়েছে। অথচ গত মঙ্গলবার জাপানের আকাশে উত্তর কোরিয়ার নিক্ষেপিত মধ্যপাল্লার ব্যালাস্টিক মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্রটি ১৪ মিনিট ছিল।

এবার আমরা বিশ্লেষণ করি, উত্তর কোরিয়াকে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান মোকাবেলা করবে। মঙ্গলবার সকালে হোয়াসং-১২ ব্যালাস্টিক মিসাইল নিক্ষেপের পরেও দেশ তিনটি প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা নিতে দেখা যাচ্ছে। দেশ তিনটি এখনও বিশ্বাস করে, কূটনৈতিকভাবেই উত্তর কোরিয়াকে শান্ত করা যাবে। উত্তর কোরিয়ার হামলার পরেও জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে অন্যের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা উত্তর কোরিয়ার উপর চাপ প্রয়োগ করে আলোচনায় আনতে এখনও আশাবাদী।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ উত্তর কোরিয়াকে কেবল কোরীয় উপদ্বীপ এলাকায় জন্য হুমকি হিসেবে ঘোষণা করেছে, তা নয়। তারা বলছে দেশটি এখন জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলির জন্যও হুমকি। ট্রাম্প শিনজে আবের সঙ্গে কথা বলার সময় জানান যে, যুক্তরাষ্ট্র জাপানের সঙ্গে শতভাগ রয়েছে। এদিকে মুন যে ইন উত্তর কোরিয়ার উপর কঠোর নিষেদাজ্ঞার প্রস্তাব দেন। উত্তর কোরিয়া যদি জাপানের উপর মিসাইল আবারও নিক্ষেপ করে দক্ষিণ কোরিয়া জাপানের হয়ে সামরিক পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না। সেজন্য তিনি নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী উত্তর কোরিয়ার মিসাইল হামলার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার জন্য রওনা দেন। তবে দেশ তিনটির মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা মতপার্থক্য দেখা যায়।

দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নির্বাচন হয়েছে পাশাপাশি সময়ের মধ্যেই। দুটি দেশের নতুন নেতা নির্বাচিত হওয়ার পরে উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে একটি স্থায়ী সমাধান আসবে তেমনটি কারও প্রত্যাশা ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন যে ইনের নির্বাচনী প্রচারের সময় উত্তর কোরিয়ার প্রতি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তাদের ভোটারের কাছে পরিষ্কার করেছেন। উত্তর কোরিয়ার প্রতি ট্রাম্প সবসময় কঠোর অবস্থানে ছিলেন। এখনও হয়তো কিছুটা কৌশলগত নমনীয়তা দেখাচ্ছেন। ভবিষ্যতে কীভাবে দেখান সেটি স্পষ্ট নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের উপর বড় আঘাত এলে সকল সমীকরণ উলটপালট হয়ে যেতে পারে।

ট্রাম্প চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য-ঘাটতি পুঁজি করে চীনের উপর চাপ প্রয়োগ করতে উত্তর কোরিয়ার ইস্যুতে চীনকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। ট্রাম্পের সেই কার্ড এখন শতভাগ ব্যর্থ। উত্তর কোরিয়ার বিষয়ে চীনের ভূমিকা তেমন শক্তিশালী হবে না বলেই ধারণা। এদিকে জাপান উত্তর কোরিয়ার বড় টার্গেট পরিণত হয়েছে। উত্তর কোরিয়া পুরোপুরি যুদ্ধে জড়ানোর আগে যে কোনো ধরনের সামরিক তৎপরতা চালালেই জাপান আক্রান্ত হচ্ছে। তাই জাপান আপ্রাণ চেষ্টা করছে যে, কোনো উপায়ে কোরিয়াকে শান্ত করতে। তবে তুলনামূলক বিচারে দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান নেতৃত্বের মতো উত্তর কোরিয়ার প্রতি সহমর্মিতা কিংবা বেশি মাত্রার প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থায় জাপান বিশ্বাসী বলেই ধারণা।

অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন সান সাইন পলিসির বিশ্বাসেই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় আগ্রহী ছিলেন, হয়তো এখনও আছেন এবং ভবিষ্যতও থাকবেন। মুন জে ইন পিয়ংইয়ংএর সঙ্গে আলোচনা করে উত্তর কোরিয়াকে ডি-নিউক্লিয়ারাইজ করতে চান। কিন্তু মুন জে ইনের আলাপ আলোচনা করার কৌশলটি উত্তর কোরিয়াকে শান্ত রাখবে সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ।

এ অবস্থায় উত্তর কোরিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের দৃষ্টিভঙ্গি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির মাঝ বরাবর একটি অবস্থান দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য নিরাপদ। কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনার পাশাপাশি নিজের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও সম্ভাব্য উত্তর কোরিয়ার হামলা মোকাবেলা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে নিজেদেরকে সাময়িকভাবে প্রস্তুত রাখা দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য বেশি গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক।

উত্তর কোরিয়ার উত্তেজনাপূর্ণ আচরণের ফলে দক্ষিণ কোরিয়া এখন কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থেকে ক্রয়কৃত মিসাইল-বিধ্বংসী প্রযুক্তি থাতের প্রতি নির্ভরশীল আর থাকছে না। তারাও এখনও স্বল্পপাল্লার মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরপরই দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সামরিক উন্নয়ন সংস্থা ৫০০ থেকে ৮০০ মাইল রেঞ্জের মিসাইল ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করে। দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তির শীর্ষে থাকা কয়েকটি দেশের একটি। তারা সেই স্বপ্নপাল্লার রেঞ্জটি দূরপাল্লায় নিতে বেশি সময় নিবে না। জাপানে তা-ও করছে। জাপান নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি আক্রমণ করার সামরিক শক্তি অর্জনের দিকে নজর দিচ্ছে। উত্তর কোরিয়া যদি এমন আচরণ চালিয়ে যেতে থাকে, এই এলাকায় বড় ধরনের একটি সামরিক ভয়াবহতা তৈরি হবে।

কিম জং উন উত্তর কোরিয়ার শাসনভারে আসার পর থেকেই দেশটি দ্রুতই পারমাণবিক কর্মসূচিতে বহুদূর এগিয়ে যায়। এখন অর্থনীতি ও প্রযুক্তির শীর্ষে থাকা তিনটি দেশকে হামলা করতে চান। আগস্টের প্রথমার্ধে উত্তর কোরিয়ার স্ট্রাটেজিক ফোর্সের প্রধান কমান্ডার কিম রাক-গিয়ম জানান তারা গুয়ামে চারটি হোয়াসং-১২ মিসাইল দিয়ে হামলার পরিকল্পনা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছেন। ফলে এখানে প্রেক্ষাপটটি সম্পূর্ণ ভিন্ন, কিম জং উনের বাবার জমানার মতো নয়। এমন একটি বেপরোয়া দেশের জন্য জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের সভ্যতা নষ্ট হয়ে যাবে, এমনটি ভাবার কারণ নেই।

ইতোমধ্যে, দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফ অফ স্টাফ জেনারেল জিয়ং কিয়ং ডু ও যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফ ও স্টাফ জেনারেল জোসেফ ডানফোর্ডের সঙ্গে টেলিফোনে উত্তর কোরিয়ার হামলা আগাম মোকাবেলার বিষয়ে কথা বলেন। উত্তর কোরিয়া থেকে সম্ভাব্য হামলার ইঙ্গিত পেলেই আমেরিকার কৌশলগত বোমা ব্যবহারের চিন্তাও করে রাখা হয়। প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন দেশটির শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট পাওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সীমান্তে সামরিক তৎপরতা বাড়াতে নির্দেশ দেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের বাসভবনের এক কর্মকর্তা দ্য কোরিয়া টাইমস কে জানান, কোরীয় উপদ্বীপ এলাকায় বি-১ বি লাঞ্চার বোমারু, বি-৫২ স্ট্যারেটুফর্টন্যাস বোমারু, স্টেলথ জেট, এজিস ডেস্ট্রয়ার এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার সাবমেরিনের মতো যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অস্ত্রগুলি স্থাপনের বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সেসব কৌশলগত সম্পদ উত্তর কোরিয়ার অদূরে গুয়ামে রয়েছে।

এ অবস্থায়, উত্তর কোরিয়া যদি গুয়ামে হামলা করে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও সামরিক স্থাপনার বড় ধরনের ক্ষতি হয়, সে ক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়াকে বড় ধরনের মূল্য দিতে হবে। জাপান কিংবা কোরিয়ার কথা বাদই দিলাম, উত্তর কোরিয়ার উপর যুক্তরাষ্ট্রকে হামলা না করার জন্য চীন কিংবা রাশিয়ার কোনো কথা থাকবে না। অধিকন্তু, যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজে এমন একজন প্রেসিডেন্ট, নিজ দেশের স্বার্থ, বিশেষ করে পরাশক্তিকে সুরক্ষা দিতে উত্তর কোরিয়াকে আরেকটি হিরোশিমা বানাতে তিনি দ্বিধা করবেন বলে মনে হয় না।

বিজন সরকার : ভাষা গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

You Might Also Like